somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

কেমন আছে আমাদের ‘বাংলা নাটক’

১৬ ই জুলাই, ২০১৫ সন্ধ্যা ৬:২৮
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

মাসখানেক আগের কথা। নাটকের দল ‘নাগরিক নাট্যঙ্গন’-এর দলনেতা লাকী ইনামকে জিজ্ঞেস করেছিলাম, ‘আমাদের দেশের অধিকাংশ ঘরেই কলকাতার নাটক দেখা হয়। তাহলে আমাদের নাটকের মান কি খারাপ?’

প্রত্যুত্তরে তিনি বলেছিলেন, ‘ইদানিং অনেক টিভি নাটকেই যাদেরকে অভিনয় করতে দেখি তাদের বাচন ভঙ্গি ভালো না। উচ্চারণ শুদ্ধ না। আবার অনেক নাটকে তো দেদারছে আঞ্চলিকতার প্রয়োগ করা হচ্ছে। ভালো নাটকের মানদন্ডে এগুলো কেমন সেটি দেখা ছাড়াও আগে দেখতে হবে আমাদের দর্শকরা সেসব নাটক গ্রহণ করছে কিনা। অনেকেই বলে কলকাতার নাটক দেখা যাবে না। কিন্তু সন্ধ্যার পর প্রায় সব বাড়িতেই তো কলকাতার সিরিয়াল চলে। সেগুলো তো চাইলেই আর বন্ধ করা যাবে না। কলকাতার অনেক আর্টিস্টদের চেয়ে আমাদের আর্টিস্টদের কোয়ালিটি অনেক ভালো। সুতরাং ভালো নাটক তৈরির বিষয়টি নিয়ে যত্মবান হয়া উচিত।’

লাকী ইনামের কথার সূত্র ধরেই বলি, আমাদের দেশে বর্তমানে যেসব নাটক তৈরি হচ্ছে সেগুলো নিয়ে নির্মাতারা আত্মতুষ্টিতে ভুগলেও দর্শকরা আসলে সেগুলো গ্রহণ করছেন কিনা তা নিয়ে তাদের মাথাব্যথা নেই। অধিকাংশ নির্মাতাই নাটক নির্মাণকে ক্রিয়েটিভের জায়গা থেকে বাণিজ্যিক জায়গায় নিয়ে গেছেন। একটি নাটক নির্মাণ করে তারা কত দ্রুত জনপ্রিয় হতে পারবেন, কত টাকা আয় করতে পারবেন এসব নিয়ে অনেকে ব্যস্ত।

অথচ আশি ও নব্বই দশকে বিটিভিতে জনপ্রিয় যেসব নির্মাতা ছিলেন, যেমন- মোস্তাফিজুর রহমান, মোস্তফা কামাল সৈয়দ, নওয়াজেশ আলী খান প্রমুখ নির্মাতাদের ধ্যান-ধারণায় ছিল কিভাবে স্বল্প লজিস্টিক সাপোর্টেও একটি ভালো নাটক দর্শকদেরকে উপহার দেয়া যায়। আউটদোরে শুটিংয়ের ব্যবস্থা সহজলভ্য না থাকায় বিটিভির নিজস্ব ভবনেই তারা সেট নির্মাণ করে সেখানে নাটক নির্মাণ করতেন। সে সব নাটকের গল্প ও নির্মাণশৈলী এতটাই স্ট্রং হতো যে দর্শকদের কাছে সেগুলো মোটেই একঘেঁয়ে লাগতো না।

উপরন্তু নাটকের অভিনয়শিল্পীরাও আগে থেকে রিহার্সেল করতেন, ডায়লগ মুখস্ত করে আসতেন। অথচ এখন যেন এসব বিষয় ভাবাটাও দুসাধ্য। কারণ এখন রিহার্সেল তো দূরে থাক, অধিকাংশ অভিনয়শিল্পীই নাটকের স্ক্রিপ্টই পড়ে শুটিং স্পটে আসেন না। অনেকে তো পারলে একই দিনে দুটি নাটকেরও শুটিং করেন। শিল্পী বলেন নির্মতার অনুরোধ, নির্মাতা বলেন চ্যানেলে ডিমান্ড আর চ্যানেল বলে স্পন্সরদের চাওয়া- এভাবেই বাংলা নাটকের দুষ্টু চক্র চলছে।

এজন্যই দেখা যায় একই সময় সব চ্যানেলেই একই অভিনয়শিল্পীর চেহারা। আর মজার ব্যাপার হলো, এর ফলে অধিকাংশ নাটকেই অভিনয়শিল্পীর চরিত্র যাই হোক না কেন, অভিনয় কিন্তু তিনি একই রকম করছেন। অর্থাৎ. চরিত্র অনুয়ায়ী অভিনয়ের যে বৈচিত্র্য থাকার কথা ছিল সেটি কিন্তু তিনি করছেন না। বরং কাজের চাপে তিনি জাস্ট ডায়লগই বলে যাচ্ছেন, আর এক্সপ্রেশন দিচ্ছেন সবগুলোতেই একই রকম। কারণ তিনি তো রিহার্সেল দূরে থাক, স্ক্রিপ্টই পড়ে আসেন নি। ফলে নাটকের মান যথারীতি ডাউন হচ্ছে আর দর্শকও আমাদের বাংলা নাটক থেকে মুখ ফিরিয়ে কলকাতার বাংলা নাটকের প্রতি আকৃষ্ট হচ্ছে।

অপরদিকে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় উল্লেখ না করলেই নয়, দিন কে দিন আমাদের নাটকের আর্থিক মূল্যমান চ্যানেলগুলো কমিয়ে দিচ্ছে। সাম্প্রতিক কালে দেশে যেন স্যাটেলাইট চ্যানেলের বিস্ফোরণ হয়েছে। দুই ডজনেরও উপরে চ্যানেল অনএয়ারে আছে। শীঘ্রই যুক্ত হবে আরো কিছু চ্যানেল। এতো চ্যানেল আসার ফলে স্বাভাবিক ভাবেই প্রচুর নাটকের প্রয়োজন দেখা দিয়েছে। আর এসব নাটকের জন্যও দরকার প্রচুর স্পন্সর। ফলে আগে যেখানে হাতে গোণা কিছু চ্যানেলে স্পন্সররা তাদের বিজ্ঞাপন ভাগ করতে পারতেন, এখন তাদেরকে ভাগ করতে হচ্ছে অনেক বেশি। এ কারণে স্পন্সরের আর্থিক হার কমে যাওয়ায় হাতে গোণা কিছু চ্যানেল ছাড়া অধিকাংশ চ্যানেলই কম মূল্যে নাটক কিনতে আগ্রহী। নির্মাতারা তো আর নিজে লস দিয়ে নাটক বানাবেন না, তাই তারাও কম রেটে নাটক বানাতে চান।

আবার অভিনয়শিল্পীদের অনেকেই এখন নিজেদের অভিনয়ের রেট বাড়িয়ে দিয়েছেন। ফলে চ্যানেল ও স্পন্সরদের ডিমান্ডের কারণে নির্মাতারা অভিনয়শিল্পীদেরকে উচ্চ রেট দিয়েই তাদের নাটকে কাস্ট করছেন। এতে করে খরচের লাগাম টেনে ধরার জন্য নির্মাতারা অন্যান্য দিকে হাত বাড়াচ্ছেন। যেমন- তারা নাট্যকারের পেমেন্ট কমিয়ে দিচ্ছেন, প্রোডাশনের খরচ কমাচ্ছেন বা বকেয়া রাখছেন, নতুন অভিনয়শিল্পীদের পেমেন্ট দিচ্ছেন না, অনেক সময় অনেক নতুন অভিনয়শিল্পীর কাছ থেকে অর্থও নিচ্ছেন প্রভৃতি।

ফলে আমাদের দেশে বাংলা নাটকের সাবলীল যে যাত্রা শুরু হয়েছিল আজ থেকে অর্ধ শতাব্দী আগে, আজ নানা কারণে সেই নাটকেরই গতিপথ পাল্টে যাচ্ছে। সুতরাং, নাটকের এসব অসঙ্গতি অচিরেই দূর না করলে আমাদের দেশের বাংলা নাটকের অস্তিত্বই হুমকির মুখে পড়বে।

[পাক্ষিক "সময়ের কারুকাজ" পত্রিকার ঈদ সংখ্যা-২০১৫ তে প্রকাশিত]
সর্বশেষ এডিট : ১৬ ই জুলাই, ২০১৫ সন্ধ্যা ৬:২৮
০টি মন্তব্য ০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

বিয়োগের রূপকথা

লিখেছেন ইসিয়াক, ২৯ শে সেপ্টেম্বর, ২০২৬ সন্ধ্যা ৬:৪৩



মা বরাবরই পাতে ভাত কম নিতো , বলতো- ভাতে না-কি  বাত বাড়ে।
বিশেষ বিশেষ দিনে বাড়ি পোষা মোরগের ঝোল কিংবা রুই মাছের তরকারীর সবটুকু  আমাদের... ...বাকিটুকু পড়ুন

দৃষ্টিকটু পোশাক ও দৃষ্টিকটু আচরণ

লিখেছেন ঠাকুরমাহমুদ, ২৯ শে সেপ্টেম্বর, ২০২৬ সন্ধ্যা ৭:১৪



আপডেট - হাফপেন্ট আন্দোলন: ৩০/০৯/২০২৬
হাফপেন্ট পরে মেট্রো ট্রেন ও বাসে চলাচল বাংলাদেশের একটি নাগরিক চাহিদা হতে পারে। যেহেতু সমস্যা মেট্রোতে হয়েছে, আমি ধারণা করেছি বাংলাদেশে ফেসবুকে “হাফপেন্ট আন্দোলন” হওয়ার সম্ভবনা... ...বাকিটুকু পড়ুন

কঠিনতম সব চ্যালেঞ্জের মুখে বিএনপির ভবিষ্যৎ কি অন্ধকার??

লিখেছেন শেহজাদ আমান, ২৯ শে সেপ্টেম্বর, ২০২৬ রাত ৮:১০



বিএনপির সামনে অনেক কঠিন সব চ্যালেঞ্জ...

তাদের মোকাবেলা করতে হচ্ছে দ্বিমুখী বিরোধী-দলীয় রাজনীতি বা কর্মকাণ্ড (যেটা কিনা বাংলাদেশের রাজনীতিতে আগে কখনো দেখা যায়নি)।

জামাত-এনসিপি যতই লীগের ফিরে আসার বিরুদ্ধে বিএনপির... ...বাকিটুকু পড়ুন

আমার নানা মরহুম শাহাবুদদীন মাহমুদ জায়গীরদার

লিখেছেন সত্যপথিক শাইয়্যান, ২৯ শে সেপ্টেম্বর, ২০২৬ রাত ৯:২৫



আমার আম্মার সেঝ চাচা’র লেখা ‘My life is not mine’ বইটি পড়ছি। বইটিতে ‘মাইজম ভাই’ নামের একটি অধ্যায় আছে। এতে সেঝ নানা আমার নানার বিভিন্ন সত্য... ...বাকিটুকু পড়ুন

মৃত্যু পেরিয়ে আবার ব্লগে------

লিখেছেন মোঃ মাইদুল সরকার, ৩০ শে সেপ্টেম্বর, ২০২৬ দুপুর ১:০৬




প্রায় ০৩ মাস হয়ে গেলো ব্লগে আসনা হয় না, আসা হয়না মানে লিখা হয়না। প্রিয়জনের মৃত্যু শোক কাটিয়ে ব্লগে উকি দেওয়া হয় কিন্তু পোস্ট দেওয়া হয় না।


গত... ...বাকিটুকু পড়ুন

×