somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

চিরনূতনেরে দিল ডাক পঁচিশে বৈশাখ

০৮ ই মে, ২০১৪ বিকাল ৪:১৮
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

‘হে নূতন/দেখা দিক আর-বার জন্মের প্রথম শুভক্ষণ/…/চিরনূতনেরে দিল ডাক/পঁচিশে বৈশাখ’- বাঙালি জাতির ইতিহাস ও সংস্কৃতির অন্যতম প্রধান পুরুষ কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের জম্মদিন আজ। ১২৬৮ বঙ্গাব্দের ২৫ বৈশাখ (১৮৬১ সালের ৭ মে) কলকাতার জোড়াসাঁকোর বিখ্যাত ঠাকুর পরিবারে জম্মগ্রহণ করেন তিনি। বাঙালির মনন, সংস্কৃতি আর চেতনার অবিচ্ছেদ্য অংশীদার বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ১৫৩ তম জন্মজয়ন্তী সরকারি-বেসরকারি পর্যায়ে নানা আয়োজনে বরণ করে নেওয়া হবে।
তিনি একাধারে কবি, ঔপন্যাসিক, সংগীতস্রষ্টা, নাট্যকার, চিত্রকর, ছোটগল্পকার, প্রাবন্ধিক, অভিনেতা, কণ্ঠশিল্পী ও দার্শনিক। বাংলা ভাষার সর্বশ্রেষ্ঠ এ সাহিত্যিককে ডাকা হয় গুরুদেব, কবিগুরু ও বিশ্বকবিসহ নানা অভিধায়। তার লেখালেখির মধ্যে রয়েছে ৫২টি কাব্যগ্রন্থ, ৩৮টি নাটক, ১৩টি উপন্যাস এবং ৩৬টি প্রবন্ধ ও অন্যান্য গদ্যসংকলন। তার লেখা ছোটগল্পের সংখ্যা ৯৫টি ও গান ১৯১৫টি। এঁকেছিলেন প্রায় দুই হাজার ছবি। এখনও নিয়মিত বিভিন্ন প্রকাশনা সংস্থা প্রকাশ করছে তার রচনাসমগ্র। এ থেকে বুঝা যায় তিনি কতটা জনপ্রিয় ও বাঙালির মননের কাছাকাছি।
১৯১৩ সালের ১০ নভেম্বর সুইডিশ একাডেমি তাকে সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার প্রদান করে। যার মাধ্যমে বাংলা ভাষা ও সাহিত্য বিশ্ব দরবারে পরিচিতি ও গুরুত্ব লাভ করে। বর্তমান সময় পর্যন্ত বাংলায় সাহিত্যচর্চার যে প্রধান ধারা, সেখানে তাকেই অনুসরণ করা হয়। সাহিত্যের বিভিন্ন শাখায় লেখালেখি ছাড়াও তার গুরুত্বপূর্ণ অবদান রয়েছে ভাষার ব্যবহারে।

সাহিত্যের ভাষা হিসেবে চলিত ভাষার ব্যবহারকে তিনি প্রতিষ্ঠিত করেন। সে সূত্রে বলা যায়, ভাষার ক্ষেত্রে বর্তমানে যে ধরনের পরীক্ষা-নিরীক্ষা চোখে পড়ে তার প্রধান অনুপ্রেরণা রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। তিনি বাংলা গদ্যের সনাতনী ও আধুনিক ধারার মধ্যে যুগসন্ধি। সে দিক থেকে তার গুরুত্ব উত্তরোত্তর বাড়ছে।

বাঙালির আবেগ অনুভূতিতে জড়িয়ে আছে রবীন্দ্রসংগীত। প্রেম-বিরহ, ঋতু উদযাপন, পূজা-পার্বন কোথায় নেই তার গান। তার গান এ দেশের মাটি থেকে উৎসরিত। যেখানে উপনিষদ্, হিন্দু পুরাণ, সংস্কৃত কাব্যনাটক, বৈষ্ণব ও বাউল দর্শন একসূত্রে মিলেছে। সুরের দিক থেকে ভারতীয় শাস্ত্রীয় সংগীত, বাংলা লোকসংগীত, কীর্তন ও রামপ্রসাদী এবং পাশ্চাত্য ধ্রুপদি ও লোকসংগীতের অসামান্য সম্বন্বয় ঘটেছে রবীন্দ্রসংগীতে। তার কবিতা ও গানে রয়েছে মুগ্ধকর বিমূর্ততা। তা যেন দেশ-কালের সীমানা পেরিয়ে ধ্রুপদী উপলব্ধি দেয়। সত্য, সুন্দর ও কল্যাণের অসামান্য প্রতিভূ তার কবিতা ও গান। তার লেখা ‘আমার সোনার বাংলা’ গানটি গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের জাতীয় সংগীত। এ গানটি সুরারোপিত হয়েছে কুষ্টিয়ার গননহরকরার একটি গানের সুরে। সে সূত্রে বলা যায়, আধুনিকতা ও লোকায়ত সুরকে আমরা চমৎকারভাবে এ গানে পায়। এ ছাড়া সবচেয়ে বেশিসংখ্যক মানুষ গানটি গেয়ে ২০১৪ সালে গিনেস বুক অব ওয়ার্ল্ড রেকর্ড গড়েছে।

বাঙালির শোষণবিরোধী ও অসম্প্রদায়িক রাজনীতিতে রয়েছে তার অবদান। তিনি ছিলেন সাম্রাজ্যবাদবিরোধী ও ভারতীয় জাতীয়তাবাদীদের একনিষ্ট সমর্থক। ১৮৯০ সালে প্রকাশিত মানসী কাব্যগ্রন্থে তার প্রথম জীবনের রাজনৈতিক ও সামাজিক চিন্তাভাবনার পরিচয় পাওয়া যায়। ১৯১৯ সালে জালিয়ানওয়ালাবাগ হত্যাকাণ্ডের প্রতিবাদে নাইটহুড বর্জন করেন। বাংলাকে বিভক্তকারী ১৯০৫ সালের বঙ্গভঙ্গ আইনের প্রধান বিরোধীদের মধ্যে তিনি অন্যতম। এর জন্য কবিতা-গান নিয়ে রাস্তায় নেমেছিলেন। প্রতিবাদে যুক্ত করেন স্বদেশী রীতি। বঙ্গভঙ্গের আনুষ্ঠানিক ফরমান জারির দিনটিকে 'অরন্ধন দিবস' হিসেবে ঘোষণা করেন।

সম্প্রদায়গত বিভাজন এড়াতে 'রাখীবন্ধন' উৎসবের নবায়ন ঘটান। ভ্রাতৃদ্বিতীয়ার ভাইফোঁটা দেওয়ার রীতিকেও সামাজিক রূপ দিতে সচেষ্ট হয়েছিলেন।

বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামে তিনি এসেছেন অনুপ্রেরণা হয়ে। এর আগে ষাটের দশকে পাকিস্তান সরকার বেতার-টেলিভিশনে তার উপর নিষেধাজ্ঞা জারি করে। কিন্তু বাঙালিরা তা মেনে নেয় নি। প্রতিবাদের ঝড় উঠে দিকে দিকে। ১৯৬১ সালে তার জম্ম শতবার্ষিকী পালনের সূত্রে আবির্ভাব ঘটে ছায়ানটের মতো প্রতিষ্ঠানের। ১৯৬৪ সালে প্রতিষ্ঠানটি রমনা বটমূলে প্রথমবারের মতো আয়োজন করে বাংলা নববর্ষ পালন। এখন তো রমনা বটমূলে ছাযানটের বর্ষবরণ ও ‘এসো হে বৈশাখ’ গানটি ছাড়া বাংলা নববর্ষকে কল্পনায় করা যায় না। এভাবে তিনি আমাদের মনন ও চেতনায় ছড়িয়ে আছেন দিবস-রজনী।

তার রাজনৈতিক চিন্তার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো শিক্ষা দর্শন। তিনি প্রাচীন ভারতের গুরুমুখী শিক্ষায় প্রধান দিকটি সামনে তুলে নিয়ে আসেন। তাই শান্তিনিকেতন আশ্রমের মাধ্যমে দেশ ও ভূগোলের ছড়িয়ে ভারত ও বিশ্বকে একসূত্রে বাধতে চেয়েছেন। বিশ্বভারতীর মাধ্যমে সনাতন ভারতীয় শিক্ষাব্যবস্থার ব্রহ্মচর্য ও গুরুপ্রথার পুনর্প্রবর্তন করেন। বাঙালির শিল্প-সংস্কৃতি ও দর্শনচর্চায় এ দুই প্রতিষ্ঠান এখনও অনুপ্রেরণা।

এভাবে প্রতিদিন তিনি আমাদের কল্পনা ও কর্মে নতুন নতুন ভাবে হাজির হন। তার কর্ম আমাদের উৎসাহিত করে নতুন পথের যাত্রায়। সে অভিযাত্রায় তার প্রতি শ্রদ্ধা।
০টি মন্তব্য ০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

৭ই নভেম্বর বিপ্লব ও সংহতি দিবস....

লিখেছেন জুল ভার্ন, ০৭ ই নভেম্বর, ২০২৬ সকাল ১০:২০


৭ই নভেম্বর বিপ্লব ও সংহতি দিবস....

দেখা হবে যুদ্ধ ফুরোলে সন্ধের মাহফিলে;
দেখা হবে ঠিক চেনা রাস্তার অচেনা-অন্ত্যমিলে।
ছড়াব আবার শস্যের দানা দেশ থেকে মহাদেশে
মানুষই জেতে, খুঁজে নেয় আলো অন্ধকারের শেষে...

তোমার গল্পে... ...বাকিটুকু পড়ুন

বস্ত্রশিল্পের জন্য আমি সরকারের যথাযথ স্থানে থাকলে কি করতাম !!!

লিখেছেন অপলক , ০৭ ই নভেম্বর, ২০২৬ দুপুর ১২:১৬



গত ১০ দিন হল দেশের বস্ত্র শিল্পের উপর আঘাত খুব চিন্তার বিষয়। অনেক আগে বিচ্ছিন্নভাবে বস্ত্রশিল্প নিয়ে কথা বলেছিলাম। আজ সব মিলিয়ে কিছু চিন্তা করলাম। তার কিছু এখানে নোট... ...বাকিটুকু পড়ুন

বাংলাদেশের চরম দারিদ্র্য নির্মূলে পাঁচ বছর মেয়াদি একটি সমন্বিত নগর পরিকল্পনা

লিখেছেন সত্যপথিক শাইয়্যান, ০৭ ই নভেম্বর, ২০২৬ বিকাল ৩:১৭


প্রস্তাবিত প্রকল্প: স্বাবলম্বী বাংলাদেশ - দারিদ্র্যমুক্তির নতুন নগর

আমি যদি সরকারের দারিদ্র্য নির্মূল বিভাগের প্রধান হতাম, তাহলে আমার প্রথম লক্ষ্য হতো বাংলাদেশের চরম দারিদ্র্য সীমার নিচে বাস করা ১ কোটি ৭০... ...বাকিটুকু পড়ুন

Sajna

লিখেছেন আরমান আরজু, ০৭ ই নভেম্বর, ২০২৬ বিকাল ৩:৩১



Sajna
Love is sacred;
Commences from the intense mystery of pure souls.
Has a beginning, but no end;
Here, only peace prevails.
So, love—
Solely for the sincere and the disenchanted,
Not for the pharisaic.
...বাকিটুকু পড়ুন

বিপ্লব সংহতি দিবস সফল ও সার্থক হোক.....

লিখেছেন কলিমুদ্দি দফাদার, ০৭ ই নভেম্বর, ২০২৬ বিকাল ৫:১১



আজকে নাকি বিপ্লব সংহতি দিবস। দল ক্ষমতায় থাকলে অনেক রকমের দিবস পালিত হয়। আওয়ামী লীগের সময় শেখ জামাল-কামালের বিবাহ দিবস, শিশু শহীদ শেখ রাসেলের সুন্নাতে খৎতা দিবস আরো কতো কি?... ...বাকিটুকু পড়ুন

×