somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

গল্পঃ আবছা কালো

১৪ ই জানুয়ারি, ২০১৭ সকাল ১১:২৯
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

বছর তিনেক আগেও, মধ্যাহ্ন বেলায় এই পুকুর পাড়ে দু খানা চেয়ারে মুখোমুখি বসে ছিলেন মতিন সরকার আর থানার এক বড় অফিসার। অফিসারের চোখে মুখে ছিল স্পষ্ট দুশ্চিন্তার ছাপ, মতিন সরকার সেখানে ভাবলেশহীন। ঘটনা ততক্ষণে জেনে গিয়েছে পুরো গ্রামবাসী, সরকার বাড়িতে পুলিশ এসেছে। মানুষজন বাড়ির আশেপাশে ঘুরঘুর করছে, পুরো ঘটনা জানার জন্য। কেউ সাহস করে বাড়ির ভিতর যাচ্ছে না। সরকারের লোকেরা লাঠি নিয়ে দাঁড়িয়ে বাড়ির আশেপাশে। কেউ ঢুকতে চাইলেই পায়ের হাড় ভেঙে ফেলার হুকুম। কিছু না জেনেও লোকে নানা কথা বলছে, মুখে মুখে রটে যাচ্ছে। অজানা বিষয়ে অন্যের মুখের মিথ্যে কথায় অসত্য কিছু খুঁজে পায় না মানুষ। কেউ বলছে, মতিন সরকারের দুই নাম্বারি ব্যবসার খবর পুলিশ পেয়েছে। তাই তাকে ধরতে এসেছে। কিন্তু মতিন সরকারের আসলে কী দুই নাম্বারি ব্যবসা, সে ব্যাপারে জানা নেই। শুধু জানে মতিন সরকার দুই নাম্বারি ব্যবসা করে। দুই নাম্বারি না করে, লোকে এতো বড়লোক হয় কী করে? আবার কেউ বলছে মতিন সরকারের জমি জমা নিয়ে ঝামেলা। গ্রামে পিচ ঢালা রাস্তা হবে, সে রাস্তা পড়েছে পুরোটাই মতিন সরকারের জমিতে। তার সাথে তো কিছু আলাপ আলোচনার ব্যাপার আছে। আরও নানা কথা বলছে লোকে। লোকের কথায় কি আসে যায়? যা রটে তার কিছুটাও বটে, কিন্তু অনেক রটনার কিছুই ঘটে না। পুকুরে ফেলা হয়েছে জাল, মতিন সরকার হাক ডেকে বলছেন, ছোট মাছ জালে উঠলে ছেড়ে দিবি। বড় রুই আর কাতলা ছাড়া ধরবি না। বড় অফিসার আসছে, তার যত্ন আর্তির ব্যাপার আছে না?
বড় অফিসারের সে সবে মনোযোগ নেই। তিনি বাড়ির চারপাশে চোখ বুলাচ্ছেন। বিশাল বাড়ি, বাড়ির চারপাশ ঘিরে গাছপালা। কামরাঙ্গা গাছে টিনের এক বড় কৌটা লাগানো, তার সাথে বাধা দড়ি ঝুলে আছে গাছের নিচে। গাছে ঝুলছে বাড়তি হওয়া কামরাঙ্গা। তুলি এসে সে দড়িতে টান দেওয়াতে, টুংটাং আওয়াজ হল। মতিন সরকার গলার স্বর নরম করে বললেন, মা, তুমি বাহিরে আসছ কেন?
- কামরাঙ্গা গাছে পাখি বসছে, কামরাঙ্গা খেয়ে নিবে।
জবাব দিয়ে ঘরের ভিতর চলে গেল তুলি। মতিন সরকার অফিসারের দিকে তাকিয়ে বললেন, আমার বড় মেয়ে। ডাক্তারি পাস করে বাড়িতে আসল মাস খানেক হল। অনেক কিছু জানে, ওর বুদ্ধির কাছে আপনি আমি কিছু না।
অফিসার সাহেব ছোট একটা নিঃশ্বাস ফেলে, নীরবতা ভেঙে বললেন, আপনি ব্যাপারটার কী করলেন?
- ব্যাপার আপনাকে বুঝিয়ে বলেছি, আপনি বুঝতেও পারছেন আশা করি। আমার আশা হতাশা করবেন না আপনি আমি জানি। যাওয়ার সময় আমার ম্যানেজার মোসলেম আপনার সাথে নিভৃতে আলাপ করবে। আমার একমাত্র ছেলে, পাগল হোক আর ভাল হোক আমার ছেলে। আপনি এই ব্যাপারে আপনার যা করার করেন। বাকিটা আমি দেখব।
বড় অফিসার সাহেব, কিছু বলতে গিয়েও বললেন না। অন্য কথায় কথা বলে বললেন, লাশের কী হবে?
- আপনার ঝামেলায় যাওয়ার কী দরকার? ঈমাম সাহেব রাস্তায় আছেন, জানাজা হবে, কবর বাড়ির পিছন দোরায় হবে। ঠিক আছে তো সব, তাই না?
এবার চোখের ভাষা একটু পরিবর্তন করে অফিসারের দিকে তাকিয়ে কথাটা বললেন মতিন সরকার। অফিসার না বলতে গিয়েও, চেয়ার ছেড়ে উঠে বললেন, ঠিক আছে।
- সে কী আপনি উঠছেন নাকি?
- জ্বি, কাজ আছে। দক্ষিণ পাড়ায় যেতে হবে, এক ডাকাত ধরেছে লোকজনে।
- আপনার জন্য মাছ ধরা হচ্ছে যে!
- অন্য দিন।
বলে চলে গেল অফিসার সাহেব। যাবার সময় যদিও, মতিন সরকারের ম্যানেজার মোসলেমের সাথে দেখা করতে ভুলেন নি। দোতালার বারান্দায় দাঁড়িয়ে সব দেখছিল তুলি। মতিন সরকার উঠে দাঁড়াতেই সেখান থেকে সরে গেল। তিন খানা বড় রুই, এক খানা কাতলা, আর একটা শোল পাওয়া গিয়েছে পুকুরে। মতিন সরকার মুখে একটা পান দিয়ে, হুকুম করলেন, পাক ঘরে পাঠিয়ে দে মাছ। তোরা পছন্দ মত দুইটা নিয়ে যা, বউ বাচ্চা নিয়ে খেতে পারবি।
মানুষ মরা বাড়িতে রান্না বান্না হয় না। এই বাড়িতে হচ্ছে, বেশ আড়ম্বরের সাথেই হচ্ছে। বাড়ির কারও মধ্যে কোন ভাবান্তর নেই। ঈমাম সাহেব চলে এসেছেন, জনা পাঁচেক দাঁড়িয়ে জানাজা পড়ে লাশ কবর দেয়া হল। তুলি দূর থেকে জানালা একটুখানি ফাঁকা করে কবর দেয়া দেখছিল। এতক্ষণে যেন বাঁধ ভেঙেছে কান্নার, তুলি হাউমাউ করে কেঁদে উঠল। সে কান্নার শব্দ আকাশ বাতাস ভারী করে ছড়িয়ে পড়ল পুরো বাড়ি জুড়ে। তুলির কান্না থামে না বরং বাড়ে। মতিন সরকার দরজার কাছে এসে একটা টোকা দিয়ে বললেন, মা, মানুষকে জানাবার মত কোন ঘটনা ঘটে নি। এমন করলে তোমার ভাইটাই তো ফেঁসে যাবে বুঝতেই পারছ। কান্না থামাও মা, গোসল সেরে খেতে আসো।
তুলি আর কাঁদে নি, এক ফোটাও কাঁদে নি। সেদিন তুলির কান্না কাঁদতে পারেনি আকাশ, বাতাস, মেঘের দলও। সেবার বর্ষায় আকাশে খুব মেঘ করল, ঘন কালো মেঘ, ধমকা হাওয়া বইল, তবু ঝিরিঝিরি একটু আধটু বৃষ্টি ছাড়া কিছুই হল না। তুলি যেমন ধৈর্য ধরে থাকতে পারল, কান্না অমন বুকের ভিতর জমিয়ে রাখতে পারল। আকাশ, বাতাস মেঘের দল তেমন পারল না। পরের বছর হুট করেই এমন বর্ষা শুরু হল, আর থামার কোন নাম গন্ধ নেই। মেঘের অবিরাম কান্নায়, নদীর সইতে না পারা ব্যথার জলে পুরো গ্রাম ভেসে গেল। পানি বাড়তে বাড়তে হাঁটু জল হল, ফসলের জমি ডুবল, বুক জল হল, বাড়ি ডুবল, গোয়ালের গরু, খোপের হাস মুরগি সব ভেসে গেল। মানুষ জনের থাকার জায়গা নেই। একমাত্র উঁচু বাড়ি সরকার বাড়ি। ভেলা করে মানুষ জন সরকার বাড়ির আশেপাশে ঘুরঘুর করে। মতিন সরকারের হুকুম, কোন ফকিন্নি যেন তার বাড়িতে না ঢুকতে পারে।
তুলি যেন ভেবেই নিয়েছিল মতিন সরকারের কথার অবাধ্য হবে। তুলি ডাক্তার, মানুষের ব্যথা বোঝার ক্ষমতা প্রবল। গ্রামের যাদের থাকার জায়গা নেই, তাদের তুলি সরকার বাড়ির গুদাম ঘরে আশ্রয় দিল। মতিন সরকার শান্ত স্বরে এসে বললেন তুলিকে, মা কাজটা বোধহয় ঠিক করছ না।
তুলি কোন উত্তর দেয় না। চুপ করে সামনে থেকে সরে আসে। মতিন সরকার আদেশ দেন যেন দশ মিনিটের মধ্যে গুদাম ঘর খালি হয়। গুদাম ঘর খালি হয় না। বরং মতিন সরকারের লোক চালের বস্তা রান্না ঘরে নিয়ে যায়। ভাত রান্না হবে গুদাম ঘরের লোকজনের জন্য। মতিন সরকার হুংকার ছেড়ে বলেন, কী রে? কথা কানে যায় না তোদের?
চালের বস্তা নিচে রেখে মাথা নিচু করে বলে লোকবল, আপা বলছে তাদের জন্য রান্না করতে। পানি না কমার আগ পর্যন্ত তারা এইখানেই থাকব।
মতিন সরকারের নিশ্চুপ চোখ লাল হয়ে আসে, হাতের ছাতাটা মাটিতে আছড়ে ফেলে উঠে চলে যান উপরে। দিন দুয়েকের মধ্যে রটে যায়, মতিন সরকারের মাথায় সমস্যা দেখা গিয়েছে। গ্রামের লোকজনের মাঝে তা বিশ্বাসযোগ্যতাও পায়। মতিন সরকারের মাথায় সমস্যা না দেখা দিলে এই বিপদের দিনে আশ্রয় নেয়া লোক গুলোকে বের করে দেবার চিন্তা ভাবনা কখনই আসত না। মতিন সরকার পাগল হয়ে গেল, যেমন করে পাগল হয়ে গিয়েছিল তুলির ছোট ভাই তাহের। পাগলামির কোন লক্ষণ তাহেরের মাঝে ছিল না, হঠাৎ করে একদিন মতিন সরকার ঘোষণা করেছিলেন, তাহেরের মাথায় সমস্যা দেখা দিয়েছে। সমস্যা দেখা দিয়েছে বলেই প্রেমে পড়ে গিয়েছিল, কাশেম মিয়ার ছোট মেয়ে নিপুর। কাশেম মিয়া গঞ্জে জুতা সেলাই করে, সবাই ডাকে কাশেম মুচি। মুচির মেয়ের প্রেমে কী করে মতিন সরকারের একমাত্র ছেলে পড়ে। কারণ ছাড়াই তাহেরকে ঘরে আটকে রাখা হত। সবাই পাগল বলতে বলতে এক সময় সত্যি পাগল পাগল হয়ে যায় তাহের। তাহেরের ব্যাপারে কিছু বলে নি তখন তুলি। বলেছিল তুলির মা। কথা বলেই, মাগুর মাছ ভরা পুকুরে পড়ে মরে গেল। সে লাশ মাগুর মাছে খাবলে খাবলে খেল। ক্ষত বিক্ষত লাশ তুলেই জানাজা পড়ে কবর দেয়া হল, তুলির ঘরের জানালার কাছে। মতিন সরকার বললেন, তাহেরের মাথায় সমস্যা, তাই ধাক্কা মেরে ফেলে দিয়েছে মাকে।
পাগলেও মায়ের ভালবাসা বুঝতে পারে, মায়ের কোলের মাঝে চুপ করে শান্ত হয়ে মাথা গুঁজে থাকে। পাগলও কখনও মাকে খুন করতে পারে না। পারা সম্ভব না। তুলি বুঝত ব্যাপারটা, বলে নি কিছু। চুপ করে দেখেছে সব। বড় অফিসারকে ঘুষ দিয়ে ব্যাপারটা ধামাচাপাও দিয়েছেন মতিন সরকার। মায়ের মৃত্যর দিনে বাড়িতে কোন শোক ছিল না, বরং রান্না বান্না হয়েছিল বেশ ভাল ভাবেই। তুলিকে কাঁদতে নিষেধ করেছিলেন মতিন সরকার, তুলি কাঁদে নি। সেদিনের কয়েক দিনের মাথায় নিপুর লাশও পাওয়া গেল, উত্তরের জঙ্গলে। গলায় ফাঁস দেয়া লাশ। এই মৃত্যুও চালিয়ে দেয়া হল তাহেরকে না পেয়ে মরে গিয়েছে নিপু। তুলি সেদিনও কিছু বলে নি।
আজ তিন বছর পর আবার আজকের এই দিনে আবার এই মধ্যাহ্নে পুকুর পাড়ে মুখোমুখি বসে আছে যে দুজন। তিন বছর আগের চরিত্র দুটোর দুটিই পরিবর্তন হয়েছে। মতিন সরকারের চেয়ারে বসে আছে তুলি, অফিসারের চেয়ারে বসে আছে অন্য এক অফিসার। তুলি এখন সরকার বাড়ির সব দেখাশুনা করে। অফিসার শান্ত স্বরে বললেন, কী সিদ্ধান্ত নিলেন ম্যাডাম?
- সিদ্ধান্ত তো আপনাকে আগেই বুঝিয়ে দিয়েছি। এখানে কোন ঝামেলা নেই। আপনি তাও যাবার সময় ম্যানেজারের মোসলেম চাচার সাথে দেখা করে যাবেন। আপনার ব্যাপার সে দেখবে।
- তাও ম্যাডাম। এটা তো এভাবে সমাধান হয় না।
- সমাধান করলেই হয়। এটা অপমৃত্যু ছাড়া আর কিছুই না। মাথায় সমস্যা ছিল, পুকুরে পড়ে মরে গিয়েছে। আর লাশের অবস্থা ভাল না। আপনারা এই লাশ কোথায় কাটা ছেড়া করবেন বলেন? আপনি শুধু শুধুই সময় অপচয় করছেন, আপনি ম্যানেজারের সাথে দেখা করেন। আমি উঠলাম।
তুলি উঠে গেল। পুলিশ অফিসার বেশি একটা ঝামেলা করলেন না। চুপ করে উঠে ম্যানেজারের সাথে দেখা করে চলে গেলেন। তুলি উপর তলার তাহেরের ঘরে গেল, উদাস দৃষ্টি ছুড়ে তাকিয়ে আছে জানালা দিয়ে বাহিরে। তুলি পাশে এসে বসল, তাহেরের মাথায় হাত বুলিয়ে বলল, কেমন আছিস ভাই?
তাহের নিচের ঠোঁটটা কামড়ে ধরে তুলির দিকে তাকিয়ে আস্তে করে মাথা নাড়ল।
- বাহিরে চল।
তাহের তুলির হাত ধরে বেরিয়ে আসল। মায়ের কবরটার পাশে এসে দাঁড়াল দুজন। তাহেরের চোখ ছলছল করছে। একটু দূরে কাফনের কাপড়ে জড়ানো আর একটা লাশ। সেই লাশটার জন্য দুজনের কারও মনেই কোন মায়া নেই, ব্যথা নেই, কষ্ট নেই। মতিন সরকার নামের লোকটার জন্য মায়া ভালবাসা আসার কোন যুক্তিও নেই। এই লোকটা সারাজীবন নিজেকে সবার থেকে বুদ্ধিমান, ক্ষমতাধর ভেবে গিয়েছে। রাগ উঠলে ঠাণ্ডা মাথায় যা মনে এসেছে, করে গিয়েছে। সব অপকর্ম থেকে সারাটা জীবন খুব সুন্দর ক্ষমতার জোরে পার পেয়ে গিয়েছে। তুলি আর তাহেরের জন্মগত পিতা মতিন সরকার নয়। তুলি আর তাহেরের মা রাফেজা খাতুনের প্রতি অনেক আগে থেকেই দুর্বলতা ছিল মতিন সরকারের। যে কারণেই হোক বিয়ের চেষ্টা তকবীর করেও সফল হন নি মতিন সরকার তখন। স্কুল মাস্টার রুহুল মিয়ার সাথে বিয়ে হয় রাফেজা খাতুনের। তখন গ্রামে কোন স্কুল নেই। রুহুল মিয়া মতিন সরকারের কাছ থেকে ধার দেনা করে একটা স্কুল ঘর বসান, জমিও দেয়া মতিন সরকারের। স্কুল বসে কিন্তু সে স্কুলে বেশীদিন মাস্টারি করা হয় না রুহুল মিয়ার। যখন তুলির বয়স দুই বছর, তাহেরের এক, তখন এক রাতে করে বাজার থেকে ফেরার পথে মারা যান রুহুল মিয়া। কেউ রুহুল মিয়াকে পিটিয়ে খুন করেছে। রুহুল মিয়ার মৃত্যুর পর কেন যেন রাফেজা খাতুনের শ্বশুর বাড়ির লোকেরাও বদলে যায়, রাফেজাকে বাড়িতে রাখতে অস্বীকৃতি জানায়। মতিন সরকার তখনও সাহায্য করতে এগিয়ে আসেন। সন্তানদের ভবিষ্যতের কথা চিন্তা করেই, মতিন সরকারকে বিয়ে করেন রাফেজা খাতুন তুলি আর তাহেরকে নিয়ে। তুলি, তাহেরকে লালন পালনের কোন সমস্যা ছিল না মতিন সরকারের। কখনও আচার আচরণে তেমন কিছু প্রকাশও পায় নি। বরং মনে হত পৃথিবীতে সবচেয়ে বেশি ভালবাসেন মতিন সরকার, তাহের, তুলি আর রাফেজা খাতুনকে। অতি ভালবাসা অতি দ্রুত হারিয়ে যায়। তাহেরের প্রতি ভালবাসা তাহের যখন নিপুর প্রেমে পড়ে তখন হারিয়ে যায় মতিন সরকারের, রাফেজা খাতুন যখন ছেলের পক্ষ নিয়ে কথা বলে, তখন রাফেজা খাতুনের প্রতি ভালবাসাও বাষ্প হয়ে উড়ে যায়। তাহের পাগল হয়, রাফেজা খাতুন মাগুর মাছ ভর্তি পুকুরে পড়ে মরে যায়, নিপুর গলায় ফাঁস দেয়া লাশ জঙ্গলে পাওয়া যায়। ব্যাপার গুলো বুঝত না তুলি তেমন নয়, বেশ ভাল করে, স্পষ্টভাবেই বুঝত। তবুও চুপ থাকত, একটু ধৈর্য, একটু সুযোগের অপেক্ষা। রাফেজা খাতুন মাঝে মাঝেই তুলিকে চুপি চুপি ডেকে বলতেন, তোদের বাবা মরল ক্যান তুই কি বুঝিস না?
তুলি বুঝত তবু নিশ্চুপ চোখে চেয়েই থাকত। জবাব দিত না কোন কথার। রুহুল মিয়ার মৃত্যু, রাফেজা খাতুনের মতিন সরকারের সাথে বিয়ে, তাহেরের পাগল হওয়া, রাফেজা খাতুনের পানিতে পড়ে মরে যাওয়া, নিপুর মৃত্যু সব গুলো ঘটনার পিছনে কে ছিল, কীভাবে ছিল সবটাই জানা তুলির। মতিন সরকার ধুরুন্ধর ব্যক্তি ছিলেন, সূক্ষ্ম বুদ্ধির লোক ছিলেন বলেই বুঝতেন তুলি অনেক কিছুই জানে, একমাত্র তুলির বুদ্ধির প্রশংসাই তিনি জীবিত কালীন সময়ে করে গিয়েছেন। এতো গুলো পাপ করে কেউ কখনও পার পায় নি, পাপ গুলো জমে জমে একদিন অভিশাপ হয়, অভিশাপে আটকে যায় মানুষটা। বন্যার সময়ে গ্রাম যখন ভেসে যায়, সে সুযোগটা কাজে লাগায় তুলি। অসহায় মানুষ গুলোর কাছের মানুষ হয় তুলি, মতিন সরকারকে পাগল হিসাবে দাঁড় করায় সে মানুষ গুলোর সামনে। একটা সময় মতিন সরকারের জায়গায় তুলি জায়গা নিল, সরকার বাড়ির সব কিছুর দায়িত্ব একটা সময় বর্তায় তুলির উপর। একটু সময় নিয়েই সব গুলো মানুষকে নিজের বাধ্যগত করে তুলে তুলি। রাফেজা খাতুনের মৃত্যুর প্রায় তিন বছর পরেই সব হিসাব মেটাবার সময় আসল, মতিন সরকারের পাপ গুলোর অভিশাপের আঘাত পাবার দিন এল। মতিন সরকারকে নিয়ে পুকুর পাড়ে এলো তুলি, যে পুকুরে পড়ে মারা গিয়েছিল তুলির মা রাফেজা খাতুন। মতিন সরকার শান্ত গলায় বললেন, কেমন আছ মা?
তুলি শক্ত মুখে জবাব দিল, ভাল।
- আসলেই মা, তোমার মাথায় অনেক বুদ্ধি। তোমার বুদ্ধির কাছে আমি কিছু না।
বলে একটা স্মিত হাসি দিলেন মতিন সরকার। তুলি পুকুরের পানির দিকে তাকিয়ে বলল, আপনি জীবনে কতগুলো পাপ কাজ করেছেন, জানেন?
- আমি কোন পাপ করিনি। আমি যা করেছি তার কোনটাই কখনও ভুল মনে হয় নি। আমার যা দরকার ছিল, তাই করেছি। প্রয়োজনে করা পাপ, পাপ নয়, সেটা চাহিদা, দরকার।
তুলি অবাক দৃষ্টি ছুড়ে মতিন সরকারের দিকে তাকিয়ে রইল কিছুক্ষণ, এরপর মাথা নিচু করে চলে আসল। মতিন সরকার সেখানেই দাঁড়িয়ে রইলেন। তুলিকে উদ্দেশ্য করে পিছন থেকে বললেন, তোমার প্রতি আমার কোন রাগ বা অভিযোগ নেই মা।
তুলি সে কথা গায়ে লাগাল না। বাড়ির উঠানে কাদের আর কামাল দাঁড়িয়ে। বেশ বলিষ্ঠ দেহ। এরা আগে কাজ করত মতিন সরকারের কথা মত, এখন তুলির কথায় চলে। তুলি তাদের ইশারা করে বলল, কাজ শেষ করে ম্যানেজার চাচার সাথে যোগাযোগ করে যেও।
কাজ করতে চলে যায় কাদের আর কামাল, কাজ পুকুর পাড়ে, মাগুর মাছ ভরা পুকুরে, মতিন সরকারের সাথে।

সব হিসাব শেষ এখন। পুলিশক অফিসারকেও ঠিক মানিয়ে নিয়েছে তুলি। মায়ের কবরের পাশ থেকে তাহেরকে নিয়ে সরে আসল। মতিন সরকারের জানাজা হবে, রাফেজা খাতুনের কবরের পাশেই কবর হবে। তুলি জানালার ফাঁক দিয়ে দেখল কবর দেয়া দেখছে। আজ খারাপ লাগা আসার কথা নয়, আজ খুশির দিন, তবু চোখটা ভিজে আসছে, কার জন্য কী ভেবে জানে না তুলি।

আকাশে মেঘ করে আবার বৃষ্টি নেমেছে। হিসেব করে দেখলে, আজ পূর্ণিমা হবার কথা, মাতাল করা জ্যোৎস্না খেলা করার কথা উঠোন জুড়ে। সে জ্যোৎস্না জল হচ্ছে, বৃষ্টি হয়ে আঁচড়ে পড়ছে, আকাশের বুক হালকা হচ্ছে। জমাট মেঘেরও দরকার মাঝে মাঝে, জ্যোৎস্না গুলোকে আড়াল করে, মেঘ জড়িয়ে বৃষ্টি হয়ে আবছা কালো ব্যথার শেষ দেখার জন্য।

- রিয়াদুল রিয়াদ
সর্বশেষ এডিট : ১৪ ই জানুয়ারি, ২০১৭ সকাল ১১:৩০
২টি মন্তব্য ২টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

একটি মেয়ের দৌড়াদৌড়ি ও একটি মায়ের অপেক্ষা

লিখেছেন এস.এম. আজাদ রহমান, ২০ শে আগস্ট, ২০২৬ সকাল ৮:১৭

একটি মেয়ের দৌড়াদৌড়ি ও একটি মায়ের অপেক্ষা

মঙ্গলবার রাত ১০টা ২৭ মিনিট। গুলশানের একটি হাসপাতালে থেমে গেল ব্যারিস্টার তৌফিক নেওয়াজের হৃদয়- দীর্ঘদিনের অসুস্থতার পর।

আর ঠিক তখন, শহরের অন্য প্রান্তে, মুন্সিগঞ্জ... ...বাকিটুকু পড়ুন

বিকাশ নূরা এবং হিরো আলমকে যারা প্রধানমন্ত্রী ভাবতেন ;)

লিখেছেন জ্যাক স্মিথ, ২০ শে আগস্ট, ২০২৬ দুপুর ২:৩২



একজন মানুষের জ্ঞান-বুদ্ধি, শিক্ষা-দীক্ষা থাকার চাইতেও জরুরী বিষয় হচ্ছে তার অন্তর্দৃষ্টি থাকা। অন্তর্দৃষ্টি, অন্তরচক্ষু বা জ্ঞানচক্ষু সম্পন্ন একজন ব্যক্তিকে কখনোই ধোঁকা দেওয়া বা ধোঁকায় ফেলানো সম্ভব নয় কারণ এরা... ...বাকিটুকু পড়ুন

ঈশ্বর আমার সঙ্গে আছেন

লিখেছেন দানবিক রাক্ষস, ২০ শে আগস্ট, ২০২৬ বিকাল ৩:১০



যুদ্ধের আগে
আকাশের দিকে তাকিয়ে,
মানুষ নিজ নিজ পতাকা ঈশ্বরের রঙে রাঙায়।

প্রথম আঘাতের পর,
প্রথম রক্তের ফোঁটা মাটিতে পড়ার পূর্বে,
মানুষ আকাশের দিকে তাকিয়ে বলে—
"ঈশ্বর আমার সঙ্গে আছেন।"

প্রতিটি যুদ্ধের আছে একেকটি... ...বাকিটুকু পড়ুন

বাঙ্গালী কেন মুসলমান হতে পারে না?

লিখেছেন মুহাম্মদ মামুনূর রশীদ, ২০ শে আগস্ট, ২০২৬ বিকাল ৫:৪৫

অনারব টার্কিশ, কুর্দি আর ইরানিয়ানরা তাদের নিজ নিজ ভাষা ও সংস্কৃতি সংরক্ষন করে ও তা ধারন করেও তারা মুসলিম, পাকিস্তানের পাঞ্জাবীরাও যখন নিজেদের পাঞ্জাবী জাতি হিসেবে অহংকার করে, তখনও তারা... ...বাকিটুকু পড়ুন

গল্পঃ মোহাম্মদপুরে কখনও বিচ্ছেদ হয় না

লিখেছেন রাজসোহান, ২০ শে আগস্ট, ২০২৬ সন্ধ্যা ৭:১৪





আমার দোকানের নাম নিউ শাপলা কম্পিউটার ও ফটোস্ট্যাট। সাইনবোর্ডের শাপলা ফুলটা এঁকে দিয়েছিলো তাজমহল রোডের এক সাইনম্যান, দেখতে হয়েছিলো কচুরিপানার মতো। চৌদ্দ বছর ধরে ঝুলে আছে। রোদে রঙ উঠে... ...বাকিটুকু পড়ুন

×