
রোহিঙ্গাদের দেশ ত্যাগ ঘটনার কোনও পরিবর্তন নেই। জীবন বাঁচাতে পাড়ি জমাচ্ছে কক্সবাজারে। কিন্তু যারা চোখে পড়ছে তাদের পুনরায় ফেরত পাঠানে হচ্ছে।এদিকে বিজিবি সীমান্তে টহল জোরদার করেছ। তারপরও আসছে এবং আসতেই থাকবে। মানুষ জীবন রক্ষার জন্য কোনও কিছুই ধর্তব্যে আনে না। এমন নয় যে এবারই এটা প্রথম ঘটল। কিছুদিন পর পর একটি ঘটনা ঘটে আর রোহিঙ্গাদের বাংলাদেশে আসার হিড়িক পড়ে। বর্মিরা হামলা করতে ওদের ছুতোর অভাব হয় না। এমনিতে সারা বৎসর কম-বেশি আসছে। ইতঃপূর্বে যারা এসেছে তাদের মায়ানমার ফেরত নিচ্ছে না। মায়ানমার সরকার রোহিঙ্গাদের বাংলাদেশের অনুপ্রবেশকারী হিসেবে দেখে। এবং তারাও আর সেখানে ফেরত যেতে চায় না। কক্সবাজার ও তার আশে-পাশে এরা ছড়িয়ে পড়েছে। রোহিঙ্গারা আমাদের জন্য এখন বোঝা। এরা নানা অপরাধের সঙ্গে যুক্ত, জঙ্গল কেটে পাহাড় ন্যাড়া করে ফেলেছে। পতিতাবৃত্তি, ইয়াবা পাচার সহ নানা অপকর্মে জড়িত।
আমরা অনেকেই ধর্মীয় ও জাতিগত আবেগের কারণে তাদেরকে আশ্রয় দেয়ার পক্ষে। বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে এ নিয়ে তর্ক-বিতর্ক চলছে। আমরা চিন্তা করছি না পরে কী হতে পারে। কেননা রোহিঙ্গারা আবার তার দেশে ফেরত যাবে তার কোনও নিশ্চয়তা নেই। এদের গ্রহণ করে বাংলাদেশের নাগরিক করে নেয়ার পক্ষে কেউ কেউ। এটা কোনও সমাধান হতে পারে না। আর সত্যিই যদি এমন করা হয় আরও নতুন সমস্যার উদ্ভব হবে। আমরা বিহারিদের ফেরত পাঠাতে পারিনি। যারা বাংলাদেশকে নিজের দেশ ভাবে তাদের কথা বলছি না। বলছি যারা পাকিস্তান ফিরে যেতে চায়—যাদের পা বাংলায় দিল পড়ে আছে পাকিস্তানে।
বলছিলাম রোহিঙ্গাদের গ্রহণের নতুন সমস্যার কথা। আমরা ভুলে যাচ্ছি আসামের কথা। মাওলানা ভাসানী আসামের ভাসানী চরে অবস্থান নিয়েছিলেন। তার অনুসারীদের অনেকেই সেখানে রয়ে গিয়েছেন। আসামে মাঝে-মধ্যেই রব ওঠে বাংলাদেশের অনুপ্রবেশকারীদের ফেরত পাঠানোর। রোহিঙ্গা গ্রহণ করলে আসামের এই দাবী তখন আরও জোরদার হবে। এদের সঙ্গে আসামের মুসলমানদেরও বাংলাদেশের অনুপ্রবেশকারী আখ্যা দিয়ে নতুন ফ্যাসাদ তৈরি করা হবে। স্বাধীনতা পূর্ব থেকে করাচিতে বহু বাঙ্গালি বসবাস করে আসছে। মুক্তিযুদ্ধের পরে অনেক রাজাকার পালিয়ে পাকিস্তান চলে গিয়েছিল, তাদের ছা-পোনা আরও বেড়েছে। সরকারি অভিবাসী নিয়ন্ত্রণ সংস্থা নারার মতে করাচির বাঙ্গালির সংখ্যা প্রায় এক কোটি দশ লাখ। এর মধ্যে আবার পঁচিশ লাখ রোহিঙ্গা। রোহিঙ্গা পেজগি করচিতেও! এদের খুব কম সংখ্যকই বৈধ কাগজ-পত্র পেয়েছে। এত বছর পরও তাদের বিদেশি বলে অভিহিত করা হয়। এরাও রয়েছ চরম মানবেতর অবস্থার মধ্যে। দেখাদেখি পাকিস্তানও বাঙ্গালি খেদাও শুরু করে দেবে। কয়দিন আগেই কিন্তু তারা আমাদের কাছে বকেয়া (?) ভিক্ষা চেয়েছে। এত লোক বাংলাদেশ গ্রহণ করতে পারবে? খুব পরিষ্কারভাবেই বোঝা যাচ্ছে রোহিঙ্গাদের গ্রহণ করা মোটেই সমাধানের রাস্তা নয়। এটা কখনও হবার নয়। তবু কথাগুলো বললাম যারা এমনটি ভাবছেন তাদের উদ্দেশে। এমন চিন্তা ঝেড়ে ফেলে কী করে রোহিঙ্গাদের পক্ষে বিশ্ব জনমত তৈরা করা যায়, সেদিকে দৃষ্টি দিতে হবে।
আমরা যতটা আবেগ ঢালছি, ভুয়া ছবি পোস্ট করছি, সে তুলনায় জোরালো কোনও প্রতিবাদ জানাচ্ছি না মায়ানমারের প্রতি। বিশ্ব জানছে আমরা যে ছবি প্রচার করছি সেসব আসল নয়। এতে করে রোহিঙ্গাদের কি কোনও লাভ হল? বরং তাদের নির্যাতন, ধর্ষণ, হত্যার ঘটনাগুলোকে হালকা করে ফেললাম। রাজনৈতিক দলগুলো নানান ছল-ছুতোয় রাস্তা-ঘাট বন্ধ করে মিছিল, সমাবেশ করে । এখন তারা কোথায়? কোথায় আমাদের ছাত্রলীগের সোনার ছেলেরা? সরকারের কাজ সরকার করবে—সীমান্তে টহল বাড়াবে, ফেরত পাঠাবে, কূটনৈতিক তৎপরতা চালাবে। যদিও তা তেমন জোরদার মনে হয় না। কিন্তু আমাদের সুশীল, সংস্কৃতি কর্মীরা কোথায় গেল? আমাদের পাহাড়ি ভাইয়েরা চুপ কেন? তারা তো মায়ানমারকে এই সমস্ত বর্বরতা বন্ধ করতে বলতে পারে। তাদের প্রতিবাদ সহজেই বিশ্ববাসীর দৃষ্টি কাড়তে সমর্থ হবে। তাদের সঙ্গে বর্মিদের নৃতাত্ত্বিক একটা সম্পর্ক আছে। রোহিঙ্গারা যেমন করে বাংলা থেকে আরাকানে গিয়েছিল, একইভাবে মঙ্গোলীয় ক্ষুদ্র জাতিগুলোও তো নানা অঞ্চল থেকে বাংলাদেশে এসে বসতি গেড়েছিল। তাহলে রোহিঙ্গাদের প্রতি আপনাদের সহমর্মিতা থাকবে না কেন? যদি রোহিঙ্গারা এভাবে আসতেই থাকে— এক সময় ওরাই আপনাদের ঝেঁটিয়ে তাড়াবে। সাবধান হোন।
ড. ইউনুসের সমালোচনাকারীদের বঙ্গবীর বলেছিলেন নোবেল পুরষ্কার কি ছেলের হাতের মোয়া? সত্যিই তো নোবেল তো আর চাইলেই কেউ পায় না। শত বৎসর অপেক্ষা করতে হয়। সেই নোবেলধারী শান্তি চাচা এখন কোথায়? দেশের সকল সমস্যার, দুর্যোগে যেমন চুপটি করে থাকেন, রোহিঙ্গা ইস্যুতেও বরাবরের মতো নিশ্চুপ। সমকামীদের জন্য অধিকার চাইতে পারেন, রোহিঙ্গাদের ওপর যা ঘটছে তা কি মানবাধিকার লঙ্ঘন নয়!? তার তো আন্তর্জাতিক পরিচিতি আছে, উন্নত বিশ্বে যথেষ্ট প্রভাব আছে। তিনি কি পারেন না, এই বর্বরতার বিরুদ্ধে জনমত সৃষ্টির উদ্যোগ নিতে। এক শান্তির নেত্রী রাক্ষসীর ভূমিকা নিয়েছে আর আমাদের শান্তি চাচা হয়ত দেখে যাচ্ছেন—কীভাবে এর ক্ষুদ্র ঋণ দিয়ে স্বাবলম্বী করা যায়! বাঘ এখন মিউ হয়ে গেছে!
আমাদের প্রতিবেশী যারা আছে তাদের ব্যাপারটি হালকাভাবে নেয়ার কোনও উপায় নেই। উপায় নেই পৃথিবীর অন্য প্রান্তের কারো। এই সমস্যা সমাধানে সবাইকে মায়ানমারকে চাপ প্রয়োগ করতে হবে—একটা স্থায়ী সমাধানে আসতে হবে। এখানে গোজামিল দেয়ার কোনও সুযোগ নেই। জাতিসংঘের তথ্যমতে রোহিঙ্গারা পৃথিবীর সবচেয়ে নির্যাতিত জনগোষ্ঠী। মৌলবাদীরা তাদের উদ্দেশে নানা কৌশল নিয়েছে। এদের মধ্যে উগ্রবাদীতা ছড়ানোর পাঁয়তারা করছে। জাতিগত সমস্যাকে (মায়ানমারে বহু মুসলমান আছে, তাদের নিয়ে কোনও সমস্যা নেই।) ধর্মীয় রঙ লাগাতে ব্যস্ত। সেখানকার ভৌগলিক অবস্থানটা সবার মাথায় রাখা উচিত। এমন চলতে থাকলে, কোনও সমাধানে না পৌঁছতে পারলে রোহিঙ্গারা এক সময় চোখের সামনে মৃত্যু ছাড়া আর কিছুই দেখতে পাবে না। শেষ পরিণতি হিসেবে ভয়ঙ্কর জঙ্গিবাদের দিকে ঝুঁকে পড়তে পারে। আদম বোমা, আইএস হয়ে উঠতে কতক্ষণ? আর তা যদি একবার শুরু হয়, সেটা কেবল বাংলাদেশ বা ভারত নয় সমগ্র বিশ্ববাসীর জন্যই নতুন এক আতঙ্ক হিসেবে আবির্ভূত হবে।
সর্বশেষ এডিট : ০২ রা ডিসেম্বর, ২০১৬ রাত ৯:৩৭

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।




