নিস্তব্ধ রাত। ঝিঁ ঝিঁ পোকা ডাকছে। মধ্যরাত পার হতে চলেছে। হঠাৎ করে কোথা থেকে কালো কি যেন এসে পড়ল রাজিবদের বাসার ছাদে। আজ তার জন্মদিন। তাই একাকি আপনমনে সে তার দুঃখ-বেদনা রাতের আধারের সাথে ভাগ করছে। উড়ন্ত বস্তু তার মনোযোগ নষ্ট করায় সে প্রচন্ড ক্রোধান্বিত হল। আজ তার বাবা-মা থাকা সত্ত্বেও নেই। তার খোজখবর কেউ নেয় না। সে অনেক কষ্টে জীবনযাপন করছে। গতকাল ছিল বন্ধুত্ব দিবস। কিন্তু আজ তার কোন বন্ধু নেই। তবুও তার রয়েছে অজানা এক বন্ধুর সাথে সম্পর্ক। যে তার স্বপ্নে লালিত এক অশরীরী আপন আত্মা। তার সাথেই রাজিবের বন্ধুত্ব , ভালোবাসা, ক্রোধ, হারানোর ব্যাথা সব।
সে ছাদের যে পাশে বসে আছে তার বিপরীতেই পড়েছিল বস্তুটা। এতক্ষন ঝিঁঝিঁ পোকার সাথে সে গল্পে ব্যস্ত ছিল। আস্তে আস্তে বস্তুটার কাছে গেল। সে যত আগাচ্ছে ততই সে বস্তুটা দেখে অবাক হচ্ছে। কারন বস্তুটা একটা কালো রেপিং পেপারে মোড়ানো উপহার। বস্তুটাকে হাতে নিয়ে সে প্রথমে নেড়েচেড়ে দেখল। কিন্তু কোথাও কোন নাম-ঠিকানা লেখা নেই। সে চিন্তা করল তারতো কেউই নেই তাহলে কে দিল উপহারটা। সে প্রথমে ভয় করলেও পরক্ষনে বুকের সাহস নিয়ে রেপিং পেপার খুলে ফেলল। উপহারের কালো আলখাল্লা খুলতেই একটা হাতে লেখা চিঠি তার পায়ের সামনে এসে পড়ল। সে চিঠিটা তুলে নিয়ে যেই পড়া শুরু করল অমনি কোথা থেকে যেন একটি পরিচিত কন্ঠ ভেসে আসল তার কানে। তার মনে ভেসে উঠল কোস হিংস্র মানব অবয়বের দৃশ্য। সেই পরিচিত কন্ঠটা “আমার কথা মনে রেখ বন্ধু” বলেই বাতাসের সাথে মিশে গেল। তারপর সে চিঠিটা পড়া শুরু করল। হাতের লেখাটাও অতি পরিচিত। কিন্তু সে কিছুতেই মনে করতে পারছে না তার চেহারা বা নামটা। চিঠিটাতে অনেক দিন আগের কিছু স্মৃতি কথা দিয়ে শুরু হয়েছে। চিঠির যতই নিচের দিকে যাচ্ছে ততই তার মন আনচান করছে। অবশেষে সে দেখা পেল তার কাঙ্খিত সেই পরিচিত জনের নাম। তার বেশ কিছুদিন আগের খুব কাছের এক বন্ধু এই চিঠিটা পাঠিয়েছে তাকে। বন্ধুর সাথে শেষ যেদিন দেখা হয়েছিল তারই দৃশ্য রোমান্থিত আছে চিঠিটাতে। হঠাৎ তার হাতে দু’ফোটা পানি কোথা থেকে এসে পড়ল। মাথা তুলে সে যা দেখল তা রীতিমত অবিশ্বাস্যই। তার সেই বন্ধু পিছনে দাড়িয়ে আছে আর বন্ধুর দু’চোখ বেয়ে পড়া পানিই তার হাতে এসে পড়েছে। চিঠিটা পড়ার পর থেকে এমনিতেই রাজিবের প্রচন্ড কান্না পাচ্ছিল আর বন্ধুকে দেখে তার কান্না এবার বাস্তবে রূপ দিল। তারপর তারা একে অপরকে জড়িয়ে ধরল। এভাবে তারা কতক্ষন ছিল তার কোন হিসাব নেই। তারপর তারা আস্তে আস্তে শান্ত হয়ে চুপ করে কতক্ষন একে অপরের দিকে তাকিয়ে বসে রইল। এমনিভাবে প্রায় ভোর হতে চলল। আকাশে সূর্যের সাদা আভার সৃষ্টি হল। পৃথিবী পেল আর একটি নতুন সকাল। আর তাদের বন্ধুত্বও পেল নতুন একটি জীবন। তারা একে অপরের কুশল বিনিময় পর্বটা শেষ করল।
এবার তারা আর দেরী না করে কালো প্যাকেটটা খুলে ফেলল। রাজিব তো ভেতরের বস্তুটি দেখে খুব অবাক হল। সেই শেষদিনের স্মৃতি, মায়ের হাতের তৈরী রুমালটা তার প্রিয় বন্ধুকে উপহার দিয়েছিল। আজ তা-ই তাকে উপহার রূপে ফেরত দিল। রুমালটাতে রাজিবের মা কিছু কথা লিখে রেখেছেন। আর সেই কথাগুলো আজ তার বাস্তব জীবনের প্রতিটি কদমকেই নির্দেশ করছে। তার মা তাকে বলেছে-
“ বাবা, কখনো খারাপের সাথে মিশবে না, যদি তোমার আশেপাশে সবাইকে খারাপের মধ্যে দেখতে পাও তাহলে তুমি তাদের সাথে না মিশে একাকি থাকতে চেষ্টা করবে। একাকি থাকলে তুমি প্রকৃতির কাছ থেকে অনেক কিছু শিখতে পারবে, প্রকৃতির মতো নিষ্পাপ হতে পারবে, মানুষকে ভালোবাসতে পারবে।”

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



