somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

ইতিহাসের বাইরের নায়ক , তোমাদের প্রতিও আমাদের বিনম্র শ্রদ্ধা।

২১ শে ফেব্রুয়ারি, ২০১৬ সকাল ৮:৪০
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :



পৈতৃক সূত্রে পাওয়া কিছু জমি বিক্রি করে ঢাকায় আসেন দেদার মিয়া ,পঞ্চাশের দিকে পুরান ঢাকায় । কিছু দিন উদ্বাস্তু হয়ে ঘুরলেও স্বল্প শিক্ষিত হওয়ায় বাংলাবাজারের একটা নামী ছাপা কারখানায় কাজ জুটে যায়।বূড়িগঙ্গার শীতল হাওয়া পুরান ঢাকার সরু গলি, রিক্সার ক্রিং ক্রিং বাতাসে মিষ্টি গন্ধ, চারদিকে বাহারী খাবার দোকানের আখড়া, ভালোই কাটছে দিনকাল।

আবাস গড়েন নারিন্দার ভূতের গলির মোড়ের টিনশেডের একটা রুমে। থাকার খরচ মাইনের সাথে দেয়া হয় , ফলে কিছু টাকা পকেটেই থেকে যায় ।

এখানে থাকার সুবাদে বহু ধরনের লোকের সাথে পরিচয় , তেমন একজন রতন খাঁ ।ভূতের গলি মোড়ের বড় টং দোকানটাই তার, পরিবার বলতে একটা মেয়ে।ইনকাম ভালো, যা আয় হয় দুজনের উপচে পড়ে।

কাকা, ওজ্ঞা পান দেওন যায় নি।মিষ্টি জর্দা দিয়া......
-কে, দেদার মিয়া নি? আরে বহ বহ ।
আজকে এতো দেরি করলা, শরীলডা খারাপ নি?
-না ভালাই, তয় মনডা বেশি ভালা নাহ।
শোন মিয়া , কই কি একখান বিয়া কর বিয়া কর ।
-কি যে কন, আমার কাছে কোন বেডায় মাইয়া দিব।
ক্যান, তুমি মিয়া কোন দিক দিয়া কম? এই লও পা্ন......
-দ্যান, অহন যাই। ম্যালা খিদা পাইছে ।
আজ রাইত ১০ টায় আজগরের হোটেলে থাকতে হইবো, ম্যালা লোক আইবো । জরুরি মিটিং আছে নাকি। আর কাগজের কি করলা?
হ, আনছি । লইয়া যমুনে।



ওয়ারীর লারমিনী স্ট্রীটের সর্বপ্রথম হোটেল ছিলো আজগর হোটেল। হঠাত চা সিঙ্গারা পরোটা সর্বস্ব হোটেলটিতে আতপ চালের ভাত, রুই মাছ ,মুরগীর গিলা কলিজাও পাওয়া যেতে শুরু করে। বেচাকিনি ভালো, মেজাজ ফুরফুরা.....
আজগর মিয়া হোটেলের মালিক সাথে ৫ জন কর্মচারী।

৫ টা পরোটা ডাল আর একটা চা ।
-৬ টাহা বিল আইছে।
এই ধরেন।
-আবার আইয়েন স্যার।

আজগরের কাজ শুধু সব কিছু দেখবাল করা আর কাস্টমারের কাছ থেকে টাকা নিয়ে ক্যাশে রাখা।

-আরে মহুরী সাব , বহুদিন পর আইলেন ।
আরে আর বইলোনা , দেশে যে আকাল পড়ছে । অফিস বাসা অফিস বাসা এই আছি।
-তা ঠিক কইছেন , তয় আপনাগো কিয়ের ডর,সরহারী লোক।
হ , সরকারের চামচামী করি তাও তো ভরসা নাই কোনো।জরুরী সংবাদ আছে , রাতে থাইকো। এখন কি আছে দেও খাই। ।
-এই লিটন দেখ সাবের কি লাগে।

তখন দেশে বইছিলো অন্যরকম হাওয়া। পাকিস্তানের শাষক শ্রেনীর একের পর এক পূর্ব পাকিস্তান বিরোধী কার্যকলাপের বিরুদ্ধে প্রতিবাদী হাওয়া।রাষ্ট্র ভাষার স্বিকৃতির হাওয়া, চায়ের চুমুকে কিংবা পরোটার ফাক ফোকরেও এই হাওয়ার রেশ ছিলো সতেজ।
দিনে কর্মব্যাস্ততার পর রাতে আজগরের হোটেল হয়ে উঠত ছাত্রদের পরিকল্পনার অন্যতম কেন্দ্র, রং বেরঙয়ের কাগজের বুক চিড়ে আচড় কাটতো রাষ্ট্র ভাষা বাংলা চাই বাংলা চাই।

ভাষা আন্দোলনের মতো আবেগিক বিষয়ের পুনরায় জোরালো হবার পেছনে ১৯৫২ সালের ২৭ জানুয়ারি খাজা নাজিমুদ্দিনের ভাষণ প্রধান নিয়ামক হিসেবে কাজ করে। তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী পদে আসীন খাজা নাজিমুদ্দিন ২৫ জানুয়ারি ঢাকায় আসেন এবং ২৭ জানুয়ারি পল্টন ময়দানের এক জনসভায় দীর্ঘ ভাষণ দেন। তিনি মূলত জিন্নাহ্'র কথারই পুনরুক্তি করে বলেন, পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা হবে উর্দু। রেডিওতে সরাসরি সম্প্রচারিত তাঁর ভাষণে তিনি আরো উল্লেখ করেন যে কোনো জাতি দু'টি রাষ্ট্রভাষা নিয়ে সমৃদ্ধির পথে এগিয়ে যেতে পারেনি। নাজিমুদ্দিনের বক্তৃতার প্রতিবাদে রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ ২৯ জানুয়ারি প্রতিবাদ সভা এবং ৩০ জানুয়ারি ঢাকায় ছাত্র ধর্মঘট পালন করে। সেদিন ছাত্রসহ নেতৃবৃন্দ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আমতলায় সমবেত হয়ে ৪ ফেব্রুয়ারি ধর্মঘট ও প্রতিবাদ সভা এবং ২১ ফেব্রুয়ারি প্রদেশব্যাপী হরতাল পালনের সিদ্ধান্ত নেয়।

৪ ফেব্রুয়ারী নওয়াবপুর রোডেও এক বিশাল মিছিল অনুষ্ঠিত হয়। এই দিকে ২১ শে ফেব্রুয়ারীকে কেন্দ্র করে আজগর হোটেলেও সতেজ হয়ে ওঠে, শুরু হয় বিশাল প্রস্তুতি । প্রানের ভাষার মান রক্ষার প্রস্তুতি, ব্যানার ফেস্টুন আর প্রতিবাদীদের গুনগুন কন্ঠ রাত বাড়ার সাথে সাথে দ্বিগুন হতে থাকে।গরম চা আর সিঙ্গাড়ার ভেতরেও যেনো তীব্র ক্ষোব........

আজও সেই একুশে ফেব্রুয়ারি, বাংলাদেশের জনগণের গৌরবোজ্জ্বল একটি দিন। এটি শহীদ দিবস ও আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস । বাঙালি জনগণের ভাষা আন্দোলনের মর্মন্তুদ ও গৌরবোজ্জ্বল স্মৃতিবিজড়িত একটি দিন হিসেবে চিহ্নিত হয়ে আছে।
আমরা ভাষা শহীদদের বিদেহী আত্নার মাগফেরাত কামনা করি । পাশাপাশি তাদের প্রতিও যারা প্রাণের ভাষার জন্য পরোক্ষভাবে রতন খাঁ , দেদার ,মুহুরী অথবা আজগরের মতো যেকোন উপায়ে অবদান রেখে গেছেন। ইতিহাসের বাইরের নায়ক , তোমাদের প্রতিও আমাদের বিনম্র শ্রদ্ধা.........
সর্বশেষ এডিট : ২১ শে ফেব্রুয়ারি, ২০১৬ সকাল ৮:৪৪
২টি মন্তব্য ০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

আ-তে আনন্দবাজার, আ-তে আওয়ামী লীগ

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ০৪ ঠা সেপ্টেম্বর, ২০২৬ রাত ১:১৫


ইন্টারনেটে খবর পড়তে পড়তে হঠাৎ একটা শিরোনাম সামনে এলো। পড়েই কয়েক সেকেন্ডের জন্য মনে হলো, বাংলাদেশের বিদ্যুৎ খাতে বুঝি বিশাল কোনো ঘটনা ঘটে গেছে। শিরোনাম, “আধ পয়সা বেশি... ...বাকিটুকু পড়ুন

২০১৮ সালের পর ঢাকাতেই ৪টা এক্সপ্রেসওয়ে

লিখেছেন মাথা পাগলা, ০৪ ঠা সেপ্টেম্বর, ২০২৬ রাত ৩:৫৩



একটা দেশের উন্নয়ন কতটা এগিয়েছে, সেটা বোঝার অনেকগুলো উপায় আছে। তবে সবচেয়ে সহজ উপায় হলো সেই দেশের রাস্তা, সেতু আর যোগাযোগব্যবস্থা। কারণ এগুলোর পরিবর্তন সরাসরি মানুষের দৈনন্দিন জীবনে চোখে... ...বাকিটুকু পড়ুন

আজকের ডায়েরী- ১৯৭

লিখেছেন রাজীব নুর, ০৪ ঠা সেপ্টেম্বর, ২০২৬ দুপুর ১২:৫৪



শরতের সকাল! সকাল ৮ টা।
ভাদ্র মাস। ইংরেজি সেপ্টেম্বর মাস। ২০২৬ সাল। ঘটনাটা কি হয়েছে, আমি বলি। মোটামোটি ভয়াবহ ঘটনা বলা যেতে পারে! যে কোনো সময় রোদ উঠবে।... ...বাকিটুকু পড়ুন

বাংলাদেশে বর্তমান গ্যাস-বিদ্যুৎ সংকট: দায় কার?

লিখেছেন ডঃ এম এ আলী, ০৪ ঠা সেপ্টেম্বর, ২০২৬ বিকাল ৩:০৭


সংক্ষিপ্ত রায় সবচেয়ে বড় দায় বাংলাদেশের দীর্ঘদিনের জ্বালানি ও বিদ্যুৎ নীতির। এর মধ্যে ২০০৯–২০২৪ সময়কালের সরকারের সিদ্ধান্তগুলোর দায় তুলনামূলকভাবে বেশি, কারণ ওই সময়ে বিদ্যুৎ উৎপাদন ক্ষমতা দ্রুত বাড়ানো হলেও... ...বাকিটুকু পড়ুন

যাপিত জীবন.....

লিখেছেন কলিমুদ্দি দফাদার, ০৪ ঠা সেপ্টেম্বর, ২০২৬ বিকাল ৫:২৭


১।মালয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়া, ব্রুনাই দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার কিছু দেশে জুম্মার নামাজ পড়ার সুযোগ হয়েছে। ১২.৫০ এ আজান তারপর ১.১৫ দিকে জুম্মার নামাজের সকল আনুষ্ঠানিকতা শেষ। আজানের কিছুক্ষণ পর খুতবা শুরু তারপর... ...বাকিটুকু পড়ুন

×