
ই-মেইল হলেও তার চিঠিভাব প্রবল। প্রেরক বাংলাদেশের খুব বিখ্যাত এক পদার্থবিজ্ঞানী। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইব্রাহীম। 'কিম্ভূত স্বদেশির অদ্ভুত বিদেশ' নামে গোলমেলে আর হিজিবিজি একটা বই লিখেছিলাম গেল বইমেলায়। কিছুদিন আগে হাত ঘুরে বইটা তাঁর কাছে গিয়ে পৌঁছায়। আর ফলস্বরূপ চমক লাগানো সুদীর্ঘ এক চিঠি। তবে বুক রিভিউ বললেও এতটুকু ভুল হবে না। এত বড় মানুষের অত বড় মন্তব্যে নিজেকে ছোট থেকে আরো ছোট মনে হচ্ছে। চিঠিটা নিচে তুলে দিতে চাই।
তবে তার আগে কিঞ্চিৎ ভূমিকা।
শিক্ষক বাবা-মা'র সুবাদে বেড়ে ওঠার পুরোটাই ক্যাম্পাসের ছায়াসুনিবিড় ফুলার রোডে। তিন তলায় আমরা আর চার তলায় দুই সন্তান নিয়ে ইব্রাহীম পরিবার। চার তলার এই বাসাটা আর দশটা বাসা থেকে আলাদা। এ বাড়ির এমাথা থেকে ওমাথা জুড়ে শুধু বইয়ের তাক। পেট মোটা, পেট চিকন, নানান কিসিমের বইয়ের আড়ালে দেয়ালের চুনকাম দেখা যেত না। আসবাবপত্রেরও বালাই নেই। এমন কি টেবিলে ফুলদানিও ব্রাত্য। কারণ সেটা থাকতো ন্যাশনাল জিওগ্রাফি আর রিডার ডাইজেস্টের হাল সংখ্যার বারোমাসি দখলে।
জীবনে যত বই পড়া হয়েছে, তার ষোলো আনার আট আনাই পড়েছি এই চার তলার বৈঠকখানার তাক থেকে।
কেরোসিন কাঠের সস্তা তাকে থরে থরে সাজানো থাকতো অমূল্য সব বই। কোনো তাকে ফেলুদা আর তোপসের পাশে বিনা বিরোধে দাঁড়িয়ে শার্লক হোমস আর ওয়াটসন। দেশি কমিক্স নন্টে-ফন্টে আর চাচা চৌধুরীরাও নির্বিবাদে মিলে ঝুলে থাকতো বিদেশী অ্যাজটেরিক্স আর আর্চি কমিক্সের সাথে। সেগুলোও গিলতাম গোগ্রাসে।
এতো গেল শিশুতোষ বই।
এদিকে শেক্সপিয়ার তক্ সত্যজিৎ, আন্তন চেখভ টু নিকোলাই গোগল, সিডনি শেল্ডন থেকে এরিখ মারিয়া রেমার্ক-কি না ছিল সেখানে। ভারিক্কি চেহারার রাশান অনুবাদের বইগুলো যেমন জাঁকিয়ে বসতো, তেমনি বঙ্কিম-শরৎ আর রবীন্দ্র-নজরুলও হুঁকো হাতে আয়েশ করে জুড়ে থাকতো অনেকখানি জায়গা নিয়ে। আবার বৃটিশ লেডি জেন অস্টিন, এমিলি ব্রন্টিদের সাথে পাল্লা দিয়ে রোকেয়া রচনাবলিও শোভা পেত সগৌরবে। কখনো ভুল করে বার্ট্রান্ড রাসেল পড়ে দাঁত ভাঙলে ফার্স্টএইড হিসেবে হাতের কাছেই মিলতো মুজতবা আলী।
কোন বই ৮+ আর কোনটা ১৮+ আঠারো প্লাস-এই পরোয়া বা পরোয়ানা ছিল না বড়দের তরফ থেকে। ছোটরা চ্যাঁওভ্যাঁও হল্লা না করে চুপচাপ বই পড়ছে, এতেই সবাই খুশি। তবে বই পড়ে কেউ বখে যায় না, এই বাঁচোয়া আর কি।
সব মিলিয়ে ফুলার রোডের চার তলা ছিল কল্পনার এক যাদুর জগত। রঙ্গিন মলাটের সাদা-কালো পাতা ওল্টাতেই রহস্য-রোমাঞ্চের কপাট খুলে যেত ক্যাঁচকোঁচ শব্দ তুলে। হাসি-আনন্দের ঠাস বুনটে ভরা শৈশব-কৈশোরের জন্যে বইপাগল এই পরিবারের কাছে তাই শত ঋনে ঋনী।
এবার কথার আর না বাড়িয়ে চিঠিখানা হুবহু তুলে দিতে মর্জি হয়ঃ
-----
"রিম,
তোমার বইটি পড়ে খুব মজা পেয়েছি । সেটি কী কী ভাবে তা তোমাকে জানাতে ইচ্ছা করলো।
প্রথমে ভেবেছিলাম তুমি ভ্রমণ কাহিনী লিখেছো, কিন্তু আরো এগিয়ে দেখলাম সেটি বড়ো কথা নয়, এখানে তুমি নিজের দৈনন্দিন কাজের জীবনটাকে এত রস-ঘন করে তুলে ধরেছ , যেই সব ব্যতিক্রমী চরিত্রগুলির ছবি এত মজা করে এঁকেছো উপভোগ্য হবার বড় কারণ ওখানেই। এগুলো শুধু পড়ার মজা নয় , এদেরকে ভোলাও যায়না। নিজেকে ইচ্ছে করে ঘোষণা দিয়ে কিম্ভুত করে দেখানোর ক্ষমতা একমাত্র ব্রিটিশদের মধ্যেই আগে দেখেছিলাম । প্রত্যেক ক্ষেত্রে এমন একটা ভাব দেখিয়েছো যেন জবু থবু থেকে সবার কথা শুনছ , খুব ভোরে মেট্রোর দৌড়ে অফিসে ছুটছো , অথচ পাতাল রেলের কাব্যটা তোমার কাছেই ধরা পড়ছে --, কী ভাবে বুদ্ধি করে মাতাল সামাল দেয়া যায় সেটি তোমার জানা , বিয়ার ফেসটে মেট্রো প্লাটফর্মের কিনারায় থেকে গড়িয়ে তাদের ট্রেনে কাটা পড়া থেকে তোমাকেই বাঁচাতে হচ্ছে , অন্যদের মতো না দেখার ভান করে চলে যেতে পারছনা।
তোমার আঁকা সব চরিত্রের সঙ্গে আমার বেশ ভাব হয়ে গেছে । বয়স্কা যে সেক্রেটারি পেত্রার সঙ্গে গাদা গাদি করে বসে অফিস করো , আর অপেক্ষা করো কখন নয়টা বাজলে ওয়ারকারদের যেতে দেখে জানালা খুলবে, যেই রাশিয়ান বাবুশকা মহিলা তোমাকে দব্র দব্র বলে চকোলেট খেতে দেয়, যেই আফগান ফেরত সৈনিক রবার্ট প্লেনে তোমার পাশে বসে বক বক করতে করতে তোমার হালাল বিরিয়ানি অর্ধেক খেয়ে ফেলে , সান ডিয়াগোর যেই হোমলেস ভিখারি কার্ডবোর্ডে লিখে রেখে সবাইকে জানায় তাকে যেন কেউ এখন অমুক দোকানের থেকে চিকেন উইং দিয়ে যায়, ওরা সবার সঙ্গে আমার এখন খুব পরিচয়।
আমার খুব মজা লেগেছে তোমার ছোট ছোট চিন্তা গুলো - ঘুম কাতর ভোরে চলে আসাতে কাজের মধ্যে ঘন ঘন হাসপাতালের ক্যান্টিনে কফি আনতে গিয়েই মুহূর্তে ছোট খাটো অদ্ভুত চিন্তা আর কথা হচ্ছে। রোজ রোজ বিস্বাদ জার্মান সবজি দিয়ে লাঞ্চ, শুক্রবার সকালে খ্রিস্টান ধর্মীয় নিয়মে মেনুতে মাছের আশ্বাসে মনটা ভালো হয়। পেরুর মহিলা অলগাও এই সুসংবাদটি তোমাকে দেয় , কয়েক ঘন্টা পর লাঞ্চে মাছ পাওয়ার সুসংবাদ। জানো আমারও অনেক সময় এমন ছোট খবরেও খুশি লাগে, তাই তোমার এই সরল খুশিটি এত ভালো লাগলো।
ল্যাবে হাজার ইঁদুর কাটা মানুষ তুমি , তোমার কাছে হঠাৎ গরম লাগা ল্যাবে আশপাশ না তাকিয়ে দিব্যি আইসক্রিম খেয়ে যাওয়া স্বাভাবিক । তোমাকে ঠেলে খোলা একটি বালতিতে ফরমালিনে ডুবিয়ে শুয়োরের বিরাট কাটা মুন্ড নিয়ে যাওয়ার দিকে লক্ষ্য নাই। ফরমালিনের সংঘাতিক কটু গন্ধের দিকেও তেমন না । আমার কাছে তোমার বর্ণনা এত জলজ্যান্ত হলো যে গন্ধটা আমিই পাচ্ছিলাম, অনেক আগে যে গন্ধ ছিপি দেয়া জার থেকে বেরিয়ে কাহিল করতো খোলা বালতি ভরা ফরমালিনে তা কত শত গুণ বেশি হবার কথা সেটি হিসেব করেই যেন আমার এই অবস্থা। টেবিলে বিশাল কাটা মুন্ডু, ড্রিল দিয়ে ফুটো করে ওরা অনেক চেষ্টায় গোলাপি রঙের একটু ঘিলু বের করতে পেরেছে। ভেবেছিলাম রাতে দুঃস্বপ্ন হবে , ভাগ্যিস হয়নি। ওই ল্যাবের পরিবেশ আইসক্রিম খেতে খেতে সহ্য করতে পারে , আবার তার বর্ণনাও এত মজা করে দিয়ে দুঃস্বপ্নের সম্ভাবনা ঘটাতে পারে , এরকম মানুষ কত জন আছে দুনিয়াতে ? তোমাকে অভিনন্দন ।
এখন নিশ্চয় বুঝতে পারছো তোমার লেখা কত দাগ কাটতে পারে । তোমার সরল মনের রসালো লেখা , নিজেকে গুটিয়ে রেখে লেখা, অনেক দূর যেতে পারে। মালটা, সান দিয়াগো এই দুটি , এবং অন্য কয়েকটির কাছাকাছি জায়গা দেখেছি বলে আমার দেখার সঙ্গে মিলিয়ে নিতে ভালো লেগেছে।
রুমি আর তাফসুকে শুভেচ্ছা জানাবে ( নাম বইয়ে যেমন পেয়েছি) । তোমাকে আবারও অনেক অভিনন্দন । লেখার অভ্যাসটি ছাড়বেনা , যতই ব্যস্ত থাকো না কেন , এটি তোমার ভালো বিনোদনও হতে পারে। তোমার যেই থীম ও স্টাইল সেটি বেশ বৈশিষ্ট্য পূর্ণ। চোখের সামনে যা দেখছো, বিজ্ঞানী হিসেবে, বিদেশে থাকার সুবাদে, তাতেই আশা করি অনেক দূর যেতে পারবে, তারপর নতুন নতুন থিম পেতেও কী অসুবিধা ।
যোগাযোগ রেখো এবং কিছু লিখলে পাঠিও।
অনেক শুভ কামনায় ,
ইব্রাহীম।"
সর্বশেষ এডিট : ০৭ ই নভেম্বর, ২০২১ সন্ধ্যা ৭:০০

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।




