সারাদিন অদ্ভুত ভাবে সময় কাটে। স্বপ্নে পার্থ তাকে কবির সঙ্গে কথা বলতে বলেছে। "ফোনের সেই মানুষটা নাকি পার্থর শরীরের একটা অংশ, সে কারণে শ্রাবন্তী লোকটাকে ফিরিয়ে না দেয়। "
ঘুম ভেঙ্গে যায় শ্রাবন্তীর, শীতের রাতে কপালে ঘাম জমে। দু'গ্লাস পানি খায়। জীবন যুদ্ধে শ্রাবন্তী আজ কান্ত অসহায়! সব রকম যন্ত্রণা ভুলে থাকার জন্যই বই পড়া তার একটা নেশার মতন হয়েছে। রাত জাগার চিহ্ন চোখের পাতার নীচে নীল দাগ পড়েছে। মনের জীর্ণদশায় রাগ অনুভব হয় ? পার্থ যদি মরেই যাবে তবে শ্রাবন্তীকে সে কেন ভালোবাসে স্বার্থপরের মত চলে গেল নীরবে? অপরিচিত কবি তাকে নতুন করে মায়ায় আচ্ছন্ন করছে?
কবিকে সে এখনো চোখে দেখেনি আর সত্যিই কবি না লেখক লোক সেটা শুধু অনুমানের উপর ধারণা মাত্র। তবে লোকটার কথায় মিথ্যা নেই এটুকু শ্রাবন্তী বুঝেছে?
জীবনের একান্ত গভীরের যন্ত্রণা এতকাল তাকে নিশ্চুপ করে রেখেছিল। মনের যন্ত্রণা শোনানোর মত কেউ থাকলেও তার ইচ্ছা হয়নি সেই কষ্ট বাড়ানোর, শ্রাবন্তী তার মা আর কাজের দু'জন মেয়ে নিয়ে মোটামুটি? ছায়ার মত কবি মানুষটার কথা তার কাছে বার বার মনে পড়ছে?
কারো সাথে কথা বলবেনা ইচ্ছেটাকে সে দমন করেছিল চারপাশের একাকীত্ব নিয়ে দহনে দাহ্য করেছে সব মমতা কে।
শ্রাবন্তী কাঁদে অবিরাম ভাবে। বহু দিন পর ফোন বেজে ওঠে; হ্যালো বলতেই অন্য রকম তান্ত্রিক মতায় সেই কবি বলছে, শ্রাবন্তী তুমি কাঁদছো কেন? শ্রাবন্তী হতবাক, মৌনতায় পেয়ে বসেছে, আজ আর ফোন রাখবে না। ঠাস করে ফোন রাখার অভিমান যেন ভেঙ্গে দিয়ে গেছে সেই অদৃশ্য মানব।
হ্যালো, কবি ভাল আছেন? বহুদিন পর ফোন করলেন,বিবাহিতা বলে .........? লোকটি আশ্চর্য্য সরল, প্রাণ খোলা হাসি দিয়ে বলল-শ্রাবন্তী আমার নাম কবি নয়, দীপন চৌধুরী। আর বিবাহিতা তুমি নও আর সন্তানের এ খবরটার যৌক্তিকতাই নেই সে জন্য আমি তোমাকে প্রথমদিন দেখেই ভালোবেসেছি। আর কিছু জানতে চেওনা.............. শ্রাবন্তী, খুব শিঘ্রই আমাদের দেখা হবে। শুধু বলতে হবে ছেলেটাকে দেখলে তুমি রাগবেনা ?
তোমার অশ্রু পড়া অমন কাজল কালো চোখ জলে ভাসতে দেবনা....বলেই ফোনের সংযোগ কেটে দেয় দীপন চৌধুরী।
সিলেটের তারাপুর চা বাগানের কবি দীপন চৌধুরী।
শ্রাবন্তী কথা বলতে ভুলে গেছে নিজের সঙ্গে। বাড়িতে আত্মীয় স্বজন, মিস্ত্রি কেমন যেন একটা আনন্দঘন পরিবেশ, আর কিসের জন্য এই আনন্দ শ্রাবন্তীকে জিজ্ঞাসা করলে ভাবি হেসে বলে '' সময় হলে বুঝবে, আনন্দ যে শান্তির প্রলেপ সেটা এইবার তুমি বুঝবে?
শ্রাবন্তী ফোনের ক্রিং ক্রিং শব্দে বেডরুমে চলে গেল। ভাবির সুরেলা হাসি কানে আবার এলো!
-হ্যালো শ্রাবন্তী, কেমন আছ? বাড়িতে লোকজন বুঝি এসেছে? তুমি ডাকটা প্রথমে শ্রাবন্তী বুঝতে পারেনা। দ্বিতীয়বারে ডাকটি কানে মধ্যবর্তী অংশ ছুঁয়ে গেল , তুমি তুমি করছেন যে?
আবার জলতরঙ্গের হাসি, আমি তোমার বড় কিনা এ জন্য। আমি আর পার্থ তো একসঙ্গে পড়াশোনা করতাম, এমন কি আমরা দেখতেও এক রকম।
আপনি পার্থকে চেনেন? আমার সঙ্গে ওর কি সম্পর্ক ছিল জানেন?
শ্রাবন্তী আমি জানি, তোমরা একে অপরকে ভালোবাসলেও তোমাদের প্রেম ছিল পবিত্র! যারা শরীর পবিত্র তার হৃদয় পবিত্র।
-পার্থ তো হটাৎ করে সবাইকে কে কাঁদিয়ে চলে গেল আর.......
শ্রাবন্তী কাঁদছে অবিরাম ভাবে, ওর কান্নার শব্দে দীপন কাঁদছে....অনেক দুঃখেও শ্রাবন্তী কথা বলে আপনি কাঁদছেন কেন?
-শ্রাবন্তী তুমি কাঁদছ পার্থকে মনে পড়ায়, আর আমি কাঁদছি তোমার ও পার্থর জন্য! তোমাকে আমার মৃত বন্ধুর মতন ভালোবাসি, পার্থ আমাকে বলেছিল- "আমি যদি মারা যাই শ্রাবন্তীকে তুই বিয়ে করবি, তবে শ্রাবন্তীকে যদি ভালোবাসতে পারিস আমার মনের মতন করে।
আমি তোমার ছবি দেখেছিলাম তোমার বড় ভাই ভাবি কে প্রস্তাব দিয়েছি বিয়ের, তোমার নিজের একটা মতামত প্রয়োজন নইলে তুমি আমাকে ঘৃণা করবে ?
শ্রাবন্তী, এই শ্রাবন্তী চুপ করে থেকোনা; যদি ভালোবাস আমায় তবে কদম ফুল শাড়ি পড়ে বিকেলে ছাদে উঠবে।
-দীপন চৌধুরী, আমি কবি কে ভালোবেসেছি?
-কদমফুল শাড়ি পড়ব তোমাকে যখন কাছে পাব ! দীপন'তুমি তো হারিয়ে যাবেনা? পার্থর মত আমাকে ছেড়ে চলে যাবেনা।
ভাবির সুরেলা হাসি ঝংকারে পরিণত হলো। শ্রাবন্তী লজ্জায় রক্তিম, পরে কথা হবে বলে ফোন রাখল!
-ভাবি তুমি দীপন চৌধুরীকে চেন!
-চিনি, অত্যন্ত ভাল ছেলে। মেধাবী এবং স্বর্ণপদক পাওয়া একজন কবি! ওর সাথে কোন মেয়ের সম্পর্ক পর্যন্ত নেই।
-বাড়িতে আমি আম্মা ও বোনদের সঙ্গে কথা বলেছি, ওরা তোর পছন্দের উপর ছেড়ে দিয়েছে।
-শ্রাবন্তী তুই ননদ হলেও আমার নিজের ছোট বোনের মত সোনা বোন অমত করিস না! অশ্রু দিয়ে লেখা ভাগ্য মুছে যায়রে।
-বিয়ে যার সাথে হবে সেটা অশ্রু দিয়ে লেখা নয়, সত্যি দীপন খুব ভাল ছেলে। ভাবি আমার অমত নেই বরং দীপনের মাঝে আমি পার্থকে পাব!
-চল এবার শপিং এ যাই, আর মা কে বলে আসি আনন্দের খবর।
সত্যিই বিয়ের দিনে দীপনকে দেখে শ্রাবন্তীর আনন্দে অশ্রু ঝরছিল। দীপন শ্রাবন্তীকে আনন্দ অশ্রু মুছে দিয়ে বুকে তুলে নেয়। শ্রাবন্তী তোমাকে আর কখনো কাঁদতে দেবনা, তুমি কাঁদলে আমিও কাঁদব কিন্তু।
শ্রাবন্তী এই বার প্রাণখোলা হাসি হাসে। দীপন আমার দীপন বলে বাহুগোরে আবদ্ধ হয়!
-দীপন একটা স্বরচিত কবিতা শোনাবে
-হু শোনাব......................
শ্রাবন্তী
কে আছ এমন বন্ধু শ্রাবন্তী রাতে
বর্ষা চোখে আমায় খোঁজে.........
কে আছ এমন বন্ধু শূণ্য কাননে দুঃসময়ে
দহনে পুড়ে প্রতিনিয়ত দীর্ঘসূত্রতায় বিধুর সুগন্ধি
বকুল রুমালে রাখে।
যে রাতে তুমি এলেনা অশ্রু নয়না কামিনী রুপে
যামিনী আমি সর্বগ্রাসী পরিচয়ে দগ্ধ নিয়ে
বন্ধু তোমায় চেয়েছি।
আজ বুঝি তাই তোমাকে পেয়েছি কদম শাড়িতে
মধু যামিনী রাতে শ্রাবন্তী রাতে শ্রাবন্তীকে.......
দীপনের কবিতা আবৃত্তি মন দিয়ে শোনে। দীপন তাকে নিয়েও কবিতা লিখেছে। শ্রাবন্তী সব দুঃখ ব্যথা ভুলে যায়া দীপন চৌধুরী পেয়ে নিজেকে ভাগ্যবতী মনে করে।
সর্বশেষ এডিট : ৩১ শে ডিসেম্বর, ১৯৬৯ সন্ধ্যা ৭:০০

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



