“স্যার, আপনাকে আমার অসম্ভব ভালো লাগে; এ কথা কি আপনি জানেন?” কথাটা লতা ম্যাডামের মুখে শুনে মুচকি হাসল মৃণাল। সৌজন্যতার হাসি। তাকে কারও ভালো লাগে; এটা ভাবতেই মনটা কেমন ফুরফুরে হয়ে গেল। কার না হবে?
“তাই বুঝি?” মুখে হাসি রেখে মৃণাল বলল। লতা ম্যাডামও চওড়া হাসি দিয়ে বললেন, “হুম। আমার যদি কোনো বোন থাকত, আপনার সাথে বিয়ে দিতাম।”
“কিন্তু আমি তো কখনও বিয়ে-শাদী করব না, চিরকুমার থাকব। আপনার ইচ্ছেটা মনে হয় পূরণ হতো না।” মৃণাল বলল।
“এ বয়সে এমন উদ্ভট চিন্তা থাকেই। বয়স বাড়লে ঠিকই চিন্তা-ভাবনা পাল্টে যাবে।” লতা ম্যাডাম আত্মবিশ্বাসের সাথেই বললেন।
একটু খাটো মতন, তবে যথেষ্ট সুন্দরী লতা ম্যাডাম। মিষ্টি একটা হাসি আঠার মতো সবসময় মুখে লেগেই থাকে। মৃণালকে খুব পছন্দ করেন, উনার স্বামী সুমন স্যারও তাকে বিশেষ স্নেহ করেন। লতা ম্যাডাম ইংরেজি সাহিত্যের ছাত্রী, মৃণালও সাহিত্যানুরাগী। তাই দু’জনের বনে ভালো। বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন বিষয় নিয়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা আলাপ-আলোচনা করে। সাহিত্য, দর্শন, রাজনীতি, ধর্ম- কোনো কিছুই বাদ যায় না।
কিছুদিন যাওয়ার পর দেখা গেল সুমন স্যার মৃণালকে একদম সহ্য করতে পারছেন না। লতা ম্যাডাম, সুমন স্যার আর মৃণালের মধ্যে দোতলার ঘরে আলাপ হচ্ছিল একদিন। হঠাৎ জরুরি ফোন আসায় সুমন স্যার নিচে নেমে যান। অনেকক্ষণ পর ফিরে এসে দেখেন লতা ম্যাডাম আর মৃণাল তখনও আলাপ করছে। উনি খুব বিরক্ত হলেন। শিষ্টাচার বহির্ভূতভাবে লতা ম্যাডামকে বললেন, “আর কত আলাপ? নিচে বাচ্চা কাঁদছে।”
একদিন লতা ম্যাডাম আর সুমন স্যার অফিসকক্ষে বসে ছিলেন। মৃণালও তাদের সামনে বসা। হঠাৎ কী প্রসঙ্গে লতা ম্যাডাম মৃণালের খুব প্রশংসা করলেন। সুমন স্যারের মুখটা কালো হয়ে গেল। বোঝা গেল উনি মৃণালের প্রশংসা সহ্য করতে পারছেন না। বললেন, “থাক ওসব। এখন অন্য বিষয়ে কথা বলি।”
লতা ম্যাডামের সাথে মৃণালের বয়সের ব্যবধান ন্যূনতম আট বছর। ব্যাপারটা এমন না যে আট বছরের বড়ো কারও সাথে সম্পর্ক হতে পারে না। বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময় জনৈকা ম্যাডামের প্রতি মুগ্ধতা বেড়ে গিয়েছিল মৃণালের। ম্যাডাম শিক্ষিকা হিসেবে বিরক্তিকর ছিলেন। উনার ক্লাস কারও ভালো লাগত না। তাই সবাই এড়িয়ে যেতে চেষ্টা করত। কারও ভালো লাগুক আর না লাগুক মৃণালের ঠিকই ভালো লাগত। ম্যাডামের ক্লাস করার জন্য উদগ্রীব হয়ে থাকত। ম্যাডামের সাথে তার বয়সের ব্যবধান কমপক্ষে বারো বছর, তার ওপর একটা বাচ্চাও আছে।
আসলে বয়স কোনো ব্যাপার না। এটা একটা সংখ্যা মাত্র। সে শেষ পর্যন্তই অপেক্ষায় থেকেছে। এখানে লতা ম্যাডামের ব্যাপারটা সম্পূর্ণ ভিন্ন। কিছু কিছু স্ত্রীলোকের চেহারায় মাতৃত্বভাব ফুটে ওঠে, নিকটাত্মীয় মনে হয়। মায়ের মতো অথবা বড়ো বোনের মতো মনে হয়। মৃণাল তাকে বড়ো বোনের চোখেই দেখত, সে মতোই পছন্দ করত।
কোনো একদিন ক্লাসে মেজাজ চড়া হয়ে গেল মৃণালের। শিক্ষার্থীরা খুব হট্টগোল করছিল। রাগান্বিত হয়ে সবাইকে বেধড়ক পেটাল। বেসামাল হয়ে এক ছেলেকে মাথায় আঘাত করে বসল। হুলস্থুল কাণ্ড বেঁধে গেল।
রাতে টিউশনিতে ছিল মৃণাল। হঠাৎ ফোন দিলেন সুমন স্যার। বললেন, “ঐ ছেলের মা-বাপ-বোন তিন জনই পুলিশ। থানায় গিয়েছিল মামলা করতে। আমি হাতেপায়ে ধরে নিবৃত্ত করেছি। আপনি কয়েকদিন আসবেন না। আপনাকে মারার জন্য খুঁজছে। আসার সময় হলে আমিই আপনাকে ফোন দেব।”
সুমন স্যার আর মৃণালকে ফোন দেননি। ঐ ছেলের আঘাত সামান্যই ছিল। যত না আঘাত তারচেয়ে বেশি ছিল অভিনয়। আসলে সুমন স্যার নিজেই চাচ্ছিলেন না মৃণাল আবার উনার প্রতিষ্ঠানে আসুক। কেন চাচ্ছিলেন না সেটা বুঝতে নিশ্চয়ই জ্যোতিষী হওয়া লাগে না।
২০ মাঘ ১৪২৫ বঙ্গাব্দ
গাজীপুর।
সর্বশেষ এডিট : ১৭ ই জুন, ২০২৪ রাত ১১:৫১

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


