কোন কোন দিন থাকে যার শুরুতে হঠাৎ করেই সব কিছু ভালো লাগতে থাকে। বড় ষ্টেশনের সামনে মাতালদের চিৎকার, বাস-ট্রামে অগনিত মানুষের হুরমুড় ভিড়, রাস্তায় মানুষের ঢল, সবকিছুর মাঝেই যেন কৌতুক, সবকিছুই যেন আমার ভালো লাগানোর উপাদান। কাদেরী কিবরিয়ার সাথে ঠোঁট মিলিয়ে গুন গুন করে দিনটা পাড় করে দিই। কিন্তু "তোমারে লেগেছে এতো যে ভালো..." চাঁদ তা জানার আগেই ভালো লাগার আবেশটুকু মিইয়ে যায় যেনো। দুম করে ভর করে রাজ্যের যত বিষাদ, বেথোফেন স্কয়ারের কালো লোকটার সুললিত কন্ঠে বাজানো সেক্সোফোনের "নাথিংস গন্না চেইঞ্জ মাই লাভ ফর ইউ" ও অসহ্য লাগে।।
গোধুলী লগ্নে রাইনের পাড় ধরে হাটতে একদমই ইচ্ছে করেনা আর।। পা দুটু ভারী হয়ে আসে ।। নিজের অজান্তে অবসন্ন দেহটাকে একটা বেঞ্চের উপর সঁপে দিয়ে হারিয়ে যাই নিজের মাঝে... হাতড়ে বেড়াই হারিয়ে যাওয়া কিছু স্মৃতি, ডুবে যেতে থাকি উপলব্ধি করতে না পারা কিছু মুহুর্তের মহাসাগরে। । একাকীত্ব আমার সমস্ত সতা্ব গ্রাস করে চলে... সবকিছু যেন বিশাল দাঁত তুলে চারদিক মাতিয়ে হাঃ হাঃ করে হাসতে থাকে।। সন্ধ্যার ভুতুরে আলোতে নিজেকে সেই হাসির কাছে বড় অসহায় মনে হয় ।। জীবনের সব অসফলতা, সব অপারগতা মিলে চোখের সামনে ঘোলাটে একটা পর্দা মেলে ধরেছে যেন ।। রাইনের বুক চিড়ে ভট ভট শব্দ তুলে একটা ফেরী যাচ্ছে মনে হয়, কিন্তু আমি দেখতে পাচ্ছিনা কেনো? আমার গাল বেয়ে ঊষ্ণ জলের ধারা, একী... আমি কাদঁছি?
আমার আর বসে থাকা হয়না 2000 বছরের পুরনো রাইনের পাড়ে। ফেরার পথে ভাবি "চে-গুয়েভারা" তে ঢুকে খানিক পান করলে হয়তো বিষন্নতা কেটে যাবে, কিন্ত আমার আর পান করা হয়ে উঠে না।। ক্লান্ত, বিষন্ন, ভারাক্রান্ত দেহ-মন নিয়ে পালিয়ে আসি নিজের ঘরে... কেবল পালাতে পারিনা নিজের থেকে।। ঘুমে ভরা চোখ নিয়েও এপাশ ওপাশ করি বিছানায়, চোখ বুজলেই দেখতে পাই সবুজের সমারোহ, গোধুলীর অবকাশে পাখীদের ঘরে ফেরার তাড়া, সরু কোন নদীর কলকল বয়ে চলা ।। ঝিরঝিরে বাতাসে ঘাঁশের মেঁটো-ভ্যাপসা গন্ধ।। এমন একটা পরিবেশে আমার যাওয়া হয়না, সন্তর্পনে তাঁর হাতটা চেপে ধরা হয়না, তাঁর লম্বা কালো চুলে মুখ ডুবিয়ে বুক ভরে নি:শ্বাস নেয়া হয়না আমার... ... ... ভেতরটা ডুকড়ে উঠতে চাইছে আবার... একের পর এক দীর্ঘশ্বাসের মাঝে নিদ্্রাদেবী আমাকে আদর করে তার কোলে তুলে নিয়ে যায় তার দেশে... অনাবিল প্রশান্তির ছোঁয়ায় ভড়িয়ে তুলতে।। আমার তাও পাওয়া হয়না... ... ...
........ মোবাইলের মেলোডিয়াস রিং-এ লাফ দিয়ে উঠি বিছানা ছেড়ে।
:কয়টা বাজে? এখনো ঘুমাচ্ছ... 1টার সময় আমাদের একটা মিটিং আছে 'ক্যাফে গোয়েটলিশ'-এ, ভুলে গেছ নাকি?-- এ্যাঞ্জেলার খেদ মেশানো খবরদারী!
আসছি বলে ফোনটা আস্তে করে কান থেকে নামিয়ে রাখি।। আয়নার সামনে দাঁড়াই... ... চুলগুলো উষ্কোখুষ্কো ... গালের উপর কালো সরু রেখা... "... ... আই এ্যাম সো হলো বেবী... ..." বেজেই চলেছে.... ... ... ওদিকে নামিয়ে রাখা ফোনে এ্যাঞ্জেলা একা একাই কথা বলে যাচ্ছে... ... ... বাসা থেকে ইউনিভার্সিটির প্রধান ফটকের কাছে 'ক্যাফে গোয়েটলিশ' , কতক্ষন লাগবে যেতে, বড়জোড় 10 মিনিট!... ... আমি সময় ক্ষেপন না করে বাথরুমের দিকে পা বাড়াই... ... ... পিছনে পড়ে থাকে আরো একটা নির্ঘুম রাত, কয়েক ফোঁটা তপ্ত জলের সাক্ষী হয়ে... ... ...
সর্বশেষ এডিট : ৩১ শে ডিসেম্বর, ১৯৬৯ সন্ধ্যা ৭:০০

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



