
মেয়েটা বড় কুকুর ভয় পায়। কুকুর দেখলেই ভয়ে কুঁচকে যায়,একটু দূরত্ব রেখে পা চালায় বা জমে থেমে যায়। তবুও প্রতিদিন কলেজে যাবার পথে, বাসা থেকে বেরিয়ে গলি পেরুলেই রাস্তার মাঝে কুকুর গুলোকে দেখে মেয়েটা। শুয়ে আছে, বসে আছে, কোনটা জিব বের করে চেয়ে আছে। সত্যি বড় ভয় লাগে। দাঁড়িয়ে থাকে অনেকটা সময়, কেউ রাস্তা দিয়ে গেলে পিছু পিছু যাবে। মাঝে মাঝে কারও পিছু পিছু যাওয়া হয়, আর বেশির ভাগ সময় কলেজে দেরী হবার চিন্তায় একাই পা বাড়ায়। খুব ধীর পা। টিপে টিপে পা ফেলে খুব সন্তর্পণে রাস্তার মাঝখানটায় আসতেই যেন ঝিম ধরে থাকা কুকুরগুলো শক্তি ফিরে পায়। মেয়েটার দিকে তাকিয়ে গলা ফাটিয়ে ঘেউ ঘেউ করে। মেয়েটাও চিৎকার করে উঠে, কেঁদে ফেলার উপক্রম করে শক্ত হয়ে দাঁড়িয়ে থাকে, বা কখনও দেয় এক দৌড়। পিছন পিছন দৌড়ায় কুকুর গুলো। আরও ভয় লাগে মেয়েটার। বড় অসহায় লাগে নিজেকে। কিছুটা পথ পরে আর পিছু নেয় না রাস্তার মাঝখানে থাকা কুকুর গুলো। হাফ ছেড়ে যেন বেঁচেও ভয়ের রেশটা রয়ে যায়। এভাবে প্রতিদিন ভয় পেতে ভাল লাগে না মেয়েটার। বাবাকে বলতে ইচ্ছা করে, বাবা আমার কলেজ যেতে সমস্যা হয়। রাস্তায় কুকুর দেখে ভয় লাগে।
বাবা সারাদিন অফিস করে আসেন রাতের বেলা। বাবার ক্লান্ত মুখটার দিকে তাকিয়ে আর ইচ্ছা করে না, রাস্তার কুকুর নিয়ে আলাপ করতে। বরং এক গ্লাস লবন, চিনি, লেবু দেয়া সরবত বাবার দিকে বাড়িয়ে দিয়ে, “ সরবতটা খেয়ে নাও বাবা” বলতেই বেশি ভাল লাগে।
অপরদিকে মা অসুস্থ। বেশি হাঁটাচলা করতে পারেন না। মার কাছেও বলা হয় না। বললে হয়ত বলবেন, আমি বাঁচি না আমার শরীর নিয়া। তুই আসছিস কুকুরের গল্প নিয়া। কলেজে যাওয়া লাগবে না। বাসায় বসে রান্না বান্না শিখ। স্বামীর ঘরে গিয়ে কিছু তো করতে হবে। খালি চেহারা দিয়া মানুষের সংসার করতে পারবি না। এই গুন নিয়া কারও ঘরে গেলে, ঝাঁটা পেটা করে বের করে দিবে।
মায়ের মুখে এ কথাগুলো স্বাভাবিক। মা মাঝে মাঝে মেয়েটাকে আরও অনেক খারাপ ভাষায় বকা দেন। সেসবে আর খারাপ লাগায় না মেয়েটা। একসময় হয়ত অনেক কিছুই বদলে যাবে। একসময় ঠিক বদলে যাবে কুকুর দেখে ভয় পাবার ব্যাপারটা।
কুকুরের গলি পার হয়ে মোড় নিলে, যে গলিটা আসে সে গলিতে একটা চায়ের দোকান আছে। সে চায়ের দোকানের সামনে দিয়েও পা চালিয়ে দ্রুত যেতে চায় মেয়েটা। চায়ের দোকানের সামনে দিয়ে যাবার সময়, দৌড়ে এসে এক ছেলে সামনে এসে দাঁড়াল। এই ছেলে আজ নতুন এসেছে, পথ আটকাচ্ছে প্রথম, ব্যাপারটা তেমন না। ছেলেটা এর আগেও অনেক দিন বিরক্ত করেছে। আজ সামনে এসে বলল, এই মেয়ে তোমার নাম যেন কী?
মেয়েটা চুপ করে থাকে, বলে না কিছু।
ছেলেটা মুখটা মেয়েটার কানের কাছে এনে বলে, আমি মিজান। বল নামটা তোমার।
মেয়েটা ভয়ে কাঁপতে কাঁপতে বলল, জান্নাত।
-আরে বাহ কী সুন্দর নাম। তুমি দেখতে যেমন নামটাও তেমন। শোন, মিজান নামটা অনেক বড়। তুমি আমাকে ছোট করে জান বলে ডাকবা। মি বাদ। আর তোমাকেও ছোট করে জান ডাকব। নাত বাদ। তুমি আমার জান, আমি তোমার জান।
মেয়েটা ভয়ে ভয়ে বলল, আমার কলেজে দেরী হচ্ছে। কলেজে যাব।
-আরে যাবা তো। কেউ আটকাবে না।
জান্নাত মাটির দিকে তাকিয়ে কথা বলছে, আর মিজানের নজর জান্নাতের দিকে। সে নজর ভাল নজর না। কু নজর।
মিজান বলে, তুমি আসলেই সুন্দর। সবই সুন্দর। ওড়নাটা আরও উপরে পরলে আরও সুন্দর লাগত। আর.....
আর কোন কথা কানে যাচ্ছে না জান্নাতের। মনে হচ্ছে কুকুরের ঘেউ ঘেউ শব্দ শুনছে। এখনি কামড় বসিয়ে দিবে। পালিয়ে যাওয়া দরকার। দৌড়ে কামড় থেকে বাঁচা দরকার। জান্নাত সত্যি দৌড় দিল। সে দৌড়ের সাথে সাথে পিছন থেকে শুনল, কুকুরের ঘেউ ঘেউ শব্দ।
এ কথা গুলোও বাবাকে বলতে ইচ্ছা করে।
" বাবা তোমার রাজকুমারীকে নিয়ে রাস্তার ছেলেরা বাজে কথা বলে।"
কিন্তু বলা হয় না বাবাকে, বলা হয় না মাকে। কেন যেন এই কথা গুলো বলা যায় না। বললে কিছুই হবে না। এরা একা না। এরা অনেকে। সবাই এলাকার বাড়িওয়ালাদের ছেলে। এদের সাথে জান্নাতের ভাড়াটিয়া বাবা পেরে উঠবে না। ওঠা সম্ভব না।
কলেজ শেষে প্রাইভেট পড়া থাকে। পড়া শেষ করে আসতে সন্ধ্যা হয়ে যায়। বাসায় ফেরার সময়টাও অমন ভয়ে ভয়ে কাটে। রাস্তায় অনেক ছেলে রূপী কুকুর ঘেউ ঘেউ করে। কিন্তু এই চায়ের দোকানের সামনে এসে তা মাত্রা ছাড়িয়ে যায়। এবার মিজান একা বলে না, দল বেধে অনেক গুলো কুকুর চায়ের দোকান থেকে বেরিয়ে এসে জান্নাতকে দেখে ঘেউ ঘেউ করে। শরীরের নানা জিনিস নিয়ে নানা মন্তব্য করে। এই ঘেউ ঘেউ শব্দ সত্যি একদম সহ্য হয় না জান্নাতের। কিছু মাংস পিন্ডের প্রতি এদের এত নিচু আগ্রহ। সত্যি বড় করুণা হয় কুকুর গুলোর প্রতি। সে করুণা ভয়ে তলিয়ে যায়। দৌড়ে গলি পেরিয়ে রাস্তায় শুয়ে থাকা কুকুরের গলি পার হয়। ভয়ে, ঘেমে, যন্ত্রণায়।
বাসায় গিয়ে গোসল খানায় শাওয়ার ছেড়ে কাঁদে জান্নাত। নিঃশব্দে কাঁদে। শরীরে পানি দিয়ে ভাবে, ধুঁয়ে ফেলছে গায়ে লাগা কথা গুলো। কথা গুলো ধুঁয়ে যায় না। আরও বুকের ভিতর গেঁথে যায়। একটা মেয়ে, কিছু বেড়ে ওঠা মাংস পিন্ডের জন্য নিজেকে বড় অবাঞ্ছিত লাগে। গোসল করে বেরিয়ে মায়ের ঘরে যায়। মা শুয়ে আছেন বিছানায়। মায়ের পাশে বসে, মাথা নিচু করে জান্নাত বলে, মা একটা বলব।
-বল।
- তোমার বোরকা আছে না? ওটা আমাকে দিও তো।
- তোর আবার বোরকা পরার শখ হইছে ক্যান? বোরকা পইরা কার সাথে দেখা করতে যাবি?
- কারও সাথে দেখা করতে যাব না। কলেজে যাব।
- ঢং দেখলে মেয়ের বাঁচি না, দুই দিন পর পর তার এক একটা ঢং। উপরের তাকে বোরকা আছে। যা বের করে নে।
বোরকা পরে কাঁধে ব্যাগ ঝুলিয়ে আজ কুকুর শুয়ে থাকা গলিতে এসে কিছুটা চমকে উঠল। রাস্তায় আজ একটা কুকুরও নেই। জান্নাত পা বাড়িয়ে এদিক ওদিক উঁকি দিতেই বিষয়টা পরিষ্কার হল। কুকুর গুলো রাস্তায় নেই, তবে রাস্তার পাশেই আছে। দল বেধে কী যেন খাচ্ছে। জান্নাত উঁকি দিতেই অনুভব করল, বিশাল দুর্গন্ধ আসছে। এ দুর্গন্ধ মানু্ুষের মলের। নাক হাত দিয়ে পাশে তাকিয়ে দেখল, একটা সেপটি ট্যাংক ভেঙে গেছে, সেখান থেকে বের হওয়া মল খাচ্ছে কুকুর গুলো। জান্নাত নাক চেপে ধরে সরে আসল ওখান থেকে। অন্তত আজ রাস্তার কুকুরের তাড়া খেতে হয় নি। চায়ের দোকানের ছেলে গুলোও হয়ত বলবে না বাজে কথা। কিন্তু চায়ের দোকানের সামনে যেতেই ব্যাপার তা হল না। চায়ের দোকানের ছেলেগুলো বোরকা পরা জান্নাতকে দেখেও চিৎকার করে উঠল। জান্নাতের কানে আসল, হায় রে বোরকার উপর দিয়েই এই অবস্থা, ভিতরে না জানি.......
বাকি কোন কথা কানে আসল না। বাকিটা ঘেউ ঘেউ শব্দ। আর কিছুই না। দল বেধে সব গুলো ছেলে ঘেউ ঘেউ করছে। আর জান্নাতের গা জ্বালা করছে। এই গা জ্বালা করার কোন লাভ নেই। জান্নাতের কিছুই করার ক্ষমতা নেই।
কলেজ ফিরে আসতেও আজ সন্ধ্যা। জানে চায়ের দোকানের কুকুর গুলো আজও এসে বলবে নানা কথা। জান্নাত মনে মনে ঠিক করল, আজ শুনিয়ে দিবে কথা। মুখ বুজে শুনবে না কিছু।
জান্নাত চায়ের দোকানের সামনে যেতেই একই রকম কথা ছুটে আসল। জান্নাত নড়ল না দাঁড়িয়ে রইল। কুকুর গুলো ঘেউ ঘেউ করতে করতে চায়ের দোকান থেকে এগিয়ে আসল জান্নাতের দিকে। জান্নাতের সামনে এসে মিজান দাঁড়াল, শরীরের এখানে ওখানে চোখ বুলিয়ে বাজে কিছু কথা বলল আবার।
জান্নাত এবার চুপ করে শুনল না। ভয় না পেয়ে বলল, আর একটা বাজে কথা বললে থাপ্পড় দিয়ে গাল লাল করে দিব। বেয়াদব গুলা যেন কোথাকার।
একটু সময় থমকে গিয়ে, ছেলেগুলো আবার হেসে উঠল। মিজান যা করল, তার জন্য জান্নাত মোটেও প্রস্তুত ছিল না। একটা হাত জান্নাতের বুকের উপর রেখে বলল, বাজে কথা বললাম না, বাজে কিছু করলাম। থাপ্পড়ের বদলে এখন কী দিবা?
জান্নাত অসহায় ভঙ্গিতে চারপাশে তাকাল। মিজানের সাথে কতগুলো কুকুর আছে। সেগুলো ঘেউ ঘেউ করছে। আর চায়ের দোকানে কিছু লোক। তারা নিশ্চিন্তে চা খাচ্ছে। সিগারেট ফুঁকছে। এপাশে কী হচ্ছে না হচ্ছে তাতে তাদের কিছু যায় আসে না। জান্নাত দৌড়ে চলে গেল সেখান থেকে। পিছনে ফেলে কিছু কুকুরের ঘেউ ঘেউ শব্দ। এই কুকুর গুলো মানুষের মল খাওয়া রাস্তার কুকুরের চেয়েও অধম। এরা মাংসের ঘ্রাণ খুঁজে। মেয়েদের শরীরের বেড়ে ওঠা মাংসের ঘ্রাণ। এরা একা থাকলে কুকুর, দল বেধে আরও হিংস্র কুকুর। এরা মানুষ নয়, ধীরে ধীরে বেড়ে ওঠা শরীরের ভিতরের পশুটার পরিচর্চা করা অমানুষ।
রাত দশটা। মিজান বাড়ি ফিরেছে। বাবা আসবেন এগারটায়। তার আগেই বাসায় ফেরা দরকার। আজ বড় গরম পড়েছে। মিজানের আর একবার গোসল করা প্রয়োজন। গোসলখানা ভিতর থেকে লাগানো। ছোট বোনটা গোসল করছে। অপেক্ষা করছে মিজান। খানিক পরেই বেরিয়ে আসল ছোট বোনটা। মিজান তাকিয়ে আছে ছোট বোনটার দিকে। মিজান নজর সরাতে চাচ্ছে। পারছে না। ছিঃ ছিঃ কোথায় তাকাচ্ছে মিজান। মাথার ভিতর কী সব ঘোরপাক খাচ্ছে। ছোট বোনটা বলল, কেমন আছিস ভাইয়া?
মিজানের মুখ দিয়ে বের হল, ঘেউ ঘেউ ঘেউ।
ছোট বোনটা অবাক হওয়া চোখে তাকিয়ে থেকে চলে গেল।
শুধু যাবার আগে বলল, ছিঃ ভাইয়া।
ক্ষুধা পেয়েছে মিজানের। মায়ের কাছে খাবার চাইবে। মায়ের পাশে দাঁড়িয়ে মিজান বলল, ঘেউ ঘেউ ঘেউ।
মাও তাকিয়ে রইল মিজানের দিকে।
মিজান এসব বলতে চায় না। একদম না। তাও জান্নাতের দিকে তাকিয়ে, বুকে হাত দিয়ে যেমন ঘেউ ঘেউ করেছিল, মা বোনের দিকে তাকিয়ে যতই বলতে চাচ্ছে, মা, আপুটা। ততই মুখ থেকে বের হচ্ছে ঘেউ ঘেউ ঘেউ।
- শেষ রাতের আঁধার (রিয়াদুল রিয়াদ)
৩০/০৯/২০১৫
সর্বশেষ এডিট : ২৯ শে অক্টোবর, ২০১৫ রাত ৯:০৬

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



