somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

অধিবর্ষের সাতকাহন: সৌর বছরের সমীকরণ মেলাবার ইতিহাস,অ্যালগরিদম এবং অন্যান্য

০২ রা জানুয়ারি, ২০২০ সকাল ৮:২৩
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :


আকাশগঙ্গা ছায়াপথের হলদে বামন নক্ষত্রটির আকর্ষণের বন্ধন এবং সে বন্ধন ছিন্ন করে মহাবিশ্বে নির্বাণ লাভের দুর্নিবার তাড়নার মাঝে এক ধ্রুব সমঝোতায় পৃথিবী নামক গ্রহটি সূর্যকে উপবৃত্তাকার পথে প্রদক্ষিণ করে চলেছে। কেবল সূর্যকে প্রদক্ষিণ নয়, গ্রহটির আরেক প্রকার ঘূর্ণনও রয়েছে-নিজ অক্ষে ঘূর্ণন। ঠিক যেন লাটিমের মতন নিজ মেরুদন্ড বরাবর পাক খেতে খেতে চতুর্দিকে চক্কর কাটা। গ্রহটির উভয় প্রকার ঘূর্ণন নিয়ে গ্রহবাসী সর্বোন্নত প্রাণসত্তা মানুষের কৌতূহলের কমতি ছিল না কোন কালেই। অবাক বিস্ময়ে সে আবিষ্কার করেছে সূর্যের চারিদিকে প্রতিবার ঘুরে আসতে আসতে মেরুদন্ডে ৩৬৫ বারের 'একটুখানি বেশি' পাক খাচ্ছে পৃথিবী। তাই সব ঋতু ঘুরে একেকটা ঋতু ফিরে আসার মাঝে ৩৬৫ বার দিন-রাত পালাক্রমে নেমে আসছে গ্রহটির প্রতিটি অঞ্চলে। ৩৬৫ আহ্নিক আবর্তনে এক বার্ষিক আবর্তন,সহজ কথায় ৩৬৫দিনে এক বছর-সরল হিসাবটির নিষ্পত্তি এখানেই টানা যেত। কিন্তু বাধ সাধলো ৩৬৫ বারের পরও 'একটুখানি বেশি' পাক খাওয়া। তবু খুব একটা সমস্যা ছিল না;কারণ এরকম চারটা 'একটুখানি বেশি' পাক মিলিয়ে প্রায় এক দিনের সমান হয়ে যায়। কিন্তু ঐ যে,একটা 'প্রায়'ও কিন্তু থেকেই গেল! এভাবে বেশ কিছু 'প্রায়','একটু বেশি','কাছাকাছি' ঘুচিয়ে দিন আর বছরের সমীকরণকে মিলাতে অবতারণা করতে হলো একটি নতুন ধারণার;নাম তার Leap Day. আর এমন অদ্ভুতুরে ৩৬৬ দিনের বছরের নাম হলো Leap Year,বাংলায় অধিবর্ষ



আমাদের অতি পরিচিত এ বিষয়টির অ্যালগরিদমকে আয়ত্তে আনতে জ্যোতির্বিজ্ঞানীদের কিন্তু কম কসরত করতে হয়নি! আবার দেশে দেশে অধিবর্ষের হিসাব-নিকাশেও রয়েছে নানান বৈচিত্র্য। চলুন,শতাব্দীর পঞ্চম অধিবর্ষের প্রারম্ভে ফিরে তাকানো যাক লিপ ইয়ার বা অধিবর্ষের নেপথ্য ইতিহাস এবং দেশে দেশে অধিবর্ষ হিসাবের রকমফেরের দিকে।


শুরুটা রমুলাসের হাতে,পম্পিলিয়াস জুড়ে দিলেন দুই মাস......

সৌর আবর্তনের কাল গণনা করা তো আর চাট্টিখানি কথা না। সংসারবিমুখ পাগলাটে জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা না হয় রাতের পর রাত আকাশের দিকে চোখ রেখেই কাটিয়ে দিতে পারেন;কিন্তু আমজনতার বয়েই গেছে তাতে! ক্রমাগত বৃদ্ধি আর ক্ষয়ের চক্রে ঘোরা চাঁদকেই তাই প্রাচীনকালে মাস গণনার ভিত্তি হিসেবে ধরা হতো।



অন্যান্য প্রাচীন বর্ষপঞ্জির মতন প্রাচীন রোমান বর্ষপঞ্জিও তাই চান্দ্র হিসাব মেনে চলতো। কিন্তু তাতে ঋতু আবর্তনের হিসেবটা অবশ্য মিলানো যেত না। নির্দিষ্ট ঋতুতে পালিত উৎসবের দিনক্ষণ ঠিক রাখাটাও বেশ ঝামেলার ব্যাপার ছিল। এজন্য প্রয়োজনমাফিক বছরখানেক পর পর অতিরিক্ত একটি ২২-২৩ দিনের মাসকে ক্যালেন্ডারে আমদানি করবার রেওয়াজ ছিল। ভালো কথা,ক্যালেন্ডার শব্দটি কিন্তু এসেছে রোমান 'Kalendae' থেকে;যা দিয়ে প্রতি মাসের প্রথম দিনকে বোঝানো হতো।



সম্রাট রমুলাস রোমান সাম্রাজ্যের রাজকীয় কাজকর্ম চালানোর জন্য যে ক্যালেন্ডারটিকে স্থির করেন,তাতে ছিল ১০ মাস,বছর শেষ হতো ৩০৪ দিনে।



৩০৪ দিনের ক্যালেন্ডারে চলে শীঘ্রই একটা হ-য-ব-র-ল অবস্থা দেখা দিল। প্রকৃতি তো আর সম্রাটের হুকুমে চলবে না! সম্রাট পম্পিলিয়াস খ্রিষ্টপূর্ব ৭০০ সনে তাই যোগ করে দিলেন ৬০ দিন। ডিসেম্বরের শেষে জুড়ে দিলেন জানুয়ারি আর ফেব্রুয়ারি নামে দুটি নতুন মাস। কিন্তু তবুও হিসেব ঠিকমত আর মিললো কোথায়?

সম্রাট জুলিয়াস সিজারের নির্দেশে সৌর বছরের সমীকরণ মিলাতে বসলেন সসেজেনেস অব আলেকজান্দ্রিয়া......



৪৬ খ্রিস্টপূর্বাব্দ । প্রচলিত ক্যালেন্ডার নিয়ে বড্ড নাখোশ রোমান সম্রাট জুলিয়াস সিজার। বিশেষত উৎসবের দিনক্ষণ স্থির করা নিয়ে জটিলতার জন্য কোনভাবেই পুরাতন এ ক্যালেন্ডারটি নিয়ে তিনি সন্তুষ্ট থাকতে পারলেন না। সাধ জাগলো নিজের নামে সৌরভিত্তিক অভিনব এক ক্যালেন্ডার প্রবর্তনের। তাই ডাক পড়লো সাম্রাজ্যের বিখ্যাত জ্যোতির্বিদ সসেজেনেস অব আলেকজান্দ্রিয়ার। এখানে বলে রাখা ভালো,জুলিয়াস সিজারের আগেও কিন্তু সৌর বছরের হিসেব মিলাবার চিন্তা এসেছিল মিশরীয় পন্ডিতদের মাথায়! কিন্তু তারপর আর বেশিদূর কাজ এগোয়নি।



যাহোক,হিসেব মিলাতে বসলেন সসেজেনেস। একবছরে ৩৬৫ দিনের সাথে বাড়তি সময় এক দিনের চার ভাগের একভাগ। এখন আমরা পুঙ্খানুপুঙ্খভাবেই জানি সূর্যের চারদিকে পৃথিবীর এক চক্করে সময় ৩৬৫ দিন ৫ ঘন্টা ৪৮ মিনিট ৪৭ সেকেন্ড। কিন্তু সে সময় গ্রিক জ্যোতির্বিজ্ঞানী হিপারাকাসের করে যাওয়া হিসেব মোতাবেক এক বছর সমান ৩৬৫ দিন ৫ ঘন্টা ৫৫ মিনিট ১২ সেকেন্ড মানা হতো।

তাহলে দাঁড়ালো,
১ বছরে দিন সংখ্যা= ৩৬৫+ ৫/২৪ + ৫৫/(৬০*২৪)+ ১২/(৬০*৬০*২৪) = ৩৬৫.২৪৬৬৭

অর্থাৎ,বাড়তি ০.২৪৬৬৭ দিন। মোটা দাগে ০.২৫ দিন। তাহলে,চার বছর পর পর ১ টা অতিরিক্ত দিন গণনা করলেই মিলে যায় হিসেব! অতএব চার বছর অন্তরন্তর অধিবর্ষ গণনার বিধানসমেত প্রণীত হলো জুলিয়ান ক্যালেন্ডার




ফেব্রুয়ারির ভাগে কেন মাত্র ২৮ দিন??

ফেব্রুয়ারি মাসে কিন্তু এককালে পাক্কা ৩০ দিন ছিল। আসলে রোমান ক্যালেন্ডার এবং জুলিয়ান ক্যালেন্ডারের বেশকিছু মাসের নামকরণ করা হয়েছিল বিভিন্ন দেব-দেবীর নামানুসারে। তবে জুলাই মাসের নামকরণ করা হয় খোদ সম্রাট জুলিয়াস সিজারের নামে। জুলিয়াস সিজারের পর মসনদে বসলেন সম্রাট অগাস্টাস সিজার। তিনি দেখলেন জুলিয়াস সিজারের নামের মাসে সর্বোচ্চ ৩১ দিন; অথচ ঢেলে সাজানো ক্যালেন্ডারে নিজের নামের মাস আগস্টের ভাগে পড়ে কি না মোটে ২৯ দিন! তা কি করে হয়? তাই তিনি নতুন একটা ফন্দি আটলেন। ঠিক করলেন কোন একটা মাস থেকে দুটো দিন ছিনিয়ে আনবেন। কিন্তু প্রশ্ন হলো কোন দেবতার নামের মাসে ছুরি চালানো যায়? নাকি সংখ্যাবাচক সেপ্টেম্বর-ডিসেম্বর থেকে কেড়ে নেওয়া হবে দুটো দিন।



সে আমলে বছরের প্রথম মাস মার্চ আর শেষ মাস ছিল ফেব্রুয়ারি। দেবতা ফেব্রুসের নামে বছরের শেষ মাসটিকে নিয়ে টানা-হেঁচড়া কম হয় নি। পম্পিলিয়াসের যুগ থেকে শুরু করে উৎসবের দিনক্ষণ ঠিক রাখতে দিন যোগ-বিয়োগ করার যত ঝক্কিঝামেলা,পুরোটাই যেত ফেব্রুয়ারি মাসের উপর দিয়ে। এক্ষেত্রেও তাই বেছে নেওয়া হলো বেচারা ফেব্রুয়ারিকেই। ৩০ দিনের মাসটি থেকে কেটে আনলেন ২ দিন,জুড়ে দিলেন আগস্ট মাসের সাথে। নিজের নামের মাসকে ৩১ দিনে টেনে সমকক্ষ হলেন সম্রাট জুলিয়াস সিজারের! সেই থেকে বেচারা ফেব্রুয়ারি মাস ২৮ দিনের! অবশ্য চার বছর পরপর সান্ত্বনা হিসেবে যোগ হতে থাকলো লিপ ইয়ারের অতিরিক্ত একটা দিন।

পোপ গ্রেগরি আনলেন সংশোধনী, ক্যালেন্ডারের পাতা থেকে হারিয়ে গেল আস্ত ১০ টা দিন!

জুলিয়ান ক্যালেন্ডারে লিপ ইয়ারের হিসেবে একটা বড়সড় গলদ ছিল। ভুলে গেলে চলবে না সসেজেনেস কিন্তু হিসেব করে গেছেন ৩৬৫.২৫ দিন ধরেই। তাই পোপ ত্রয়োদশ গ্রেগোরির আমল পর্যন্ত হাজার বছরে গোটা ১৪টা দিন বেশি গণনা করা হয়ে গিয়েছিলো! পোপ ভাবলেন এর একটা বিহিত করা দরকার। ১৮৫২ সালে চালু করলেন নতুন গ্রেগরিয়ান ক্যালেন্ডার। ক্যালেন্ডার থেকে গুম করে দেওয়া হলো অক্টোবরের ৫ থেকে ১৪ তারিখ,মোট দশটা দিন। এলো অধিবর্ষের নতুন অ্যালগরিদম:প্রতি ৪০০ বছরে বাদ দেওয়া হবে ৩ টা লিপ ইয়ার। বেছে নেওয়া হলো প্রতি শতাব্দীর শেষ বছরগুলোকে যেগুলো ৪০০ দ্বারা বিভাজ্য নয়;যেমন ১৯০০,২১০০,২২০০,২৩০০,২৫০০.....। আর রেহাই পেল ২০০০,২৪০০,২৮০০....।



তাহলে হিসেবটা দাঁড়ালো,
১ বছর=৩৬৫+ ১/৪ - ৩/৪০০ দিন= ৩৬৫.২৪২৫ দিন।

ওদিকে,সূর্যকে প্রদক্ষিণের কাল ব্যাপ্তি ৩৬৫ দিন ৫ ঘন্টা ৪৮ মিনিট ৪৭ সেকেন্ড ধরে,
১ বছর= ৩৬৫+ ৫/২৪ + ৪৮/(৬০*২৪) +৪৭/(৬০*৬০*২৪) দিন= ৩৬৫.২৪২২১০৬ দিন

তার মানে দশমিকের পর তিন ঘর পর্যন্ত মিলে গেল! একটা 'প্রায়' থেকে গেলেও আপাতত তাই রফা করা গেল।


ইংরেজি বর্ষপঞ্জিতে অধিবর্ষের প্রচলিত অ্যালগরিদম:

বিশ্বজুড়ে এখন ইংরেজি ক্যালেন্ডারের মোড়কে গ্রেগোরিয়ান ক্যালেন্ডার মোতাবেকই বছর গণনা হচ্ছে। অধিবর্ষের হিসেবটাও খুব একটা জটিল না,সকলেরই জানা। তবু আলাদা করে আরেকবার উল্লেখ করা যাক-
১)সন সংখ্যা ১০০ দ্বারা অবিভাজ্য হলে ৪ দ্বারা বিভাজ্য হওয়া মাত্রই সেটি লিপ ইয়ার। যেমন:২০২০।
২)সন সংখ্যা ১০০ দ্বারা বিভাজ্য হলে যাচাই করতে হবে সেটি ৪০০ দ্বারাও বিভাজ্য কি না;বিভাজ্য না হলে লিপ ইয়ার,হলে লিপ ইয়ার নয়।

বাংলা বর্ষপঞ্জিতে অধিবর্ষের অ্যালগরিদম:



১৬৬৪ সালে সম্রাট আকবর যে বাংলা বর্ষপঞ্জির প্রচলন করেছিলেন,সেখানে অধিবর্ষ হিসেবের কোন বালাই ছিল না। কিন্তু সনাতন ধর্মাবলম্বীদের অনুসৃত সনাতনী বাংলা বর্ষপঞ্জিতে কিন্তু অধিবর্ষ গণনা করা হয়। তবে সে হিসেব কিছুটা জটিল।
১)সন সংখ্যাটি নিন।
২)গৃহিত সংখ্যাটি থেকে ৭ বিয়োগ করুন।
৩)প্রাপ্ত সংখ্যাকে ভাগ করুন ৩৯ দিয়ে।
৪)ভাগশেষ কি ০? তবে নির্দ্বিধায় সিদ্ধান্ত নিন এটি একটি অধিবর্ষ। অন্যথায়......
৫)প্রাপ্ত ভাগশেষ কি ৪ দ্বারা বিভাজ্য? তাহলেও এটি অধিবর্ষ। আর এবারও শর্ত না মানলে এতে অতিরিক্ত দিন যোগের প্রয়োজন নেই।

আধুনিক বাংলা বর্ষপঞ্জিতে এ নীতি প্রয়োগ করে দেখা যাক। এটা বাংলা ১৪২৬ সাল। ৭ বিয়োগে হয় ১৪১৯। ৩৯ দিয়ে ভাগে ভাগফল ৩৬ ও ভাগশেষ ১৫;৪ দ্বারা বিভাজ্য নয়। অর্থাৎ ১৪২৬ না হলেও আগামি বছর কিন্তু এ নীতি মোতাবেক অধিবর্ষ।

অবশ্য আধুনিক বাংলা বর্ষপঞ্জিতে বাংলা একাডেমি(বাংলাদেশ) প্রণীত নিয়ম অনুযায়ী গ্রেগরিয়ান নীতি অনুসরণ করে অধিবর্ষ গণনা করা হয়। অতিরিক্ত দিনটি যোগ হয় ফাল্গুন মাসের সাথে।

আরবীয় এবং ইসলামিক বর্ষপঞ্জিগুলোতে অধিবর্ষের অ্যালগরিদম:



হিজরি ক্যালেন্ডারে প্রতি ৪-৫ বছর অন্তর বছরের শেষদিনটির পর অতিরিক্ত একটি দিন গণনার রেওয়াজ ছিল। তবে বর্তমান আধুনিক ইসলামিক ক্যালেন্ডারে লিপ ইয়ার বা লিপ ডে হিসেব করা হয় না। অবশ্য মধ্যযুগে প্রচলিত 'ট্যাবুলার ইসলামিক ক্যালেন্ডার' অনুসরণ করে এখনো অনেক গোষ্ঠী প্রতি ৩০ বছরে ১১ বার একটি লিপ ডে যোগ করে নেয়। আহমদীয়াদের 'হিজরি-শমসি ক্যালেন্ডার' সৌর নীতিতে চলে যার অধিবর্ষের নীতি গ্রেগরিয়ান ক্যালেন্ডারের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ।

চৈনিক বা চীনা বর্ষপঞ্জিতে অধিবর্ষের অ্যালগরিদম:



চীনা বর্ষপঞ্জিও চান্দ্রমাসের নীতি অনুসরণ করে। মজার ব্যাপার হলো চীনা ক্যালেন্ডারের প্রথম মাস কিন্তু স্থির নয়! মাস হিসেব এমনভাবে করা হয় যেন দক্ষিণ অয়নান্ত(Winter Solstice) ঠিক ১১ তম মাসে পড়ে। অর্থাৎ যে মাসে পৃথিবীর দক্ষিণ গোলার্ধ সূর্যের দিকে সবচেয়ে বেশি হেলে পড়ে(একেই দক্ষিণ অয়নান্ত বলে),সে মাসটির দুমাস পর থেকেই নতুন বছর। এ নিয়ম বজায় রেখে সুযোগ বুঝে বারো মাসের পর আরেকটি মাস টেনে এনে দক্ষিণ অয়নান্তের পর তৃতীয় মাস থেকে নতুন বছর শুরু করা হয়। তবে চীনের এ জগাখিচুড়ি ক্যালেন্ডারের বিভিন্ন সংস্করণে কিছুটা করে ভিন্নতা রয়েছে।

অন্যান্য চান্দ্র বর্ষপঞ্জির মধ্যে হিব্রু ক্যালেন্ডারে প্রতি ১৯ বছরে ৭ বার অতিরিক্ত একটি ত্রয়োদশ মাস গণনা করা হয়। হিন্দু বর্ষপঞ্জিতে ২-৩ বছর ব্যবধানে একটি অতিরিক্ত মাস হিসেবে 'অধিক মাস' যোগ করে নেওয়া হয়।

যাদের জন্ম লিপ ডে তে,সাধারণ বছরগুলোতে তারা কি করে জন্মদিন উদযাপন করবে?

২৯ ফেব্রুয়ারিতে জন্মগ্রহণ করা দুর্ভাগা মানুষদের সংখ্যা কিন্তু নেহাত কম নয় পৃথিবীতে। সম্ভাব্যতার সাধারণ নীতি বলে প্রতি ১৪৬১ জনের একজনের জন্ম লিপ ডে তে(যেহেতু,৩৬৫*৪+১= ১৪৬১)। চার বছর ঘুরে আসা এ বিশেষ দিনটিতে জন্মগ্রহণ করা শিশুদের জন্য একটি বিশেষ নাম পর্যন্ত রয়েছে-লিপ্লিংস বা লিপারস। এদের মধ্যে কবি জন বায়রোম, গায়িকা ডিনা সোর রয়েছেন। ভারতের প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী মোরারজি দেশাইয়ের জন্মদিনও ২৯ ফেব্রুয়ারি।



লিপারদের জন্মদিন পালনের জন্য কিছু দেশ আইন পর্যন্ত করে দিয়েছে! চীনে ১৯২৯ সালের ১০ অক্টোবর প্রণীত কোডে ২৮ ফেব্রুয়ারি লিপারদের জন্মদিন পালনের বিধান দেওয়া হয়। অন্যদিকে হংকং ১৯৯০ সালে উল্টো আইন করে ১ মার্চ লিপারদের জন্মদিন ধরার (কিছু কি বুঝলেন?)।
জন্ম-মৃত্যু দুই-ই লিপ ডে তে-এরকম হবার গাণিতিক সম্ভাবনা ২১,৩৪,৫২১ ভাগের ১ ভাগ। তবু এমন মানুষও কিন্তু আছেন!
তাসমানিয়ার প্রাক্তন গভর্নর জেমন মিনে উইলসন নিজের জন্ম ও মৃত্যুর তারিখের জন্য জায়গা করে নিয়েছেন ইতিহাসে। তিনি ১৮১২ সালের ২৯ ফেব্রুয়ারি জন্মগ্রহণ করেছিলেন এবং ১৮৮০ সালের ২৯ ফেব্রুয়ারি তাঁর মৃত্যু হয়েছিল-দুই-ই লিপ ডে তে!


লিপ ইয়ারকে ঘিরে কুসংস্কার:

১) গ্রিসে লিপ ইয়ারকে বিয়ে করার জন্য অশুভ বছর বিবেচনা করা হয়! বর্তমানে অবশ্য এই সংস্কার অনেকেই মানেন না। তবুও গ্রিসে লিপ ইয়ারগুলোতে বিয়ে রেজিস্ট্রির হার অন্যান্য বছরগুলোর তুলনায় কম।



২)আয়ারল্যান্ডে আবার ব্যাপারটা উল্টো! আইরিশ তরুণীদের জন্য প্রেম নিবেদনের শুভ লগ্ন লিপ ইয়ারের ফেব্রুয়ারি মাস। ২০১০ সালে এ মিথকে কেন্দ্র করে Leap Year নামে একটা মুভি পর্যন্ত হয়েছে!

৩)তাইওয়ানে এমন ধারণা আছে যে লিপ ইয়ারের ফেব্রুয়ারি মাস বয়স্কদের জন্য অশুভ। তাই এ সময়টাতে তাইওয়ানের অনেক বিবাহিত মেয়েকে বৃদ্ধ বাবা-মায়ের সাথে কাটাতে দেখা যায়।


আছে লিপ সেকেন্ডও!!!!



এক দিন কত ঘন্টা? সহজ উত্তর- ২৪ ঘন্টা বা ৮৬,৪০০ সেকেন্ড। নাহ! এখানেও আছে বিচ্যুতি! ১৮২০ সাল থেকে হিসেব করে দেখা যচ্ছে গ্রহগুলোর মধ্যে আকর্ষণ বলের কারণে এ হিসেবেও গরমিল হচ্ছে। নাসা বলছে পৃথিবীর আহ্নিকগতি ক্রমশ শ্লথ হচ্ছে। প্রায়শই দিনগুলোর ব্যাপ্তি ২ মাইক্রোসেকেন্ড পর্যন্ত কমবেশি হচ্ছে। বছর শেষে তা পুরো এক সেকেন্ড এদিক-সেদিক করে ফেলছে। এজন্য ১৯৭২ সাল থেকে লিপ সেকেন্ড হিসেবের প্রচলন শুরু হয়। ২০১৬ সালের ৩১ ডিসেম্বর সবশেষ ২৭ তম লিপ সেকেন্ড যোগ করা হয়। লিপ সেকেন্ডের হিসেব কিন্তু মোটেও লিপ ইয়ারের মতন নিয়মিত না। প্রয়োজন অনুযায়ী অনেকটা এলোমেলোভাবে লিপ সেকেন্ড পালনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।


গ্রেগরিয়ান বর্ষপঞ্জির ভবিষ্যত কি?

গ্রেগরিয়ান ক্যালেন্ডারের সফলতা এই যে এটির অধিবর্ষের অ্যালগরিদম বছরের হিসেবকে দশমিকের পর ৩ ঘর পর্যন্ত মিলিয়ে দিতে সক্ষম হয়েছে। কিন্তু এটা ভুলে গেলে চলবে না যে এটিও সম্পূর্ণ নির্ভুল নয়। ৩,২৩৬ বছর এ হিসেব মোতাবেক চললে ১ টা দিন বেশি গণনা করা যাবে। তাই তখন এ ক্যালেন্ডারকেও সংশোধন করতে হবে। কী করা হবে তখন? এমনিই একটা দিনকে উধাও করে দেওয়া হবে ক্যালেন্ডারের পাতা থেকে? অবশ্য সহস্র বছর পরে কি করা হবে না হবে তা নিয়ে এখন আমাদের ভাবতে বয়েই গেছে!

ভাবতে অবাক হতেই হয়,যে বিষয়গুলোকে এক সময় পরম ভাবা হতো,সেখানেও কতই না বিচ্যুতি রয়েছে! বিশ্ব-ব্রহ্মান্ড নিপুণ শৃঙ্খলায় পরিচালিত হচ্ছে,সন্দেহ নেই। কিন্তু তাকে ব্যাখ্যা করার জন্য মানুষের করা সহজ-সরল হিসেবগুলোতেও ধরা পড়ছে কত সূক্ষ্ম ভুল। লিপ ইয়ার ছাড়ুন,লিপ সেকেন্ডের কথাই একবার ভাবুন না! দিনকে ২৪ ঘন্টা বা ৮৬,৪০০ সেকেন্ডে ভাগ করে যে গণনা চলে এসেছে শতাব্দীর পর শতাব্দী,সেটাও যে নির্ভুল নয় তাও আজ প্রমাণিত হয়েছে। মানুষের লব্ধ যেসকল জ্ঞানকে আমরা আজ পারফেক্ট বা নির্ভুল ভেবে বড়াই করছি,তা যে কাল ভুল প্রমাণিত হবে না বা তাতে যে কোন বিচ্যুতি ধরা পড়বে না,তার কী নিশ্চয়তা আছে?


যাহোক,সকলকে ইংরেজি নববর্ষের শুভেচ্ছা! হ্যাপি নিউ ইয়ার।

তথ্যসূত্র:
১)Leap Year-Wikipedia
২)The Physics of Leap Day-Forbes
৩)Leap Year Explained
৪)Who Invented Leap Year?
৫)Solar Calendar-Britannica
৬)Countries That Use Their Own Calendar-Worldatlas
৭)Leap Year-Math is fun
৮)What's A Leap Second?
৯)লিপ ইয়ার নিয়ে এ তথ্যগুলি জানেন কি আপনি?
১০)লিপ ইয়ার কেন হয়?


.........................................................................................................................................................................

আমি অন্য একটা পোস্ট ড্রাফট করে রেখেছিলাম পহেলা জানুয়ারির জন্য। কিন্তু একই টপিক নিয়ে গুরুজি শের শায়রী সাহেব এক দিন আগেই পোস্ট দিয়ে দিয়েছেন :(( :(( :(( :((। অগত্যা প্ল্যান-বি মোতাবেক তাড়াহুড়ো করে এটাই তৈরি করলাম। ভুলগুলো ক্ষমাসুন্দর দৃষ্টিতে দেখার এবং ধরিয়ে দিয়ে সহায়তা করবার আমন্ত্রণ রইলো।

সকলকে ইংরেজি নববর্ষের শুভেচ্ছা!
সর্বশেষ এডিট : ০৪ ঠা জানুয়ারি, ২০২০ সকাল ১১:০৪
২৩টি মন্তব্য ২৩টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

চিলেকোঠার প্রেম- ১৩

লিখেছেন কবিতা পড়ার প্রহর, ২৭ শে অক্টোবর, ২০২০ বিকাল ৪:২৫


দিন দিন শুভ্র যেন পরম নিশ্চিন্ত হয়ে পড়ছে। পরীক্ষা শেষ। পড়ালেখাও নেই, চাকুরীও নেই আর চাকুরীর জন্য তাড়াও নেই তার মাঝে। যদি বলি শুভ্র কি করবে এবার? সে বলে... ...বাকিটুকু পড়ুন

নগ্ন দেহের অপূর্ব সৌন্দর্যতা বুঝেন না! বলাৎকার বুঝেন?

লিখেছেন মুজিব রহমান, ২৭ শে অক্টোবর, ২০২০ রাত ৮:৩৫


শৈল্পিক প্রকাশের সর্বোচ্চ রূপ হিসেবে বিবেচনা করা হয় নগ্নতাকে৷ ইউরোপে অন্ধকার যুগ কাটিয়ে রেনেসাঁ নিয়ে এসেছিল আধুনিক ও সভ্য ইউরোপ৷ রেনেসাঁ যুগের শিল্পীরা দেদারছেই এঁকেছেন শৈল্পিক নগ্ন ছবি৷... ...বাকিটুকু পড়ুন

আমাদের নবীকে ব্যঙ্গ করার সঠিক শাস্তি সে ফরাসি শিক্ষক কি পেয়েছে?

লিখেছেন নূর আলম হিরণ, ২৭ শে অক্টোবর, ২০২০ রাত ৯:৫৩



গত কয়েকদিন আগে ফ্রান্সে কি হয়েছিল? একজন শিক্ষক ক্লাসে আমাদের নবীর ব্যঙ্গচিত্র দেখিয়েছিলেন, বলা হয়েছিল তার উদ্দেশ্যে ছিল বাকস্বাধীনতা ও ব্যক্তিস্বাধীনতার বিষয়ে বুঝানো। এটার পর এক মুসলিম যুবক তার ধর্মীয়... ...বাকিটুকু পড়ুন

কবি ও পাঠক

লিখেছেন সোনাবীজ; অথবা ধুলোবালিছাই, ২৭ শে অক্টোবর, ২০২০ রাত ১১:৩১

কবিদের কাজ কবিরা করেন
কবিতা লেখেন তাই
ভেতরে হয়ত মানিক রতন
কিবা ধুলোবালিছাই

জহু্রি চেনেন জহর, তেমনি
সোনার পাঠক হলে
ধুলোবালিছাই ছড়ানো পথেও
মাটি ফুঁড়ে সোনা ফলে।

৩০ সেপ্টেম্বর ২০২০

***

স্বরচিত কবিতাটির ছন্দ-বিশ্লেষণ

শুরুতেই সংক্ষেপে ছন্দের প্রকারভেদ জেনে নিই। ছন্দ... ...বাকিটুকু পড়ুন

হযরত মুহাম্মদ (সাঃ) এর প্রিয় খাবার সমূহ

লিখেছেন রাজীব নুর, ২৮ শে অক্টোবর, ২০২০ রাত ৩:৩৪



আমাদের প্রিয় নবী হযরত মুহাম্মদ (সা.)।
প্রিয় নবী হজরত মুহাম্মদ (সা.) যেসব খাবার গ্রহণ করেছেন, তা ছিল সর্বোচ্চ স্বাস্থ্যসম্মত ও পুষ্টিগুণে সমৃদ্ধ। নবীজি (সা.) মোরগ, লাউ, জলপাই, সামুদ্রিক মাছ,... ...বাকিটুকু পড়ুন

×