somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

ইকো.......ভালবাসার প্রতিধ্বনি জানায় যে দু:খী মেয়েটি!

১৬ ই এপ্রিল, ২০১২ বিকাল ৫:৫১
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

"Sweet Echo, sweetest nymph, that liv'st unseen
Within thy aery shell
By slow Meander's margent green,
And in the violet-embroidered vale,
Where the love-lorn nightingale
Nightly to thee her sad song mourneth well;
Canst thou not tell me of a gentle pair
That likest thy Narcissus are?
O, if thou have
Hid them in some flowery cave,
Tell me but where,
Sweet queen of parly, daughter of the sphere,
So may'st thou be translated to the skies,
And give resounding grace to all heaven's harmonies."


জলপরী ইকো!




অলিম্পাস পর্বতের পাদদেশে যেখান সবুজ ঢাল, কুলকুল করে বয়ে যায় পাহাড়ী ঝর্ণা, সেখানে বাস করতো জলপরীরা। তারা ছিল স্বর্গের দেবী হেরার পরিচারিকা!

জলপরীদের মধ্যে ইকো ছিল সব চাইতে সুন্দরী, আনন্দময়ী আর প্রাণোচ্ছল! যখন তার অন্য বোনেরা গোপন অভিসারে যেতো বা অন্য কোন দুষ্টুমিতে মগ্ন থাকতো, ইকো তখন মজার মজার গল্প বলে সঙ্গ দিত হেরাকে!


হেরা ইকোকে খুব পছন্দ করতেন, তার কোমল মুখের দিকে তাকালে হেরার কঠিন দৃষ্টি নরম হয়ে যেতো! ইকোর মধুর কন্ঠের গল্প শুনতে শুনতে দেবী ভুলে যেতো তার কামুক স্বামী জিউসের উপর নজর রাখার কথা, অন্য কোন সঙ্গিনী নিয়ে মেতে থাকার কথা, ইর্ষার কথা!
ইকো মজার মজার লম্বা সব গল্প বলে হেরাকে সুকৌশলে ভুলিয়ে রাখতো, তার মনোযোগ ধরে রাখতো।

কিন্তু একদিন তীক্ষ্ন বুদ্ধীর হেরা ঠিকই ধরে ফেললেন ইকোর চালাকি!
রেগে আগুন হয়ে ইকোকে অভিশাপ দিলেন তিনি " এখন থেকে বোবা হয়ে থাকবি তুই। শুধু তোর সামনে কেউ কথা বললে তার কথার শেষ অংশই আওড়াতে থাকবি"!


'হায়! হায়! এক সাথে আফসোস করে উঠলো সব জলপরীরা!


আর ইকো?

সেও হায়! হায়!" বলা ছাড়া আর কিছুই বলতে পারলো না, হেরার কাছে মাপও চাইতে পারলো না!

হতভাগ্য জলপরী ইকো, লোলুপ দেবরাজের আদেশ পালন করতে গিয়ে বোবা হয়ে বনে চলে গেলো, একা!


একদিন সেই বনে এল তারুণ্যের দিপ্তী আর সৌন্দর্য্যে ভরপুর এক তরুন, নাম তার নার্সিসাস! নার্সিসাসের জন্মের পরে এক ভবিষ্যৎবক্তা বলেছিলেন .....'যে পর্যন্ত সে নিজের সম্পর্কে জানবে না, ততদিন সে বেঁচে থাকবে এবং সুখে থাকবে!"


নার্সিসাস...অপরূপ সেই তরুনকে সবাই ভালবাসতো, কিন্তু ভালবাসা কি সেটার কিছুই সে বুঝতো না, জানতো না! সে ছিল শীতল এক বরফের খন্ডের মতো নির্বিকার।

একদিন বনের মধ্যে নার্সিসাসকে একা একা হাটতে দেখে তার প্রেমে পরে গেলো জলপরী ইকো! চুপিচুপি গাছপালার আড়ালে থেকে থেকে অনুসরণ করতে লাগলো সে।

ওদিকে নার্সিসাস আসলে পথ হারিয়ে ফেলেছিল, সে সঙ্গীদের উদ্দেশ্য চিৎকার করে বললো 'তোমরা কোথায়?'

'তোমরা কোথায়' জবাব দিল ইকো।

তার কন্ঠ শুনে থামলো নার্সিসাস, কান পাতলো কে কথা বলে শোনার জন্য, কিন্ত আর কোন শব্দ নেই!

তখন সে আবার চিৎকার করে বললো 'আমি নার্সিসাস-----এই বনের মধ্যে আছি।'

'আমি নার্সিসাস-----এই বনের মধ্যে আছি' ইকোও তাই বললো।

এখানে এসো' চেচালো নার্সিসাস।

এখানে এসো' বললো ইকো!

খুব অবাক হয়ে গেলো নার্সিসাস এমন অদ্ভুত কন্ঠ আসে কোথ্থেকে! চারিদিকে তাকালো সে, কিন্তু দেখতে পেলেো না কাউকে!

'তুমি কি আমার হাতের কাছে?' জানতে চাইলো নার্সিসাস!

হাতের কাছে'...জবাব দিল ইকো!

আবারও খুজলো নার্সিসাস, কিন্তু কেউ নেই!
এবার সে কন্ঠ স্বরের লক্ষ্য করে এগুতে লাগলো!
তখন তাকে এগুতে দেখে দৌড়ে পালালো ইকো। কাজেই নার্সিসাস যখন আবার কথা বললো, তখন ইকোর জবাব পাওয়া যেতে লাগলো ক্রমাগত দূর থেকে দূরান্তে।

ইকো বুঝলো নার্সিসাসকে এড়ানোর কোন উপায় নেই তার। সে কিছু বললে জবাব তাকে দিতেই হবে, আর তার কন্ঠ শুনে সেও এগিয়ে আসতেই থাকবে!


এভাবে লুকোচুরি করতে করতে এক সময়ে বনের একটা খোলা জায়গায় বের হয়ে আসলো দু'জনে। সেখানে ছিল টলটলে পানির একটা পুকুর, যেখানে সবুজ পাহাড়ের ঢাল এসে মিশেছে, সেই পুকুরের প্রান্তে এসে দাড়ালো ইকো, পেছনে তার লম্বা নলখাগড়ার সারি বাতাসে দুলছে।
নার্সিসাস যখন তার সামনে এসে দাড়ালো, টপটপ করে অশ্রু ঝড়ছে তার চোখ দিয়ে! এই অদ্ভুত সুন্দর উদাস যুবকটিকে সে তার গভীর ভালবাসা কথা জানাতে ব্যাকুল হয়ে আছে, কিন্তু পারছে না, কি কষ্ট, কি কষ্ট!

নতমুখি ইকোকে দেখে তার সামনে এসে দাড়ালো নার্সিসাস!

'তুমি কি সেই, যে আমার ডাকে সাড়া দিয়েছো?' জিগেস করলো নারসিসাস!

'তুমি কি সেই, যে আমার ডাকে সাড়া দিয়েছো?....জাবাবে একই কথা বললো ইকো!

'আমি তো বলেছি আমি নার্সিসাস'

'আমি নার্সিসাস' শেষ শব্দটা আওড়ে করুণ চোখে দু'হাত বাড়িয়ে দিলো ইকো!

কে তুমি'? জানতে চাইলো নার্সিসাস

কে তুমি? বললো ইকো

'আমি কি তোমাকে বলিনি যে আমি নার্সিসাস?'

'আমি নার্সিসাস' বলে মিনতির ভঙ্গিতে আবার দু'হাত বাড়ালো ইকো!

'এবার বলো কে তুমি আর আমাকে ডেকেছোই কেন?'

ইকো বললো "ডেকেছো কেন?"

এবার রেগে গেলো নার্সিসাস। বললো দেখো মেয়ে আমাকে সারা বন দৌড় করিয়েছো তুমি, এখন আবার মুখে মুখে ভেংচি কাটছো!


'মুখে মুখে ভেংচি কাটছো"..বললো নিরুপায় ইকো!

একথায় আরও রেগে গেলো নার্সিসাস। রেগে গিয়ে ভয়াবহ সব কথায় ভর্ৎসনা করতো লাগলো ইকোকে, আর অসহায় ইকো বাধ্য হয়ে সেই অপ্রিয় কথা গুলোরই পুনরক্তি করতে লাগলো!

একসময় হতাশ হয়ে হাল ছেড়ে দিল নার্সিসাস, ক্লান্ত হয়ে গিয়ে বসলো সেই কাকচক্ষু পুকুরের পারে গিয়ে, ইকোর দিকে তাকালো না আর।
দু:খি ইকো সেখানে দাড়িয়ে কাঁদলো কিছু সময়ে তারপর ধিরে ধিরে চলে গেলো সেখান থেকে! গিয়ে পাথরের আড়ালে লুকিয়ে দেখতে লাগলো তাকে!


ইকো ও নার্সিসাস Nicolas Poussin 1628-1630

আর নার্সিসাস, তেষ্টা পেয়েছিল তার, তাই পানি খেতে ঝুকলো পুকুরের পানিতে! আর সেখানেই সে প্রথম বারের মতো দেখলো নিজেকে!
এত সুন্দর মুখ জীবেন আর দেখেনি সে!
যে নার্সিসাস ভালবাসা কি জানতো না, সে প্রথম বারের মতো প্রেমের পরে গেলো এবং হতভাগ্য যুবক জানলো না সেটা সে নিজেই!

একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে সে ধরতে গলো অনিন্দ্য সুন্দর সেই মুখটাকে, পুকুরের ছায়াটাও হাত বাড়ালো তার দিকে।
তার দীর্ঘশ্বাসের উত্তরে ইকোও দীর্ঘশ্বাস ফেললো পাথরের আড়াল থেকে!

বিভ্রমে পরে গেলো নার্সিসাস, সে ভাবলো পানি থেকেই এসছে শব্দটা! পানির দিকে ঝুকে পরে সে বললো " আমি তোমাকে ভালবাসি"

"আমি তোমাকে ভালবাসি" পাথারের আড়াল থেকে কোমল কন্ঠে বললো ইকো!

এক কথা শুনে পানির ছায়াটাকে দু'হাতে জড়িয়ে ধরে আদর করতে চাইলো নার্সিসাস! কিন্তু হাত লেগে ভেঙ্গে গেলো পানির স্থিরতা, আর দেখা গেলো না তার ভালবাসাকে।

আকুল আকাঙ্ক্ষা নিয়ে তাকিয়ে রইলো সে পানির দিকে, আর একবার সেই মুখটা দেখবার জন্য!
পানি স্থির হলে এক সময় আবার দেখা গেলো মুখটা, কিন্তু নার্সিসাস যখনই ধরতে যায় তাকে তখনই ছায়া ভেঙে হারিয়ে যায় সে!

এভাবে এক সময় তার হতাশা যখন চরমে পৌছালো, তখন সে সিদ্ধান্ত নিল হয় সেই মুখটাকে সে আলিঙ্গন করবে, নয়তো মরবে ! এই ভেবে ঝাপ দিল জলে!

কিন্তু শূণ্য জলতল! কেউ নেই কিছু নেই সেখানে!


ওদিকে জলপরী ইকো পাথরের আড়াল থেকে দেখছিল তার প্রিয় মানুষটার চরম পরিণতি, কিন্তু ছুটে আসতে আসতে চিরতরে হারিয়ে গেলো সে জলের আড়ালে!
নার্সিসাসকে হারিয়ে পুকুরের ধারে বসে কাঁদতে লাগলো ইকো, হারানো ভালবাসার দু:খে এক সময়ে ক্ষয় হয়ে যেতে লাগলো সে।
তার সুন্দর শরীরটা মিশে গেলো বাতাসে, হাড় গুলো পরে রইলো পাথর হয়ে পুকুরের ধারে!




ইকো, নার্সিসাস..... Nicolas Poussin


আর ইকোর অশ্রু জমেছিল পুকুরের যে পাশে, সেখানে বসন্তে সাদা সোনালী ফুল ফুলে ছেয়ে গেলো! পুকুরের পারে তখন ছড়িয়ে যায় অপার্থিব মিষ্টি একটা সৌরভ, যে সৌরভে জড়িয়ে থাকে এক যুবকের স্মৃতি, ভুল করে যে নিজেকেই ভালবেসে ছিল!

আর রয়ে গেলো ইকোর উপর হেরার অভিশাপ!

আজও খোলা প্রান্তরে, পাথুরে পাহাড়ে, গুহায় শোনা যায় ইকোর প্রতিধ্বনি!

চেঁচিয়ে যখন কিছু বলো তুমি বন্ধু, আজও তার জবাব দেয় ইকো.......



পোস্ট পড়ার সাথে সাথে এই গানটা শোনা বাধ্যতা মূলক!










পরিশিষ্ট: দেবতারা সব সময়েই এমন অসহিষ্ণু হয় কেন? এত লোভ কেন তাদের?? এগুলো তো মানবীয় গুনাবলীর মধ্যে পরে। নাকি আমরা সাধারণ ক্ষমতাধর মানুষদেরই দেবতা বানিয়েছিলাম! যারা ইচ্ছা করলেই মানুষকে বোবা বানিয়ে ফেলতে পারে (জিব কেটে?)!

কে জানে, হয়তো বা.....হয়তো না!

তবে তাদের হটকারিতার জন্য এমন অনেক দু:খময় ঘটনার জন্ম নিয়েছে পৃথিবীতে, দেশ কাল ভেদে সকল সভ্যতায় সকল ধর্মে!

রোমান্টিকতার কারণে নার্সিসাস যত না আলোচিত সাহিত্যে, ইকো ততটাই উপেক্ষিত! অথচ এই দুজন তো এক সুতোতেই গাঁথা ছিল, যদি পুরো ঘটনা তলিয়ে দেখা যায়, তবে ইকোর অবদানটাই বেশি!
নাকি এটা দেবীর অভিশাপ অথবা পুরুষতান্ত্রীক সমাজের!



ক্যাথেলিন লাইন্সের 'গ্রীক লিজেন্ড'র ছায়া অবলম্বনে!
সর্বশেষ এডিট : ২২ শে অক্টোবর, ২০১২ বিকাল ৫:২৭
১২৭টি মন্তব্য ১২৯টি উত্তর পূর্বের ৫০টি মন্তব্য দেখুন

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

নদী ও নৌকা - ১৫

লিখেছেন মরুভূমির জলদস্যু, ২৩ শে মে, ২০২২ দুপুর ১২:২৫


ছবি তোলার স্থান : কক্সবাজার-টেকনাফ মেরিন ড্রাইভ, কক্সবাজার, বাংলাদেশ।
ছবি তোলার তারিখ : ০১/১০/২০২০ ইং

নদী, নদ, নদনদী, তটিনী, তরঙ্গিনী, প্রবাহিনী, শৈবালিনী, স্রোতস্বতী, স্রোতস্বিনী, গাঙ, স্বরিৎ, নির্ঝরিনী, কল্লোলিনী, গিরি নিঃস্রাব, মন্দাকিনী,... ...বাকিটুকু পড়ুন

পুরানো সেইদিনের কথা (ছেলেবেলার পোংটামি)

লিখেছেন রূপক বিধৌত সাধু, ২৩ শে মে, ২০২২ রাত ৮:১১

শেকল
এলাকার এক ভাবীর সাথে দেখা। জিগ্যেস করলেন, বিয়েশাদি করা লাগবে কি না। বয়স তো কম হলো না।
একটু চিন্তা করে বললাম, সত্যিই তো। আপাতত একটা করা দরকার।
তো এই ভাবী... ...বাকিটুকু পড়ুন

কে কেমন পোশাক পড়বে মোল্লাদের জিজ্ঞেস করতে হবে ?

লিখেছেন মোহাম্মদ গোফরান, ২৩ শে মে, ২০২২ রাত ৮:৫২




কয়েকদিন আগে আমরা পত্রিকায় পড়েছি পোশাকের কারণে পোশাকের কারণে হেনস্থা ও মারধরের শিকার হয়েছেন এক তরুণী। চিন্তা করতে পারেন!! এদেশের মোল্লাতন্ত্র কতটুকু ভয়াবহ রূপ নিচ্ছে? কোরানে একটা আয়াতও কি এই... ...বাকিটুকু পড়ুন

কেন এত জ্বলে !!

লিখেছেন নূর মোহাম্মদ নূরু, ২৩ শে মে, ২০২২ রাত ৯:১৮


কেন এত জ্বলে !!
© নূর মোহাম্মদ নূরু
(মজা দেই, মজা লই)

সত্য কথা তিক্ত অতি গুণী জনে বলে,
সত্য কথা কইলে মানুষ কেনো এত জ্বলে?
তাঁদের সাথে পারোনা তাই আমার সাথে লাগো,
সত্য... ...বাকিটুকু পড়ুন

যাহা দেখি, তাহাও ভুল দেখি!

লিখেছেন সোনাগাজী, ২৪ শে মে, ২০২২ সকাল ১১:২৫



আমার চোখের সমস্যা বেড়ে গেলে, আমি অনেক কিছুকে ডবল ডবল দেখি; ইহা নিয়ে বেশ সমস্যা হয়েছে সময় সময়, এটি ১টি সমস্যার কাহিনী; বেশ আগের ঘটনা।

আমাদের এলাকায়... ...বাকিটুকু পড়ুন

×