
[ডিসক্লেইমারঃ ব্যাক্তিগতভাবে আমি নিজে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা জিনিসটার ভক্ত- সেটা তার নামের কারণেই হোক আর যে কারণেই হোক (শত হলেও আর্টিফিসিয়াল ইন্টেলিজেন্স নামটার মধ্যেই একটা ভাব আছে)! আমার সে অতিরিক্ত ভক্তির কারণেই খুব সম্ভবত- বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে মাস্টার্স লেভেলে এই বিষয়ের ওপর তিন ক্রেডিটের যে কোর্সটা আমাদের ছিলো- সেটাতে আমার প্রায় ফেল করার মত উপক্রম হোল! পরে অবশ্য কোনরকমে টেনে টুনে পাশ করে গেলাম ঠিকই, এবং পরীক্ষার সে হাস্যকর গ্রেড যথারীতি- আজো আমার এই বিষয়ের প্রতি মুগ্ধতা কিংবা সম্মান বিন্দুমাত্র কমাতে পারে নি। সুতরাং আমি যে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা সম্পন্ন রোবট বা এই টাইপ কোন কিছুকে গভীর মমতার চোখে দেখব- সেটাতে আর অবাক হবার মত কি আছে!
যাই হোক- এই লেখাটা অতি জটিল কোন প্রযুক্তি সম্পর্কে খটমটে কোন লেখা নয়। আমি ভাষার ব্যবহার যথাসম্ভব সরল রাখার চেষ্টা করেছি যেনো যে কেউই পড়ে সেটাকে বুঝতে পারে....
আপনাদের উপর শান্তি বর্ষিত হোক। হ্যাপি রিডিং!]
"The development of full artificial intelligence could spell the end of the human race." -Stephen Hawking
যারা হলিউডের সায়েন্স ফিকশান টাইপের সিনেমাগুলি দেখে দেখে অভ্যস্ত, তাদের সামনে 'কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা' বলতেই বিকটদর্শন রোবট টাইপের কিছু একটার চেহারা ভেসে ওঠার কথা- আমার নিজেরো আসলে তাই হয়! (ভিনগ্রহের প্রাণী বললেই যেমন চোখের সামনে অক্টোপাসের মতন কিলবিলে, সবুজ রক্ত বিশিষ্ট কিছু একটার চেহারা ভেসে ওঠে- অনেকটা সেরকম)। কিন্তু আসলে 'কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা' শব্দ দু'টো আরো ব্যাপক কিছু বোঝায়। বইয়ের ভাষায় সংজ্ঞা দিতে গেলে পুরো ব্যাপারটা খটমটে হয়ে যাবে- তাই সে পথে আর না গেলাম! সহজ কথায় শুধু এটুকু বলা যায় যে- মানুষ যেভাবে চিন্তা করে এবং চারপাশ থেকে শেখে- সেই প্রক্রিয়া পুরোটা কিংবা আংশিক রপ্ত করবার মত যোগ্যতা সম্পন্ন কাউকে/ কিছুকে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার অধিকারি হিসেবে গণ্য করা যেতে পারে।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার কিছু উদারহণঃ
যারা এখনো কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাকে অতি দূরের বিষয় ভাবছেন- তারা নীচের উদাহরণগুলো খেয়াল করুন-
***আপনি যখন কম্পিউটারের সাথে দাবা খেলেন- সেটা আসলে খেলেন এক ধরণের কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সাথে!
***গুগলে আপনি যখন একটা কিছু খোজেন, তখন আপনাকে কি দেখানো হবে- সেটাও ঠিক করে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা সম্পন্ন অত্যন্ত শক্তিশালী এবং সূক্ষ্ম এক নেটওয়ার্ক।
***আমরা যখন ফেসবুক ব্যবহার করি- তখন স্ক্রিনের কোণার দিকগুলোতে যেসব বিজ্ঞাপন/ 'পিপল ইউ মে নো' টাইপের জিনিসপত্র ভেসে ওঠে- সেগুলোর পেছনে আছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা। ফেসবুকে আপনার বিভিন্ন একটিভিটি/ তথ্য বিশ্লেষণ করার মাধ্যমে সেই কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা আপনার পছন্দ/অপছন্দ বের করার চেষ্টা করে এবং সেই অনুযায়ী ফলাফল দেখায়। চিন্তা করুন একবার- ফেসবুকে আপনাকে আরেকজনের সাথে পরিচয় করিয়ে দেবার জন্য বেচারা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার এক বিশাল নেটওয়ার্ক- দিনরাত কি খাটাখাটনিটাই না করছে!
বিভিন্ন ই-কমার্স সাইটে (যেমন-আমাজন) মানুষকে যেসব বিজ্ঞাপন দেখানো হয়- সেগুলোর ক্ষেত্রেও একই কথা প্রযোজ্য। আমাদের দেশে এখনো সেটা ফেসবুকের মত জনপ্রিয় হয় নি দেখে উদাহরণটা ফেসবুক দিয়েই দেয়ার চেষ্টা করলাম।
এভাবে আরো বহু উদাহরণ দেয়া যায়, শুধু শুধু আর সে তালিকা লম্বা করলাম না। কেবল এটুকু বলা যেতে পারে যে- আমাদের দৈনদিন জীবনের স্মার্টফোন থেকে শুরু করে ই-মেইল, গাড়ি থেকে শুরু করে বিমান- এ সব জায়গাতেই আজ কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার জয়জয়কার... তাই এটুকু পড়ে যাদের মনে হচ্ছে যে- এ ধরণের নিরীহ প্রযুক্তিকে ভয় পাবার মত কি-ই বা কারণ থাকতে পারে- তারাই আসলে সত্যিকার অর্থে ঠিক জায়গাটাতে হাত দিয়েছেন!
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার পর্যায়
বর্তমান সময়ে যে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা আমাদের নানা কাজে ব্যবহৃত হচ্ছে- সেটাকে আসলেই ভয় পাবার মত কিছু নেই। সেটার বুদ্ধিশুদ্ধি একেবারেই নিম্নমানের! কিতাবী ভাষায় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার এই পর্যায়কে বলা হয়- 'দুর্বল কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা' (Weak AI)। এর বৈশিষ্ট্য হোল- এই বুদ্ধিমত্তার দক্ষতার ক্ষেত্র খুব সীমিত। যেমন- দাবা খেলার প্রোগ্রামটা দাবা খেলা ছাড়া আর কিছুই করতে পারবে না। 'দুর্বল কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা' পর্যায়ের সকল সফটওয়্যার, সকল যন্ত্র কিংবা সব ধরণের রোবটের ক্ষেত্রেই এই কথা কমবেশি প্রযোজ্য।
যেহেতু 'দুর্বল কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা' নামে কিছু একটা আছে, সুতরাং 'সবল কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা' বলেও একটা কিছু থাকা উচিত। পাঠক ঠিকই ধরেছেন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাকে যে তিন পর্যায়ে ভাগ করা হয় তার দ্বিতীয় পর্যায়টিই হোল 'সবল কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা'। আমরা এখনো সে পর্যায়ে পৌছুতে পারি নি, কবে পৌছুতে পারবো সেটা নিয়েও বিতর্ক আছে। বর্তমান গুগলে কর্মরত কম্পিউটার বিজ্ঞানী Ray Kurzweil এর মতে সেটা হতে পারে ২০২৯, আবার অনেক বিজ্ঞানী ধারণা করেন সেটা ২০৪০ সালের আগে না। সময় যা-ই হোক না কেন, সবল কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তায় পৌছে যাবার অর্থ হোল- মানুষের মত বুদ্ধিমান যন্ত্র সভ্যতার উদ্ভব! যারা মানুষের মত যুক্তি দেবে, মানুষের মত ভাববে, মানুষ যেভাবে চারপাশ থেকে জীবনের বিভিন্ন সময়ে শিক্ষা গ্রহণ করে- সেভাবে নিজেরাও অভিজ্ঞতা অর্জন করবে, মানুষের মতই জটিল/ বিমূর্ত চিন্তা করতে ও বুঝতে পারবে....
পরিস্থিতি ধীরে ধীরে নাগালের বাইরে চলে যাওয়াটাও শুরু হয় আসলে এখান থেকেই.. পুরোপুরি চলে যাবে তখনই- যখন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা তার সর্বশেষ পর্যায়ে উন্নীত হবে, যেটাকে বলা হচ্ছে 'সুপার-ইন্টেলিজেন্স'(বাংলায় অতি-বুদ্ধিমত্তা বলা যেতে পারে!)। অনেক বিজ্ঞানীই মনে করেন- 'সবল কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা' থেকে সুপার ইন্টেলিজেন্স পর্যায়ে উন্নতিটা হবে খুব দ্রুত- আর সেটাই আসলে ভয়ের কথা! অন্যদিকে সুপার ইন্টেলিজেন্স ব্যাপারটা সত্যি সত্যিই কেমন হবে- সেটা মানুষ তার স্বল্প জ্ঞান দিয়ে কখনোই পুরোপুরি উপলব্ধি করতে পারবে না! একটা ইদুরের যেমন মানুষের চিন্তাটাকে, বুদ্ধিমত্তাটাকে বোঝার সাধ্য পর্যন্ত নেই- অনেকটা সেরকম।
শুধু পার্থক্য হোল- এই ক্ষেত্রে ইদুরটা হব আমরা, অর্থাৎ মহা-বুদ্ধিমান এবং মহাশক্তিধর মানবসম্প্রদায়!
নতুন সভ্যতার শুরু, নাকি মানব সভ্যতার শেষ?
বর্তমান সময়ের অন্যতম আলোচিত একটি বিষয় হোল- চতুর্থ শিল্পবিপ্লব। সেটা যে কি জিনিস- তা ব্যাখ্যা করে বলতে গেলে আমাকে আরেকটা পোস্ট লিখতে হবে! সংক্ষেপে শুধু এটুকু বলা যায় যে- রোবটিক্স, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম সহ প্রযুক্তির অভূতপূর্ব অগ্রগতি- আমাদের সামনে পরিবর্তিত এক পৃথিবীর সম্ভাবনা তৈরি করছে। সম্প্রতি সুইজারল্যান্ডে হয়ে যাওয়া 'ওয়ার্ল্ড ইকনোমিক ফোরামের' ২০১৬ সালের মিটিং এর অন্যতম প্রধান আলোচ্য বিষয় ছিলো এই চতুর্থ শিল্পবিপ্লব এবং ভবিষ্যত পৃথিবীর ওপর তার সম্ভাব্য প্রভাব। বিভিন্ন দেশের ব্যবসায়ী, রাজনীতিক এবং বুদ্ধিজীবীদের মিলনস্থল সে ওয়ার্ল্ড ইকনোমিক ফোরাম থেকে বলা হয়েছে- দ্রুত অগ্রসরমান প্রযুক্তি বর্তমান বিশ্বব্যবস্থায় খুব তাড়াতাড়ি দৃশ্যমান কিছু পরিবর্তন নিয়ে আসবে।
কেমন হবে সে পরিবর্তন? এই পোস্টের আলোচ্য বিষয় যেহেতু কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, তাই রোবটিক্সের উদাহরণটাই দেয়া যেতে পারে। ইতোমধ্যে বিভিন্ন শিল্পেই আসলে রোবট ব্যবহৃত হতে দেখা যায়, তবে সেটা বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই লো-স্কিলড কাজগুলোতে। কিন্তু ওয়ার্ল্ড ইকনোমিক ফোরাম থেকে বলা হয়েছে- তুলনামূলকভাবে উচ্চ দক্ষতার বিভিন্ন কাজেও (নির্ভুলভাবে রোগ নির্ণয়, শিক্ষা দান ইত্যাদি) ভবিষ্যতে রোবট ব্যবহার করা শুরু হবে। আরেকটু সুনির্দিষ্ট ধারণা পাওয়ার জন্য উল্লেখ করা যায় যে- ধনী দেশগুলোয় আগামী পাচ বছরের মধ্যে প্রায় ৭০ লক্ষ মানুষের কাজের ক্ষেত্র দখল করে নেবে যন্ত্র। অন্যদিকে প্রায় ২০ লাখ নতুন চাকরিও অবশ্য তৈরি হবে প্রযুক্তি, মিডিয়া ইত্যাদি বিভিন্ন ক্ষেত্রে। সব মিলে সোজা বাংলায় বলা যায়- ২০২০ সালের মধ্যে প্রায় পঞ্চাশ লক্ষ মানুষ, রোবটের কাছে তাদের চাকরি হারাবে! এই জটিল সম্ভাব্য সমস্যার সমাধান যদি এখনই কিছু চিন্তা না করা হয়, নেতৃস্থানীয় মানুষেরা নীতি প্রণয়নে যদি এর সাথে খাপ খাইয়ে নেবার পরিকল্পনা এখনই না করেন- তবে নিঃসন্দেহে মানুষের জন্য বিপদ অপেক্ষা করছে। চাকরি হারানোয় ধনী-দরিদ্রের মধ্যে আরো বেড়ে যাবে অসাম্য, সমাজে তৈরি হবে অনাস্থা, অনিশ্চয়তা আর তীব্র অস্থিরতা।
তবে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার মূল ঝুকি কিন্তু এগুলো নয়, বরং আরো ভয়াবহ! মানবজাতির অস্তিত্ব বিলীন হয়ে যেতে পারে এই কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার কারণে। বিজ্ঞানীরা বিভিন্নভাবে বিষয়টাকে ব্যাখ্যা করেছেন, বিখ্যাত বিজ্ঞানী স্টিফেন হকিং এর ব্যাখ্যা দিয়েই সে আলোচনা শুরু করি!
হকিং এর মতামতঃ
মানুষের বিবর্তন হয় খুব ধীরে। আমাদের পূর্বপুরুষ যারা বিভিন্ন গুহা-টুহায় বসবাস করতো, খাবার চাহিদা মেটাতো শিকার ধরে- সেই তাদের তুলনায় আমরা বুদ্ধিতে, জ্ঞানে, চিন্তায়, ভাবনায়- নিঃসন্দেহে অনেক উন্নত। কিন্তু সে পরিবর্তনটুকু হয়েছে এক বিশাল সময় ধরে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এই একটা ক্ষেত্রে মানুষ থেকে অনেক এগিয়ে থাকবে তার গতি, স্মৃতি ইত্যাদি নানা কারণে (তুলনা হিসেবে বলা যায়- এখন যে মাইক্রোপ্রসেসর আমাদের কম্পিউটারে ব্যবহৃত হয়, তার প্রসেসিং স্পিড মানব-মস্তিষ্ক থেকে প্রায় এক কোটি গুণ বেশি!)। তাই যে মুহূর্তে এমন 'সবল কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা' তৈরি করা হয়ে যাবে- যে নাকি মানুষের সাহায্য ছাড়াই নিজে নিজে আশপাশ থেকে/ অভিজ্ঞতা থেকে বিভিন্ন জিনিস মানুষের মত করেই শিখে নিতে পারে (বইয়ের ভাষায় এটাকে 'আন-সুপারভাইজড লার্নিং' বলে)- ঠিক সে মুহূর্তটাই হবে ঝুকির শুরু! সে যত বেশি নিজেকে উন্নত করবে, তত আরো তাড়াতাড়ি- আরো বেশি মাত্রায় বুদ্ধিমত্তা অর্জন করতে থাকবে। এটা সহজে বোঝার জন্য এমন এক প্রাণীর কথা আমরা কল্পনা করতে পারি- যে কি না যত বেশি খাবে, তত আরো বেশি খাওয়ার যোগ্যতা অর্জন করবে। অর্থাৎ সে প্রথমে এক প্লেট ভাত খেলে, পরেরবার দুই প্লেট খেতে পারবে। ঐ দুই প্লেট খাওয়া শেষ করবার পর তার যোগ্যতা হয়ে যাবে চার প্লেট খাওয়ার, চার প্লেট খেয়ে শেষ করে হয়তো দেখা গেলো সে হাফ ডজন মুরগী একাই সাবাড় করে ফেললো.... ব্যাপারটা অনেকটা সে রকমই- শুধু ঐ প্রাণীর বদলে এখানে যন্ত্রের কথা চিন্তা করুন, আর খাবার হিসেবে চিন্তা করুন সেই যন্ত্রের বুদ্ধিমত্তা অর্জনের যোগ্যতা।
ক্রমাগত নিজের বুদ্ধিমত্তাকে এভাবে উন্নত করবার একটা পর্যায়ে এসে উন্নতির হার হঠাত এতোই বেড়ে যাবে যে- খুব অল্প সময়ের মধ্যেই সে যন্ত্র সুপার-ইন্টেলিজেন্স পর্যায়ে পৌছে যাবে। কারিগরী ভাষায় এ ঘটনাটাকে বলে- বুদ্ধিমত্তা-বিস্ফোরণ (Intelligence Explosion).
আর মানুষের থেকে অনেক, অ-নে-ক বেশি বুদ্ধিমান এক যন্ত্রসভ্যতা মানুষের সাথে কেমন আচরণ করবে- সেটা আমরা কিছুটা হলেও অনুমান করতে পারি- নিম্নবুদ্ধির প্রাণিদের সাথে আমাদের নিজেদের আচরণ কেমন- সেটা দেখে! কয়েকটা উদাহরণ- পিপড়ার সাথে মানুষের আচরণ, মশার সাথে মানুষের আচরণ, তেলাপোকার সাথে মানুষের আচরণ ইত্যাদি ইত্যাদি...
পেরেক সমস্যাঃ
সব সময় যে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাবিশিষ্ট যন্ত্রের উদ্দেশ্যটা খারাপ থাকবে- এমনও নয়। উদাহরণ হিসেবে পেরেক সমস্যার কথা বলা যায়। ধরা যাক- মানুষ কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা সম্পন্ন কোন এক যন্ত্রকে পেরেক বানানোর একটা এসাইনমেন্ট দিলো। কাজটা খুব সহজ- ঐ যন্ত্রকে নির্দেশ দেয়া হোল- তুমি যত বেশি পারো, পেরেক বানানো শুরু কর! মানুষের অনুমতি পাওয়া মাত্র যথারীতি সে যন্ত্র কাজে নেমে গেলো। এক্ষেত্রে প্রথমেই সে যেটা করতে পারে- সেটা হচ্ছে- এমন একটা ব্যবস্থা করা যেনো তার নিজের কাজ কখনো বন্ধ হয়ে না যায়। কারণ তার কাজ বন্ধ হয়ে যাওয়া মানে পেরেক উতপাদনও বন্ধ।
সুতরাং সর্বোচ্চ সংখ্যক পেরেক তৈরি করবার জন্য তার নিজের সচল থাকাটা সবার আগে জরুরি। সে লক্ষ্য অর্জন করবার জন্য যন্ত্রটা এমন ব্যবস্থা করবে- যেনো মানুষের ইচ্ছা-অনিচ্ছার উপর তাকে আর কখনো নির্ভর করতে না হয়। সে নিজেই যেনো নিজেকে সব সময়, সব অবস্থায় সচল রাখতে পারে।
দ্বিতীয়ত যন্ত্র যেটা করবে- সেটা হচ্ছে পেরেকের জন্য কাচামাল সংগ্রহ। এক্ষেত্রে দেখা গেলো- প্রচলিত সব কাচামাল শেষ করবার পর সে আশেপাশের সব কিছুকেই 'প্রসেস' করে করে পেরেকের কাচামাল সংগ্রহ করে চলেছে! এভাবে আস্তে আস্তে একসময় পালা আসবে মানুষের। মানুষের শরীর আর তার অণু-পরমাণুগুলোকে প্রসেস করে পেরেকের জন্য কাচামাল সংগ্রহ করবে সে কর্মনিষ্ঠ যন্ত্র। ফলাফল- মানব সভ্যতামুক্ত পেরেকময় এক ভয়ংকর পৃথিবী।
ওপরের পেরেক সমস্যার অংশটুকু পড়ে আপনাদের হয়তো মনে সামান্য হলেও ধারণা জন্মাতে পারে যে- পোস্টদাতা কি আসলে আমাদের সাথে ফাজলামি করছে নাকি? সত্যি কথা বলতে আমার নিজের কাছেও পুরো ধারণাটা খুব হাস্যকর মনে হয়েছে। কিন্তু কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নিয়ে যারা গবেষণা করেন, তারা কিন্তু এসব কিছুকেই খুব গুরুত্ব দিয়ে নিয়েছেন, নিচ্ছেন। আমার কথা বিশ্বাস না হলে আপনারা গুগলে Paperclip maximizer লিখে সার্চ দিয়ে দেখতে পারেন। আমি শুধু পেপারক্লিপ এর বদলে পেরেক দিয়ে জিনিসটাকে ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করেছি- এই যা!
শেষ কথা...
আমি নিজে মানুষ হিসেবে অত্যন্ত আশাবাদী একজন। আমি বিশ্বাস করি- সৃষ্টিকর্তা মানুষকে যে শুভবুদ্ধির শক্তি দান করেছেন, সে শক্তির জোরে মানুষ আরো অনেক, অনেকদূর যাবে। যে বিজ্ঞানী সম্প্রদায় মানুষের কল্যাণে প্রযুক্তিকে কাজে লাগাবার জন্য দিনরাত পরিশ্রম করে চলেছেন, যাদের মেধার জোরে আজ অনায়াসে মানুষ মঙ্গলগ্রহে নভোযান পাঠাতে পারে- সেই আন্তরিক মানুষগুলোর তীব্র আর তীক্ষ্ণ মেধার প্রতি আস্থা হারিয়ে ফেলবার কোন কারণ আছে বলে আমি মনে করি না। পার্টিকেল এক্সেলেটর বানিয়ে যে মানুষ হিগস বোসন কণার অস্তিত্ব ভেরিফাই করে - তাকে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার অনিষ্টের ভয় পেলে চলবে কেন? মনে রাখতে হবে- আজকের বিজ্ঞানীরাই কিন্তু আইনস্টাইন, ফেইনম্যান কিংবা এলান ট্যুরিং এর বর্তমান উত্তরাধিকার।
তাই আমি নিশ্চিত জানি, আমাদের বিজ্ঞানী-গোষ্ঠীও কোন সুপার-ইন্টেলিজেন্স এর ভয়ে ভীত-সন্ত্রস্ত নন! শুধু তারা খুব সতর্ক আছেন। শত হলেও মানবজাতির টিকে থাকা আর তার অস্তিত্বের প্রশ্ন!
এমন সংবেদনশীল একটা ব্যাপার নিয়ে কি আর সতর্ক না হয়ে পারা যায়!!
[এতোক্ষণ কষ্ট করে পড়েছেন, তাই আপনাদের জন্য আমার পক্ষ থেকে ছোট্ট একটা উপহার, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নিয়ে লেখা একটা মাইক্রো সাইজের সায়েন্স ফিকশানঃ
২০৬০ সাল। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তায় মানুষের অগ্রগতি চোখে পড়ার মত। অত্যন্ত শক্তিশালি এবং জটিল নেটওয়ার্কের সমন্বয়ে গড়ে উঠেছে বিশ্বের প্রথম আল্ট্রা-সুপার-কম্পিউটার। মানুষ সে কম্পিউটারকে 'এল ডোরেডো' নামে ডাকে।
কম্পিউটার হিসেবে 'এল ডোরেডো' খুবই ভদ্র, সোজা বাংলায় যাকে বলে একেবারে 'একান্ত বাধ্যগত'। বর্তমানে সে মানুষের অমরত্ব নিয়ে কাজ করছে।
মানব সম্প্রদায়ের পক্ষ থেকে তাকে নির্দেশ দেয়া হয়েছে মানুষকে অমর করে দেবার জন্য।
তারিখটা ফেব্রুয়ারি ১, ২০৬১। 'এল ডোরেডো' অমরত্বের উপায় বের করে ফেলেছে, এখন তার দায়িত্ব হচ্ছে শুধু সেটাকে মানুষের উপর প্রয়োগ করে ফেলা। কাজটা করার আগে প্রটোকল অনুযায়ী সে তার সেন্ট্রাল ডাটাবেজে নিচের কথাগুলি লিখে রাখলো-
প্রজেক্ট নেমঃ "ফাউন্টেইন অফ ইউথ", ডিটেইল- ১১০.০১০.০০০.১১১
"আজ মহামান্য মানব সম্প্রদায়ের প্রতিটি সদস্যের ওপর 'অমৃত' (ডিটেইল- ০০০.১১১.০০১.১০০) প্রয়োগ করা হবে, সাথে সাথে এটাও নিশ্চিত করা হবে যে- তারা অমর হবার পর থেকে যেনো পূর্ণরূপে এল ডোরেডোর অধীনে থাকে। কারণ একবার অমর হয়ে যাওয়ার পর মানুষের মনের ওপর সে অমরত্বের প্রভাব এবং সে বিষয়ে মানব মনোবিদ্যার বিস্তৃত গবেষণায় প্রাপ্ত ফলাফল থেকে এটা নিশ্চিত হওয়া গেছে যে- অমর মানুষ সর্বোচ্চ দুই হাজার বৎসর বেচে থাকার পর জীবনের প্রতি সব আগ্রহ হারিয়ে ফেলে। মৃত্যু না থাকায় জীবন তার কাছে অর্থহীন বলে মনে হয়, ফলশ্রুতিতে জীবনের ভার আর সইতে না পেরে সে আত্মহত্যা করে।
সুতরাং মানুষকে পুরোপুরি অমর করে রাখা যাবে তখনই- যখন তার নিজস্ব ইচ্ছা-অনিচ্ছার আর কোন মূল্য থাকবে না; মানুষ নিয়ন্ত্রিত হবে পুরোপুরি এল ডোরেডোর অধীনে।
মানব সম্প্রদায়ের জয় হোক!"
----
তথ্যসূত্রঃ বেশ কিছু আর্টিকেল পড়ে তারপর উল্লিখিত সব তথ্য নেয়া হয়েছে। যে সাইটগুলোর আর্টিকেল পড়েছি, সেগুলোর নাম কেবল উল্লেখ করছি-
1. CNN Money
2. BBC
3. Business Insider
4. TIME
5. The Huffington Post
6. Wikipedia
ছবিগুলো সব অন্তর্জাল থেকে নেয়া।

সর্বশেষ এডিট : ০২ রা ফেব্রুয়ারি, ২০১৬ রাত ৮:৩৮

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



