somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

একটি সত্য গল্প/ 'সাধারণ ছাত্র'

০১ লা জুলাই, ২০০৬ সকাল ৯:০০
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

// সাধারণ ছাত্র //

ঘড়িতে তখন সকাল দশটা বাজে।
এইমাত্র একটা কাসটেস্ট দিয়ে এলাম। স্যার কি সব হাবিজাবি প্রশ্ন করেছেন! কিছুই পারিনি। পারব কি করে? স্যার কাসে পড়ান এক, পরীায় দেন আরেক। এ ব্যাপারে স্যার বলেন, 'আমি আসলে তোমাদের মেরিট টেস্ট করছি। সব সময় তোমরা শুধু মুখস্থ করে পাশ করতে চাও। আমি চাই তোমরা বেসিক কনসেপ্ট দিয়ে অ্যানসার করা শেখ।' মনে মনে বলি, 'জি্ব স্যার ঠিকই বলেছেন। আপনার তো আর চিন্তা নাই। গ্রেডিং নিয়ে তো ভাবতে হয় না। আপনার বেসিক কনসেপ্ট নিয়ে চিন্তা করতে করতে আমাদের রেজাল্টের বেসিক যে ঢিলা হয়ে গেছে-এটা কি ভেবেছেন?' এ প্রশ্নের উত্তর আর আমাদের জানা হয় না। কেননা বিড়ালের গলায় ঘন্টা বাঁধতে কে! স্যারের সামনে গেলে আমাদের বেশিরভাগেরই গলা থেকে কোন স্বর বের হতে চায় না। ভয় লাগে। কি বলতে না কি বলে ফেলি! শেষে যদি স্যার প্রাকটিকালে শূণ্য দেয় তাহলে তো জীবন শেষ!
অবশ্য আমাদের ভয় পাবার পিছনে যথেষ্ট যুক্তিসঙ্গত কারণও আছে। গত বছর এই স্যার আমাদের সিনিয়র এক ভাইকে তার বিষয়ে ফেল করিয়ে দিয়েছিলেন, যদিও ভাইয়া নাকি ভালই পরীা দিয়েছিল। তবুও ফেল করেছিল। কারণ ওই ভাইয়া স্যারকে কাস লেকচারের মধ্য থেকে পরীায় প্রশ্ন করতে অনুরোধ করেছিলেন। এটা স্যারের খুব গায়ে লেগেছিল। 'কত্ত বড় সাহস! আমাকে উপদেশ দেয়! কি করব না করব সেটা আমি ভাল বুঝি। ও বলার কে? বেশি বোঝে। দেখাচ্ছি মজা!' স্যার শহীদ ভাইকে ঠিকই মজা দেখিয়েছিলেন। দেখাবেনই না কেন? মতা দেখাতে আমরা সবাই খুব পছন্দ করি। তাছাড়া ক্যাম্পাসে যারা 'সাধারণ ছাত্র' বিশেষণে বিশেষায়িত তাদের জন্য লঘু পাপে গুরু দন্ড হওয়াটাই স্বাভাবিক। ওহ হো! স্যারের নামটাই তো বলা হয়নি। তিনি জনাব আব্দুল কুদ্দুস। আমাদের স্ট্রাকচার পড়ান। পাশাপাশি আমাদের হলের প্রোভোস্ট হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন।
মিনিট বিশেক পর আমাদের একটা কাস শুরু হবে। আমরা কাস রুমের সামনের বারান্দায় দাঁড়িয়ে গল্প করছিলাম। দূরে আমাদের ভার্সিটির শহীদ মিনার দেখা যাচ্ছে। পাশে অস্থায়ী চায়ের দোকান। অনেকেই সেখানে বসে চা খাচ্ছে। একটু দূরেই মেইনগেট। বাইরে ব্যস্ত সড়কে মানুষের নিরন্তন ছুটে চলা। রিকশার পিছন রিকশা। গাড়ির পিছন গাড়ি। পুরুষের পাশে নারী। নারীর পাশে শিশু। ফেরিওয়ালা ফেরি করছে। হকার বিক্রি করছে পত্রিকা । বলা যায় সব মিলিয়ে মোটামুটি শান্ত কিন্তু ব্যস্ত এক জীবনের খন্ডচিত্র।
আমি বললাম, 'আমরা আসলে খুব ভাগ্যবান। দেশের অনেক ভার্সিটিতে বড় ধরনের গন্ডগোল হলেও সবসময়ই আমাদের এখানটা শান্ত থেকেছে।'
'থাকবে না কেন?' নওরিণ বলল, 'ফাঁকা মাঠে সবাই গোল দিতে পারে!'
'মানে? তোর কথা আমি কিছুই বুঝতে পারছি না।'
'আরে বাবা এটা না বোঝার কি আছে! এখানে বিরোধী দলের কোন ছেলেপেলে আছে? যা আছে সবই তো সরকারি দলের। তারা যা বলে আমরা তাই করি। ন্যায় বললেও করি। অন্যায় বললেও করি। যেহেতু বিরোধিতা করার কেউ নেই, মতের অমিল নেই তাই এখানকার সিচুয়েশান শান্ত থাকাটাই স্বাভাবিক।'
নওরিণ ঠিকই বলেছে। আসলেই ফাঁকা মাঠে যে কেউই গোল দিতে পারে।
আমি নওরিণকে কি যেন বলতে যাচ্ছিলাম কিন্তু বলতে পারলাম না। তার আগেই গেটের দিকে দৃষ্টি যেতেই চোখ আটকে গেল। দশ-বারটা ছেলে হকিস্টিক, লাঠিসোটা হাতে ক্যাম্পাসে ঢুকছে। কি ব্যাপার! কোন গন্ডগোল হবে নাকি? কিন্তু বিরোধী দলের তো কেউ নেই, তো মারামারিটা হবে কার সাথে? দূর থেকে ছেলেগুলোকে ঠিক চেনা যাচ্ছিল না। তবে কাছে আসতেই চিনতে পারলাম। অবশ্য এদেরকে সবাই চেনে। বেশিরভাগই ফার্স্ট ইয়ারের ছাত্র। সরকারি দলের ছাত্র সংগঠনের ক্যাডার। বোঝা যাচ্ছে কিছুণের মধ্যেই এখানে অপ্রীতিকর একটা কিছু ঘটতে যাচ্ছে। মনটা একটু খারাপ হল। একটু আগে যে ক্যাম্পাস নিয়ে অহংকার করছিলাম, এত তাড়াতাড়ি যে সে অহংকারের পতন হবে তা ভাবতেই পারিনি।
'এই চল,চল, কাসে চল। স্যার চলে এসেছেন।' বলল নওরিণ। আমরা কাসে চলে গেলাম। অযাচিত ঝামেলার সাী হতে কেউ চায় না। আমাদের ইচ্ছাটাও সেরকমই ছিল।
দুপুরে হলে ফিরে দেখলাম গেস্টরুমে ভীষণ ভীড়। কি ব্যাপার? কি হয়েছে? বাইরে থেকে দেখে মনে হল ভেতরে বোধহয় কোন মিটিং চলছে। কিন্তু এ অসময়ে কি নিয়ে মিটিং? গেস্টরুমের ঠিক পাশেই দাঁড়িয়ে ছিল মনির। আজ ও কাসে যায়নি। জিজ্ঞেস করলাম, 'দোস্ত কি হয়েছে?' মনির আমাকে একটু দূরে সরিয়ে নিয়ে নিচু গলায় বলল,'দলের মিরাজ আজকে সকালে শফিক ভাইরে মারছে।'
-ক্যান? কি করছে শফিক ভাই? আর মিরাজ না জুনিয়র?
-আরে ওগো কাছে সিনিয়র জুনিয়ারের কোন বেল আছে! কালকে টিভি রুমে খেলা দেখার সময় শফিক ভাই মিরাজরে বিড়ি খাইতে মানা করছিল। এই নিয়া তর্কাতর্কি। কথা কাটাকাটি। আর আজ সকালে...কি আর কমু!
-তো গেস্টরুমে কারা?
-প্রোভোস্ট স্যার, ছাত্র কল্যাণ স্যার আর কয়েকজন সিনিয়র স্যার আইছেন ঘটনার বিচার করার জন্য।
-শফিক ভাই কই?
-ভেতরেই আছে।
-আর ক্যাডারগুলা?
-ওই তো।
সকালে যাদের দেখেছিলাম তারাই। ভেবেছিলাম একটা কিছু অপকর্ম ঘটবে। কিন্তু এমন কিছু ঘটবে তা ভাবিনি। নির্দলীয় একজনকে এভাবে পেটানো হল! অবশ্য নির্দলীয় বলেই এত সহজে গায়ে হাত দিতে পেরেছে। কোন দলের হলে হয়ত কিছুটা ভাবত। কিন্তু স্যাররা তো কেউ লাল দল, কেউ বা নীল দলের সদস্য। তারা কি ভাববেন এমন দলহীন ছাত্রের কথা!
যথারীতি দীর্ঘ মিটিং হল। কিন্তু কোন ফলাফল হল না। অনেকটা ড্র হওয়া ক্রিকেট টেস্ট ম্যাচের মত। বল আছে, রান আছে কিন্তু কোন রেজাল্ট নেই। যাবার সময় প্রোভোস্ট স্যার মিরাজকে মৃদু ভৎসনা করলেন এভাবে-'তুমি খুব খারাপ কাজ করেছ। ভীষণ অন্যায় করেছ। তোমার শাস্তি হওয়া উচিত।' 'উচিত' মানে? আমরা হতভম্ব! স্যার এটা কি বললেন? স্যারই বলেন, শাস্তি হওয়া উচিত। তাহলে শাস্তিটা দেবে কে? কে যেন পাশ থেকে বলল, 'চোরে চোরে মাসতুত ভাই! সাধারণ ছাত্রের কোন দাম নাই!'
সর্বশেষ এডিট : ৩১ শে ডিসেম্বর, ১৯৬৯ সন্ধ্যা ৭:০০
৬টি মন্তব্য ০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

নির্বাচন তাহলে হয়েই গেল

লিখেছেন অনিকেত বৈরাগী তূর্য্য , ১৩ ই ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ ভোর ৪:১৬


ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে সরকার গঠন করতে যাচ্ছে বিএনপি। ২৯৯টি আসনের মধ্যে এখন পর্যন্ত বেসরকারি ফলাফলে ১৭৫টি আসনে জয় পেয়েছে দলটির প্রার্থীরা।

অন্যদিকে, জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থীরা ৫৬টি আসনে... ...বাকিটুকু পড়ুন

মেটিকুলাস ডিজাইনের নির্বাচন কেমন হলো?

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ১৩ ই ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ সকাল ১১:২৪


ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল বিএনপি ২১৩ আসনে জয়ী হয়েছে। তবে প্রত্যাশার চেয়ে বেশি ভালো ফলাফল করেছে জামায়াত ! এগারো দলীয় জোট প্রায় ৭৬ টি আসনে... ...বাকিটুকু পড়ুন

দেশ চুরান্ত লজ্জার হাত থেকে রক্ষা পেয়েছে।

লিখেছেন জ্যাক স্মিথ, ১৩ ই ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ দুপুর ২:১৮



অনেক জল্পনা কল্পনার পর শেষ পর্যন্ত বিএনপির ভূমিধ্বস বিজয় হয়েছে- এ যাত্রায় দেশ চুরান্ত লজ্জার হাত থেকে বেঁচে গেলো। চারিদিকে যা শুরু হয়েছিলো (জামাতের তাণ্ডব) তা দেখে মনে... ...বাকিটুকু পড়ুন

আল্লাহ ইসলামপন্থীদের ক্ষমতা দেন না কেন?

লিখেছেন মহাজাগতিক চিন্তা, ১৩ ই ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ সন্ধ্যা ৭:৫৫



সূরাঃ ৩ আলে-ইমরান, ২৬ নং আয়াতের অনুবাদ-
২৬। বল হে সার্বভৈৗম শক্তির (রাজত্বের) মালিক আল্লাহ! তুমি যাকে ইচ্ছা ক্ষমতা (রাজত্ব) প্রদান কর এবং যার থেকে ইচ্ছা ক্ষমতা (রাজত্ব) কেড়ে... ...বাকিটুকু পড়ুন

২০ বছর সামহোয়্যারইন ব্লগে: লেখক না হয়েও টিকে থাকা এক ব্লগারের কাহিনি B-)

লিখেছেন নতুন, ১৩ ই ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ রাত ৯:৪২



২০২৬ সালে আরেকটা ঐতিহাসিক ঘটনা ঘটেগেছে একটু আগে।

ব্লগার হিসেবে ২০ বছর পূর্ন হয়ে গেছে। :-B

পোস্ট করেছি: ৩৫০টি
মন্তব্য করেছি: ২৭০৭২টি
মন্তব্য পেয়েছি: ৮৬৬৭টি
ব্লগ লিখেছি: ২০ বছর... ...বাকিটুকু পড়ুন

×