একপশলা বৃষ্টির পর পায়চারি করছিলাম বৃক্ষ-উদ্যানে। মাথার ওপরে তখন ঝলমলে নির্মল নীলাকাশ। বৃক্ষ-তরুলতায় বৃষ্টি-ধোওয়া উচ্ছ্বাস, পাতার কোলে বিন্দু বিন্দু জলের সৌন্দর্য। শান্ত-সজীব প্রকৃতির এমন মুহূর্তে চালতা গাছের দিকে তাকাতেই থমকে গেল দৃষ্টি। ঘন সবুজ পাতার কোলে সদ্য ফোটা ফুলের মায়াবী হাসিতে ভরে গেল মন। বৃষ্টি-ভেজা দিনে চালতা ফুলের উল্লাস এ যেন বর্ষারই আগমনী বার্তা। মুগ্ধ চোখে ফুলের দিকে চেয়ে কেটে গেল নিষ্পলক আরও কিছু ক্ষণ। চালতা ফুলের রূপে মোহিত কবি এমন কোনো দিনেই হয়ত লিখেছেন-
আকাশ নীলের তারাখচা পথে বৃষ্টি পড়ে/
চালতা ফুলে ফলের বাগান মদির করে। (বিষ্ণু দে)
চালতা ফুলের কমনীয়তা কদম-কেয়া-মালতীর চেয়ে কোনো অংশেই কম নয়। রূপবৈচিত্র, সৌকর্যে বাগানের যে কোনো ফুলের সঙ্গে এটি তুলনীয়। কিন্তু আমাদের ভোগবাদী দৃষ্টিভঙ্গির কারণে চালতা ফুলের মাধুর্য বরাবরই উপেক্ষিত থেকেছে। তাই ফল হিসেবেই লোকসমাজে এর যেটুক পরিচিতি ও জনপ্রিয়তা।
বর্ষা ঋতুর প্রথম ভাগে ফুল ফোটা শুরু করে। ফুল আকারে বড়। দুধসাদা পাঁচটি মোটা পাপড়ি আর হলদে পরাগকেশরের সমাহার বড়ই দৃষ্টিনন্দন। ১৫-২০টি গর্ভকেশর তারার মতো সাজানো। গঠনবৈশিষ্ট্যে এটি ম্যাগনোলিয়ার ঘনিষ্ঠ। রূপসী চালতা ফুল বর্ষার বাতাসে ছড়ায় মৃদু সৌরভ। চিরসবুজ চালতা গাছ আকারে মাঝারি, বাকল লালচে ও মসৃণ। ডালপালা ওপরের দিকে ছড়ানো-ছিটানো। চালতা গাছের পাতার বিন্যাসের বৈচিত্রও দেখার মতো। টিয়াসবুজ রঙের পাতা দীর্ঘাকৃতি, সমান্তরাল শিরায় পরিপূর্ণ এবং পাতার কিনার খাঁজকাটা। ফুলের পাপড়ি ঝরে যাওয়ার পর বৃতি একসময় ফলে পরিণত হয়। ফলের রঙ সবুজ, প্রায় গোলাকার, পাতার ফাঁকে বোঁটায় ঝুলে থাকে। শরৎ-হেমন্তে ফল পাকে। ফলের স্বাদ টক-মিষ্টি বলে আচার-চাটনি-জেলি হিসেবে এটি বেশ উপাদেয় ও মুখরোচক। বিশেষ করে কাঁচা চালতার আচারের স্বাদ মনে এলে যে কারও জিভের ডগায় জল আসে। চালতার কাঠ শক্ত ও টেকসই। নৌকা ও বন্দুকের বাট তৈরিতে ব্যবহারযোগ্য। চালতার বাকল ও পাতার ওষুধি ব্যবহারও রয়েছে। পেটের পীড়া ও জ্বর নিরাময়ে উপকারী।
আমাদের দেশের সর্বত্র চালতা গাছ দেখা যায়। বাড়ির আঙিনায় কিংবা বনে-জঙ্গলে অনাদরে দু’চারটা গাছ থাকাও বিচিত্র নয়। সুপরিকল্পিত বীথি না-থাকলেও ঢাকায় বিচ্ছিন্নভাবে কিছু গাছ চোখে পড়ে। বলধা গার্ডেন, রমনা পার্ক, মুক্তাঙ্গন ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় চালতা গাছের দেখা মেলে। ভারতবর্ষ চালতার আদিনিবাস। বাংলাদেশ ছাড়াও নেপাল, শ্রীলংকা, আসাম ও মালয়ে প্রচুর পরিমাণে জন্মে। বৈজ্ঞানিক নাম ডিলেনিয়া ইন্ডিকা (Dillenia indica) ও ইংরেজি নাম এলিফ্যান্ট আ্যপল। ফুল ও ফল ছাড়াও চালতা গাছ বৃক্ষ হিসেবে সৌন্দর্যে অনুপম, অতুলনীয়। তাই শোভাবর্ধনের জন্যও এটি বাগানে লাগানো যেতে পারে।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।




