
আমি যখন ক্লাস সেভেনে পড়ি তখন প্রথম বিশ্বকাপ ফুটবল খেলা দেখি । সেটা ১৯৮২ সালের কথা ।সেই সময়টাতে দেশের ফুটবল লীগও জমজমাট । সালাহূউদ্দীন,চুন্নু, সালাম,বাদল,গাফফার,আশিস ভদ্র, খোরশেদ বাবুল ,টুটুল, ওয়াসিম তখন দেশের সুপার স্টার ফুটবলার । আবাহনী- মোহামেডান-ব্রার্দাস ঢাকার মাঠ দাবড়িয়ে বেড়ায় । ১৯৮১ সাল থেকেই আমি ঢাকা স্টেডিয়ামে নিয়মিত আবাহনীর খেলা দেখতে যেতাম। স্টেডিয়ামে আমার খেলা দেখার সবচেয়ে বড় উৎসাহ ও প্রেরনা ছিলেন পাশের বাসার বড়ভাই আবু হানিফ । তার সাথেই আবাহনীর খেলা দেখতে যেতাম তার সাইকেল চেপে কিংবা বাসাবো থেকে কিছুটা রিক্সা চেপে আউটার সার্কুলার রোডের আল-হেলাল হোটেলের সামনে এসে রিক্সা ছেড়ে দিতাম । তারপর কিছুটা হেঁটে ফকিরাপুল-আরামবাগের খাল পেরিয়ে স্টেডিয়াম যেতাম । আবাহনীর খেলা থাকলে ঝড়-বৃষ্টি আমাকে আটকে রাখতে পারত না।
আমার বাবাও স্টেডিয়াম গিয়ে নিয়মিত খেলা দেখতেন । তিনি ছিলেন মোহামেডানের ঘোর সমর্থক। আমি আবাহনী, বড়ভাই ও বোন ছিল মোহামেডানের সমর্থক । বাসায় খেলা নিয়ে তিনভাই বোনের মধ্যে তুমুল ঝগড়া বেঁধে যেত। কিন্তু প্রায় সময় আমি তর্কে হেরে যেতাম। কারন বাসায় আমি ছিলাম সংখালঘধে। আমার ছোটকাকাও ছিলেন মোহামেডানের সমর্থক, তিনি আমার বড়ভাই ও বোনের পক্ষ নিতেন। তারপরেও তিনি আমাকে আবাহনীর খেলার দেখার জন্য টাকা দিতেন । সেই টাকা নিয়ে আমি স্কুল থেকে টিফিনের পর সোজা স্টেডিয়াম চলে যেতাম ।
পরিবারের সবাই খেলা পাগল বলেই বাসায় নিয়মিত রাখা হত পাক্ষিক ক্রীড়াজগত । ম্যাগাজিনটি যখন হকার দিয়ে যেত, তখন কে কার আগে পড়বো- এই নিয়েও কাড়াকাড়ি পড়ে যেত ।
১৯৮২ সালে বিশ্বকাপ ফুটবল খেলার আসর হবে স্পেনে। তখনো আমাদের বাসায় রঙিন টেলিভিশন আসেনি ।পাড়ায় হাতে গোনা ২/৪টি বাসায় রংগীন টিভি ছিল। বিটিভি বেশ কয়টি খেলা দেখাবে শুনেই আমাদের তিনভাই বোনের প্রচন্ড মন খারাপ , সাদাকালো টিভিতে খেলা দেখতে হবে বলে !
আমাদের মনের অবস্থা বাবা বুঝতে পেরেছিলেন কিনা জানি না। কিন্তু বিশ্বকাপ শুরুর আগের রাতে আমাদের বাসায় চলে আসে ১৭ ইঞ্চি ফিলিপসের রংগীন টিভি । যদ্দুর মনে পড়ে আমরা তিন ভাইবোন পড়া শেষ করে রাতের খাবার খেয়ে ১০টা কি সাড়ে ১০টায় ঘুমিয়ে পড়েছিলাম। বাবা টিভি নিয়ে বাসায় এসেছিলেন অনেক রাত করেই। সেই রাতে আমাদের ঘুম থেকে উঠিয়ে বাবা সারপ্রাইজই দিয়েছিলেন।
বাসায় রঙ্গীন টিভি দেখে আমাদের কি আনন্দ, সেটা বলে বোঝানো যাবে না ! সবেমাত্রই তখন বিটিভি রংগীন হতে শুরু করেছে ।
জ্ঞান হবার পর প্রথম বিশ্বকাপ ফুটবল দেখেছি ১৯৮২ সালে, যা স্পে্নে অনুস্টিত হয়েছিল । মনে পড়ে পোল্যান্ডের লেটো, বনিয়েক, ফ্রান্সের মিশেল প্লাতিনি, ব্রাজিলের জিকো্ ,সক্রেটিস , ইংল্যান্ডের কেভিন কিগান, ইতালীর দিনো জফ, মালদিনির খেলা কিশোর মনে দাগ কেটেছিল । যা আজও স্মৃতিতে ভাস্বর হয়ে আছে । বিশ্বকাপ নিয়েও বাসায় আমাদের তিনভাই-বোনের মধ্যে প্রচন্ড ঝগড়া ঝাটি লেগেই থাকতো। সেইবারো আমি ছিলাম সংখালঘু। কারন বাসায় সবাই আর্জেন্টিনার সমর্থক ছিলেন।
১৯৯০ সালের পর ফুটবল নিয়ে আমার উত্তেজনা কমেছে ।
এখন আর নিয়মিত ঢাকা ফুটবল লীগ দেখা হয় না। এই খেলা দেখা নিয়ে আমার বা হাত ভেঙ্গেছিল । স্টেডিয়ামের মারামারি ছিল প্রায় নিয়মিত ঘটনা । কতদিন গ্যালারীতে পুলিশের ছোঁড়া কাঁদানে গ্যাসের ঝাঁঝে চোখ দিয়ে অবিরাম পানি ঝরেছে ।১৯৮২ সালের সুপারলীগে আবাহনী-মোহামেডান খেলায় মারামারি বাধলে ৩জন দর্শকের মৃত্যু ঘটে । সেই রাতে সুপারস্টার ফুটবলার কাজি সালাহউদ্দীন, চুন্নু, আনোয়ার ও হেলালকে ক্লাব টেন্ট থেকে পুলিশ ধরে নিয়ে যায় । পরেরদিন সিএমএইচের সংক্ষিপ্ত কোর্ট মার্শাল শেষে ঢাকার বাইরে নিয়ে যাবার জন্য কমলাপুর রেলস্টেশনে হ্যান্ডক্যাপ পড়া অবস্থায় প্রিয় খেলোয়াড়দের নিয়ে এলে চোখের পানি গড়গড়িয়ে পড়েছে । ভালোবাসার ফুটবল , প্রিয়দল , প্রিয় খেলোয়ারদের নিয়ে কত স্মৃতি !
কিন্তু এখন সেই চিত্র উল্টো ।
ফুটবল ছেড়ে সব ভালোবাসা এখন ক্রিকেট নিয়ে ।তারপরও ফুটবলের প্রতি একটা টান রয়েই গেছে হ্রদয়ের গভীরে ।বিশ্বকাপ ফুটবল এলে কিংবা ইউরোপীয়ান লীগের খেলা নিয়ে মাঝে মাঝে সেই উত্তেজনায় গা ভাসিয়ে দেই । বাসায়ও সাপোর্টারদের মাঝে এসেছে পরিবর্তন । এখন বাবা-ভাই-মা আমিসহ সবাই ব্রাজিল সমর্থক।বিশ্বকাপ এলে আমার ছোট বোনটাকেও খুব মিস করি ।
সর্বশেষ এডিট : ০৯ ই সেপ্টেম্বর, ২০১৫ রাত ৯:৫০

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



