somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

বোবা ভদ্রলোক

১১ ই ফেব্রুয়ারি, ২০১৭ রাত ৯:১৫
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :





লাইটগুলো একে একে আলো হারিয়ে ফেলতে লাগল। মনে হল সেগুলোতে রেগুলেটর যুক্ত। আর কেউ একজন তা ঘুরিয়ে আলো কমিয়ে ফেলছে। পট করে একটা শব্দ—হয়ত লাইন অকেজো হয়ে গেল। বেড-সুইচ ধরে টেপাটেপি করলাম কোন কাজ হল না। পাশের রুমগুলোয় ঘুটঘুটে অন্ধকার, ভয় ঘাপটি মেরে আছে।
কাজের-মেয়েটি পাশের ঘরে ছিল—নাম জ্যোতিকা। কিন্তু এবার যে ঘরে ঢুকেছে সে অগ্নিকা—জিজ্ঞেস করায় বলল। চেহারা অবিকল জ্যোতিকার কিন্তু ওর কোন যমজ বোন ছিল বলে আমার জানা নেই। ওর কোনও বোনই নেই—একটি মাত্র ছোট ভাই।
ঘুমিয়েছিলাম একাই। মনে হল কেউ একজন মশারি ধরে টানছে। হাত দিয়ে দেখলাম ‘কেরে?’ গায়ে হাত লেগে গেল।
‘তোমার সঙ্গী—অঞ্জন। পেশাব করতে গিয়েছিলাম।’
কিছুক্ষণ পর খেয়াল হল আমি তো একাই ঘুমিয়েছিলাম...’
ঘার ফেরালাম বাঁয়ে অন্ধকারের মধ্যেও বেশ বুঝতে পারছিলাম জ্যোতিকা আমার পাশে শুয়ে। ওর নরম চুল আমার গালের নিচে সুড়সুড়ি দিল। সুন্দর একটা ঘ্রাণ— শ্যাম্পু করেছে নিশ্চয়। দিনের বেলায় পাশ দিয়ে যাবার সময় শরীরের বোটকা গন্ধে দম আটকে আসে। আশ্চর্য—আমার পাশে শুয়ে আছে অথচ কিছুই টের পাইনি। হয়ত গোসল করে এসেছে... আসলে ভুল আমারই ও তো জ্যোতিকা নয়—অগ্নিকা। তাই হয়ত গন্ধটা এত মিষ্টি...

কিন্তু অঞ্জন গেল কোথায়? সেদিন বিকেলে সাইকেল নিয়ে বেরিয়েছিলাম দুজন। পড়ন্ত সূর্যের আলোয় গল্প করে পথ চলতে বেশ লাগছিল। সিগারেটের অভ্যেস নেই তবু দুজনে সিগারেট ধরিয়ে মনের সুখে ধোঁয়া ছাড়তে লাগলাম। ডালিম বাগানটার সামনে এসে আমাদের গতি কমে গেল। বাগানের ভেতর থেকে মেয়েদের হাসির শব্দ ভেসে আসছে। অনেকটা ভরা কলসি থেকে জল ঢালার সময় প্রথমে যেমনটা হয়। গোপনে, খুব সাবধানে সাইকেল রেখে এগোতে থাকলাম। চারটি মেয়ে যেন রূপের নদীতে ডুব দিয়ে মাত্র উঠে এসেছে। ওরা চুল আঁচড়াচ্ছে সবারই মুখের অর্ধেকটা চুলে ঢেকে আছে। চিরুনিতে উঠে আসা চুলগুলো পেছন দিকে দলা পাকিয়ে ছুঁড়ে দিচ্ছিল। তার কয়েকটি নাকে ধরে শ্বাস নিলাম। ঘ্রাণে মাদক মেশানো যেন—চোখ মুদে এল। বুকের ভেতর শিরশির করে উঠল। ঠোঁটে চেপে ধরে চুমো খেলাম পাগলের মত। হয়ত পাগলই হয়ে উঠেছিলাম ক্রমশ। হাত আপনা থেকেই সচল হয়ে উঠল, দু-হাতে প্যান্টের পকেটে পুরতে থাকলাম। একবার ভাবলাম এসব কী করছি আমি! কিন্তু কাজটি থামাতে পারছিলাম না। কোন পৈশাচিক শক্তি অনুভব করলাম। আবার মনে হতে লাগল আমি নিজেই তো একটা পিশাচ...
আমাদের উপস্থিতি টের পেয়ে একসঙ্গে ওরা কপাল থেকে চুল সরিয়ে তাকাল। কাজল আঁকা দেবীর চোখ! কিন্তু সবার চেহারাই তো জ্যোতিকার মত, তবু আলাদা আলাদা! বিস্ময়ে অঞ্জনকে দেখাতে চাইলাম। হঠাৎ খেয়াল হল অঞ্জন তো চট্টগ্রামে, ও এখানে কী করে আসবে!

চিৎকার করে উঠলাম ‘কে রে?’
দেখি জ্যোতিকার নয়ত অগ্নিকার পাশে আরও একজন শুয়ে আছে। বয়স্ক ব্যক্তি। দুজনকেই মারতে চেষ্টা করলাম। হাত-পায়ে কোনও জোর পেলাম না। ভাল করে খেয়াল করে দেখি লোকটি মোটেই বয়স্ক নয়, নিতান্তই শিশু। আর মেয়েটি তাকে বুকের দুধ খাওয়াচ্ছে। ও-টি ওর ছেলে, নাম রেখেছে ভোলা। তাই বলেই তো ডাকল ‘ভোলা সোনা কাঁদে না, কাঁদে না...’
হঠাৎ করে অন্ধকারের মধ্যেও আমি দেখতে শুরু করলাম। সত্যি বলতে হঠাৎ করে কিন্তু নয়—কখনও কখনও আমি এমন আঁধারেও দেখতে পাই। তখন আমার সমস্ত শরীরে কোটি কোটি চোখ গজাতে থাকে। সেই চোখগুলো কিছু দেখার জন্য তৃষ্ণায় ছটফট করতে থাকে। আমি হেরে যাই ওদের অতজনের কাছে। আয়নায় নিজেকে দেখে একদিন ভয় পেয়ে গিয়েছিলাম। ঠিক একটা শুঁয়োপোকার মত দেখাচ্ছিল, কিন্তু মুখটা ছিল ইঁদুরের মত। তারপর ভয় পেয়ে ঘরের আয়নাটা ভেঙ্গে ফেললাম।

আমাকে চমকে দিয়ে সেই বয়স্ক লোকটি কোথা থেকে যেন আবির্ভূত হল। লোকটি ওদের মা-ছেলেকে নিয়ে যেতে চাইল। ওরাও উঠে যাবার প্রস্তুতি নিতে লাগল। ভাবলাম বাধা দেই ওর বাবা তো সন্তানের জন্য পাগল হয়ে যাবে!
‘কিছুতেই নিতে পারো না ওদের—ওর বাবা কাকে নিয়ে থাকবে? ওকে হারালে তো সে মরেই যাবে!’
‘তাতে তোমার কী? তুমি তো আর ওর বাবা নও?’
‘ওরা এখানেই কাজ করবে—ভাল থাকবে...’
‘সারা জীবন কি শুধু পরের কাজই করবে? ওর কি কোনও ঘরের স্বপ্ন হয় না? শিশুটাই-বা কী কাজ করবে?’
‘ওদের আবার স্বপ্ন থাকে নাকি! ওদের কোনও মুখ থাকতে পারে না। সংসার তো কেবল মানুষেরই থাকে...’
‘ওরা কি তবে মানুষ নয়?’
তীব্র ঘৃণায় আমার মুখে কোনও কথা ফুটল না।

বারবার চেষ্টা করলাম আলো জ্বালতে, কিছুতেই পারলাম না। এক সময় দেখলাম দুলালকে। চাইলাম ঘটনাটি খুলে বলতে। পরে দেখি সেও ওদেরই দলে। আসলে সে দুলাল ছিল না। চিৎকার করে উঠলাম জোরে ‘ওদের কিছুতেই নিয়ে যেতে পারো না! ওরা আমার কাছেই থাকবে।’
ওদের গালাগাল দিলাম—শোনাল মাতালের মত। কিছুতেই ‘না’ শব্দটি উচ্চারণ করতে পারছিলাম না। তাই কথাটি হয়ে গেল ‘ওদের কিছুতেই নিয়ে যেতে পারো...’
লোক দুটো বিশ্রীভাবে হাসল।‘বেশ তাহলে সুমতি হল এতক্ষণে?’
ক্রোধে আমার দুচোখ জ্বলতে লাগল। একজন বলল ‘দেখ লোকটার চোখ দুটো কেমন পিশাচের মত!’
‘...আমি পিশাচ...’ এবারও না শব্দটি উচ্চারণ করতে কোনও শব্দ হল না। ওরা হা হা করে হাসতে লাগল।
‘দেখ পিশাচটাকে দেখ...’
ক্ষোভ, লজ্জা, ব্যর্থতায় গলার মধ্যে হাত ঢুকিয়ে একটানে আলা-জিহ্বাটা ছিঁড়ে ফেললাম।

তার পর থেকে বোবা হয়ে আছি। ঘরে-বাইরে আমি একজন সম্মানিত ব্যক্তি—কেননা বোবার কোনও শত্রু থাকে না।

ছবি - গুগল
সর্বশেষ এডিট : ১১ ই ফেব্রুয়ারি, ২০১৭ রাত ৯:১৯
৩টি মন্তব্য ৩টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

=আয় সখিরা ফিরে যাই মেয়ে বেলা=

লিখেছেন কাজী ফাতেমা ছবি, ১৯ শে আগস্ট, ২০২৬ রাত ১০:৪৯


যাবি নাকি তোরা সখি
আমার সাথে মেয়েবেলা;
যেখানটাতে বসতো যে রোজ
কানামাছি বউছি খেলা।

ভাইবোনেরা রোজ বিকেলে
মাঠে হতাম সমবেত,
ডাংগুলি আর গোল্লাছুটে
বিকেল-খেলায় কেটে যেত।

খেলার আসর উঠোনজুড়ে
তোরাও কী খেলতি এমন?
করলে স্মরণ অতীতের দিন
বুকে লাগে কেমন কেমন।

আয়... ...বাকিটুকু পড়ুন

আমি মাস্টার্স পাস করে ড্রাইভিং পেশা বেছে নিয়েছি

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ২০ শে আগস্ট, ২০২৬ রাত ১২:৪৩


পিংক বাস সার্ভিসের একজন নারী চালক, নাম রাবেয়া খাতুন। তিনি মাস্টার্স পাশ করে বাস চালাচ্ছেন। খবরটা পড়ে অনেকেই বাহবা দিচ্ছেন, কেউ কেউ বলছেন বাংলাদেশ এমন প্রতিভাকে ধরে রাখার যোগ্য... ...বাকিটুকু পড়ুন

একটি মেয়ের দৌড়াদৌড়ি ও একটি মায়ের অপেক্ষা

লিখেছেন এস.এম. আজাদ রহমান, ২০ শে আগস্ট, ২০২৬ সকাল ৮:১৭

একটি মেয়ের দৌড়াদৌড়ি ও একটি মায়ের অপেক্ষা

মঙ্গলবার রাত ১০টা ২৭ মিনিট। গুলশানের একটি হাসপাতালে থেমে গেল ব্যারিস্টার তৌফিক নেওয়াজের হৃদয়- দীর্ঘদিনের অসুস্থতার পর।

আর ঠিক তখন, শহরের অন্য প্রান্তে, মুন্সিগঞ্জ... ...বাকিটুকু পড়ুন

বিকাশ নূরা এবং হিরো আলমকে যারা প্রধানমন্ত্রী ভাবতেন ;)

লিখেছেন জ্যাক স্মিথ, ২০ শে আগস্ট, ২০২৬ দুপুর ২:৩২



একজন মানুষের জ্ঞান-বুদ্ধি, শিক্ষা-দীক্ষা থাকার চাইতেও জরুরী বিষয় হচ্ছে তার অন্তর্দৃষ্টি থাকা। অন্তর্দৃষ্টি, অন্তরচক্ষু বা জ্ঞানচক্ষু সম্পন্ন একজন ব্যক্তিকে কখনোই ধোঁকা দেওয়া বা ধোঁকায় ফেলানো সম্ভব নয় কারণ এরা... ...বাকিটুকু পড়ুন

বাঙ্গালী কেন মুসলমান হতে পারে না?

লিখেছেন মুহাম্মদ মামুনূর রশীদ, ২০ শে আগস্ট, ২০২৬ বিকাল ৫:৪৫

অনারব টার্কিশ, কুর্দি আর ইরানিয়ানরা তাদের নিজ নিজ ভাষা ও সংস্কৃতি সংরক্ষন করে ও তা ধারন করেও তারা মুসলিম, পাকিস্তানের পাঞ্জাবীরাও যখন নিজেদের পাঞ্জাবী জাতি হিসেবে অহংকার করে, তখনও তারা... ...বাকিটুকু পড়ুন

×