somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

শোক তাদের সবার জন্য!

১৪ ই সেপ্টেম্বর, ২০১৬ সন্ধ্যা ৭:২১
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

২০০১ সাল, পড়তাম এইটে। ঘরে বিনোদনের মাধ্যম বলতে ছিল দুই ব্যাটারির একটা রেডিও, 'জাহান্নামের খুঁটা' বিধায় ঘরে টিভি তুলতে দেননি বাবা। স্কুল থেকে ফিরে 'বিজ্ঞাপন তরঙ্গ' শোনার জন্য রেডিও ছাড়তাম। বিজ্ঞাপন তরঙ্গে ছায়াছবির গান থাকত, 'হাঁ ভাই'-এর (মাজহারুল ইসলাম) উপস্থাপনায় স্পন্সর অনুষ্ঠান থাকত।

আজ থেকে ঠিক এক যুগ আগে রেডিও কাঁপিয়ে একটা খবর শোনা গেল— টুইন টাওয়ার ও পেন্টাগনে বিমানহামলা হয়েছে, ৩০০০ লোক মারা গেছে। সংবাদপাঠক যত উত্তেজনাকর কণ্ঠে খবর দিতে লাগলেন, আমি তার চেয়ে বেশি উত্তেজিত হতে লাগলাম। একটি ঘটনায় ৩০০০ লোকের মৃত্যুর কথা এর আগে শুনিনি। 'পূর্ণদৈর্ঘ্য বাংলা ছায়াছবি' দেখতে পাশের বাসায় যাতায়াত ছিল, সেখানকার টিভিতে তন্ময় হয়ে বিমানহামলার ছবি দেখেছি। চিকন একটা বিমান এসে সাঁই করে বিশাল একটা ভবনের পেটের মধ্যে ঢুকে গেল, ভবনাগ্রে সোনালি আগুন জ্বলে উঠল, সমুদ্রের ঢেউয়ের মতো ধোঁয়ার ঢেউ জাগল, ভবনটা হুড়মুড় করে ভেঙে পড়ল— 'দেখার মতো' দৃশ্য! কোনো ভিডিও গেমেও এমন প্রাণবন্ত দৃশ্য দেখিনি আগে; দৃশ্যটি খবরে যতবার দেখিয়েছে, ততবারই মুখ হাঁ করে 'মুগ্ধ হয়ে' দেখেছি।

ঐ সময়ে আমি বরগুনায়। 'নাসারাদের দেশ' আমেরিকার ভবন বিমানহামলায় ভেঙে পড়েছে— খবরটি শহরময় ছড়িয়ে পড়ল। দাড়িওয়ালা মুরুব্বিদের মুখে জেল্লাদার হাসি। চারিদিকে উৎসব-উৎসব আমেজ। ইহুদি-নাসারাদের এহেন পতনে উৎসব না হয়ে পারেই না। এক মুরুব্বি তো বলেই বসলেন, 'আল্লাহপাক আবাবিল পাঠিয়ে আবরাহার হস্তীবাহিনীকে ধ্বংস করে কাবাঘর বাঁচিয়েছিলেন, তিনি আবারও আবাবিল পাঠিয়ে আমেরিকাকে ধ্বংস করে পৃথিবীটাকে বাঁচালেন; ঐ বিমান বিমান ছিল না, ঐ বিমান ছিল বিমানরূপী আবাবিল!' বয়স মোটে ১৩, শহরের মুরুব্বিদের উচ্ছ্বাস-উল্লাস দেখে নিজের ভেতরও ফুরফুরে ভাব তৈরি হলো।

হামলার জন্য আমেরিকা একচ্ছত্রভাবে দায়ী করল আল-কায়েদাকে। আল-কায়েদার প্রধান নেতা আবার ওসামা বিন লাদেন। লাদেন তখন বরগুনা শহরে এক বিরাট নায়কের নাম। ইহুদি-নাসারাদের ওপর তিনি হামলা চালিয়ে ইসলামকে বাঁচিয়েছেন। মসজিদে-মসজিদে তাকে নিয়ে দোয়া হতে লাগল, জুমার নামাজের বয়ানে ইমামরা তাকে 'ইমাম মাহদি' বলে অভিহিত করতে লাগলেন। আখেরি জামানায় 'মাহদি' নামক একজন ইমামের আবির্ভাব ঘটবে, যিনি ইসলামরক্ষা করবেন; বিন লাদেন মাহদি না হয়ে পারেনই না!

ইতোমধ্যে বাজারে দু-টাকা দামের খেলনা বোমা এল, নাম লাদেন বোম, বাচ্চারা ঠুশঠাশ করে লাদেন বোম ফোটাতে লাগল; লাদেনের ছবিওয়ালা ক্যালেন্ডার এল, ভিউ কার্ড এল; এক ভিউ কার্ডে দেখা গেল একটি ইগল ঠোঁটে করে লাদেনকে উড়িয়ে নিয়ে যাচ্ছে, লাদেনের মুজিজা দেখে চোখে পানি এসে গেল। বাসা থেকে সালমান শাহ-শাবনুর-রিয়াজের সব ভিউ কার্ড ফেলে দিয়ে লাদেনের ভিউ কার্ড কিনে পকেটে নিয়ে ঘুরতে লাগলাম। সালমানদের কার্ড কিনে যত গুনাহ করেছি, লাদেনের কার্ডক্রয়ের ফলে অর্জিত নেকিতে তা ধুয়ে গেছে বলে ধারণা পেতে শুরু করলাম।

আমেরিকা আফগানিস্তানে হামলা শুরু করল। বরগুনার মর্দে মোজাহিদদের জেহাদি জোশ বেড়ে যেতে লাগল, হামলাবিরোধী মিছিল হতে লাগল শহরজুড়ে। দূর থেকে আমি সেই জেহাদি মিছিলগুলো দেখতাম, আর পকেট থেকে লাদেনের ছবি বের করে-করে মোছা দিতাম। মার্কিন হামলা শুরুর পর থেকে বাজারে লাদেনের নামে আগত দ্রব্যগুলোর কাটতি বেড়ে গেল। আমেরিকায় ৩০০০ লোক মরে গিয়ে এই সুদূর বাংলাদেশের কত আবেগ-ব্যবসায়ীর কার্ডব্যবসা-ক্যালেন্ডারব্যবসার পথ খুলে দিয়ে গেছেন; তা ঐ ৩০০০ লোক যদি জানতেন, তবে তারা জীবিত হয়ে ফের আত্মহত্যা করতেন! আর লাদেন যদি জানতেন, তাকে নিয়ে বাংলাদেশে এমন ধুন্দুমার ব্যবসা হবে; তবে তিনিও নিশ্চয় ব্যবসালব্ধ টাকার হক আদায়ে বাংলাদেশের এক কোণায় একখানি বোম ফেলে যেতেন!

যা হোক, মার্কিন হামলার পর বাংলাদেশের গুপ্ত জঙ্গিরা গর্ত থেকে বেরিয়ে প্রকাশ্যে আসার সুযোগটি পায়; আমেরিকাবিরোধী তরতাজা সেন্টিমেন্টকে কাজে লাগিয়ে তখন তারা মিছিলে এক অদ্ভুত স্লোগান দিয়েছিল— 'আমরা সবাই তালেবান, বাংলা হবে আফগান!' স্লোগানটি আপাত-নিরীহ হলেও পরবর্তীতে এর ভয়াবহতা বোঝা গেল এবং দেখা গেল দেশের আনাচে-কানাচে কী পরিমাণ জঙ্গি লুকিয়ে ছিল! পরবর্তীতে জেএমজেবি-জেএমবির সাথে আল-কায়েদাসহ এই আফগানিস্তান-ভিত্তিক জঙ্গিসংগঠনগুলোরই সংশ্লিষ্টতা পাওয়া গেছে। যে বরগুনার কথা বললাম, 'আনসারুল্লাহ বাংলা টিম'-এর দুর্ধর্ষ জঙ্গি মুফতি জসিমকে সম্প্রতি সেই বরগুনা থেকেই ধরা হয়েছে। ঘূর্ণিঝড় ছাড়া অন্য কোনো ইশুতে গণমাধ্যমে না এলেও এই জসিমের কল্যাণে বরগুনার নামটি কিছুদিন ধরে গণমাধ্যমে ছিল।

আফগানিস্তান এক অন্ধকূপ। ধর্মীয় অনাচার-কুসংস্কারের লীলাভূমি এই আফগানিস্তান। এই অন্ধকারের পালনকর্তা আমেরিকা। বিশ্বব্যাপী আঁধার জিইয়ে রেখে তারা আলোর ব্যবসা করে বেড়ায়, গণতন্ত্র বিলিয়ে বেড়ায়। আমেরিকাই বিশ্বসন্ত্রাসের গডফাদার, আবার আমেরিকাই চালিয়ে যাচ্ছে সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধের নামে নির্মম কৌতুক; আর সেই কৌতুকের সহকারী ভাঁড় হিশেবে কাজ করে যাচ্ছে বিশ্বের সবচেয়ে রহস্যময় রাষ্ট্রগুলোর একটি— সৌদি আরব!

২০০১ সালের আজকের এই দিনে কারা আমেরিকায় হামলা করেছিল, তা এখনও অস্পষ্ট। কিন্তু এই জুজুটিকে ব্যবহার করেই বাকি বিশ্বের আপত্তিকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে আফগানিস্তানে হামলা চালিয়ে আমেরিকা একুশ শতকের নিরঙ্কুশ পরাশক্তি হিশেবে আবির্ভূত হয়েছে। যে লাদেনকে আমেরিকা নিজ হাতে জন্ম দিয়েছিল, ফ্রাংকেনস্টাইন হয়ে ওঠার পর সেই লাদেনকে ধরতেই আমেরিকা হত্যা করেছে অজস্র নিরীহ আফগানকে। যে লাদেনকে ধরতে আফগানিস্তানকে তামা করা হলো; আফগানিস্তানে নয়, সেই লাদেনকে শেষতক পাওয়া গেল আমেরিকারই পেয়ারের দেশ পাকসার জমিন পাকিস্তানে! অভিশাপ নয়, নাইন-ইলেভেন আমেরিকার জন্য মস্ত এক আশীর্বাদ!

নাইন-ইলেভেনের এক যুগ পূর্তি হয়ে গেলো দুদিন আগেই। গ্রাউন্ড জিরোতে আজ বিরাট শোকসভা হলো, আমেরিকার বন্ধুরা গ্রাউন্ড জিরোতে বোতলে ভরে অশ্রু পাঠালো। কিন্তু কেউ মনে করলোনা সেইসব নিরীহ আফগানকে, ঐ ৩০০০ মৃত্যুর পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া হিশেবে আমেরিকা যাদেরকে হত্যা করেছিল! ১১ই সেপ্টেম্বর যারা নিহত-আহত হয়েছিলেন এবং এর জের ধরে যেসব নিরীহ আফগান বেঘোরে প্রাণ দিয়েছেন, তাদের সবার জন্য শোক।
সর্বশেষ এডিট : ১৪ ই সেপ্টেম্বর, ২০১৬ সন্ধ্যা ৭:২২
২টি মন্তব্য ০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

২১শে আগস্ট গ্রেনেড হামলা তার সাথে কিছু রুঢ় সত্য যা বদলে দিয়েছিলো দেশের রাজনীতি।

লিখেছেন অন্তর্জাল পরিব্রাজক, ২১ শে আগস্ট, ২০২৬ রাত ১২:৩৪





২১শে আগস্ট গ্রেনেড হামলা সম্পর্কে আমরা সবাই মোটামুটি জানি। এই হামলায় কারা জড়িত ছিল সেটাও আজকের দিনে অজানা নয় একমাত্র নিতান্ত দলকানা ছাড়া। তৎকালীন বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের সময়... ...বাকিটুকু পড়ুন

ধানমন্ডি ৩২ যারা ভেঙেছিল, আর যারা বিচার চাওয়ার পথ বন্ধ করে দিল- তারা কি একই?

লিখেছেন এস.এম. আজাদ রহমান, ২১ শে আগস্ট, ২০২৬ সকাল ৯:৪৪



ধানমন্ডি ৩২ যারা ভেঙেছিল, আর যারা বিচার চাওয়ার পথ বন্ধ করে দিল- তারা কি একই?

ধানমন্ডি ৩২ ভাঙা হয়েছিল- কে দেখেনি, কে জানে না, এটা অস্বীকার করার উপায় নেই।,... ...বাকিটুকু পড়ুন

গরীবের বউ সবার ভাবি

লিখেছেন অপলক , ২১ শে আগস্ট, ২০২৬ দুপুর ১:০২



৩৬ জুলাই আন্দোলনের পর অনেক আশায় ছিলাম। আশার গুড়ে বালি। তত্বাবধায়ক সরকারের সময় বাংলাদেশ ব্যাঙ্ক গভর্ণর ড. আহসান এইচ মনসুর বুদ্ধিদীপ্ত প্ররিশ্রম করে ২০২৬ জানুয়ারীতে রিজার্ভে রেখে গেছেন ৩৫... ...বাকিটুকু পড়ুন

মন থেকে যারা আওয়ামী লীগকে ভালোবাসেন এখন তাদেরকে আওয়ামী লীগের প্রয়োজন

লিখেছেন মহাজাগতিক চিন্তা, ২১ শে আগস্ট, ২০২৬ বিকাল ৩:৪০



ক্ষমতায় গেলে কোন দল যাদেরকে মনে রাখে না ক্ষমতায় গেলে তাদেরকেই তারা সবচেয়ে বেশী মিস করে। সেই নিখাঁদ দল প্রেমিকদেরকে এখন আওয়ামী লীগ খুঁজছে। তারা লগি বৈঠা নিয়ে... ...বাকিটুকু পড়ুন

৫ই আগস্ট ছিলো আরো একটি ১৫/২১শে আগষ্টের অপচেষ্টা।

লিখেছেন ক্লোন রাফা, ২১ শে আগস্ট, ২০২৬ রাত ১০:৫২



২১শে আগস্ট পালন করা অর্থে , আমার কাছে মনে হচ্ছে আবারো জঘন্য কোনো ঘটনার পুনরাবৃত্তি হবে। কারন আমরা ঐ নারকীয় হত্যাকাণ্ডের কোনো বিচার সম্পন্ন করতে পারিনি। আমরা যারা... ...বাকিটুকু পড়ুন

×