somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

সম্পর্ক

২১ শে আগস্ট, ২০১৩ ভোর ৪:০৫
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

সম্পর্ক গুলো খাপছাড়া, সম্পর্ক গুলো ভিত্তিহীন।একটা সময় ছিল যখন মানুষের সম্পর্ক গুলোতে ছিল মায়াজাল। মায়াবন্ধনে আবদ্ধ হয়েই থাকতে পছন্দ করতো প্রতিটি মানুষ। আগে একজন মানুষ অন্য একটি মানুষের সাথে তার কি সম্পর্ক তা অবলীলায় প্রকাশ করবার ক্ষমতা রাখতো, আর এখন? একটি মানুষের সাথে অন্য একটি মানুষের সম্পর্কের প্রকাশ করতেই চায় না বরং সম্পর্কের নাম নিয়েও সন্দিহান হয়ে উঠে।
“সন্দেহ” এ এক ভয়ঙ্কর রোগ। একবার যদি কোন সম্পর্কে সন্দেহের বীজ ঢুকে যায় তবে সেই সম্পর্কের ফাটল নিশ্চিত। সন্দেহ তখনি সম্পর্কে প্রবেশ করে যখন বিশ্বাস উঠে যায়। “বিশ্বাস” যে কোন সম্পর্কের প্রধান ঔষধ। বন্ধুত্বপূর্ণ, সুন্দর হাস্যজ্বল, চিরন্তন ভালবাসাপূর্ণ, সম্পর্ক তখনি গড়ে ওঠে যদি সেখানে বিশ্বাস থাকে। আর সেই কারণে সমাজবদ্ধ মানুষ হিসেবে আমরা আমাদের জীবনে বিভিন্ন সম্পর্কে আবদ্ধ হই।
সমাজে চলতে হলে আমাদের বিভিন্ন পরিবেশে নিজেকে মানিয়ে নিতে হয়। কিন্তু এখনকার মানুষগুলো যেন পারেনা মানিয়ে নিতে। সমঝোতা হয় না পরিবারের মানুষের সাথে,বন্ধু মহলে, অফিস আদালতে, স্কুল কলেজ এ এবং আর অনেক জায়গায়। কিন্তু বিশ্বাস এর পাশাপাশি সমঝোতা অনেক প্রয়োজন, দরকার সম্পর্কের সম্মানতা।
একটা সম্পর্কের মধ্যে বিশ্বাস, সমঝোতা, বন্ধুত্ব, ভালবাসা, উৎসর্গতা, আস্থা, সন্মানবোধ এগুলো থাকলেই সেই সম্পর্ক হয়ে উঠে চিরন্তন সুন্দর। ইদানিং রাস্তাঘাটে বের হলেই গুরুজনদের মুখে শোনা যায় –“কলিকালের প্রেম বড়ই আজব”, কেন এই কথা শোনা যায় তা নিয়ে কেউ কি কখনো ভেবে দেখেছে? আগের সম্পর্কগুলো ছিল অটুট। কেউ যদি কাউকে ভালোবাসতো তবে সেই সম্পর্কের শেষ পরিণতি হতো সামাজিক বন্ধন। সেই সম্পর্কে থাকতো বিশ্বাস, ভালবাসা, আস্থা সেই সাথে সম্মানবোধ। অথচ এখনকার ভালবাসাগুলো যেন কাঁচের মতোই ঠুনকো। আজ যে সম্পর্ক গড়ে কাল বাদে পরশু তা ভেঙ্গে চুরচুর হয়ে যায়। কারন একটাই নেই বিশ্বাস, নেই আস্থা, নেই সম্মানবোধ। আমরা যে মানুষটিকে ভালবাসি তাকে যদি আমরা বিশ্বাস ই না করি, তাকে যদি সম্মান নাই বা করতে পারি, তার প্রতি যদি আমাদের আস্থা নাইবা থাকে তবে এ সম্পর্ককে যে কোন সস্তা পণ্যর সাথে তুলনা না করলেই নয়। সস্তা হতে পারে অনেক কিছুই, তার মধ্য থেকে যদি একটি সম্পর্ককে একটি ঠুনকো কথার সাথে তুলনা করা হয় তাহলে হয়তো এটি যথার্থতা লাভ করবে। সম্পর্কের মত কথাও এখন সস্তা হয়ে গেছে। এখনকার মানুষ গুলো যা বলে করে তার উল্টো । আগে কথার মধ্যে থাকতো অদম্য শক্তি। মানুষের প্রতিটি কথায় যেন তার গভীরতা , তার অনুভূতির সত্যতা প্রকাশ পেত। আগের যুগে কথার মাঝে যে প্রাঞ্জলতা, যে সত্যতা ,যে গভীরতা নিহিত ছিল তা দিয়ে গড়ে উঠত সম্পর্ক। আর এখন এই কথা দিয়ে সম্পর্ক গুলো যেন ভাঙতে বেস্ত । দুটি মানুষের মধ্যে এখন যে সম্পর্ক রচিত হয় সেই সম্পর্কের সাথে আগেকার মানুষের রচিত সম্পর্কের ভিন্নতা অনেক।
আগে প্রেম বুঝাতো মনস্তাত্তিক ব্যাপারগুলো , কথার মাঝে গভীরতা , কথার মাঝে স্বপ্ন যা পূর্ণতা প্রকাশ পেতো সত্যতায়, তা কলিকালে এসে বদলে গেছে অর্থবিত্তে । এখন যার কাছে যত টাকা , যার কাছে যত খ্যাতি আছে তার সাথে সম্পর্ক না করতে পারলে যেন জীবন বৃথা । মনস্তাত্তিক ব্যাপারগুলো এখন নাড়া দেয় না , তার বদলে চলে এসেছে শরীরবৃত্তীয় ব্যাপার । আগের যুগে একজন আরেকজনের হাত ধরতে যে সংকোচ বোধ করতো তা বদলে গিয়ে হয়েছে এখন নিশসংকোচ । এখন নির্দ্বিধায় নিশসংকোচে হাত ধরতেও বাধে না। এখন যেন মনস্তাত্তিক ব্যাপারগুলো গৌণ হয়ে যায় আমাদের অন্যান্য আপেক্ষিক উপাদান গুলোর কাছে।
সময়ের সাথে সাথে বদলে গেছে মানুষের জীবন প্রণালী , বেড়ে গেছে কর্মবেস্ততা, তৈরি হয়েছে নানান সামাজিক, পারিবারিক, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক , প্রযুক্তিভিত্তিক জটিলতা । যা থেকে মানুষ বের হতে পারছে না বরং তৈরি হচ্ছে যান্ত্রিক রোবটে । নিজেকে এবং তার পারিপার্শ্বিকতাকে সে তৈরি করেছে মায়াজালের বদলে মিথ্যার জালে । এখন মানুষ প্রযুক্তির উপর নির্ভর হয়ে পড়েছে তার ফলে হারিয়ে ফেলেছে নিজস্বতা । প্রত্যেকটি মানুষের নিজস্বতা থাকে। অথচ এখন সেই নিজস্বতা ধরে রাখবার মতো কারোরই সময় নেই। কথা দিয়ে আগে মানুষ সহজেই তার মনের অনুভূতি, আবেগ, স্বপ্নের গভীরতা গুলোকে তুলে ধরতে পারতো যা সম্ভব ছিল তার নিজস্বতার কারনে। অথচ এখন যান্ত্রিকতা মানুষকে এতোটাই প্রভাবিত করেছে যে মানুষ এখন তার নিজস্ব আবেগ, অনুভূতি ,স্বপ্নের কথা প্রকাশ করতে পারে না। তার মনের কথাগুলো বারবার ঘুরপাক খায় তারই তৈরি করা যান্ত্রিক দেয়ালে কিন্তু প্রকাশ করতে পারে না। আর যখন তা প্রকাশ করতে যায় তখন সেটি শুধুমাত্র প্রকাশ করবার জন্যই প্রকাশ করে যায়। দায়সাড়া ভাবেই তা প্রকাশিত হয় যার পেছনে অনেকটা মেকিভাব অথবা অন্যকে কিভাবে কথা দিয়ে আকর্ষণ করা যায় তা নিয়েই মানুষ মত্ত থাকে। তাই তো আমাদের জন্য যারা কবিতা, অথবা কিছু অসমাপ্ত কথা রেখে গেছেন তাদের লাইন গুলো পড়েই আমরা আমাদের মনের ভাব প্রকাশ করছি। আমরা কেন পারছি না আমাদের নিজস্বতা আনতে আমাদের কথার মাঝে? অবশই এই প্রযুক্তিগত যান্ত্রিকতার কারনে। রবীন্দ্রনাথ থেকে শুরু করে এ পর্যন্ত যত বড় বড় মনিষী , লেখক, কবি আছেন তাদের লেখাগুলোকেই আমরা পড়ে গড়গড় করে তোতা পাখির মতো বলছি কিংবা প্রযুক্তিগত যন্ত্রের মাধ্যমে পাঠিয়ে দিচ্ছি আমাদের পছন্দের মানুষের কাছে। কয়জন আছে যারা তাদের নিজেদের ভাবগুলো প্রকাশ করে? ইচ্ছা থাকলেও পারছে না মানুষ , কারন মানুষ এখন বন্দী সময়ে কাছে , প্রযুক্তির কাছে। এর ফলে মানুষ সহজেই তৈরি করে নানান জটিলতা । মনে পড়ে যায় Benjamin Franklin এর সেই কথা- “ For Technology we are running out of our Spirituality. We have guided missile & misguided people.”
জীবনের এই যে পরিবর্তন তা মানুষের মাঝে এনে দিয়েছে একক সত্তা, যার প্রভাব পরেছে তার জীবনপ্রণালীতে ,তার ভাব আদান প্রদান এর ক্ষেত্রে, এখন তার মাঝে দেখা দেয় আবেগের ঘাটতি । তার ভেতরে জন্ম নিয়েছে আত্মঅহঙ্কার। আর এক নিজস্ব গর্ববোধ যা তাকে তাড়া করে সবসময় । যা তাকে তার স্বার্থমূলক নীতিবাদে সাহায্য করে, সাহায্য করে তার আমিত্বকে আত্মাভিমানী এক বাক্তিত্তে।
তখন শুরু হয় তার নানান জটিলতা। যেমন, পারিবারিক জটিলতা এড়াতে সে খুব সহজেই তার শেকড় থেকে আলাদা হয়ে যায়। অথবা তার শেকড়কে নির্বাসনে পাঠায়।
কতটা নিষ্ঠুর হতে পারে একজন মানুষ!
“ দুটি পাতা থেকে একটি কুঁড়ি , কুঁড়ি থেকে মুকুল তারপর হয় একটি পুরনাঙ্গ ফুল। “ এই যে জীবনচক্র ঠিক তেমনি মানুষের সম্পর্কগুলোও এভাবে তৈরি । অথচ আমরা মানুষেরা কতোসহজেই সম্পর্ককে জলাঞ্জলি দিয়ে ফেলি। মানুষের এই যান্ত্রিক জীবন সামাজিকতায় রূপ নেয় ঠিকই কিন্তু অচিরেই তা ভেঙ্গে যায়। যা আমরা আমাদের আইনকাঠামো , বিধিনিষেধ এর মাধ্যমে পালন করছি তা আবার মাস যেতে না যেতেই , বছর যেতে না যেতেই একই আইনকাঠামো কিংবা বিধিনিষেধ মোতাবেক ভেঙ্গে ফেলছি। তৈরি করছি আবার নতুন সম্পর্ক । অথচ এর প্রভাব বয়ে বেড়াচ্ছে আমাদের এক একটি ফুল। যেখানে তাদের পুরনাঙ্গ ফুল হয়ে গড়ে উঠবার কথা সেখানে পুরনাঙ্গতা খুঁজে পাওয়া দুর্বিষহ । তারা গড়ে উঠছে অপূর্ণাঙ্গ ফুল রূপে । নিজেরাই তৈরি করছে নিজেদের মাঝে অসুস্থ মনস্তাত্তিক চিন্তাচেতনা ! যা তাদের চলতি পথে জটিলতা তৈরিতে সাহায্য করতে তৎপর।
সর্বশেষ এডিট : ২১ শে আগস্ট, ২০১৩ সকাল ১০:২২
২টি মন্তব্য ০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

কত ভেবেছি, আমাদের একদিন দেখা হবেই

লিখেছেন সোনাবীজ; অথবা ধুলোবালিছাই, ০৮ ই জুলাই, ২০২৬ সন্ধ্যা ৭:০৯

কত ভেবেছি,
আমাদের একদিন দেখা হবেই।
হয়তো হঠাৎ সামনে এসে
আমাকে চমকে দেবে।
হায়,
ওরা কেন জানালো,
পৃথিবীতে
তুমি আর বেঁচে নেই!

কত ভেবেছি,
চলতে চলতে পথে
সামনে একটা রিকশা থেমে যাবে।
কী মোহন ভঙ্গিমায়
রাজাসনে বসে আছো তুমি,
রোদে ভেজা মুখ... ...বাকিটুকু পড়ুন

ফতোয়া যখন আইসক্রিম: ক্ষমতার গরমে গলে, মার্কিন বাতাসে জুড়ায়!

লিখেছেন মহিউদ্দিন হায়দার, ০৮ ই জুলাই, ২০২৬ রাত ৯:২৩




মুখে জিকির আর অন্তরে ডলারের ফিকির—ধর্মের নামে এই লেভেলের "মাল্টিটাস্কিং" মুনাফেকি কি আপনিও খেয়াল করেছেন?
ঈমানের তলোয়ার শুধু গরিবের ওপর চলে, আর হোয়াইট হাউজের সামনে গেলেই কেন এদের লুঙ্গি কোঁচা... ...বাকিটুকু পড়ুন

পি ভি নরসিমা রাও - ভারতের অর্থনৈতিক সংস্কারের জনক

লিখেছেন সত্যপথিক শাইয়্যান, ০৯ ই জুলাই, ২০২৬ রাত ১২:৪৩



পি ভি নরসিমা রাও ১৯৯১ সালে ভারতের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর তৎকালীন ভয়াবহ অর্থনৈতিক সংকট মোকাবিলায় যে ঐতিহাসিক সংস্কারনীতি গ্রহণ করেন, তা "এলপিজি সংস্কার" (LPG Reforms - Liberalisation,... ...বাকিটুকু পড়ুন

সব দোষ গাজী সাহেবের!

লিখেছেন মাথা পাগলা, ০৯ ই জুলাই, ২০২৬ রাত ২:৫৩



ধরেন, এখন আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আছে। শেখ হাসিনা সংসদ ভবনের সামনে ভারতের স্বাধীনতা দিবস জাঁকজমক করে পালন করলেন। ভারতের শীর্ষ নেতা এলেন, ভারতের পতাকা উড়ল...

এখন চুপ করে থাকা পাকিস্থানপন্থীরা... ...বাকিটুকু পড়ুন

হিসাব বিষয়ক ভাবনা

লিখেছেন করুণাধারা, ০৯ ই জুলাই, ২০২৬ বিকাল ৩:৫৩



সংখ্যাওয়ালা কোনো লেখা দেখলে হিসাব ঠিক আছে কিনা তা যাচাই করা আমার অভ্যাস। ইদানিং বিভিন্ন রকম সংখ্যাওয়ালা কিছু বিজ্ঞাপন সামনে আসছে, এগুলো ফ্ল্যাট বিক্রির বিজ্ঞাপন। এসব বিজ্ঞাপনে যেসব সংখ্যা... ...বাকিটুকু পড়ুন

×