কথা বলাটা মূলত একটা আর্ট। এ আর্ট রপ্ত করতে না জানলে সংসার সমুদ্রে দিশা হারাতে হয়। বস্তুত কথা বলাটা আর্ট হবার কারণে এর শক্তিও অপরিমেয়, এর বিস্তৃতি ঐ আকাশ পর্যন্ত। কথার ফুলঝুরি দিয়ে উদ্দেশ্যের খোলস মুক্ত করুন। দেখবেন বিস্মরণশীল মানুষ আপনার কথা সুগারকোটেড কুইনাইনের মতো গ্রোগ্রাসে গিলছে। সরকারি দল বলুন আর বিরোধী দলই বলুন, কথার বান নিভর্ুলক্ষ্যবস্তুতে বিদ্ধ করতে পারলে কেল্লাফতে, কিস্তিমাত। সুড়সুড় করে যান্ত্রিক ওয়াদাগুলো বৈশল্যীকরণ পথ্যের মতো অনায়াসে গেলানো যাবে, অসুবিধার বালাই থাকবে না। ঐ যে বললাম, কথার শক্তি আছে। এটা মানুষকে প্রভাবিত করে। ইতিবাচক অথবা নেতিবাচক প্রভাব সৃষ্টি করতে পারে। কথার শক্তি কতটা মারাত্মক ও বাস্তব তা প্রমাণ করতে কোন ভাষা ইনস্টিটিউট অথবা নামের শেষে লম্বা লেজওয়ালা (বিশেষণ!) ধ্বনি বিজ্ঞানীর নিকট যাওয়ার দরকার নেই। পাশে বসা ভদ্রজন অথবা চলমান পথচারীকে কান লাল করা কোন বিশেষণে সম্বোধন করুন। পৈত্রিক ধন মুখের জিওগ্রাফিটা অত রাখতে মিলখা সিং অথবা মরিস গ্রীনের গতি নিয়ে মুহূর্তে পগারপাড় হতে হবে। পৃথিবীর ভূগোলের একটা স্বীকৃত মাপকাঠি থাকলেও কথার প্রকারভেদের কোন মাপকাঠি নেই। ইষ্টকথা, তত্ত্বকথা, দশকথা, মর্মকথা, মোটকথা, সুকথা, অজানা কথা, অনুক্ত কথা, অনুচিত কথা, অতি গোপন কথা, অদ্ভুত কথা, অপ্রিয় কথা, অযৌক্তিক কথা, একটানা কথা, আন্দাজি কথা, কথার মতো কথা, খোনা কথা, গা-জোরি কথা, গায়েবি কথা, ঘুমজুড়ানো কথা, চাট্টিখানি কথা, চ্যাটাং-চ্যাটাং কথা, ছোটমুখে বড় কথা, টানা টানা কথা, ঠেস মারা কথা, ড্যামনা কথা, তেরছা কথা, দশ কথার এক কথা, না-হক কথা, ন্যাকা-ন্যাকা কথা, পষ্টাপষ্টি কথা, প্রাইভেট কথা, ফুটানি মারা কথা, বাতেনি কথা, বে-আন্দাজি কথা, ভাবের কথা, মস্তবড় কথা, মুখ-ফসকা কথা, মোদ্দা কথা, যার-তার কথা, রঙ্গ-তামাশার কথা, লম্বা-চওড়া কথা, শানানো কথা, সাফসাফা কথা, হক না হক কথাসহ ইত্যাকার হাজার রকমের কথা থাকলেও তার ফিরিস্তি দেয়া সম্ভব নয়। আবার উচিত কথায় দেবতা তুষ্ট হলেও মানুষ তুষ্ট হয় না। কথার গোলক ধাঁধায় পড়ে আবার সেই মানুষই যখন বলে, 'আকথাও কথা হয়, যদি দশে কয়' তখন কোথায় যাবেন বলুন? বান্দরবান ছেড়ে সুন্দরবনে যাবেন? না হয় গেলেন। কিন্তু এর পরতো সীমান্ত। 'পুশইন' হলেই বাংলা বাতচিত শুনে রাইফেলের বাটন দিয়ে পঁ্যাদিয়ে সোজা 'পুশব্যাক' করে দেবে।
আসলে কথায় কথায় আমাদের দিন কাটে। বিকাল গড়ায়, সন্ধে হয়, রাত নামে। আবার সকালে কর্ণফুলির পুবপাশের পাহাড়গুলোর ফাঁক দিয়ে রাঙ্গামুখো সূর্যটা ওঠে। আমরা কবিতার কথা, বাজেটের কথা, বন্যার কথা, মুদ্রাস্ফীতির কথা, বাংলাভাইয়ের কথা,পত্রিকার ফার্স্ট লীড, সেকেন্ড লীড আর বটম লীডের কথা বলি। সবচে' বেশি বলি পরচর্চার কথা। আবার যা বলি, তাতে আমাদের বিশ্বাস থাকে না। নড়চড়ন হয়, থার্মোমিটারের পারদের মতো ওঠে আর নামে। অনেকটা বানরের সেই তৈলাক্ত বাঁশে চড়ার মতো। কথা কাটাকাটি, কথা চালাচালি, কম বেশি আমরা সবাই করি। আবার আমরা কথাও দিই। পরণে তা ভুলে যাই, খেয়ে মুখ মুছে ফেলার মতো। ভোজ সভাতে সকলের আগে যাই, আর প্রয়োজনের অতিরিক্ত খেয়ে অবসাদে বত্রিশটা ঢেঁকুর তুলে মন্তব্য করি, 'এই আয়োজনের সবটাই অপচয়, নাগরিক আইনে ওদের জরিমানা হওয়া উচিত।' আসলে বৃদ্ধ সাপ যখন খোলস ছড়াতে পারে না, তখন পৃথিবীর সবাইকে সে উলঙ্গ ভাবে। আমরাও কথার শ্রাদ্ধ করি, টেনে টেনে কথার হাত-পা লম্বা করি। কিন্তু কথার মানুষ মানে কথা দিয়ে কথা রাখতে পারি না। কোথায় যেন পড়েছিলাম, 'আমরা কথা দেই, আবার দেই না, কথা না দিয়েও দিয়ে দিই। আমরা সত্য কথা বলি, আবার মিথ্যা কথাও বলি। এতে প্রমাণিত হয় আমরা মানুষ।' যুক্তির সারবত্তা যাই থাকুক না কেন, আমরা মানুষ। কারণ, কথা বলতে পারি।
রবীন্দ্রনাথ এক নতুন ধরনের কথার নাম বলে গেছেন। এ কথার নাম 'চুপকথা'। তিনি বলেছেন, 'পথ ভুলে যাই দূরপারে সেই চুপকথার।' তবে আমরা কেউ তার 'কাবুলিওয়ালা' গল্পের 'মিনি'র মতো কথা না বলে একদন্ড থাকতে পারি না। অথচ তার চুপকথার রাজ্যে ডুব মারতে পারলে অনেক ফ্যাসাদকে সহজেই মাইনাস করা যায়। কিন্তু চুপ করে থাকা যায় না। স্বরযন্ত্রে প্রতিক্ষণ কথার স্পন্দন অনুরণিত হয়, আকুলি-বিকুলি করে। কথা না বলে আমরা থাকতে পারি না। শান্তি আর উদ্বেগে, উত্তেজনা আর দুঃখে, খেয়ালে-বেখেয়ালে আমরা কথার মালা গাঁথি প্রতিদিন প্রতিরাত। চুপকথার হাকিকত বুঝেও আমরা কথার মাঝে নিজেদের হারাই। 'বোবার শত্রু নেই' প্রবাদটি সকলেরই জানা। কিন্তু এটা মানার ব্যাকরণটি কখনো জয়ী হতে পারছে না। না মানার ব্যাকরণটি শাসনদন্ড হাতে আমাদের নিয়ন্ত্রণ করছে। ব্যক্তি হিসাবে আমরা কাউকে ভালবাসতে পারি অথবা সর্বতোভাবে ঘৃণাও করতে পারি। কিন্তু সামাজিক পরিবেশে আমরা চুপকথার থিউরি মেনে উদাসীন থাকতে পারি না। তাই প্রশ্ন জাগে, কথা মানব জীবনের শুরু, নাকি শেষ?'
মানুষ নিজকে স্বীকার করে বলেই কথা বলার স্বাভাবিক চেতনাকে অস্বীকার করতে পারে না, উড়িয়ে দিতে পারে না। তবে কথা মাত্রই সুফলদায়ী হয় না। যেমন করে আকাশে কালো মেঘ দেখা দিলেই ঝড় শুরু হয় না। ঝড় বা বৃষ্টি শুরু হবার পূর্বশর্ত হিসাবে সে মেঘে পর্যাপ্ত আদর্্রতা বা জলীয় বাষ্প থাকতে হবে। বাও বুঝে কথা না বললে হিতে বিপরীত হয় । সুতরাং কথামালা যেমন ব্যাকরণহীন নয়, তেমনি সীমান্ত ছাড়াও নয়। সময়, পরিবেশ ও আবেষ্টনের কারণে একই কথাকে শালীন অথবা অশালীন হতে দেখা যায়। তাই কথা শুধু কথাই নয়, এটা কখনো সাহিত্য, কখনো বা একটি প্রাণবন্ত কবিতা _ যা কীটস এর যে কোনো সরেস প্রেমের কবিতাকেও ম্লান করে দিতে পারে। আসলে কথাই মানুষের চেতনা ও অস্তিত্বের অবলম্বন। শুভ চেতনায় উদ্ভাসিত পৃথিবীর সকল ভাষার কথাই আদিম ও আরণ্যক। প্রযুক্তির হলাহল পান করে সময়ের অপরিচিত বাঁকে এসে কথার পোশাক পাল্টে যায় মাত্র। অনুভূতিতে যে কোন শুভ কথা অনন্য এবং নিত্য। আসলে নাগরিক যন্ত্রণায় আমাদের বিবর্ণ বিষন্ন মন যখন ক্লান্তি বোধ করে, যখন একই পরিবেশ ও আবেষ্টনের মাঝে মানবিকতা আর মনুষ্যত্বকে দু পায়ে দলে নররূপী কিছু পশুকে নির্লজ্জ চাটুকারিতা আর তেলের বন্যায় ভাসতে দেখা যায়, তখন সবকিছু পাওয়ার মাঝেও একটা না পাওয়ার বেদনা মনকে পীড়িত করে, জীবনাহত করে, তখন আর চুপ করে থাকা যায় না, বিদ্রোহী মনটা কথা বলে ওঠতে চায় জীবনের প্রয়োজনে। কিন্তু জীবন যুদ্ধে এ জাতীয় বিদ্রোহ আর কথা বলার নতিজা অনুমোদনীয় নয়। তাই চুপি চুপি বলছি, 'বাঘ-ভালুকের রাজ্যে থাকি, মনের কথা মনেই রাখি।'
সর্বশেষ এডিট : ৩১ শে ডিসেম্বর, ১৯৬৯ সন্ধ্যা ৭:০০

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।




