
ফুলে ফুলে ঢলে ঢলে
“এটা আপনার জন্য।” বাস থেকে নেমে বাসার দিকের গলিতে ঢুকতেই মৃণালের হাতে একটা হলুদ রঙের ফুল গুঁজে দিল নাহার। মৃণাল ফুলটা নেড়েচেড়ে দেখল, শুঁকলও। তেমন গন্ধ পেল না। জিগ্যেস করল, “কী ফুল?”
“চিনি না। স্কুল থেকে আসার পথে একটা গাছ থেকে আপনার জন্য ছিঁড়ে আনলাম”, নাহার বলল।
গাঁধা ফুল মনে করেছিল মৃণাল। গাঁধার রং তো হলুদ হয়। ভালোভাবে দেখল, ওটা আসলে গাঁধা না। আচ্ছা, যে ফুলই হোক, নাম বিবেচ্য না। কোনো স্ত্রীলোকের কাছ থেকে ফুল উপহার পেয়েছে- এটাই তো বড়ো কথা। নাম দিয়ে আর কী হবে? কতকাল হলো কেউ তাকে ফুল দেয় না, সুখ-দুঃখের কথা বলে না। শুষ্ক মরুতে যেন হঠাৎ বৃষ্টিপাত হলো। আহা! চোখে আনন্দাশ্রু এসে গেল মৃণালের।
এমন উপহারের জন্য হৃদয় নিংড়ানো ধন্যবাদ দিল নাহারকে। খুব খুশি যে হয়েছে, এ কথা তো বলাই বাহুল্য। গর্বে বুকটা ফুলে ওঠছিল। জগৎ-সংসারে নিজেকে মহামূল্যবান কেউ মনে হচ্ছিল তার। বুঝতে পারছিল, জগতে তার মতো নরাধমেরও স্বীকৃতি আছে। মনে মনে বলল, “বেঁচে থাকো বহুকাল।”
নাহার মৃণালের সহকর্মী। স্কুলে সম্প্রতি যোগদান করেছে। ‘ইংরেজি ভাষা ও সাহিত্য’ পড়ায়। ওর গ্রামের বাড়ি নেত্রকোণায়। কিন্তু ওদের পরিবার চট্টগ্রামে থাকে। ওর বেড়ে উঠাও ওখানেই। ওর বাবা ওখানে সরকারি চাকুরি করেন। ওখান থেকেই গাজীপুরে এসে নিয়োগ পরীক্ষা দিয়েছিল ও। টিকেও যায়।
নাহারের সাথে কীভাবে যে সখ্য হয়ে যায় মৃণালের কে জানে! সে সচরাচর স্ত্রীলোকদের এড়িয়ে চলে। অথচ ওর ব্যাপারে এর ব্যত্যয় ঘটে। নাহার সারাক্ষণ ওর পাশাপাশি থাকে, সেও ওর পাশাপাশি থাকতে উদগ্রীব থাকে। কী যে একটা অদ্ভূত অনুভূতি কাজ করে! তাদের মধ্যে চকোলেট বিনিময় হতে থাকে। চিপস কিংবা আইসক্রিমও বাদ যায় না। কে, কী পড়াবে সে বিষয়েও কথা হতে থাকে। দু’জনেই একই বিভাগে পড়ায় কী না। পরীক্ষায় কী দেবে, কী দেবে না সে বিষয়েও কথা হয়।
“বিকেলে কী করবেন?” নাহার জিগ্যেস করল। কী উত্তর দেবে বুঝে উঠতে পারছিল না মৃণাল। ও আসলে নিজেও জানে না বিকেলে কী করবে। এ সময়ে সে নির্দিষ্ট কোনো কাজ করে না। হয় ঘুমায়, না হয় কোথাও বেড়াতে যায়। ফেসবুকিং করে মাঝেসাঝে। আবার অনেক সময় ছাদে উঠে কফি খায়, বইপত্র পড়ে।
“আপনার বাসার সামনে থাকব,” মৃণাল বলে ওঠল। নিজের কথায় নিজেই চমকে ওঠে। কথাটা কি সেই-ই বলল?
“কী বলছেন?” নাহারের কণ্ঠে বিস্ময়।
“ঠিকই বলছি।” মৃণাল বলল, “চারটার সময় আপনার বাসার সামনে আমি দাঁড়িয়ে থাকব।”
নাহারকে ইতস্তত করতে দেখা গেল। কী বিপদেই না পড়ল বেচারি। বলল, “যদি না আসি?”
“আপনি আসবেন।” মৃণাল বলল।
“তারপরও ধরুন, আমি যদি না আসি?”
“আমি কাল সকাল পর্যন্ত অপেক্ষা করব।”
এবার নাহারের কপালে চিন্তার ভাঁজ দেখা দিল। কী বলবে বুঝতে পারছে না। ওর ঠোঁট কাঁপতে থাকে। “পাগলামো করবেন না। আমার কাজ আছে। রুমমেটকে নিয়ে বাজার করতে বের হব।” নাহার ধরা কণ্ঠে বলল।
“আপনি যা খুশি করুন, আমি চারটায় আপনার বাসার সামনে দাঁড়িয়ে থাকব।”
এই প্রথম কোনো নারীর বাসার সামনে দাঁড়িয়ে থাকবে মৃণাল। নিজের খামখেয়ালিপনার জন্য লজ্জাও লাগল খুব। কিন্তু কী আর করার! যেহেতু বলে ফেলেছেই, পাগলামো আর একটু করেই দেখা যাক না।
ভালো শার্ট পরে, মাথার চুল আঁচড়িয়ে, দামি পারফিউম মাখিয়ে বাসা থেকে দৌড়ে বেরুলো। হাতে সময় আছে মোটে ১০ মিনিট। অবশ্য গন্তব্যে পৌঁছতে এই সময়ই লাগবে।
বাতাসের বেগে হাঁটা শুরু করল।
আকাশে মেঘ করেছে। ঘনঘন দেয়া ডাকছে। মৃণাল নাহারের বাসার সামনে এসে দাঁড়াল। কেন জানি মনে হচ্ছিল সে আসবে না। নাহার হয়তো ভেবেছে মৃণাল দুষ্টুমি করেছে।
মনটা ভীষণ খারাপ হলো। ওকে নিয়ে যত কল্পনা করেছে সবই কি তাহলে মিথ্যে হবে? সাতপাঁচ ভাবতে ভাবতে পাশের চায়ের দোকানে ঢুকে গেল। দোকানদারকে কড়া করে একটা আদার চা দিতে বলে উদাসভঙ্গিতে বাইরে তাকিয়ে রইল। এমন সময় নাহারকে সামনে দিয়ে যেতে দেখা গেল। মনটা নেচে উঠল মৃণালের। দৌড়ে বাইরে এসে দাঁড়াতেই নাহার বলল, “কোথায় নিয়ে যাবেন?”
চোখ
“আপনার চোখ দুটো খুব সুন্দর।” নাহারের কথায় নড়েচড়ে বসল মৃণাল।
“সত্যিই?” অবাক হয়ে জিগ্যেস করল।
“হ্যাঁ, সত্যিই।” কণ্ঠে গাম্ভীর্য এনে বলল নাহার।
মোবাইলের স্ক্রিনে চোখ জোড়া দেখে নিল। আসলেই তো। এতদিন কেন খেয়াল হয়নি মৃণালের? নাকি চোখ বুজে ছিল? আসলে দীর্ঘদিন অযত্নে-অবহেলায় থাকলে নিজের মূল্যবান জিনিসও মৃল্যহীন-অর্থহীন মনে হয়। এই যেমন তার চোখ জোড়া এতদিন কী নিদারুণ অযত্ন-অবহেলায় ছিল, কখনও কখনও মনে হতো এ চোখ না থাকলেই ভালো হতো। অথচ আজ যখন কারও প্রশংসা শোনা গেল, চোখ জোড়া কোহিনূরের মতো দামি মনে হচ্ছে।
জগৎটা খুব সুন্দর মনে হলো। বেঁচে থাকাটাই আনন্দের। যে জীবন একসময় অভিশপ্ত মনে হতো, রাতারাতি সেই জীবনটাই আনন্দের মনে হচ্ছে। ভাবতেই অবাক লাগে।
দু’জন পাশাপাশি হাঁটছে। কথাও হচ্ছে টুকটাক। ভালো লাগার কথা, মন্দ লাগার কথা। শিক্ষাজীবনের কথা। বন্ধু-বান্ধবদের কথা।
“আপনার মধ্যে একটা মোহমত্ততা আছে। মানে কাউকে ধরে রাখার ক্ষমতা আছে।” মৃণাল বলল। ওর কথায় নাহার হাসল। কিছু বলতে গিয়েও থেমে গেল।
“চলুন পেঁয়াজু খাই।” নাহার বলল।
“চলুন।” নাহারের কথায় সম্মতি দিয়ে মহাসড়কের পাশের একটা হোটেলে ঢুকে পড়লো দু’জন। পেঁয়াজু খাচ্ছে আর টুকটাক কথা হচ্ছে।
“ভালো লাগছে না আমার।” নাহার বলল।
“কেন?”
“এমনিই।”
এবার দুষ্টুমির খেয়াল চাপল মৃণালের মাথায়। বলে উঠল, “নিঃসঙ্গ লাগে? আমার এক রুমমেট আছে। ওনার ফোন নাম্বার দিচ্ছি। কথা বলুন। ভালো লাগবে।”
কথাটা একদম ভালো লাগল না নাহারের। মুখটা কালো হয়ে গেল। খুব লজ্জা পেল মৃণাল। এসময়ে এমন কথা না বললেও পারত সে।
নাহারের কেন মন খারাপ হলো? ও কি মৃণালকে ভালোবাসে? নাকি নাহার ভাবল, ওকে আর পাঁচ জন সাধারণ স্ত্রীলোকের সাথে তুলনা করা হয়েছে, যারা এলো স্রোতে গা ভাসাতেই পছন্দ করে?
ধীরে ধীরে বায়ু বয়
“আপনার হাতটা ধরি?” চট্টগ্রাম যাবে নাহার। মৃণাল ওর সাথে আছে। ঢাকা বিমানবন্দর রেলস্টেশন পর্যন্ত এগিয়ে দিয়ে যাবে।
“ধরুন,” মৃণাল বলল।
নাহার শক্ত করে ওর হাত ধরল।
“আপনার হাত এত শক্ত কেন?”
“শক্ত কাজকর্ম করি তো তাই হাত শক্ত।” নাহার হেসে হেসে বলল।
মৃণালের একটু অস্বস্তি হচ্ছে। এই প্রথম কোনো স্ত্রীলোক ওর হাত ধরেছে; এটা একটা কারণ হতে পারে। আরেকটা কারণ হলো- পাশের সিটের এক বয়স্কা মহিলা কেমন শ্যেন দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে। মনে হচ্ছে ওদের গিলে খাবে। নাহারের কোনো দিকে খেয়াল নেই। ও পারে তো মৃণালের গায়ের সাথে লেপ্টে পড়ছে। আর দীন-দুনিয়ার যত আলাপ করছে।
১৯ অগ্রহায়ণ ১৪২৬ বঙ্গাব্দ
গাজীপুর।
সর্বশেষ এডিট : ১৮ ই জুন, ২০২৪ সকাল ১০:০৮

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


