
মহাখালী রেলগেট এলাকায় ময়মনসিংহের এক ভদ্রমহিলার সঙ্গে দেখা হলো মৃণালের। তিনি এক দোকানদারের সঙ্গে কথা বলছিলেন। তার কথায় ময়মনসিংহের আঞ্চলিকতার টান শুনে মৃণাল আগ বাড়িয়ে আলাপ জুড়ে দিল। তার নিজের বাড়িও ময়মনসিংহে।
“ময়মনসিংহ ছেড়ে হঠাৎ ঢাকায়? কতদিন হলো এখানে আছেন?”
“আট মাস,” শান্ত গলায় বললেন তিনি।
কথা প্রসঙ্গে জানা গেল, তার মেয়ে সবে কলেজ শেষ করেছিল। আনন্দমোহন কলেজে অনার্সে ভর্তির তালিকায় তার নামও এসেছিল। কিন্তু তার আগেই স্বামীর হাতে খুন হয় সে। মেয়ের হত্যার বিচারের জন্য ভদ্রমহিলা সর্বোচ্চ চেষ্টা করছেন। মেয়েটি জুলাই আন্দোলনে সক্রিয় ছিল। এনসিপির নেতা নাহিদ ময়মনসিংহে গেলে সেই ঘটনার কথা স্মরণ করিয়ে তার কাছে বিচার চেয়েছিলেন তিনি। নাহিদ তার মাথায় হাত বুলিয়ে বলেছিলেন, বিচার হবে। কিন্তু সে প্রতিশ্রুতি আর বাস্তব হয়নি।
“মেয়েকে কেন মারা হলো?”
“যে ছেলেটার সঙ্গে বিয়ে হয়েছিল, সে নেশাখোর ছিল। তুচ্ছ ঘটনায় আমার মেয়েকে মেরে ফ্যানে ঝুলিয়ে রাখে।”
“তখন বাসায় কেউ ছিল না?”
“ওরা আমাদের সঙ্গেই থাকত। আমি চাকরি করতাম, ওর বাবাও চাকরি করত। সেদিন আমরা কেউ বাসায় ছিলাম না।”
“এমন নেশাখোরের কাছে মেয়ে বিয়ে দিলেন?”
“মেয়েই আমাদের বাধ্য করেছিল। বলেছিল, ওর সাথে বিয়ে না দিলে আত্মহত্যা করবে।”
“কতদিনের সম্পর্ক ছিল?”
“ক্লাস এইট থেকে। করোনার সময় ঢাকায় চলে এসেছিলাম। অনেকদিন যোগাযোগ ছিল না। পরে কীভাবে যেন আবার যোগাযোগ বাড়ে, বুঝতেই পারিনি।”
“ফেরানোর চেষ্টা করেননি?”
“করেছি। অনেক বুঝিয়েছি। ওই যে বললাম, আত্মহত্যার হুমকি দিত। ছেলেটার বিরুদ্ধে কিছু বললেই রাগ করত।”
ভদ্রমহিলার মলিন মুখের দিকে তাকিয়ে মৃণাল জিজ্ঞেস করল, “এখন চলেন কীভাবে?”
“বাসায় বাসায় ঘুরে থ্রিপিস বিক্রি করি। ঈদের সময় একটু চলে, অন্য সময় খুব কম।”
“টাচ মোবাইল নেই। থাকলেও চালাতে পারতাম না। ব্যাকডেটেড মানুষ তো।”
“আগে কী করতেন?”
“এখানে বাজারে সমিতির টাকা তুলতাম। অফিসারের ব্যবহার খারাপ ছিল, তাই ছেড়ে দিয়েছি।”
“আপনার স্বামী?”
“বাসের টিকিট বিক্রি করে। আর রাতে মেয়ের জন্য কাঁদে। মেয়েকে এত ভালোবাসত যে, এত বড় মেয়ের কাপড়ও নিজে ধুয়ে দিত।”
“এতে তো সংসার চলে না। কীভাবে সামলান?”
“আমার এক দেবরের বাসায় থাকতে দেয়। সে প্রতিদিন ৩০০ টাকা দেয় ওর বড় ভাইকে। আমি যা উপার্জন করি, মাঝেমধ্যে চাল কিনি, ছেলের স্কুলের খরচ চালাই।”
“অবস্থা কি আগে থেকেই খারাপ ছিল?”
“না। আসলে ময়মনসিংহে এক ওয়ার্ডে রাজনীতি করতাম। নির্বাচন করে হেরে যাই, প্রায় ৩০ লাখ টাকা খোয়া যায়। সেখান থেকেই পথের ফকির।”
“কোনো মামলা আছে আপনার নামে?”
“মামলা নেই। তবে বিভিন্ন সমাবেশের ছবি আছে। সবাই কমবেশি চেনে আমাকে।”
“কোনো নেতার সঙ্গে যোগাযোগ আছে?”
“মাঝে কয়েকবার ফোন দিয়েছে। দু’বার ২০ হাজার টাকা দিয়েছে। এখন বলে, ‘একদিন না একদিন বিচার হবে, ধৈর্য ধর মা।’”
“মামলা করেননি?”
“থানায় নেয়নি, তাই আদালতে করেছি। মামলা চলছে। আসামি ধরা পড়েছে, এখন জামিনে।”
কথা চলতে থাকে আরও কিছুক্ষণ। শেষে মৃণাল বলল, “চলুন, আপনাকে কিছু খাওয়াই। মনে হচ্ছে সকাল থেকে কিছু খাননি।”
এ কথা শুনে ভদ্রমহিলা অঝোরে কেঁদে ফেললেন। মৃণাল নির্বাক চোখে তাকিয়ে রইল। সন্তানহারা এ দুঃখিনী মাকে সে কী স্বান্তনা দিতে পারে? আশপাশে লোকজন জড়ো হতে লাগল। মৃণাল সবার উদ্দেশে বলল, “দেখার কিছু নেই। উনি আমার বোন হন। নিজের মেয়ে খুন হয়েছে, আর এখন খেয়ে না খেয়ে দিন কাটাচ্ছেন।”
ছবি: ইন্টারনেট
সর্বশেষ এডিট : ১৮ ই ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ রাত ২:১৯

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


