somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

প্রেমের গপ্পোঃ ধীরে ধীরে বায়ু বয়

১৯ শে জানুয়ারি, ২০২০ সন্ধ্যা ৬:২৭
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :


ফুলে ফুলে ঢলে ঢলে
"এটা আপনার জন্য।" বাস থেকে নেমে বাসার দিকের গলিতে ঢুকতেই মৃণালের হাতে একটা হলুদ রঙের ফুল গুঁজে দিলো নাহার। মৃণাল ফুলটা নেড়েচেড়ে দেখলো, শুঁকলোও। তেমন গন্ধ পেলো না। জিগ্যেস করলো, "কী ফুল?"
"চিনি না। স্কুল থেকে আসার পথে একটা গাছ থেকে আপনার জন্য ছিঁড়ে আনলাম।" নাহার বললো।

গাঁধা ফুল মনে করেছিলো মৃণাল। গাঁধার রং তো হলুদ হয়। ভালোভাবে দেখলো, ওটা আসলে গাঁধা না। আচ্ছা, যে ফুলই হোক, নাম বিবেচ্য না। "কোন স্ত্রীলোকের কাছ থেকে ফুল উপহার পেয়েছি- এটাই তো বড় কথা। নাম দিয়ে আর কী হবে?
কতকাল হলো কেউ আমাকে ফুল দেয় না, সুখ-দুঃখের কথা বলে না।" শুষ্ক মরুতে যেন হঠাৎ বৃষ্টিপাত হলো। আহা! চোখে আনন্দাশ্রু এসে গেল মৃণালের।

এমন উপহারের জন্য হৃদয় নিংড়ানো ধন্যবাদ দিলো নাহারকে। খুব খুশি যে হয়েছে, এ কথা তো বলাই বাহুল্য। গর্বে বুকটা ফুলে উঠছিলো। জগৎ-সংসারে নিজেকে মহা মূল্যবান কেউ মনে হচ্ছিলো তার। বুঝতে পারছিলো, জগতে তার মতো নরাধমেরও স্বীকৃতি আছে।
মনে মনে বললো, "বেঁচে থাকো বহুকাল।"

নাহার তার সহকর্মী। স্কুলে সম্প্রতি যোগদান করেছে। 'ইংরেজি ভাষা ও সাহিত্য' পড়ায়। ওর গ্রামের বাড়ি নেত্রকোণায়। কিন্তু ওদের পরিবার চট্টগ্রামে থাকে। ওর বেড়ে ওঠাও ওখানেই। ওর বাবা ওখানে সরকারি চাকুরি করেন।
ওখান থেকেই গাজীপুরে এসে নিয়োগ পরীক্ষা দিয়েছিলো ও। টিকেও যায়।

নাহারের সাথে কীভাবে যে সখ্য হয়ে যায় মৃণালের কে জানে! সে সচরাচর স্ত্রীলোকদের এড়িয়ে চলে। অথচ ওর ব্যাপারে এর ব্যত্যয় ঘটে। নাহার সারাক্ষণ ওর পাশাপাশি থাকে, সেও ওর পাশাপাশি থাকতে উদগ্রীব থাকে। কী যে একটা অদ্ভূত অনুভূতি কাজ করে।
তাদের মধ্যে চকোলেট বিনিময় হতে থাকে। চিপস কিংবা আইসক্রিমও বাদ যায় না। কে, কী পড়াবে সে বিষয়েও কথা হতে থাকে। দুজনেই একই বিভাগে পড়ায় কী না। পরীক্ষায় কী দেবে, কী দেবে না সে বিষয়েও কথা হয়।

"বিকেলে কী করবেন?" নাহার জিগ্যেস করলো।
কী উত্তর দেবে বুঝে উঠতে পারছিলো না মৃণাল। ও আসলে নিজেও জানে না বিকেলে কী করবে। এ সময়ে সে নির্দিষ্ট কোন কাজ করে না। হয় ঘুমায়, না হয় কোথাও বেড়াতে যায়। ফেসবুকিং করে মাঝেসাঝে। আবার অনেকসময় ছাদে উঠে কফি খায়, বইপত্র পড়ে।

"আপনার বাসার সামনে থাকবো।" মৃণাল বলে উঠলো। নিজের কথায় নিজেই চমকে উঠে। কথাটা কি সেই-ই বললো?

"কী বলছেন?" নাহারের কণ্ঠে বিস্ময়।
"ঠিকই বলছি।" মৃণাল বললো, "চারটার সময় আপনার বাসার সামনে আমি দাঁড়িয়ে থাকবো।"
নাহারকে ইতস্তত করতে দেখা গেলো। কী বিপদেই না পড়লো বেচারি। বললো, "যদি না আসি?"
"আপনি আসবেন।" মৃণাল বললো।
"তারপরও ধরুন, আমি যদি না আসি?"
"আমি কাল সকাল পর্যন্ত অপেক্ষা করবো।"

এবার নাহারের কপালে চিন্তার ভাঁজ দেখা দিলো। কী বলবে বুঝতে পারছে না। ওর ঠোঁট কাঁপতে থাকে।
"পাগলামো করবেন না। আমার কাজ আছে। রুমমেটকে নিয়ে বাজার করতে বের হবো।" নাহার ধরা কণ্ঠে বললো।
"আপনি যা খুশি করুন, আমি চারটায় আপনার বাসার সামনে দাঁড়িয়ে থাকবো।"

এই প্রথম কোন নারীর বাসার সামনে দাঁড়িয়ে থাকবে মৃণাল। নিজের খামখেয়ালিপনার জন্য লজ্জাও লাগলো খুব। কিন্তু কী আর করার! যেহেতু বলে ফেলেছেই, পাগলামো আর একটু করেই দেখা যাক না।

ভালো শার্ট পরে, মাথার চুল আঁচড়িয়ে, দামী পারফিউম মাখিয়ে বাসা থেকে দৌঁড়ে বেরুলো। হাতে সময় আছে মোটে ১০ মিনিট। অবশ্য গন্তব্যে পৌঁছতে এই সময়ই লাগবে।
বাতাসের বেগে হাঁটা শুরু করলো।

আকাশে মেঘ করেছে। ঘনঘন দেয়া ডাকছে। মৃণাল নাহারের বাসার সামনে এসে দাঁড়ালো। কেন জানি মনে হচ্ছিলো সে আসবে না। নাহার হয়তো ভেবেছে মৃণাল দুষ্টুমি করেছে। যাবো না।

মনটা বিষণ খারাপ হলো। ওকে নিয়ে যত কল্পনা করেছে সবই কি তাহলে মিথ্যে হবে? সাতপাঁচ ভাবতে ভাবতে পাশের চায়ের দোকানে ঢুকে গেলো। দোকানদারকে কড়া করে একটা আদার চা দিতে বলে উদাসভঙ্গিতে বাইরে তাকিয়ে রইলো। এমন সময় নাহারকে সামনে দিয়ে যেতে দেখা গেলো। মনটা নেচে উঠলো মৃণালের। দৌঁড়ে বাইরে এসে দাঁড়াতেই নাহার বললো, "কোথায় নিয়ে যাবেন?"

চোখ
"আপনার চোখ দুটো খুব সুন্দর।" নাহারের কথায় নড়েচড়ে বসলো মৃণাল।
"সত্যিই?" অবাক হয়ে জিগ্যেস করলো।
"হ্যাঁ, সত্যিই।" কণ্ঠে গাম্ভীর্য এনে বললো নাহার।

মোবাইলের স্ক্রিনে চোখ জোড়া দেখে নিলো। আসলেই তো। এতদিন কেনো খেয়াল হয় নি মৃণালের? নাকি চোখ বুজে ছিলো?

আসলে দীর্ঘদিন অযত্নে-অবহেলায় থাকলে নিজের মূল্যবান জিনিসও মৃল্যহীন-অর্থহীন মনে হয়। এই যেমন তার চোখ জোড়া এতদিন কী নিদারুণ অযত্ন-অবহেলায় ছিলো, কখনও কখনও মনে হতো এ চোখ না থাকলেই ভালো হতো।
অথচ আজ যখন কারও প্রশংসা শোনা গেলো, চোখ জোড়া কোহিনূরের মতো দামী মনে হচ্ছে।

জগৎটা খুব সুন্দর মনে হলো। বেঁচে থাকাটাই আনন্দের। যে জীবন একসময় অভিশপ্ত মনে হতো, রাতারাতি সেই জীবনটাই আনন্দের মনে হচ্ছে। ভাবতেই অবাক লাগে।

দুজন পাশাপাশি হাঁটছে। কথাও হচ্ছে টুকটাক। ভালো লাগার কথা, মন্দ লাগার কথা। শিক্ষাজীবনের কথা। বন্ধু-বান্ধবদের কথা।

"আপনার মধ্যে একটা মোহমত্ততা আছে। মানে কাউকে ধরে রাখার ক্ষমতা আছে।" মৃণাল বললো।
ওর কথায় নাহার হাসলো। কিছু বলতে গিয়েও থেমে গেল।

"চলুন পেঁয়াজু খাই।" নাহার বললো।
"চলুন।" নাহারের কথায় সম্মতি দিয়ে মহাসড়কের পাশের একটা হোটেলে ঢুকে পড়লো দু'জন।
পেঁয়াজু খাচ্ছে আর টুকটাক কথা হচ্ছে।

"ভালো লাগছে না আমার।" নাহার বললো।
"কেনো?"
"এমনিই।"
এবার দুষ্টুমির খেয়াল চাপলো মৃণালের মাথায়। বলে উঠলো, "নিঃসঙ্গ লাগে? আমার এক রুমমেট আছে। ওনার ফোন নাম্বার দিচ্ছি। কথা বলুন। ভালো লাগবে।"

কথাটা একদম ভালো লাগলো না নাহারের। মুখটা কালো হয়ে গেলো। খুব লজ্জা পেল মৃণাল। এ সময়ে এমন কথা না বললেও পারতো সে।

নাহারের কেনো মন খারাপ হলো? ও কি মৃণালকে ভালোবাসে?
নাকি নাহার ভাবলো, ওকে আর পাঁচজন সাধারণ স্ত্রীলোকের সাথে তুলনা করা হয়েছে, যারা এলোস্রোতে গা ভাসাতেই পছন্দ করে?

ধীরে ধীরে বায়ু বয়
"আপনার হাতটা ধরি?"
চট্টগ্রাম যাবে নাহার। মৃণাল ওর সাথে আছে। ঢাকা বিমানবন্দর রেলস্টেশন পর্যন্ত এগিয়ে দিয়ে যাবে।
"ধরুন" মৃণাল বললো।
নাহার শক্ত করে ওর হাত ধরলো।
"আপনার হাত এত শক্ত কেনো?"
"শক্ত কাজকর্ম করি তো তাই হাত শক্ত।" নাহার হেসে হেসে বললো।

মৃণালের একটু অস্বস্তি হচ্ছে। এই প্রথম কোন স্ত্রীলোক ওর হাত ধরেছে এটা একটা কারণ হতে পারে। আরেকটা কারণ হলো, পাশের সিটের এক বয়স্কা মহিলা কেমন শ্যেন দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে। মনে হচ্ছে ওদের গিলে খাবে।

নাহারের কোন দিকে খেয়াল নেই। ও পারে তো মৃণালের গায়ের সাথে লেপ্টে পড়ছে। আর দীন-দুনিয়ার যত আলাপ করছে।

১৯ অগ্রহায়ণ ১৪২৬ বঙ্গাব্দ
গাজীপুর।

সর্বশেষ এডিট : ১৯ শে জানুয়ারি, ২০২০ সন্ধ্যা ৬:২৭
৯টি মন্তব্য ৯টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

(আবার ফিরে যাই ঝুমতলি)

লিখেছেন সুলতানা শিরীন সাজি, ২৭ শে জানুয়ারি, ২০২২ সকাল ৮:১৮

রেললাইন বয়ে যায়।ভোরের প্রার্থনার বিপুল শক্তি।অন্ধকারকে আলো দিতে দিতে সকাল এগোয়! এমন সকাল এলেই ঝুমতলি যেতে ইচ্ছে করে! কুয়াশাঘেরা এক স্টেশনের রেললাইন ধরে হেঁটে যেতে ইচ্ছে করে। কালো রং শাড়িতে... ...বাকিটুকু পড়ুন

ঢাকা-বরিশাল নৌপথে দিনের বেলা ভ্রমণ ........

লিখেছেন জুল ভার্ন, ২৭ শে জানুয়ারি, ২০২২ সকাল ১০:২৮


ঢাকা - বরিশাল/বরিশাল - ঢাকা নৌপথে দিনের বেলা বিগত বছরগুলোতে শুধু মাত্র গ্রীন লাইন জাহাজ কোম্পানির দুটি জাহাজ চলাচল করতো। যাত্রী সল্পতায় একটা জাহাজ বন্ধ করে, এক জাহাজেই... ...বাকিটুকু পড়ুন

সামুর মোবাইল এপ্লিকেশনের ইউজার ইন্টারফেস কেমন হতে পারে !

লিখেছেন অপু তানভীর, ২৭ শে জানুয়ারি, ২০২২ দুপুর ১:২১



কয়েক দিন ধরে একটা অনলাইন কোর্সে ফটোশপ এবং ইলাস্ট্রেটরের বিভিন্ন টুলসের ব্যবহার শিখছি। তবে শিখতে গিয়ে যা টের পেলাম তা হচ্ছে আমার ভেতরে ক্রিয়েটিভি শূন্য। যাই হোক, সেখানকার একটা... ...বাকিটুকু পড়ুন

Four Beautiful Ladies, বাংলাদেশী মডেলিং জগতে যাদের তুলনা ছিল শুধুই তারা - ওরা চারজন (পেছনে ফিরে দেখা)

লিখেছেন বোকা মানুষ বলতে চায়, ২৭ শে জানুয়ারি, ২০২২ বিকাল ৩:১৫



মাঝে মাঝে এমন হয় যে, একটা দীর্ঘ এক ঘন্টার নাটকের চাইতে ৩০ সেকেন্ড বা এক মিনিট এর একটা বিজ্ঞাপন আমাদের মনে অনেক গভীর দাগ কেটে যায়। আর নব্বই এর দশকে... ...বাকিটুকু পড়ুন

নারায়ণগঞ্জে নয় ঘন্টা

লিখেছেন আবদুল্লাহ আফফান, ২৭ শে জানুয়ারি, ২০২২ বিকাল ৩:৪২


দিনটা অন্যান্য দিনের মতোই শান্ত। তবুও অন্যদিনের চেয়ে আলাদা। সংক্ষিপ্ত সফরে নারায়গঞ্জে যাচ্ছি। সকাল ১০টায় বাসা থেকে বের হলাম। হোটেলে নাস্তা খেয়ে কমলাপুরের নারায়ণগঞ্জ প্লাটফর্ম থেকে টিকেট কাটলাম। ট্রেন ছাড়ার... ...বাকিটুকু পড়ুন

×