somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

ইহা একটি চুপকথা

০১ লা এপ্রিল, ২০০৬ সকাল ১১:৫০
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

সহজ কথা বলা ও লিখা, কোনোটাই সহজ নয়। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরও এ কথার স্বীকৃতি দিয়ে গেছেন। এ সহজ সরল, অকপট স্বীকৃতির জন্য তার অক্ষমতার (?) নিন্দা আজ পর্যন্ত কেউ করেননি, করাটা সঙ্গতও নয়। বরং তার সহজ-সরল স্বীকৃতি একটা আদর্শিক ডাইমেনশনে, একটা আদর্শিক ব্যাপ্তিতে পরিণত হয়েছে। তারপরও আমরা এ কথামালা নিয়ে প্রতিদিন কোলাহলে মাতি, ঝগড়া ঝাঁটি করি, আবার আপসও করে থাকি। মুগ্ধ হয়ে বত্রিশ দন্ত বিকশিত করে স্তুতি গাই। না-পছন্দ হলে মুর্দাবাদ দিই। অবশ্য ঘড়েল লোকদের কথা আলাদা। ওরা উদ্দেশ্যবাজ, চান্সনারায়ণ। উদ্দেশ্য ছাড়া ওরা বাঁচেও না, মরেও না। কারো বেফাঁস কথায়, না হক কথায় ওরা মুচকি হাসে, বগল দাবায়, কায়দামত সমর্থন জানাতেও ভুল করে না। পরজীবী সমপ্রদায়ের মত ওরা তেল মারে, সুযোগ মত আখের গোছায় সঙ্গোপনে। এরা আপন মনে গুণ গুণ করে গায় : 'তেলা মাথায় তেল দেয় সরকারেও/ তেলহীনেরা পায় না তেল দরকারেও'। এদের সরেস উপমা দেয়া যায় বাদুর আর ক্যাঙ্গারুর সঙ্গে। বাদুরের মত এরা স্বার্থের ডালে ডালে ঝুলে থাকে অথবা ক্যাঙ্গারুর মতো লাফিয়ে লাফিয়ে আদর্শ বা 'গুরু' পরিবর্তন করে। মওকা মত কথার চাল দিয়ে ওরা বাঘ বনে উতরে যায়। আর কর্তার কথার মর্ম যারা বোঝেন না, বুঝতেও চান না অথবা ধার ধারেন না, ওরা প্রতি পদে পদে হোঁচট খায়। বেড়াল সেজে ঘরের কোণে সঙ্গোপনে কল্কে টানে।
কথা বলাটা মূলত একটা আর্ট। এ আর্ট রপ্ত করতে না জানলে সংসার সমুদ্রে দিশা হারাতে হয়। বস্তুত কথা বলাটা আর্ট হবার কারণে এর শক্তিও অপরিমেয়, এর বিস্তৃতি ঐ আকাশ পর্যন্ত। কথার ফুলঝুরি দিয়ে উদ্দেশ্যের খোলস মুক্ত করুন। দেখবেন বিস্মরণশীল মানুষ আপনার কথা সুগারকোটেড কুইনাইনের মতো গ্রোগ্রাসে গিলছে। সরকারি দল বলুন আর বিরোধী দলই বলুন, কথার বান নিভর্ুলক্ষ্যবস্তুতে বিদ্ধ করতে পারলে কেল্লাফতে, কিস্তিমাত। সুড়সুড় করে যান্ত্রিক ওয়াদাগুলো বৈশল্যীকরণ পথ্যের মতো অনায়াসে গেলানো যাবে, অসুবিধার বালাই থাকবে না। ঐ যে বললাম, কথার শক্তি আছে। এটা মানুষকে প্রভাবিত করে। ইতিবাচক অথবা নেতিবাচক প্রভাব সৃষ্টি করতে পারে। কথার শক্তি কতটা মারাত্মক ও বাস্তব তা প্রমাণ করতে কোন ভাষা ইনস্টিটিউট অথবা নামের শেষে লম্বা লেজওয়ালা (বিশেষণ!) ধ্বনি বিজ্ঞানীর নিকট যাওয়ার দরকার নেই। পাশে বসা ভদ্রজন অথবা চলমান পথচারীকে কান লাল করা কোন বিশেষণে সম্বোধন করুন। পৈত্রিক ধন মুখের জিওগ্রাফিটা অত রাখতে মিলখা সিং অথবা মরিস গ্রীনের গতি নিয়ে মুহূর্তে পগারপাড় হতে হবে। পৃথিবীর ভূগোলের একটা স্বীকৃত মাপকাঠি থাকলেও কথার প্রকারভেদের কোন মাপকাঠি নেই। ইষ্টকথা, তত্ত্বকথা, দশকথা, মর্মকথা, মোটকথা, সুকথা, অজানা কথা, অনুক্ত কথা, অনুচিত কথা, অতি গোপন কথা, অদ্ভুত কথা, অপ্রিয় কথা, অযৌক্তিক কথা, একটানা কথা, আন্দাজি কথা, কথার মতো কথা, খোনা কথা, গা-জোরি কথা, গায়েবি কথা, ঘুমজুড়ানো কথা, চাট্টিখানি কথা, চ্যাটাং-চ্যাটাং কথা, ছোটমুখে বড় কথা, টানা টানা কথা, ঠেস মারা কথা, ড্যামনা কথা, তেরছা কথা, দশ কথার এক কথা, না-হক কথা, ন্যাকা-ন্যাকা কথা, পষ্টাপষ্টি কথা, প্রাইভেট কথা, ফুটানি মারা কথা, বাতেনি কথা, বে-আন্দাজি কথা, ভাবের কথা, মস্তবড় কথা, মুখ-ফসকা কথা, মোদ্দা কথা, যার-তার কথা, রঙ্গ-তামাশার কথা, লম্বা-চওড়া কথা, শানানো কথা, সাফসাফা কথা, হক না হক কথাসহ ইত্যাকার হাজার রকমের কথা থাকলেও তার ফিরিস্তি দেয়া সম্ভব নয়। আবার উচিত কথায় দেবতা তুষ্ট হলেও মানুষ তুষ্ট হয় না। কথার গোলক ধাঁধায় পড়ে আবার সেই মানুষই যখন বলে, 'আকথাও কথা হয়, যদি দশে কয়' তখন কোথায় যাবেন বলুন? বান্দরবান ছেড়ে সুন্দরবনে যাবেন? না হয় গেলেন। কিন্তু এর পরতো সীমান্ত। 'পুশইন' হলেই বাংলা বাতচিত শুনে রাইফেলের বাটন দিয়ে পঁ্যাদিয়ে সোজা 'পুশব্যাক' করে দেবে।
আসলে কথায় কথায় আমাদের দিন কাটে। বিকাল গড়ায়, সন্ধে হয়, রাত নামে। আবার সকালে কর্ণফুলির পুবপাশের পাহাড়গুলোর ফাঁক দিয়ে রাঙ্গামুখো সূর্যটা ওঠে। আমরা কবিতার কথা, বাজেটের কথা, বন্যার কথা, মুদ্রাস্ফীতির কথা, বাংলাভাইয়ের কথা,পত্রিকার ফার্স্ট লীড, সেকেন্ড লীড আর বটম লীডের কথা বলি। সবচে' বেশি বলি পরচর্চার কথা। আবার যা বলি, তাতে আমাদের বিশ্বাস থাকে না। নড়চড়ন হয়, থার্মোমিটারের পারদের মতো ওঠে আর নামে। অনেকটা বানরের সেই তৈলাক্ত বাঁশে চড়ার মতো। কথা কাটাকাটি, কথা চালাচালি, কম বেশি আমরা সবাই করি। আবার আমরা কথাও দিই। পরণে তা ভুলে যাই, খেয়ে মুখ মুছে ফেলার মতো। ভোজ সভাতে সকলের আগে যাই, আর প্রয়োজনের অতিরিক্ত খেয়ে অবসাদে বত্রিশটা ঢেঁকুর তুলে মন্তব্য করি, 'এই আয়োজনের সবটাই অপচয়, নাগরিক আইনে ওদের জরিমানা হওয়া উচিত।' আসলে বৃদ্ধ সাপ যখন খোলস ছড়াতে পারে না, তখন পৃথিবীর সবাইকে সে উলঙ্গ ভাবে। আমরাও কথার শ্রাদ্ধ করি, টেনে টেনে কথার হাত-পা লম্বা করি। কিন্তু কথার মানুষ মানে কথা দিয়ে কথা রাখতে পারি না। কোথায় যেন পড়েছিলাম, 'আমরা কথা দেই, আবার দেই না, কথা না দিয়েও দিয়ে দিই। আমরা সত্য কথা বলি, আবার মিথ্যা কথাও বলি। এতে প্রমাণিত হয় আমরা মানুষ।' যুক্তির সারবত্তা যাই থাকুক না কেন, আমরা মানুষ। কারণ, কথা বলতে পারি।
রবীন্দ্রনাথ এক নতুন ধরনের কথার নাম বলে গেছেন। এ কথার নাম 'চুপকথা'। তিনি বলেছেন, 'পথ ভুলে যাই দূরপারে সেই চুপকথার।' তবে আমরা কেউ তার 'কাবুলিওয়ালা' গল্পের 'মিনি'র মতো কথা না বলে একদন্ড থাকতে পারি না। অথচ তার চুপকথার রাজ্যে ডুব মারতে পারলে অনেক ফ্যাসাদকে সহজেই মাইনাস করা যায়। কিন্তু চুপ করে থাকা যায় না। স্বরযন্ত্রে প্রতিক্ষণ কথার স্পন্দন অনুরণিত হয়, আকুলি-বিকুলি করে। কথা না বলে আমরা থাকতে পারি না। শান্তি আর উদ্বেগে, উত্তেজনা আর দুঃখে, খেয়ালে-বেখেয়ালে আমরা কথার মালা গাঁথি প্রতিদিন প্রতিরাত। চুপকথার হাকিকত বুঝেও আমরা কথার মাঝে নিজেদের হারাই। 'বোবার শত্রু নেই' প্রবাদটি সকলেরই জানা। কিন্তু এটা মানার ব্যাকরণটি কখনো জয়ী হতে পারছে না। না মানার ব্যাকরণটি শাসনদন্ড হাতে আমাদের নিয়ন্ত্রণ করছে। ব্যক্তি হিসাবে আমরা কাউকে ভালবাসতে পারি অথবা সর্বতোভাবে ঘৃণাও করতে পারি। কিন্তু সামাজিক পরিবেশে আমরা চুপকথার থিউরি মেনে উদাসীন থাকতে পারি না। তাই প্রশ্ন জাগে, কথা মানব জীবনের শুরু, নাকি শেষ?'
মানুষ নিজকে স্বীকার করে বলেই কথা বলার স্বাভাবিক চেতনাকে অস্বীকার করতে পারে না, উড়িয়ে দিতে পারে না। তবে কথা মাত্রই সুফলদায়ী হয় না। যেমন করে আকাশে কালো মেঘ দেখা দিলেই ঝড় শুরু হয় না। ঝড় বা বৃষ্টি শুরু হবার পূর্বশর্ত হিসাবে সে মেঘে পর্যাপ্ত আদর্্রতা বা জলীয় বাষ্প থাকতে হবে। বাও বুঝে কথা না বললে হিতে বিপরীত হয় । সুতরাং কথামালা যেমন ব্যাকরণহীন নয়, তেমনি সীমান্ত ছাড়াও নয়। সময়, পরিবেশ ও আবেষ্টনের কারণে একই কথাকে শালীন অথবা অশালীন হতে দেখা যায়। তাই কথা শুধু কথাই নয়, এটা কখনো সাহিত্য, কখনো বা একটি প্রাণবন্ত কবিতা _ যা কীটস এর যে কোনো সরেস প্রেমের কবিতাকেও ম্লান করে দিতে পারে। আসলে কথাই মানুষের চেতনা ও অস্তিত্বের অবলম্বন। শুভ চেতনায় উদ্ভাসিত পৃথিবীর সকল ভাষার কথাই আদিম ও আরণ্যক। প্রযুক্তির হলাহল পান করে সময়ের অপরিচিত বাঁকে এসে কথার পোশাক পাল্টে যায় মাত্র। অনুভূতিতে যে কোন শুভ কথা অনন্য এবং নিত্য। আসলে নাগরিক যন্ত্রণায় আমাদের বিবর্ণ বিষন্ন মন যখন ক্লান্তি বোধ করে, যখন একই পরিবেশ ও আবেষ্টনের মাঝে মানবিকতা আর মনুষ্যত্বকে দু পায়ে দলে নররূপী কিছু পশুকে নির্লজ্জ চাটুকারিতা আর তেলের বন্যায় ভাসতে দেখা যায়, তখন সবকিছু পাওয়ার মাঝেও একটা না পাওয়ার বেদনা মনকে পীড়িত করে, জীবনাহত করে, তখন আর চুপ করে থাকা যায় না, বিদ্রোহী মনটা কথা বলে ওঠতে চায় জীবনের প্রয়োজনে। কিন্তু জীবন যুদ্ধে এ জাতীয় বিদ্রোহ আর কথা বলার নতিজা অনুমোদনীয় নয়। তাই চুপি চুপি বলছি, 'বাঘ-ভালুকের রাজ্যে থাকি, মনের কথা মনেই রাখি।'
সর্বশেষ এডিট : ৩১ শে ডিসেম্বর, ১৯৬৯ সন্ধ্যা ৭:০০
১০টি মন্তব্য ২টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

রাজনৈতিক দল গঠনের মতো জনপ্রিয়তা ইউনুস সাহেবের ছিলো না ।

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ০৮ ই মে, ২০২৬ রাত ২:২৬


মাঝে মাঝে আমি ইউটিউবে বা মাহফিলে গিয়ে হুজুরদের ওয়াজ শুনি। শোনার কারণটা ধর্মীয় যতটা না, তার চেয়ে বেশি হলো আমাদের সমাজের হুজুররা দেশীয় অর্থনীতি বা সামাজিক ইস্যুগুলো নিয়ে সাধারণ... ...বাকিটুকু পড়ুন

আল কোরআনের ১১৪ সূরায় হানাফী মাযহাবের সঠিকতার অকাট্য প্রমাণ (পর্ব-১৬)

লিখেছেন মহাজাগতিক চিন্তা, ০৮ ই মে, ২০২৬ সকাল ৭:০১



সূরাঃ ১৬ নাহল, ৯৩ নং আয়াতের অনুবাদ-
৯৩। আল্লাহ ইচ্ছা করলে তোমাদেরকে এক উম্মাত (একজাতি) করতে পারতেন, কিন্তু তিনি যাকে ইচ্ছা বিভ্রান্ত করেন এবং যাকে ইচ্ছা হেদায়াত দান করেন।... ...বাকিটুকু পড়ুন

সীমিত মগজ, লিলিপুটিয়ান, ডোডো পাখি (সৌজন্যে - চাঁদগাজী)...

লিখেছেন বিচার মানি তালগাছ আমার, ০৮ ই মে, ২০২৬ সকাল ১১:২৯



১. যেনা করব আমরা, ৫০১-এ যাব আমরা, পার্কে যাব আমরা। তুমি তো আলেম। তুমি কেন যাবে? তুমি তো ইসলামের সবক দাও সবাইকে। তুমি মাহফিলে কোরআন, হাদীস বয়ান কর। তুমি... ...বাকিটুকু পড়ুন

ধর্ম অটুট, মৌলভিরা নন: সমালোচনা মানেই অশ্রদ্ধা নয়

লিখেছেন কলিমুদ্দি দফাদার, ০৮ ই মে, ২০২৬ সন্ধ্যা ৭:২৬



নবী ইউসুফ (আ.)-এর সময় মিসরীয়রা 'আমুন' দেবতার পূজা করত। মিসরের শাসক আপোফিসকে তার পিতা তৎকালীন পুরোহিতদের কুচক্রী স্বভাব সম্পর্কে সতর্ক করেছিলেন। এই পুরোহিতরা ধর্মের দোহাই দিয়ে রাজ্যসভা থেকে... ...বাকিটুকু পড়ুন

শৈশব- কৈশোর বেলার গল্প

লিখেছেন রাজীব নুর, ০৮ ই মে, ২০২৬ সন্ধ্যা ৭:৪৭



আমাদের শৈশব ছিলো অতিশয় প্রাণপ্রাচুর্যময় যদিও শৃঙ্খলাপূর্ণ।
একালের মতো বিলম্বিত শয্যা ত্যাগ রীতিমতো গর্হিত অপরাধ! শয্যা ত্যাগ করেই বিশেষত অবকাশের দিন গুলোতে নিয়মিত গন্তব্য ছিলো কারো কারো খেলার... ...বাকিটুকু পড়ুন

×