আজ পহেলা বৈশাখ। দিনটা শুক্রবার। সকাল থেকেই সাজ সাজ রব পড়েছে সারাদেশে। সেই রবের ছোট একটা ঢেউ আছড়ে পরেছে মাহমুদের বাড়িতেও। পুরো বাড়ি জুড়ে উৎসবের আমেজ। কিন্তু মাহমুদের মনটা ভালো নেই।
জুমার নামাজের আগেই সে চলে গেল উত্তরা কেন্দ্রিয় কবরস্থানে। হাতে একটা গোলাপ ফুল। ধীর পায়ে কান্নাভেজা চোখে এগিয়ে যাচ্ছে ৬১১ নং কবরের দিকে। কবরের উপরে ফুলটা রাখল। হাত দিয়ে কবরের উপরের মাটিটি পরিষ্কার করতে লাগল। চোখ বেয়ে পড়া অশ্রুর কয়েকফোটা কবরের উপর পরল।
মাহমুদ তখন ৫ম শ্রেণীতে পড়ে। তার ক্লাসেরই একটা মেয়ে কানিজ। রোল নাম্বারটা পাশাপাশি থাকতো সবসময়। সে সুবাধে প্রতিদিন একসাথে বসা, একসাথে খেলা আর একসাথে গল্প করা সবই হতো। তাদের মধ্যে বোঝাপড়াটা ভালো ছিল। সবাই তাদের দুজনকে অনেক আদর করত। আর তাই তাদের এই কাছাকাছি থাকাটা কেউ খারাপ চোখে দেখত না। এভাবেই কেটে যায় প্রায় দেড়টি বছর। তারা তখন ৬ষ্ঠ শ্রেণীতে পড়ে। পড়াশোনার কাজে, গল্পের জন্য মাঝে মাঝে মাহমুদের বাসায় আসে কানিজ। তেমনি একদিন হঠাৎ করে মাহমুদের বাসায় আসল কানিজ। কোনো কাজ নেই। মাহমুদের সাথে বসে গল্প করছে। এরমধ্যেই মাহমুদকে নিজের ভালো লাগার কথা বলে ফেলল কানিজ। সেদিন সে মনে হয় শুধু একথা বলার জন্যই এসেছিল মাহমুদের বাসায়। তারপর "জবাবটা দিবে" বলেই চলে গেলো কানিজ। কানিজ আর মাহমুদের বাসা কাছাকাছি। কানিজকে মাহমুদের মা অনেক আদর করত। তাই কোনোদিন তাদেরকে কিছু বলত না। মাহমুদ নিজেও পছন্দ করত কানিজকে। কিন্তু কোনোদিন বলার সাহস পায় নি। আজ হঠাৎ করে কানিজের বলে যাওয়াটা তার কানকে কিছুতেই বিশ্বাস করাতে পারছিল না। সময়টা তখন মাত্র বিকাল। সে তখনই বাসার বাইরে বেড়িয়ে যায়। উদ্দেশ্য শুধু কানিজকে জবাব দেওয়া। যথারীতি বাসায়ই পেলো কানিজকে। বলে ফেলল মনের কথাটা। সেই শুরু। এর মধ্যে কেটে যায় দীর্ঘ নয় বছর।
তাদের সম্পর্কের কথা দুই পরিবারও জানত। কিন্তু কোনোদিন কেউ কিছু বলত না। মাঝে আসে এস.এস.সি পরীক্ষা। দুজনেই গোল্ডেন এ+ পায়। মাহমুদের ইচ্ছা ইঞ্জিনিয়ার হওয়া আর কানিজের ই্চ্ছা ডাক্তার হওয়া। তাই দুজনেই বিজ্ঞান বিভাগে ছিল। আবার একসাথে ভর্তি হয় একই কলেজে। সৌভাগ্যক্রমে একসাথে ক্লাশ করে। তাদের সম্পর্কে কোন চির ধরে নি। তখন পর্যন্ত। এভাবে কেটে যায় আর একটি বছর। ২০০৯ সালের আগস্ট মাসের ঘটনা পাল্টে দেয় সবকিছু। মাহমুদের কাছ থেকে হারিয়ে যায় কানিজ। মানসিকভাবে ভেঙ্গে পড়ে মাহমুদ। সামনে ছিল এইচ.এস.সি পরীক্ষা। পরীক্ষাটা আর দিতে পারেনি সে। প্রিয়জন হারানোর বেদনায় নীল মাহমুদ প্রায় ১বছর অসুস্থ থাকার পর পরীক্ষাটা দেয়। প্রত্যাশিত ভালো ফলাফল আর হয়নি তার। তারপর আজ সেসব স্মৃতি নিয়ে মাহমুদ ইঞ্জিনিয়ারিং পড়ছে। কিন্তু পাশে নেই তার এগিয়ে যাওয়ার পথের দিশারী।
তাকে এখনো সেসব স্মৃতি মনের অজান্তে তাকে কাঁদায়। এখনো সে রাতে ঘুমের মাঝে স্বপ্ন দেখে কানিজকে। ফুলের ডালা নিয়ে বসে আছে অনিন্দ সুন্দর একটি বাগানে। মাঝে মাঝে দেখে তাকে সেই বাগানের ডালে ডালে উড়ে বেড়ানো পাখির বেশে। ঘুম ভেঙ্গে যায়। ডুকরে উঠে সে। কখনো তার শিয়রে দাড়ানো দেখতে পায়। এইতো কিছুদিন আগেও সে স্বপ্নে দেখে তার পরী তাকে ডাকছে।
আজ থেকে প্রায় তিন বছর আগে ভয়াবহ এক সড়ক দূর্ঘটনায় মাহমুদের চোখের সামনেই মারা যায় কানিজ। সে দিন ছিল মাহমুদের জন্মদিন। দিনটি শুক্রবার ছিল। মাহমুদ আর কানিজ দুজন একসাথে সিএনজি অটোরিক্সায় করে যাচ্ছিল উত্তরায়। সারাদিন একসাথে বিভিন্ন জায়গায় ঘুরে বাসায় ফিরে যাচ্ছিল। হঠাৎ করে পিছন থেকে একটি বাস তাদেরকে ধাক্কা দেয়। কানিজ যে পাশে ছিল ঠিক সে পাশটাতেই বাসটি ধাক্কা দেয়। ঘটনাস্থলেই মারা যায় কানিজ। তার পাশে বসা তার প্রিয় সেই মাহমুদ প্রচন্ড আঘাত পায়। নিজের চোখের সামনে ভালোবাসার সেই মানুষটিকে যখন হারিয়ে যেতে দেখল তখন সেখানেই জ্ঞান হারিয়ে ফেলে সে। তারপর সব কিছুই আজ স্মৃতি। এখনও প্রতিটি শুক্রবার শত ব্যস্ততার মধ্যেও নিয়ম করে কানিজের কবরে ফুল দিয়ে ভালোবাসার শ্রদ্ধা জানায় মাহমুদ। শত চেষ্টা করেও পারেনি তাকে ভুলতে। কিভাবে পারবে ভুলতে তাকে? যাকে ভালোবেসেছে মন থেকে দীর্ঘ নয় বছর। যার জন্য নিজে করেছিল সর্বোচ্চ আত্মত্যাগ। যার কোনো বিপদে আটকে রাখতে পারতো না নিজেকে।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



