ছোট বেলা থেকে একটা প্রবাদ শুনে আসছি “ শিক্ষা জাতির মেরুদন্ড”।আমাদের দেশের রাজনিতিবিদ থেকে শুরু করে আমরা সবাই সমাজ গঠনে শিক্ষার অপরিসীম গুরুত্বের কথা বলি। এটা নিঃসন্দেহে বলা যায়, শিক্ষা ছাড়া কোন জাতিই উন্নতি করতে পারে না। প্রবাদ আছেঃ যে জাতি যত শিক্ষিত সে জাতি ততো উন্নত। কিন্তু সেই শিক্ষা অবশ্যই হতে হবে সুশিক্ষা। আমরা কি পারছি সেই সুশিক্ষিত সমাজ গড়তে?
বিশ্বায়নের এই দিনে আমার তো মনে হয় আমরা পিছনের দিকে যাচ্ছি। উদাহরনসরূপ একটা অভিজ্ঞতার কথা বলি, আমার জন্ম এক অজপাড়া গাঁয়ের মধ্য-বিত্ত পরিবারে। এই অর্থে অজপাড়া, রাস্তা ঘাট কল কারখানা তো দুরের কথা, যেখানকার মানুষ আজও বিদ্যুতের সংস্পর্শ পায়নি। গ্রামে বেড়ে উঠা আমি ছিলাম এক দুরুন্ত বালক। আমার বাবা একজন প্রাথমিক বিদ্যালয়-এর শিক্ষক। ভাগ্যক্রমে শিক্ষক পরিবারে জন্ম হওয়ার সুবাদে ছোটবেলা থেকেই পড়াশুনার প্রতি আমার ছিল একটা বিশেষ ঝোঁক । সেই অবহেলিত গ্রামের এক প্রাথমিক বিদ্যালয়ে আমার শিক্ষা জীবনের শুরু। প্রাথমিক বিদ্যালয় এর গণ্ডি পেরিয়ে একসময় আমার বাসা থেকে ২ কিলোমিটার দূরে এক উচ্চমাধ্যমিক বিদ্যালয়ে ভর্তি হই। তখন দেখেছি, আমার যারা শিক্ষক ছিলেন তারা কতটা ভাল ও দক্ষ । একাধারে তারা যেমন ছিলেন সৎ ও আদর্শিক তেমনি ছিলেন শিক্ষাদানের ক্ষেত্রে আন্তরিক। সেইসময়, তারা আমাদের যেটা শিক্ষা দিয়েছেন, তার বদৌলতে আজ আমরা কেউ ডাক্তার, কেউ ইঞ্জিনিয়ার, আর কেউ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এর শিক্ষক। আমি সেই সব গুণী ও সন্মানিত শিক্ষকদের প্রতি কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করি। কিন্তু আজ এর বিপরীত চিত্র খুঁজে পাই।আজ আর সেই স্কুল থেকে আর প্রত্যাশিত ফলাফল পাওয়া যায় না। গড়তে পারে না একজন ভাল মানুষও। কিন্তু বাস্তবিক প্রেক্ষাপটে তো আরও ভাল হওয়ার কথা ছিল কারন শিক্ষাদানের প্রযুক্তি এখন সবার হাতে হাতে। আজ যারা শিক্ষকতা করছেন, তাদের মধ্যে সেই আদর্শিকতা, দক্ষতা এবং যোগ্যতার অভাব পরিলক্ষিত হয়। কারন, আজ যারা শিক্ষক হয়েছেন বা হচ্ছেন তাদের অধিকাংশই হয় মামা-খালু নাহয় টাকার জোরে, যোগ্যতার বিচারে নয়। কিন্তু এই দোষ কি তাদের? এই দোষ সিস্টেম এর। এই উদাহরন শুধু একটি, দুটি স্কুল-কলেজে না, সারা বাংলাদেশের অধিকাংশ শিক্ষা-প্রতিষ্ঠানের। যেখানে একজন মানুষের শিক্ষার ভিত্তি রচিত হয়। এই ধরনের শিক্ষাব্যবস্থা দিয়ে আমরা কিভাবে একটা ভাল সুশিক্ষিত জাতি আশা করতে পারি?
এর ভয়াবহতা আমারা লক্ষ করছি বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার ক্ষেত্রেও । বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক হওয়ার সুবাদে আমার জানার সুযোগ হয়েছে এই নতুন প্রজন্মকে নিয়ে। যাদেরকে নিয়ে আমরা স্বপ্ন দেখি তারা একদিন এই দেশটাকে নেতৃত্ব দেবে, সোনার বাংলা গড়বে। বিশ্বের দরবারে বাংলাদেশকে উপস্থাপন করবে, দেশের সম্মান রক্ষা করবে। বিশ্ববিদ্যালয়ের আধুনিক ও উচ্চশিক্ষায় শিক্ষিত হয়ে একজন ভাল, দক্ষ দেশপ্রেমিক মানুষ হিসাবে নিজেকে গড়ে তুলবে এটাই তো একজন ছাত্র-ছাত্রীর লক্ষ হওয়া উচিৎ। কিন্তু শ্রেণীকক্ষে অনেক ক্ষেত্রে এমনটি পরিলক্ষিত হয়না। যেকোনো কারনেই হোক, অনেকেরই পড়ালেখার প্রতি আগ্রহ থাকে না, আচার-আচরন ও নৈতিক মূল্যবোধের অভাব পরিলক্ষিত হয় যেটা একজন মানুষ পরিবার কিংবা স্কুল-কলেজ থেকে শিক্ষা পাবার কথা। কিন্তু কেন এমন হয়? কারন, একজন ছাত্র-ছাত্রী বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়ে যখন বুঝতে পারে শিক্ষাগত যোগ্যতা ও মেধাকে সর্বস্তরে চাকুরীর জন্য সঠিকভাবে মূল্যায়ন করা হয় না, মামা-খালু নাহয় টাকা দিয়ে চাকুরি পাওয়া যায়, তখন সে পড়ালেখায় মনোনিবেশ না করে কোন রকমে, কম পরিশ্রমে একটা ডিগ্রি অর্জন করে অসৎ পথ অবলম্বন করে চাকুরী পাওয়ার পথ খোজে। তখন খুজতে থাকে কিভাবে অসৎ চক্রেরে মাধ্যমে পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁস করা যায়, রাজনৈতিক পরিচয়ে, কিংবা টাকার মাধমে চাকুরী পাওয়া যায়। এমন পরিস্থিতিতে যারা সৎ, পড়াশুনায় আগ্রহী তারাও পড়ালেখার উৎসাহ হারিয়ে ফেলে। এভাবেই দেশের সর্বস্তরে আজ অযোগ্য, অদক্ষ মানুষের সমাহার। এর কুফল আমরা প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে অনেক ক্ষেত্রেই লক্ষ্য করি।এটি দুর্নীতির অন্যতম একটি কারণ বলে প্রতীয়মান। আজকের বাংলাদেশের এমন পরিস্থিতিতে আমরা কিভাবে একটা ভাল দেশ গড়তে পারি? একটা ভাল জাতি গড়তে হলে এর পিছনের সমস্ত কারণ খুঁজে বের করে কার্যকারী পদক্ষেপ গ্রহন করতে হবে, অন্যথায় আমরা কোন দিনও একটা সত্যিকার সু-শিক্ষিত জাতি গড়ে তুলতে পারব না এবং উন্নত বাংলাদেশ গড়ার দ্বারপ্রান্তে পৌঁছাতে পারব না। আমাদের সেই স্বপ্ন স্বপ্নই রয়ে যাবে......।।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


