somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

পোস্টটি যিনি লিখেছেন

সাদাত হোসাইন
লিখি, ফিল্ম বানাই, ছবি তুলি। বই প্রকাশিত হয়েছে ৫ টি। উপন্যাস, ছোট গল্প আর (অ)কবিতার বই। প্রথম স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্রের নাম 'বোধ'। ২০১৩ তে জিতেছে জুনিয়র চেম্বার ইন্টারন্যাশনাল এ্যাওয়ার্ড। স্বপ্নের সবটা জুড়ে গল্প। সেই গল্প বলতে চাই লেখায়, চলচ্চিত্রে, ছবি

ডালিম কুমার

১১ ই আগস্ট, ২০১৪ বিকাল ৫:৩০
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

আমার শৈশব ছিল অদ্ভুত কিসিমের!
ক্লাস ফাইভ শেষ হতেই আম্মা বলল, 'তোমাকে বাবা আর স্কুলে পড়াব না, এখন থেকে মাদ্রাসা'।
আমি অবাক চোখে আম্মার দিকে তাকিয়ে থাকলাম। আম্মা কঠিন স্বরে ঘোষণা করলেন, 'তোমার আব্বারে বলছি পা'জামা-পাঞ্জাবি নিয়াসতে, তুমি মাদ্রাসায় ভর্তি হবা'।
আমি ঘোঁত করে বললাম, 'আমি মাদ্রাসায় পরুম না'।
আম্মা বলল, 'তুমি পড়বা, তোমার ঘাড়েও পড়ব'।
যথাসময়ে আব্বা পা'জামা-পাঞ্জাবি নিয়ে আসলেন। সেই পাঞ্জাবীর সাইজ মাশাল্লাহ! পাঞ্জাবী পড়লে আর পা'জামার দরকার হয় না। আমি এবং আমার ঘাড় উভয়েই সেই পাঞ্জাবী পরে মাদ্রাসায় যাওয়া শুরু করলাম। সমস্যা হচ্ছে, স্কুলে ক্লাস ফাইভ শেষ করে আমার যেখানে ক্লাস সিক্সে ওঠার কথা। সেখানে ক্লাস ফাইভ শেষের সিক্স থেকে দুই ধাপ নামিয়ে মাদ্রাসায় আমাকে ভর্তি করানো হল ক্লাস ফোরে। কারণ, মাদ্রাসার পড়া ভয়াবহ কঠিন! তারওপর আরবী শিখতে হবে। সো, নো ওয়ে...
আমি তখন এবতেদায়ি চতুর্থ শ্রেণীর তালেবএলেম!
মাদ্রাসার নাম 'আন্ডারচর সিনিয়র মাদ্রাসা'। সেই মাদ্রাসা আমাদের বাড়ী থেকে মাইল সাতেক দূরে। নানু বাড়ীর কাছে। আমাকে নানু বাড়িতে থেকে পড়তে হবে। আমি অতি আগ্রহ নিয়ে নানু বাড়ি গেলাম। এবং সেই অতি আগ্রহ অবশ্যই মাদ্রাসায় পড়ার লোভে না। সেই অতি আগ্রহ নানু বাড়িতে থাকার লোভে। কারণ, নানুবাড়িতে তখন থাকেন শুধু নানা আর নানু। তারা বৃদ্ধ মানুষ। নানার বয়স তখন প্রায় ৯০। সুতরাং, আমার বাঁধনহীন জীবন। ওই শৈশবে সেই বাঁধনহীন জীবনকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখায় সাধ্য কার?
নানাজান রোজ ফজরের সময় ঘুম থেকে ডাকেন। ডাকতেই থাকেন, 'ওঠো নানাভাই, নামাজে যাবা না? ওঠো...।'
আমি উঠি না। উঠবো কি? সেই ছোট্ট আমি রোজ ভোরে ঘুম থেকে উঠে আম্মার কোলের ভেতর নাক ঘষতাম, মুখ ঘষতাম, আহ্লাদ করতাম। কিন্তু এখানে আম্মা কই? তবুও আমি এখানেও সেই কাকভোরের ঘুমে বিছানা হাতড়ে আম্মাকে খুঁজি! আম্মা কই? তারপর ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদি। নানা আমাকে ঘুম থেকে ওঠান। ওযু করান। নামাজে বসান। তারপর কোলের ভেতর বসিয়ে কোরআন শরিফ পড়েন। আমি ঢুলু ঢুলু চোখে তার কোলের ভেতর ঘুমিয়ে পড়ি...
গাছের পাতার ফাঁক দিয়ে চড়চড় করে রোদ ওঠে। আমার ঘুমেরা পালায়। আম্মার জন্য মন খারাপ পালায়। আমি লুঙ্গীতে গিঁট মেরে গাব গাছে উঠি, টসটসে পাকা গাব। শিমুল গাছের কোটরে ঘুঘু পাখির বাসা, বাসার ভেতর ডিম ফুটেছে, সেই বাসা দেখি, গত সন্ধ্যায় দু দু'খানা ফড়িং ধরে লেজে সুতো বেঁধে রেখেছিলাম। তাদের দেখতে যাই। ফড়িং দুটো মরে পরে আছে। আমার সেই নিথর ফড়িঙের রঙ্গিন পাখাগুলো পিঁপড়ে খেয়ে ফেলেছে। তার ক্ষত-বিক্ষত শরীর দেখে আমার মন খারাপ হয়!
আমি কাঁদতে কাঁদতে নানুর কোলের ভেতর গুটিমুটি পাকিয়ে বসে থাকি, নানু তখন আমাকে দোল দিতে দিতে তার মুখস্ত পুঁথির পালা আওড়ান, -
''তাহার পরে ডালিম কুমার ঘোড়ায় চাবুক দিল, বিদ্যুতেরও বেগে তাহার ঘোড়া ছুটিল। সন্ধ্যা নামে পথের ধুলোয়, চিন্তায় ডালিম কুমার, পথে থাকে দস্যু ডাকাত, কি হবে আমার?
হঠাৎ কেহ বনের পরে কহিল ডাকিয়া, পুরুষ হইছ, এতো ভয়, কিসেরও লাগিয়া?
এই কথা শুনিয়া ডালিম আবার ছোটে পথে, উদ্ধার করিবে রাজকন্যারে, এই ছিল শপথে...''
নানুর পুঁথি শুনতে শুনতে আমার নিজেকে ডালিম কুমার মনে হয়। কিন্তু ডালিম কুমার হতে গেলে একটা ঘোড়া খুব দরকার। ঘোড়া পাব কই? নানুদের উঠোনের উত্তরধারে গরুর ঘর। সেখানে সাদার ওপরে কালোর ফুটকি দেয়া এক টগবগে দুরন্ত বাছুর। সেই বাছুর দেখে আমি উত্তেজনায় ছটফট করি, 'এই তো ডালিম কুমারের সেই ঘোড়া'।
আমি প্রবল আগ্রহে সেই ঘোড়ার পিঠে উঠে বসি। বিদ্যুৎ বেগে বাছুরটা আমাকে ছিটকে ফেলে দেয়, আমি ভাঙা হাত নিয়ে করুণ চোখে তাকিয়ে দেখি, 'ডালিম কুমারের ঘোড়া ডালিম কুমারকে ফেলে কি অবলীলায়ই না চলে গেল'।
আমরা মাদ্রাসায় যেতে ভালো লাগে না। ঘোড়া তার ডালিম কুমারকে ফেলে দেয়ায় আমার ভালোই হয়েছে। আমি ভাঙা হাত নিয়ে বিছানায় শুয়ে থাকি। নানু নানান রকম ঝাড়ফুঁক দেন, ফকির কবিরাজ ডেকে আনেন। তারা ঘরের মাচার সাথে দড়ি দিয়ে উঁচু করে আমার হাত বেঁধে তাতে তেল মালিশ করেন। দোয়া দরুদ মন্ত্র পড়েন। কেউ কেউ পানিতে রঙ্গিন কালিতে কাগজে লেখা তাবিজ গুলে দেন। আমি সেই পানি খেয়ে ঘুমাই। ধীরে ধীরে আমার হাত ভালো হতে থাকে। কিন্তু আমি ভান ধরে বসে থাকি, আমার হাতজুড়ে ভয়াবহ ব্যথা। আমি সময়ে অসময়ে কুকিয়ে উঠি, আহ... আহ...!
আমার চিৎকার শুনে নানু নানা ছুটে আসেন, আহারে ভাই আমার! তারা প্রবল মমতায় আমাকে ছুঁয়ে দেন। আমি সেই প্রবল মমতার পরশ মেখে ঘুমিয়ে পড়ি। কেবল মাদ্রাসায় যাওয়ার সময়টা পার হতেই সটান উঠে পড়ি। উঠোনের রোদে গিয়ে বসি। সেখানে ফুল পাখিদের মেলা। আমি সেই মেলায় হারিয়ে যাই...
সাদার ওপর কালোর ফুটকিওয়ালা সেই বাছুরটা আমার আশেপাশে ঘোরাঘুরি করে। আমি অভিমানে বাছুরটার দিকে তাকাই না। ওর রেশম কোমল লোমে হাত বুলাই না। আম গাছটার গা ঘেঁসে নানার বিশাল ধবধবে সাদা বেড়ালটা দাঁড়িয়ে। আমি সেই বেড়ালের সাথে খুনসুটি করি। বাছুরটা হঠাৎ তেড়েফুঁড়ে এসে ঘোঁত ঘোঁত শব্দ করে বেড়ালটাকে তাড়িয়ে দেয়। তারপর আমার গা ঘেঁসে এসে দাঁড়ায়। আমার শরীরের সাথে মাথা ঘসে। আমি মুখ ফিরিয়ে বসে থাকি। আমাকে অবাক করে দিয়ে সেও আমার পাশে বসে পরে। তারপর আমার কোলে মাথা দিয়ে শুয়ে পরে। আমি কিছু করি না। চুপচাপ বসে থাকি। তারপর হঠাৎ উঠে দাড়াই। বাছুরটাও। আমি নিমেষেই ওর পিঠে উঠে বসি। ও কিছুক্ষণ স্থীর হয়ে দাঁড়িয়ে থাকে। তারপর দুলকি চালে হেঁটে চলে। আমি উবু হয়ে দুই হাতে ওর গলা আঁকড়ে ধরে বসে থাকি। আমার নিজেকে তখন ডালিম কুমার মনে হয়।
ডালিম কুমার রাজকন্যা উদ্ধারে তার ঘোড়া নিয়ে ছুটে চলছে...
------------------------------------------------------------------
ডালিম কুমার/ সাদাত হোসাইন
১১/০৮/২০১৪
৩টি মন্তব্য ১টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

কোথায় পাই পাগলের শ্বশুর

লিখেছেন আলমগীর সরকার লিটন, ০৩ রা নভেম্বর, ২০২৬ সকাল ১১:৪৮


পাগলের পাতা ছাগলে খায়,
দাঁতের দোষটা হাতেই যে কয়;
দেয় রে দোষটা দেয় চোখের,
মনটা যে ধোয়া তুলসীপাতা,
কেউ দেখে না রে মুখের।

মুখের কথা ঠোঁটে কয়,
ছাগল ডাকে রে ভাই, ব্যাঁ-ব্যাঁ;
পাগলের কাজ পাগল করে সই,
সাধু... ...বাকিটুকু পড়ুন

পরিস্থিতি কি জটিল?

লিখেছেন শেরজা তপন, ০৩ রা নভেম্বর, ২০২৬ সকাল ১১:৫৯

বাইরে যাওয়ার প্রস্তুতি নিয়ে বসে আছি, অথচ বাইরে পুলিশের সাউন্ড গ্রেনেড আর টিয়ার গ্যাসের শব্দে চারদিক প্রকম্পিত! মিরপুরে আমার বাসার কাছেই মেট্রো রেলের নিচে আগুন দেওয়া হয়েছে; কিছুক্ষণের জন্য মেট্রো... ...বাকিটুকু পড়ুন

আজকের ডায়েরী- ২০৩

লিখেছেন রাজীব নুর, ০৩ রা নভেম্বর, ২০২৬ দুপুর ১২:৫৯



খাওয়া দাওয়া করাটা আজকাল বিরক্তকর লাগে।
কিন্তু মানুষের বেঁচে থাকতে হলে- খেতে হবে। না খেলে শরীর দুর্বল হয়ে যাবে। প্রিয় খাবার গুলোও খেতে ইচ্ছা করে না। ভালো লাগে... ...বাকিটুকু পড়ুন

আজ আমেরিকার মধ্যবর্তী নির্বাচন কেন এত গুরুত্বপূর্ণ?

লিখেছেন শ্রাবণধারা, ০৩ রা নভেম্বর, ২০২৬ দুপুর ২:৫৬


এই লেখাটি যখন লিখছি, তখন এই গুজবটি ছড়িয়ে পড়েছে যে, ইসরায়েল ট্রাম্পকে রাজি করিয়েছে, যাতে মধ্যবর্তী নির্বাচনের পরপরই আমেরিকা ইরানে পারমাণবিক বোমা হামলা করে। বিগত বছরগুলোতে ইসরাইল সারা বিশ্বের... ...বাকিটুকু পড়ুন

Haze দমনে সিঙ্গাপুরের কুটনৈতিক দক্ষতা

লিখেছেন ঢাবিয়ান, ০৩ রা নভেম্বর, ২০২৬ বিকাল ৪:৩১

সিঙ্গাপুর সাম্প্রতিককালে স্মরনকালের ভয়াবহ Haze (ধোঁয়াশা ও বায়ুদূষণ) এর কবলে পড়ে। সেপ্টেম্বরের শুরুতেই সারা শহর ঘন ধোয়ার আবরনে ঢেকে যায়। জানালা দিয়ে বাইরে তাকালে মনে... ...বাকিটুকু পড়ুন

×