১. সকাল থেকে বৃষ্টি ঝরছে। থামার কোনো লক্ষণ নেই। চৈত্রের শুরুতে এত বৃষ্টি অবাক লাগছে। ঘুম থেকে উঠতে ইচ্ছা করছে না। বারবার ঘুম ভাঙছে আবার ঘুমাচ্ছি। এভাবে অনেকক্ষণ চলল। হঠাৎ টিকটিকির ডাকে চোখ দেয়ালে ঘড়ির দিকে আটকাল। সকাল ১০টা। অর্থাৎ অফিস শুরু হতে এখনো আধাঘন্টা বাকি। তাড়াতাড়ি বিছানা ছেড়ে ফ্রেশ হয়ে কাধে ব্যাগ চড়িয়ে বের হলাম। বাড়ির প্রধান ফটকে দাড়িয়ে রিকশার অপেক্ষায় আছি। বাইরে প্রায় হাটু সমান পানি একটাও রিকশার দেখা পেলাম না। একবার ভাবলাম যাব না আবার কি মনে করে এর-ই মধ্যে বেড়িয়ে গেলাম। হাটু পানিতে খুব কষ্টে এগুচ্ছি। হঠাৎ গলির সর্বশেষ দোকানে একটা মেয়েকে দেখে চোখ চরকগাছে উঠল। মেয়েটা পূর্ব পরিচিত। সাথে একটা কোলের বাচ্চা।
২. মেয়েটার সাথে আমার পরিচয় হয়েছিল ক্লাস নাইনে। আমি সাফল্যের সাথে মাধ্যমিক পার হলেও সে পাশ করতে পারে নি। মেয়েটার সাথে দুবছরে আমার অনেক ভালো সম্পর্ক সৃষ্টি হয়েছিল। যেন একজন অন্যজনের জন্য সৃষ্টি হয়েছে। আমরা একসাথে ক্লাসে আসতাম। আবার একসাথে যেতাম। আমাদের সম্পর্ক দেখে অনেকে ঈর্ষা করত। আসলে মেয়েটার গায়ের রঙ ছিল যেন রূপকথার পরীর মতো আর স্বাস্থ্য ছিল যে কাউকে পাগল করার মতো। অনেকেই তার সাথে সম্পর্ক করতে চেয়েছিল কিন্তু সে তাতে কর্ণপাত করেনি। আমাদের মধ্যে ছায়ার মতো সম্পর্ক ছিল। তবে তার পরিবার ছিল আমার বিপরীতে। আমি দুবছরেও তার কোন খুত ধরতে পারি নি। মাধ্যমিক পরীক্ষার পর তার সাথে আমার দেখা হয় নি। সে কেন পরীক্ষায় পাশ করতে পারে নি তা আজো আমার অজানা। এ দীর্ঘ সময়ে আমি অনার্স, মাস্টার্স পাশ করেছি। এখন ছোট-খাট একটা চাকরি করি। তবে মাইনে ভালো। বাবা- মাকে নিয়ে মোটামুটি ভালোই আছি। সেই প্রথম প্রেমের ব্যর্থতার পর আর কোন মেয়ের সাথে সম্পর্কও করিনি তাই আজো নারীশূন্য। তবে এতে আমি ভালোই আছি।
৩. মেয়েটা দোকান থেকে বেবিফুড আর বিভিন্ন ড্রাই ফুড কিনে বাইরে দাড়িয়ে আছে। সেও কোন রিকশা পাচ্ছে না। একবার ভাবলাম দেখা করব কিন্তু দেখা না করার সিদ্ধান্ত নিলাম। হঠাৎ রাজন ডাক শুনে পিছনে ফিরে দেখি সেই আমাকে ডাকছে। সে আমাকে ডেকেছে বিধায় কাছে গেলাম। কেমন আছ জিজ্ঞাসা করতেই সে যা বলল তা কল্পনাতীত। এরপর আমাকে জোর করল তার বাসায় যাওয়ার জন্য। এমনিতেই অফিসে যাওয়ার ইচ্ছে বাইরের আসতেই মন থেকে উবে গিয়েছিল তাই অনিচ্ছা সত্ত্বেও তার সাথে যেতে রাজি হলাম। অনেক কষ্টে একটা রিকশা খুঁজে বের করে তার সাথে রিকশায় উঠলাম। তার বাসা কয়েকটা গলি পরেই। তার কোলের বাচ্চাটা ঘুমাচ্ছে। বাচ্চাটা অনেক সুন্দর। হুবহু তার মতোই। চেহারা, রঙ সবই যেন তার অনুকরণে। কোন কথা না বলে চুপ করে বসে আছি রিকশার মধ্যে। হঠাৎ মনে হলো আজ মাসের প্রথম দিন। অফিসের চিন্তা মাথায় ভর করল। গত মাসের বেতনও উঠানো হয় নি। আজ যেমন করেই হোক অফিসে যেতে হবে। তাকে বাসায় পৌছে দিয়েই আমি অফিসে চলে যাব ভাবলাম। দেখতে দেখতে বাসার সামনে এসে পড়লাম।
৪. তার বাসাটা পাঁচতলায়। রিকশা ভাড়াটা সেই দিল। মনে মনে ভাবলাম কি বড় অপরাধ না জানি করলাম যে এভাবে আমাকে ধরে নিয়ে আসল। লিফটে চড়ে উপরে উঠলাম। একটা বিরাট এপার্টমেন্ট। দরজার তালা খুলে ভিতরে প্রবেশ করে যেন ছোটখাট একটা স্বর্গ দেখলাম। একটা বাসা সাজাতে যা যা প্রয়োজন তার সবই আছে এতে। তিনবেডের বাসা। আমাকে ড্রইং রুমে বসিয়ে বাচ্চাকে নিয়ে একটা রুমে প্রবেশ করল। তার পরনে আজ গোলাপী শাড়ি। গোলাপী রঙ আমার পছন্দ। কিছুক্ষন পর চা-নাস্তা নিয়ে আসল এবং আমার পাশে বসে বাচ্চাকে ফিডারে দুধ খাওয়াতে লাগল। এতক্ষন বসে আছি কিন্তু সে ছাড়া আর কাউকে না দেখে অবাক লাগল। আমি এখনও চুপ করে আছি। কিছুক্ষন পরে সেই প্রথম মুখ খুলল আর বলল, ‘চা খাও’। আমি হাতে একটা বিস্কুট নিয়ে তাকে জিজ্ঞাসা করলাম, তোমার স্বামী কোথায় আর কি করে? সে এর জবাবে কিছু না বলে শুধু বলল আগে রেস্ট নাও দুপুরে সব কথা হবে। আমি তো অবাক, মেয়েটা বলে কি? আমার অফিসে কি তাহলে যাওয়া হবে না আজ? দুপুর পর্যন্ত একা একটা মেয়ের বাসায় থাকব নাকি? কিন্তু অজানা এক কারণে কিছুই বলতে পরলাম না প্রতিত্তরে। মনের মধ্যে হঠাৎ জাগ্রত হল সেই পুরনো প্রেম। নাস্তার পর সে তার বাচ্চাকে আমার কাছে রেখে রান্নাঘরে গেল। ততক্ষনে বাচ্চাটি আমার সাথে খেলতে শুরু করেছে যেন পূর্বপরিচিত কেউ।
৫. বাচ্চাটির সাথে খেলতে খেলতে আমার চোখে ভেসে উঠল একটি সুন্দর আদর্শ পরিবারের দৃশ্য। এরকম একটি পরিবারের স্বপ্ন ছিল আমাদের। কিন্তু সে আশা যখন ব্যর্থই হলো তখন আর কি করা এই দম্পত্তির জন্য শুভ কামনা করতে হবে। এভাবে কতক্ষন কাটানোর পর আমি ঘুমিয়ে পরলাম। দুপুরে তার ডাকে ঘুম ভাঙলো। একসাথে ডাইনিং টেবিলে বসলাম খেতে। টেবিলে নানা পদের খাবার তৈরী করেছে সে। মনে মনে খুশি হলাম তার এই আথিতেয়তায়। খাবারের টেবিলে বসে বারবার জোরাজুরি করার পরও সে তার স্বামী বা তার পরিবার সম্পর্কে কিছুই বলল না। শুধু বলল, অপেক্ষায় থাক, সব বুঝবে, সব জানবে। আমার মনে তখন একটা ভয় কাজ শুরু করল। এভাবে খাতির-যত্নের কারণটা কি, আমায় কিছু করবে নাতো? অজানা ভয় আর পুরোনো স্মৃতি সবই একসাথে কাজ করছে মনের ভিতর। খাওয়া শেষ করে সে আমাকে একটা রুমে নিয়ে গেল আর তার বাচ্চাকে আমার কাছে রেখে “তুমি থাকো, কোথাও যাবে না। আমি সন্ধ্যার মধ্যে ফিরে আসব। আর বাচ্চাটার জন্যে ফিডার ভর্তি দুধ রেখে গেলাম, কাঁদলে খাওয়াবে” বলে কোথাও যাওয়ার জন্যে বাসা থেকে বেড়িয়ে গেল। আমারতো মাথায় আকাশ ভেঙ্গে পড়া অবস্থা। কিন্তু কোন এক মায়ার বাধনে আবদ্ধ আমি কিছুই বলতে পারলাম না। বরং তার কথা মতো চলতে লাগলাম। এখন একা একা বাসায় বসে থাকতে হবে। সাথে একটা বাচ্চা। আমি কখনোই বাচ্চা সহ্য করতে পারি না। আর এখন যেন এটাই আমার কাজ। বাচ্চাটাকে নিয়ে পুরো বাসা ঘুরে দেখতে লাগলাম। তার বাসায় কি নেই, একজন ধনাঢ্য ব্যক্তির ঘরে যা থাকে তার সবই আছে এখানে। এত সম্পদ সে কোথায় পেল বা তার স্বামী কি করে, এসব চিন্তা করছি আর ড্রয়িং রুমে রাখা ৪০ইঞ্চির বিশাল টিভি স্ক্রিনের সামনে বসে টিভি দেখছি। কোন সময় যে সন্ধ্যা হল বলতে পারব না। আমার সম্বিত ফিরে আসল সদর দরজা খুলার আওয়াজে। রাতের আকাশ যখন সবেমাত্র কালো রঙ ধারন করছে ঠিক সে সময়ই মেঘ থেকে মুক্ত হওয়া চাঁদের মতো সে ঘরে ঢুকলো। এদিকে আমার বাসা থেকে ফোন আসল। আমি বললাম, “পুরোনো এক বন্ধুর বাসায় তার সাথে এসেছি, বাসায় আসতে রাত হবে।” সে ঘরে প্রবেশ করে আমার সাথে কোনো কথা না বলে সরাসরি রান্না ঘরে গেল, কিছুক্ষণ পরে সে হালকা নাস্তা নিয়ে আমার রুমে এল এবং তার বাচ্চাকে নিয়ে গেল তার রুমে। তার কোন কার্যকলাপের রহস্যভেদ করতে পারছি না আমি। সেই সকাল থেকে একটা মানুষের বাসায় অবস্থান করছি আমি। অথচ কোনো ধরনের কথা নেই বার্তা নেই। যেন মৃত্যুপুরীতে এসেছি যেখানে কারো সাথে কারো কোনো কথা চলবে না-এটাই নিয়ম। এদিকে সন্ধ্যা পেড়িয়ে রাত গভীর হচ্ছে অথচ আমি, সে আর তার বাচ্চাটা ছাড়া আর কোনো ব্যক্তির আসার লক্ষণ নেই। মনে মনে ভাবলাম হয়তো তার স্বামী ঘরে আসতে আরো রাত হবে না হয় সে প্রবাসী। রাত প্রায় ১০টার দিকে সে রাতের খাবার নিয়ে আমার রুমে প্রবেশ করল। একসঙ্গে খেলাম আমরা। এখনও সে আমার সাথে কোনো কথা বলল না। খাবার শেষে রুম থেকে বেড়িয়ে যাওয়ার সময় বলল, “বাসায় ফোন করে বলে দাও আজ আর বাসায় যাচ্ছ না।”আমারতো মাথায় হাত। এটা কি বলল, যাই হোক বাসায় ফোন করে বলে দিলাম। সে বাচ্চাটাকে আমার কাছ থেকে নিয়ে গেল আর আমার রুমের বিছানা ঠিক করে দিয়ে বলল, “আরাম করে শুয়ে পড়।”বাচ্চাটাকে তার বিছানায় ঘুম পাড়িয়ে দিয়ে আবার সে সোজা আমার রুমে চলে এল। এসেই ডাক দিল, “রাজন কি ঘুমিয়ে পড়েছ?” আমি বললাম, না। সে বলল, “তুমি না আমার কাছে জানতে চেয়েছিল-আমার স্বামী কি করে? কিভাবে করলাম এত সম্পদ? তাহলে উঠ তোমাকে সব বলছি।” অন্ধকারে তার এসব কথা শুনে আমি ভয় পেয়ে গেলাম, মেয়েটা এসব কি বলছে? সে কি কোনো কিছুর প্রতিশোধ নিতে চাচ্ছে? এসব যখন চিন্তা করছি তখন রুমে হঠাৎ আলো জ্বলে উঠায় আমার সম্বিত ফিরে এল। সে আমার পাশে এসে বসল। আর বলল- “তুমি এখনো বিয়ে কর নি কেন?” আমি জবাবে বললাম- “যাকে অনেক ভালোবাসতাম সে যখন সাথে নাই, তাহলে আর বিয়ে করে লাভ কি?” সে বলল- “এখনতো পাশে বসে আছে, তুমি কি এখনও তাকে গ্রহন করতে পারো না?” আমি বললাম-“না। সেটা কখনোই সম্ভব না। এখন সে অন্যের সম্পদ, আর অন্যের সম্পদ গ্রহন করা উচিত না।”সে মায়াবী একটা হাসি হেসে বলল- “আমি যদি চাই, তাহলে কি তুমি আসবে না?” এটা বলে সে আমাকে জড়িয়ে ধরল। আমি কিছুই বলতে পারলাম না। সে উঠে গিয়ে লাইটটা বন্ধ করে দিয়ে আমার বিছানায় আসল।
৬. অনেক রাতে ঘুমানোর ফলে সকালে উঠতে দেরী হয়ে গেল। ঘুম থেকে উঠে নিত্যদিনের নিয়ম অনুযায়ী গোসল সেরে রুমে আসতেই দেখি সে নাস্তা নিয়ে হাজির। তাড়াতাড়ি নাস্তাটা শেষ করলাম, অফিসে যেতে হবে। যখন বিদায় নিতে গেলাম, সে বলল- “দশ হাজার টাকা দাও।”আমি ঘটনার আকষ্মিকতায় তাকে বললাম- কেন? এর জবাবে সে প্রায় ৫ মিনিট এক নাগাড়ে কথা বলে গেল। তার জীবনের সব ঘটনা খুলে বলল এই সময়ে। যেসব কথা শোনার জন্য কাল থেকে অপেক্ষা করছিলাম। একটানা কথাগুলো বলে একটু থেমে সে আবার বলল- “আমি তোমাকে পুরো তিনবেলা মজাদার খাবার খাওয়ালাম, আবার রাতে তোমাকে পর্যাপ্ত আনন্দ দিলাম। অথচ তুমি এর জন্য আমাকে টাকা দিবে না? যদি এরকম আর একটা বাচ্চার (নিজের কোলে থাকা বাচ্চার দিকে ইশারা করে) জন্ম হয়, তাহলে তার লালন-পালনের খরচপাতি দেবে কে শুনি?”। এতক্ষনে আমি বুঝলাম এত আদর-যত্নের মানে কি, আর এত সম্পদ করার উৎসটাই বা কি। যাহোক তাকে টাকা দেবার নিশ্চয়তা দিয়ে বাড়িটা থেকে বেড়িয়ে আসলাম। গন্তব্য আমার অফিস।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



