১৯৭৪ সাল। হঠাৎ করেই সুযোগ হয়ে গেল বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে সাক্ষাতের। তারিখ মনে আছে, লেখাও আছে ডাইরিতে। ৩ রা ফেব্রুয়ারির সকাল নটা। তার ধানমন্ডির ৩২ নম্বর সড়কের বাড়িতে সাক্ষাতের সময় নির্ধারিত হয়েছে। আমরা ঠিক সময়ে গিয়ে হাজির হলাম। বাংলা একাডেমীর তৎকালীন মহাপরিচালক ড. মযহারুল ইসলাম, লেখক-সাংবাদিক ও আমাদের বন্ধু রাহাত খান, আমি আর বাংলা একাডেমীরই সংস্কৃতি বিভাগের জনাব ম. জিল্লুর রহমান।
তার নিজের বৈঠকখানায় তখন অনেক লোক। বঙ্গবন্ধু লুঙ্গি পরা, পাঞ্জাবি গায়ে, তার ওপরে বাদামী রংয়ের একটা শাল জড়ানো; হাতে পাইপ আর তার প্রিয় এরিনমোর তামাকের কৌটা। আমাদের দেখে প্রবল ব্যক্তিত্বসম্পন্ন বিশাল মানুষটির মুখ উজ্জ্বল হাসিতে ভরে গেল। অন্যদের বললেন, না, আজ আর কোনো কথা নয়, তোমরা আস এখন, আমি এদের জন্যে সময় দিয়ে রেখেছি। এদের সঙ্গে নিরিবিলতে কিছু জরুরি আলাপ করবো।’ বৈঠকখানা ভর্তি লোক ইচ্ছায় অনিচ্ছায় নিষ্ক্রান্ত হতে থাকলেন। তিনি বললেন, না, এখানে বসবো না। তাহলে কেউ না কেউ আসবেই। আমি মন খুলে কিছু কথা বলতে চাই।’
তাকে খুব সুন্দর আর প্রাণবস্ত লাগছিলো। তিনি উঠলেন। ধিরে এগুলেন ডানদিকে তার পাঠকক্ষের দিকে। আমরা তাকে অনুসরণ করছি সম্মোহিতের মতো। পাঠকক্ষের ভেতরে এসেব একটা আলমারির সামনে দাড়ালেন এবং অভ্যস্ত হাতে বের করলেন মাও সেতুংয়ের একটা বই। তার ঘুরে দাড়ালেন ডঃ ইসলামের দিকে। মুচকি মুচকি হাসতে হাসতে বললেন, শুধু রবীন্দ্রনাথ না, আমি নজরুল সুকান্ত এমনকি মাও সেতুংয়ের রচনাও মনোযোগ দিয়ে পড়ি। আমাদের স্বাধীনতা সংগ্রামে চীনের ভূমিকা তো...। তিনি সে কথা শেষ করতে দিলেন না। বললেন- দুটো বিষয় তো আলাদা। মাও একজন খুব বড়ো নেতা। জীবনে বহু সংগ্রাম করেছেন। তার জীবন ও চিন্তাটা জানা ও বোঝা দরকার। একটা অনুন্নত বিশাল দেশকে তিনি স্বাধীনতা এনে দিয়েছেন। সে দেশটায় এত মানুষ হওয়া সত্ত্বেও কত উন্নত হয়েছে। এই ব্যাপারটা কীভাবে ঘটেছে তা উপলব্ধি করার চেষ্টা করছি।’
হঠাৎ তার মুখে একটু বেদনার ছায়া পড়লো। কিছুক্ষণ চুপ করে থাকলেন। তারপরে বললেন- রাজনীতি বড় জটিল, নিষ্ঠুর। এর ফলে কত অস্বাভাবিক ঘটনা ঘটে। তা না হলে চীন আমাদের সমর্থন না করার কোনো যুক্তিই নেই। চীন খুব অন্যায় কাজ করেছে। থাক গে, আসুন প্রফেসর সাহেব, বসে বসে কথা বলি।’ বঙ্গবন্ধু বসনলেন, প্রফেসর ইসলাম এবং আমরাও বসলাম। তিনি বললেন- বলুন ফ্রফেসর কী মনে করে এসছেন?’ ড. ইসলাম বললেন- বঙ্গবন্ধু, আমরা বাংলা একাডেমী থেকে একটি আন্তর্জাতিক সাহিত্য সম্মেলনের আয়োজন করছি, বিভিন্ন দেশ থেকে বিখ্যাত সাহিত্যিকরা আসবেন। আপনাকে সম্মেলনে প্রধান অতিথি হিসেবে পেতে চাই।’ তিনি যেন আকাশ থেকে পড়লেন! তার প্রত্যুত্তর ঃ আমি সাহিত্যের কি বুঝি! আমি কি বলবো! একজন প্রবীণ ও সর্বজন শ্রদ্ধেয় সাহিত্যিক বা প-িতকে দিয়ে এ কাজ করান, সম্মেলনের মর্যাদা বাড়বে। আগে তো তাই হতো। ছাত্র জীবনে দু’একবার সাহিত্য সম্মেলনে যোগ দিয়েছি। কই রাজনৈতিক নেতারা তার উদ্বোধন করেছেন বলেতো মনে পড়ে না’। এই বলে তিনি হাসলেন, পরিস্থিতিকে একটু সহজ করার জন্য বললেন- আমি রবীন্দ্রনাথ পড়ি, ভালোবাসি তাকে, সাহিত্যে আমার পুঁজি তো ওইটুকুই। এই পুঁজি নিয়ে দেশে-বিদেশের বড়ো বড়ো প-িত ও সাহিত্যিক-শিল্পীদের মধ্যে যেতে আমি সংকোচবোধ করছি।’
তাকে বলা হলো ঃ এটা স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম জাতীয় সাহিত্য সম্মেলন। এর একটা ভিন্ন তাৎপর্য রয়েছে। আপনি সম্মেলন উদ্বোধন করলেন তা আন্তজার্তিক মর্যাদা লাভ করবে । তাছাড়া গণতন্ত্র, মত প্রকাশের স্বাধীনতা ও মানবাধিকতার প্রশ্নে আপনার ও আপনার সরকারের দৃষ্টিভঙ্গিরও প্রতিফলন ঘটবে।’ তিনি একটু ভাবলেন, বললেন- ঠিক আছে, যাবো। আমার বন্ধু জসীম উদ্দীন ও শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিনকেও বিশেষ মর্যাদায় আমন্ত্রণ জানাবেন। আর একটা ছোট ভাষণ প্রস্তুত করে আমাকে দেখিয়ে নেবেন।’
ড. ইসলাম খোন্দকার মোহাম্মদ ইলয়াস, সন্তোষ গুপ্ত, রাহাত খান ও আমি সেই ভাষণটি প্রস্তুত করি। যা-হোক, সম্মেলন প্রসঙ্গ স্বল্প সময়ে বেশ করে তিনি বললেন, আপনারা সাহিত্যিক-সাংবাদিক, সংস্কৃতি-কর্মী ও গবেষক। ভবিষ্যতে আপনার হয়তো মুক্তিযুদ্ধ বা বাংলাদেশ নিয়ে লিখবেন, তাই আমি আজ কিছু কথা বলতে চাই।’ তিনি ‘বাংলাদেশ’ নাম কীভাবে ঠিক করেছিলেন, দেশকে স্বাধীন করার চিন্তা তিনি যে সেই পঞ্চাশের দশক থেকেই শুরু করেন সে কথাও বললেন। ‘সোনার বাংলা’ কে জাতীয় সঙ্গীত করবেন এ স্বপ্ন তার বুকের ভেতরে আলোর মতো জ্বলতো। এ গান শুনলে তিনি রোমাঞ্চিত, আবেগাপ্লুত হতেন, তাও জানালেন। ঠিক মনে পড়ছে না, রাহাত খান অথবা আমি আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলার কথা তুললাম। তিনি আবার হাসলেন। বললেন- কিসের ষড়যন্ত্র! বলো, আমাদের স্বাধীনতার প্রয়াস।’ এরপর এ প্রসঙ্গে বিস্তৃত বিবরণ ও ব্যাখ্যা তুলে ধরেন। তার সার কথা এ রকম- আগরতলায় আমি ঠিকই গিয়েছিলাম। বৃষ্টিতে ভিজতে হয়েছিলো। একটু জ্বরও হয়েছিলো। অনেকটা পথ হেটে যেতে হয়। আমার পা ফুলে গিয়েছিলো। তবে নেতাদের সঙ্গে গুরুত্বপূর্ণ কথাবার্তা ও ফলপ্রসূ আলোচনা হয়।’
১৯৭১-এর স্বাধীনতা প্রসঙ্গে তিনি বলেন- ২৫শে মার্চ (১৯৭১) রাতে আমি গ্রেফতার হবার আগে স্বাধীনতার ঘোষণা দেই। পুলিশ হেডকোয়াটার্সের মাধ্যমে অয়্যারলেসে সে ঘোষণা সব জেলা সদরে পাঠানো হয়। আমি বিভিন্ন চ্যানেলে ভারতের সঙ্গেও যোগাযোগ করে যাই। তা না হলে তোমরা অত সহজে অস্ত্র ও সাহায্য সহযোগিতা পেতে না।’ আমরা প্রশ্ন করলাম- কিন্তু আপনি কেন ওদের হাতে ধরা দিলেন?’ তিনি বললেন- এ ব্যাপারে আমার বেশ কটি চিন্তা কাজ করেছে। এক: আমাকে ধরবে না পারলে ওরা আরো বেশিলোককে খুন করতো; দুই: আন্তর্জাতিকভাবে আমরা বিছিন্নতাবাদী ও ভারতের কীড়নক বলে প্রমাণিত হতাম এবং এতে আন্তর্জাতিক সহমর্মিতা কমতো এবং আরো বেশি দেশ আমাদের আন্দোলন সম্পর্কে সহেন্দ পোষণ করতো। আর একটা কথা বলি, তোমরা কিভাবে নেবে জানি না, প্রফেসর সাহেব আমার সঙ্গে একমত হবেন কিনা তাও বলতে পারি না, তবে আমার সুদৃঢ় বিশ্বাস আমি পাকিস্তানীদের হাতে বন্দি থাকায় আমার দুঃখী বাঙালিদের মধ্যে দুশ্চিন্তা, উদ্বেগ যেমন বেড়েছে তেমনি মানুষ আমার অনুপস্থিতিতে আমার একটা বিশাল প্রতীক মনে মনে তৈরি করে নিয়েছে। এটা ছিলো মুক্তিযুদ্ধের খব বড়ো একটা শক্তি। আমি প্রবাসী সরকারে থাকলে শুধু প্রমাণ সাইজের মুজিবই থাকতাম। ওদরে হাতে বন্দি থাকায় আমি এক মহাশক্তিধর ও বাংলাদেশের সকল মানুষের প্রাণপ্রিয় নেতার ভূমিকায় স্থান পাই। মানুষ আমার নাম নিয়ে হেলায় হেসে প্রাণ বিসর্জন দিয়েছে। কী অমোঘ অস্ত্র ছিলো, ‘জয়বাংলা’ স্লোগান। ওরা যদি আমাকে মেরে ফেলতো, তাহলে আমি আরো বড়ো প্রতীকে পরিণত হতাম। বাংলার মানুষ আরো লড়াকু হয়ে যুদ্ধ করতো। তাছাড়া, আমার জাতি আমাকে যে মর্যাদা দিয়েছে তার প্রতি সম্মান রেখেই আমি আমার বুঝমতো ব্যবস্থা নিয়েছি, আর আমার দেশবাসী ও যোগ্য সহকর্মীররা মুক্তিযুদ্ধ চালিয়েছে।’
আলাপের এ পর্যায়ে এসে আমি জিজ্ঞেস করি, আরো খোলামেলা কথা বলার সুযোগ আমাদের আছে কি না। তিনি বললেন- সবাইকে বিদায় করে তোমাদের নিয়া বসছি। আমার অন্তর খোলাসা করেই বসছি। তোমরা বাংলা একাডেমীর লোক, তোমরা লেখ, গবেষণা কর, আমি তো তোমাদের কাছেই প্রাণ খুলে কথা বলতে পারি। ভবিষ্যতে তোমরা ইতিহাস লিখলে এই সব কথা খুব কাজে লাগবে। তোমরা সত্য ইতিহাস লিখতে পারবে।’
আমরা বললাম- সমাজের মূল্যবোধ ও বাঁধন তো ভেঙে পড়ছে। নৈরাজ্য, হতাশা দেখা দিচ্ছে। সাম্প্রদায়িকতা বাড়ছে। ছিনতাই, রাহাজানি মানুষকে আতঙ্কিত করছে।’ তিনি একটু চুপ করে থাকলেন, মনে হলো গভীরভাবে ভাবছেন। তারপর উজ্জ্বল হাসি হেসে মুখে নিলেন পাইপ, ঘন ঘন ক’টা টান দিলেন তাতে। তারপর মুখ খুললেন- তোমরা অনেক পড়াশোনা করেছ, অনেক কিছু বোঝ। কিন্তু নিজ দেশের কতগুলি বাস্তব ব্যাপার তোমরা যেন দেখতে পাও না। দেশে এতবড় একটা যুদ্ধ হয়ে গেল। যুদ্ধ মানুষের মূল্যবোধ আমূল বদলে দেয়। মানুষকে বেপরোয়া, লাগামহীন করে। আমাদের দেশেও সেটা হয়েছে। হাইজ্যাক, ডাকাতি বেড়েছে, ‘চাটার দল’ বেড়েছে। এই সব একদিনে দমন করা যাবে না। এটা একটা নতুন পরিস্থিতি। অনেকে অস্ত্র জমা দেয় নাই। ইসলামী দলগুলি আগাগোড়া আমার বিরুদ্ধে গোপন প্রচার করছে, বেনামা পুস্তিকা ছাপছে। জাসদ-এর বিভ্রান্ত অংশ বিপ্লবের নামে কি না করছে? দুস্কৃতকারীরা পাটের গুদামগুলি পুড়িয়ে দিয়ে অর্থনীতিকে কাবু করছে। থানা আক্রমণ করে অস্ত্র লুটে নিচ্ছে। আমার লোকদের হত্যা করছে। অথচ তিন বছরে আমরা যা করেছি আমাদের মতো বিধ্বস্ত অন্য কোনো দেশ তা পারতো না। এজন্য আমাদেরকে প্রশংসা করে না। কী অবস্থঅ করে রেখে গেছে পাকিস্তানি হানাদাররা? দেশটা ছিল ভাঙাচুরা; এটা শ্মশান যেন। কি আর বলবো, হুজুর (মওলানা ভাসানী) মুরুব্বী মানুষ, তিনি যে সব বক্তৃতা বিবৃতি দিচ্ছেন তাকে লুফে নিচ্ছে সাম্প্রদায়িক দল ও ব্যক্তিরা। তারা তাকে শিল্ড হিসেবে ব্যবহার করে শয়তানের হাসি হাসছে। এই সব দেখেশুনে মনে হয় তাজউদ্দীনদের হাতে ক্ষমতা দিয়ে ভোলা বা মনপুরায় গিয়ে ছোট ঘর বানিয়ে থাকি।’ ...তার কণ্ঠে তখন মৃদু ক্ষোভ ও হতাশার সুর।
নেতার এই আকস্মিক বেদনা ও হতাশায় আমরাও কিছুক্ষণের জন্যে বিমূঢ় হয়ে যাই। ড. ইসলাম বলেন- বঙ্গবন্ধু, আমরা তো আছি, সারা দেশে আপনার হাজার হাজার কর্মী ও সমর্থক আছে, আপনি হতাশ হচ্ছেন কেন! কঠোর হোন। নির্দেশ দিন।’ তিনি বললেন- ডাক্তার সাহেব, বাংলাদেশ বড় কঠিন জায়গা। মনে হয় যেন বাঘের পিঠে চড়ে বসেছি। পারি, পারি সব ঠিক করে দিবার পারি। কিন্তু কি করবো, মনে হয় কার গায়ে হাত দেবো, সবারই পরিবার পরিজন আছে। তখন আপনারাই আসবেন আবার তদবির নিয়ে। কিন্তু বেশি দিন তো সহ্য করা যাবে না। শক্ত একটা কিছু করতে হবে। আমি ‘লাল ঘোড়া দাবড়াইয়া দিতে চেয়েছিলাম। তা দিতে চেয়েছিলাম ‘চাটার দলের ওপর’, কেউ কেউ তা পছন্দ করলো না। আমার সমালোচনা করলো। তাহলে আমি যাই কোথায়! এইজন্যই তো বলি, সব ছেড়ে দিয়ে ভোলা মনপুরা চলে যাই।’
আমরা এবার অর্থনৈতিক প্রশ্ন তুলি। তিনি বললেন- আমি দেশের সেরা অর্থনীতিবিদদের নিয়ে পরিকল্পনা কমিশন করেছিলাম। তারা তো আমার স্বপ্ন বাস্তবায়ন করতে পারলো না। আসলে তত্ত্ব আর বাস্তবের মধ্যে পার্থক্য অনেক। ওরা (পরিকল্পনা কমিশনের সদস্যরা) ভালো লোক, প-িত কিন্তু আমাদের গ্রামবাংলা আর গ্রামীণ অর্থনীতির সঙ্গে বোধ হয় এদের ভাল পরিচয় নাই। আমি ‘সোনার মানুষের’ কথা বলি। আমার কৃষকেরাই শুধু সোনার মানুষ। তারা সারা বছর হাড়ভাঙা পরিশ্রম করে ফসল ফলায়, ঘরবাড়ি বানায়, নৌকা চালায়, তবেই না আমরা বাবু সেজে পায়ের ওপর পা তুলে আরো কত বড়ো হবো তার খোয়াব দেখি। তেমনি মুটে মজুর, জেলে, কামার কুমার তারা আমাদের সমাজ ও অর্থনীতিকে টিকিয়ে রেখেছে। তা না হলে সব ভেঙে পড়তো। আমরা সমাজতন্ত্রের কথা বলেছি, সমবায়ের কথা বলেছি। দেশের যা অবস্থা, মধ্যবিত্তের যা খাই খাই ভাব তাতে সফল হবো কি না জানি না। চেষ্টা করছি। আমি ভিয়েতনামকে দ্রুত স্বীকৃতি দিয়েছি। হোচিমিন কত বড়ো নেতা আর খাঁটি মানুষ; তারা কি করছেন সেখান থেকে শিক্ষা নেবার চেষ্টা করছি, বড়ো বড়ো ইন্ডাস্ট্রি করে বোধ হয় খুব সুবিধা করতে পারবো না। শিল্পকারখানা থাকবে অর্থনীতির সহায়ক শক্তি হিসেবে দ্বিতীয় স্থানে, আমি সমবায় ও কৃষিভিত্তিক ছোট ছোট প্রকল্পে হাত দিতে চাই। ঔপনিবেশিক কাঠামোটা ভাঙতে চাই। তবে সে বড় কঠিন কাজ। আমার কিছু এমপিই জমির শিলিং ১০০ বিঘা করার বিপক্ষে।’
হঠাৎ তিনি কিছুটা যেন উদ্দীপিত হয়ে ওঠেন। রাতাহ আর আমার দিকে তাকিয়ে বলেন- তোরা হতাশ হবি না। প্রফেসর সাহেব, আমার এই কথাটা খুব মন দিয়ে শোনেন। বাঙালি খুব গরিব, দরিদ্র, আমার ভাষায় দুঃখী। আমি যতটা ইতিহাস পড়েছি, তাতে জেনেছি হাজার বছর ধরেই বাঙালি দুঃখী, অভাবী। তার বিত্ত নাই, বেসাত নাই। হাতে পয়সা নাই। কিছুদিন আগে একটা উপন্যাস পড়ছিলাম, ‘কলকাতার কাছেই’ তাতেও আছে বাঙালি কাঁচা পয়সার কি কাঙাল। একটা পয়সার জন্য কি ‘কেগিভেগি’ (অনুনয়-বিনয়) করতো। মনে হয় শায়েস্তা খার আমলেও বাঙালি কাঙালিই ছিলো। সস্তা হলেও কোনো জিনিস সে কিনতে পারেনি। ডাক্তার সাহেব, এরা তো (অর্থাৎ আমরা) সে দিনের ছাওয়াল। এরা বুঝবে না। কিন্তু আপনি আমি জানি। বাঙালির, বিশেষ করে কৃষিজীবী মুসলমান বাঙালির হাতে কোনো কাঁচা পয়সা থাকতো না। ধান কাটার মরশুমে পেট পুরে গরম ভাত খেতাম। আর পাটের সময় হলে পাট বিক্রি করে কিছু নগদ পয়সা জুটতো। এই টাকা দিয়ে আমাদের বাবা চাচারা ইলশা মাছ কিনে আনতেন। মা চাচীর জন্য শাড়ি আর নিজেদের জন্য কিনতেন লুঙ্গি। আমাদেরও নতুন কাপড় জুটতো। বছরের পাটের মরশুমে ওই একবারই। এইতো বাঙালি মুসলমানের অর্থনৈতিক অবস্থা।’ এই অবস্থাটা মনে রেখে ভাবো স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশের কথা। প্রকৃত অর্থে এই প্রথম বাঙালিরা সাত্যিকার অর্থে স্বাধীন হয়েছে এবং এই প্রথম বাঙালির হাতে কিছু নগদ পয়সা আসছে। ব্যাপারটা খুব তাৎপর্যপূর্ণ। এর একটা উত্তেজনা আছে।, বাঙালি বিশেষ করে তরুণরা এখন বাঁধনহারা। সমাজ পরিবর্তনের প্রবল ও আকস্মিক ধাক্কায় দিশাহারা। কেউ গাড়ি কিনছে, কেউ ফাইভ ফিফটি ভাইভ ফুঁকছে, কেউ ছিনতাই হাইজ্যাকসহ নানা আকাম-কুমাম করছে। অবাধ স্বাধীনতার এই আকস্মিক স্বাদ ও হাতে আসা নগদ অর্থ দিশাহারা করেছে অনেককে। ধিরে ধিরে রাষ্ট্রী আইন-কানুন ও প্রতিষ্ঠান তৈরি করে এদের দায়িত্ব-সচেতন করা হবে, নিয়ন্ত্রণে আনা যাবে। আনতে হবে। দেশটা তো শুধু মধ্যবিত্তের না, আমার গরিব দুঃখী মানুষের। আসল ত্যাগ তো তারাই স্বীকার করেছে। তাদের অবস্থার পরিবর্তন যদি করতে পারি তবেই অর্থনৈতিক মুক্তি আসবে। আমার দেশের মানুষ আমাকে জাতির পিতা বলে, কতজন আমার জন্য রোজা রেখেছে, জান দিয়েছে, আমার দায়িত্ব বড়ো বেশি। ডাক্তার সাহেব, আপনারা সাহায্য করেন, সোনার মানুষ দেন, আমি সোনার বাংলা গড়ে তুলি।’
সেদিনের মতো আমাদের সঙ্গে তার আলাপ এভাবেই শেষ হলো। তিনি তার ক্যামেরাম্যান আলমকে ডাকলেন। নতুন যে ক্যামেরা কিনে দিয়েছেন তা ঠিকমতো কাজ করছে কিনা জানতে চাইলেন। পরে আমাদের সঙ্গে ছবি তুললেন। আলমকে বললেন- এই ছবির কপি বাংলাএকাডেমীতে এদের পৌঁছে দিবি। এই ছবির আলাদা গুরুত্ব আছে।’
না, আলম সাহেব আমাদের কোনো ছবি দেননি। জিল্লুর রহমান বহুদিন তার কাছে ঘুরেও সে ছবি আদায় করতে পারেননি। আমরা সবাই বঙ্গবন্ধুর আদেশ নির্দেশ ও কথা এভাবেই অমান্য করেছি। মহান, সেজন্যই আন্তরিক ও সরল মানুষটি কাউকে অবিশ্বাস করতে পারেননি। তিনি বোধ হয় রবীন্দ্রনাথের ওই বিখ্যাত উক্তি ‘মানুষের প্রতি ব্বিাস হারানো পাপ’-এ প্রবল আস্থা রাখতেন। এটাই তার জন্য কাল হয়েছিলো। তিনি ডালিমদেরও বিশ্বাস করেছিলেন। বাড়িতে এসে ঘুরেফিরে সবকিছু দেখতে দিয়েছিলেন।
[দুই]
বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে আমাদের দ্বিতীয়বার আলাপের সুযোগ ঘটে কিছুকাল পরেই এবং সেটাও বাংলা একাডেমীর কাজেই। তখন একাডেমীর মহাপরিচালক ড. নীলিমা ইব্রাহীম, আমাদের শ্রদ্ধেয়া নীলিমা আপা। তিনি নিয়োগ পেয়ে সৌজন্য সাক্ষাৎ করতে যান বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে। একাডেমীর কয়েকজন সিনিয়র অফিসারকেও তিনি সঙ্গে নেন। আমিও সেই দলে ছিলাম। আমাদের সাবেক সহকর্মী ও গল্পলেখক আবুল হাসনাতাও ছিলেন তাতে। হাসনাত তখন বঙ্গবন্ধুর ওপর খুব ক্ষুব্ধ। তিনি তার ‘বাবাই দায়ী’ গল্প গ্রন্থে এই ক্ষোভের কিছু ছোপ দিয়েছেন। আমি তাকে বলি, ‘চড়ষরঃরপং রং ধ ফরভভরপঁষঃ মধসব.’ ভেতর থেকে না দেখলে সবকিছু বোঝা যায় না। তিনি আমাদের কথায় আশ্বস্ত হন না। তো, আমি, তাকে বলি আমাদের দলের সঙ্গে তুমিও চলো। তোমার ক্ষোভে অভিযোগ সামনা-সামনিই বলবে। আবুল হাসানাত বলে- হ্যাঁ, যেয়ে ওই সব ক্ষোভ জানিয়ে চাকুরিটা হারাই! আমি বলি- তোমার চাকুরি রাখার দায়িত্ব আমি নেব। ‘তিনি শেষ পর্যন্ত রাজি হন এবং আমরা নীলিমা আপার নেতৃত্বে বঙ্গবন্ধুর ধানম-ির বাড়ির নিচের তলায় ড্রয়িং রুমে কথা বলি। প্রথমে আপা সৌজন্য বিনিময় করেন। একাডেমী কেমন চলছে বঙ্গবন্ধু জানতে চান। নিয়ম-কানুন যে আগে তেমন মানা হয়নি সে প্রসঙ্গ ওঠে। বঙ্গবন্ধু ইঙ্গিতটি বোঝেন এবং কোনো নাম উচ্চারণ না করে বলেন- হ বইন, বুঝছি সব দোষ আমার। যত দোষ নন্দ ঘোষ।’ তিনি একটু বিড়বিড় করে বলেন- কি আরকরবো, যেখানে যাকে সবাই সেখানেই সে সমস্যার সৃষ্টি করে। ‘আপা একাডেমীর জন্য সাহায্য সহযোগিতা চাইলেন। বঙ্গবন্ধু বললেন- বাংলা একাডেমীর কোনো সমস্যা হবে না।’
সেদিন বঙ্গবন্ধু খুব ব্যস্ত ছিলেন, শেষ দিকটায় কথা হলো দাড়িয়ে দাড়িয়ে। আমি হাসতানকে নিয়ে সামনে গিয়ে দাড়ালাম। বঙ্গবন্ধু আমার কাধে হাত রাখলেন। মনে হলো পিতৃ¯েœহের পরশ পাচ্ছি। অন্য একটা হাত বাড়িয়ে হাসনাতের বুকের মধ্যে মৃদু আঙুল ঠেকিয়ে কথা বলতে থাকলেন। আমি হাসানাতের চোখের দিকে তাকালাম। সে চোখে তখন কোমল, কমনীয় ¯িœগ্ধতা। আবেগে সে বিন¤্র হয়ে উঠেছে। কোনো কথাই সে বলল না। বঙ্গবন্ধু কথা শুধু শুনে গেলো।
সাক্ষাৎকার শেষে বেরিয়ে এসে বলাল- কই হাসানাত, তুমি যে কিছুই বললে না?’ হাসানাত বলল- এ যে রাজনৈতিক যাদুকর। আমাকে মুগ্ধ, অভিভূত করে ফেললেন। কোনো কথাই মুখ থেকে বের করতে পারলাম না। অত বড়ো ব্যক্তিত্ব আর আন্তরিকতার নিজস্ব ধরন দিয়ে আমাকে একেবারে গলিয়ে ফেললেন।
[তিন]
বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে আমার তৃতীয় সাক্ষাৎকারটি ঘটে ১৯৭৫-এর জুনে, শেরে বাংলা নগরে, তার অফিস তৎকালীন গণভবনে। আমাকে তার কাছে নিয়ে যান শ্রদ্ধেয় প্রফেসর কবীর চৌধুরী। কবীর স্যারের নেতৃত্বে আমরা ক’দিনের মধ্যেই মস্কো যাবো সে ব্যাপারেই সাক্ষাৎ করতে যাওয়া। আমরা আফ্রো-এশীয় লেখক সম্মেলনে যোগ দেবার জন্য যাচ্ছিলাম। দলটি গঠিত হয়েছিলো চারজনকে নিয়ে, বাকি দু জন খোন্দকার মোহাম্মদ ইলিয়াস ও মোস্তফা সারওয়ার। এত ছোট দেশ থেকে এত বড়ো দল সাধারণত যায় না। দু’জনই যথেষ্ট। কিন্তু ঢাকায় এই সংস্থার এশীয় সদর দফতর খোলার কথাবার্তা হচ্ছিলো বলে বঙ্গবন্ধুর ইচ্ছাতেই দলটি বড়ো হয়। তৎকালীন সোভিয়েত সরকার দলটির সমস্ত খরচ বহন করে। ঢাকার তখনকার সোভিয়েত দূতাবাস নিশ্চিত হতে চাইছিলো, বঙ্গবন্ধু চারজনকে পাঠাতে চান কিনা। এই দূতাবাসের দ্বিতীয় সচিব আলেকজান্ডার পার্সিন বঙ্গবন্ধুর সচিবালয়ে এসে এ বিষয়ে একদিন আলাপ করে যান।
তো, কবীর স্যার ও আমি যখন তার ঘরে ঢুকি তখন তাকে একটু উত্তেজিতভাবে পায়চারি করতে দেখি। একবার তিনি চাপা স্বরে উচ্চারণ করেন- আমার সঙ্গে ডিপ্লোম্যাসাী, (শুনেছি তার সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে এসেছিলেন একটি প্রতিবেশি দেশের হাই কমিশনার); অবশ্য, কবীর স্যারকে দেখেই খুবই আগ্রহ ও আন্তরিকতার সঙ্গে এগিয়ে এসেতাকে ধরে নিয়ে সোফায় বসান তিনি। আমিও বসি। তখন ভেতরে ছাত্রলীগের কিছু ছেলেও ছিলো। তাদের মধ্যে একজন বঙ্গবন্ধুকে বলে- আপনি ছাত্র ইউনিয়নের সম্মেলনেও তো গেলেন। তিনি আবার উত্তেজিত হলেন। বললেন- যাব না কেন? আমি কি শুধু তোমাদের নেতা? আমি সকলের। তা না হলে তো আমি জাতির পিতা হতে পারতাম না।’ আরো বললেন- তোমাদের কাজে আমি সন্তুষ্ট হতে পারি না সব সময়। ছাত্র ইউনিয়নের ওরা পরিশ্রমি, নিষ্ঠাবান, ত্যাগী। ওরা সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে সীডবেড করে উৎপাদন প্রক্রিয়ার সঙ্গে নিজেদের যুক্ত করেছে। আমি একটিমাত্র জাতীয় পার্টি করছি। ত্যাগী সৎ লোকরা কাজের মাধ্যমে সেই পার্টির সামনের কাতারে আসবে। অকর্মণ্য গলাবাজরা পেছনে পড়বে। দেখ না আমি আলতাফ সাহেবকে মন্ত্রী করেছি। অমন একটা লোক পাওয়া ভাগ্যের কথা।’ ছেলেরা চুপ হয়ে গেলো। তিনি বললেন- এবার তোমরা যাও, প্রফেসর সাহেবের সঙ্গে আমার জরুরি কথা আছে।’
তিনি আমার দিকে ফিরে বললেন- তিনজনকে আমি আগেই ব্রিফ করেছি। তখন তুমি ছিলে না, প্রফেসর সাহেব তোমাকে নিয়ে এসে ভালই করেছেন। তুমি দলের বয়োকনিষ্ঠ সদস্য। দলনেতার নির্দেশ মতো চলবে। দেশের সুনাম যেন নষ্ট না হয়। আর আমাদের কিছু কাগজপত্র নিয়ে নেও। ফরাসরা (ফরাসউদ্দীন, তার তৎকালীন প্রাইভেট সেক্রেটারি) ব্যবস্থা করে দেবে।
পরে কবীর স্যারের দিকে ফিরে বললেন- চৌধুরী সাহেব, ভাগ্যের কি নিষ্ঠুর পরিহাস, সারাজীবন গণতন্ত্রের জন্য আন্দোলন করলাম, কতো জেল খাটলাম আর এখন এক পার্টি করতে যাচ্ছি। আগস্ট মাস থেকে বাকশালের কাজ পুরোপুরি শুরু হবে। আমি এটা চাইনি। বাধ্য হয়ে করতে হচ্ছে। পাকিস্তানপন্থী, বিভিন্ন ইসলাম দল এবং অস্ত্রধারী জাসদের গণবাহিনী, সর্বহারা পার্টি প্রভৃতি প্রশাসন ও রাজনৈতিক স্থিতিশীলতাকে ভেঙে ফেলার উপক্রম করে ফেলেছে। আমার বহু লোককে অন্যায়ভাবে হত্যা করেছে। ঈদের দিন নামাজের মধ্যে হত্যা করা হয় শুনেছেন কখনো? অতএব, অন্য কোনো পথ খোলা না দেখে আমি স্বাধীনতার পক্ষের লোকদের নিয়ে সমমনাদের একটি রাজনৈতিক মঞ্চ হিসেবে বাকশাল গঠন করছি। আমি সমাজতন্ত্র বিরোধী, ধর্মনিরপেক্ষতা বিরোধী ও সর্বোপরী মুক্তিযুদ্ধবিরোধী কোনো দল বা ব্যক্তিকে বাকশালে নেব না। আরো একটি কথা, আমার ক্ষমতা পাকাপোক্ত করার জন্য, দেশকে বাঁচানোর জন্য এই পদক্ষেপ। আমি ক্ষমতা অনেক পেয়েছি, এমন আর কেউ পায় নাই। সে ক্ষমতা হলো জনগণের ভালবাসা ও নজিরবিহীন সমর্থন। প্রফেসর সাহেব শোনেন, তুমিও লিখে রেখ, আমার এই একদলীয় ব্যবস্থা সাময়িক। দেশটাকে প্রতিবিপ্লবের হাত থেকে রক্ষা করে আমি আবার গণতন্ত্রে ফিরে যাবো। বহুদলীয় গণতন্ত্রে ফিরে যাবো। তবে চেষ্টা করবো আমার গণতন্ত্র যেন শোষকের গণতন্ত্র না হয়। আমার দুঃখী মানুষ যেন গণতন্ত্রের স্বাদ পায়।’
তিনি বলেন- আমাকে পরামর্শ দেয়া হয়েছিলো দালাল ও রাজকারদের ক্ষমা না করতে। খুব কঠোর পরামর্শও দেয়া হয়েছিলো... শামসুজ্জামান জানে বোধ হয়, প্রতিবিপ্লবীদের ধ্বংস করে দিতে। আমি তা করিনি। তাদের কুকীর্তির কথা জেনেও করিনি। আমার চোখে মুখে ভেসেছে অসংখ্য মা, বাবা, স্ত্রী ও শিশুর মুখ। আমার মনে হয়েছে, আল্লার আরশ কাঁপবে নাং আমি মানবিক হতে চেয়েছি। অনেকগুলো পরিবারকে ধ্বংস করিনি। আমি জাতির ¯্রষ্ট হয়ে সেটা করতে পারি না। আমি ভুল করেছি, কি ঠিক করেছি ইতিহাস একদিন সে বিচার করবে। তবে খুনি ও প্রকৃত অপরাধীরা রেহাই পাবে না। তাদের বিচার করবো।’
বঙ্গবন্ধু বললেন- নির্দেশ দিছি। সব ফাইল বাংলায় লিখতে হবে। যে লিখবে না তাকে বাড়ি পাঠায়া দিবার ব্যবস্থা করবো’। বাকশালে যোগদানের ব্যাপারে কোনো বাধ্যবাধকতা ছিলো না। অনেকেই এতে যোগ দেয়নি। বঙ্গবন্ধু এতে কিছুই মনে করেন নি। সাংবাদিকেরা প্রতিযোগিতা করে যোগ দিয়েছেন। বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান যোগ দেয়ার জন্য লাইন ধরে ফুলের মালা নিয়ে গিয়েছে। কিন্তু কবি শামসুর রহমান, নির্মলেন্দু গুণ, শওকত ওসমান, আবু জাফর শামসুদ্দীন এরা যোগ দেননি। বাংলা একাডেমী যোগ দেয়নি। মরহুম জিয়াউর রহমান ওবেগম জিয়াকে বাকশাল অফিসের একটা সভায় দেখেছিলাম, মতিয়া চৌধুরীর পাশে বসেছিলেন। মোস্তফা সারওয়ার সে সভা পরিচালনা করেন। সভা শেষে নিচে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানও তারা উপভোগ করেন। পরদিন কাগজে তার ছবি ছাপা হয়।
নির্মলেন্দু গুণকে বাংলা একাডেমীতে জিজ্ঞেস করি- বাকাশে যোগ দিচ্ছে না?’ তিনি বললেন- না।’ আমি বলি- কেন? তিনি বলেন- মনে হয় গুলি আইবো। আমি গুলি খাইয়া মরতে চাই না।’ শামসুর রহমান যোগ দিচ্ছেন না শুনে বঙ্গবন্ধু ও শেখ মণি বলেছেন- শামসুর রহমান আমাদের সকলের প্রিয় কবি। আমরা তাকে ভালবাসি। যোগ দেয়া না দেয়া তার ইচ্ছার ওপর নির্ভর করে। আমরা জোর করতে চাই না।’
শেষ দিকে আমি ঘন ঘন গণভবনে যেতাম। ফরাসউদ্দীন ও সহকারী প্রেস সচিব মাহবুব তালুকদার আমার বন্ধু। কিন্তু শুধু সেজন্যই যেতাম না। যেতাম অন্য একটা লোভে। বঙ্গবন্ধুর ‘আত্মজীবনী’ শুনতে। তিনি ডিকটেশন দিয়ে আত্মজীবনী প্রস্তুত করছিলেন। ডিকটেশন নিতেন আবদুল গাফ্ফার চৌধুরী ও মাহবুব তালুকদার। তিনি পরে দেখে দিতেন এবং তার নিজস্ব কিছু শব্দ ও বলবার ধরন বদলাতে দিতেন না। জাতির দুর্ভাগ্য তাকে সপরিবারে হত্যা করার পর মাহবুব তালুকদার সে আত্মজীবনীর কপি গণভবন থেকে আর উদ্ধার করতে পারেননি। এরশাদের নির্দেশে সব কাগজপত্র নাকি পুড়িয়ে ফেলা হয়। শুনেছি, ওই মহামূল্যবান জীবনীর একটি কপি নাকি গাফ্ফার চৌধুরীর কাছে আছে। আওয়ামী লীগের অনেককে বলেছি, কেউ এটা উদ্ধারের জন্য তেমন চেষ্টা করেন না।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


