
বিবিসির একটা প্রবন্ধ থেকে জানতে পারলাম যে সুইজারল্যান্ডে নাকি উনবিংশ শতাব্দীর মধ্যভাগ ভাগ থেকে শুরু করে ১৯৭০ সাল পর্যন্ত রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় দরিদ্র ও বিভিন্ন কারণে সুবিধা বঞ্চিত শিশুদের তাদের পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন করে (অনেক ক্ষেত্রেই বলপূর্বক) নিলামের মাধ্যমে (বিংশ শতাব্দীর প্রথম ভাগ পর্যন্ত) দেশের কৃষকদের পরিবারের কাছে দিয়ে দেয়া হত। সেখানে এই শিশুদেরকে দিয়ে খামারে বা গৃহস্থালির কাজ করান হত। প্রায়শই তাদেরকে মারধোর করা হত, কম খাবার দেয়া হত, নোংরা জায়গায় থাকতে দেয়া হত এমনকি যৌন হয়রানি করা হত। সুইস ভাষায় এ ধরনের শিশুদের বলা হত Verdingkinder যার বাংলা অর্থ ‘চুক্তিবদ্ধ শিশু’।

পরে এই বিষয়ে আরও জানার চেষ্টা করলাম। Verdingkinder নামে একটি ফিচার ফিল্ম ২০১২ সালে তৈরি হয় যেটি সুইস বক্স অফিসে ১ নম্বরে ছিল। একই বছর এই বিষয়ের উপর একটি দেশব্যাপী ভ্রাম্যমাণ প্রদর্শনী হয় যা মানুষের মন কাড়ে। সাধারণত চরম দরিদ্র ঘরের শিশু, অবৈধ সন্তান, এতিম, নেশাগ্রস্ত পিতামাতার সন্তান, পরিবারহারা সন্তান এদেরকে পুনর্বাসনের নামে রাষ্ট্রের নীতিমালা/ আইন অনুসারে এভাবে কৃষকদের কাছে (যারা সস্তা শ্রম চায়) চুক্তির মাধ্যমে দেয়া হত নিলামের মাধ্যমে। রাষ্ট্রের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ ভরণপোষণের জন্য নিলামে নির্ধারিত অর্থ এই কৃষকদের দিত (অনেক ক্ষেত্রে বাচ্চাদের পরিবার থেকেও কিছু অর্থ দেয়া হত)। তবে কৃষক ছাড়াও অনেক ক্ষেত্রে বিভিন্ন কারখানার মালিকরাও এই সব শিশুদের তাদের কারখানার কাজের জন্য নিত। ১৯২০ থেকে ১৯৭০ সাল পর্যন্ত ১ লাখেরও অধিক শিশুকে এভাবে শিশু শ্রমে বাধ্য করা হয়েছিল। এর আগের হিসাব সঠিকভাবে জানা যায় না। সাধারণত শহরের গরীব ঘরগুলি


১। শীতকালে ওরা আমার প্যান্টের পকেট সেলাই করে দিত (যেন আমি পকেটে হাত দিতে না পারি)। তারা বলত, যদি তুমি কাজ কর, তুমি উষ্ণ থাকবে।
২। আমাকে কথা বলতে দেয়া হত না। তারা আমাকে নিয়ে কথা বলত, কিন্তু আমার সাথে কখনও কথা বলত না।
৩। আমাকে আস্তাবলের পাশে একটা ছোট জানালা ছাড়া শেডে বসে খেতে হত। আমাকে কখনও রান্না ঘরে টেবিলে বসে খেতে দেয়া হত না।
৪। আমি যখন স্কুলে যেতাম তখন খুব খুশি লাগত কারণ সেখানে কেউ আমাকে মারত না।
এই প্রদর্শনীর আরেকটা রুমে রাখা হয়েছিল কিছু খামারের যন্ত্রপাতি যেমন মই, কাঠের জুতা, লোহার প্যান, চামড়ার স্ট্র্যাপ্ ইত্যাদি যা দিয়ে এই শিশুদের আঘাত করা হত। শিশুদের পরিবার থেকে চিঠি বা উপহার পাঠানো হলে তা অনেক সময় এই সব শিশুদের দেয়া হত না। সরকারের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ এই শিশুদের জন্য পৃথকভাবে প্রত্যেক শিশুর জন্য খতিয়ান ও নথি রাখত। চার বছরের বাচ্চাকেও অনেক সময় এভাবে শ্রমিক বানানো হত। এরকম একজন শিশু পরবর্তীতে তার ৮ বছর বয়সের সৃতি কথা এভাবে বলেছেন;
“ আমি তাদের উচ্চস্বরে কথা শুনছিলাম আর বুঝেছিলাম যে কোনও একটা সমস্যা হয়েছে। আমি দেখলাম আমার মা পুলিসগুলিকে সিঁড়ির কাছে সরিয়ে দিচ্ছে। তারপর সে ঘরে ঢুকে দরজা লাগিয়ে দিল। পরের দিন ৩ জন পুলিশ আসল। একজন আমার মাকে ধরে রাখল আর আরেক জন আমাকে তার সাথে নিল।"

এভাবে তাকে ৮ বছর বয়সে জোরপূর্বক বাসা থেকে নিয়ে কোনও একটা খামারে পাঠানো হল। এর আগে তার এক ভাই ও এক বোনকেও এভাবে জোর করে ধরে নিয়ে যায়। যে খামারে তাকে নেয়া হয় সেখানে সে সকাল ৮ টা থেকে রাত ১০ পর্যন্ত কাজে নিয়োজিত থাকত (স্কুলের সময় ছাড়া)। বাড়ির মালিক প্রায়শই তাকে মারধর করত। তার মা একবার তাকে ও তার ভাইবোনকে ঘরে ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করেছিল। কিন্তু ৩ দিন পরে পুলিশ তাদের আবার আগের জায়গায় যেতে বাধ্য করে। আরও দুঃখজনক হলও তার মার মৃত্যুর পরে সে কিছু কাগজ পায় যাতে দেখা যায় যে তার মা সেই খামারের মালিকদেরকে তার সন্তানদের ভরণপোষণের জন্য টাকা পাঠাতেন।
একটা মেয়ে শিশুর বর্ণনায় দেখা যায় যে ১৯৭২ সালে ৯ বছর বয়সে তাকে দেয়া হয় একটা বাড়িতে। সেখানে সে ঘর বাড়ি ঝাড়ামোছার কাজ করত (স্কুলের সময়ের আগে ও পরে)। গৃহকর্ত্রী প্রতিদিন তাকে মারত আর যখন তার বয়স ১১ বছর হয় তখন ঐ বাড়ির ছেলেদের দ্বারা যৌন নির্যাতনের স্বীকার হন। এক রাতে ঐ বাড়ির এক মেয়ে ঘটনা দেখে তার মাকে বলে। উত্তরে গৃহকর্ত্রী বলে যে এটা কোনও ব্যাপার না এবং মেয়েটার চরিত্র খারাপ। এলাকার একজন শিক্ষক ও স্কুলের ডাক্তার এ ব্যাপারে কর্তৃপক্ষের বরাবর লেখে কিন্তু কোনও প্রতিকার পাওয়া যায় নি। ( আমাদের দেশ ও আরব দেশের সাথে মিল পাওয়া যাচ্ছে)
এই প্রথা আনুষ্ঠানিকভাবে কিন্তু কখনও সমাপ্তি ঘটানো হয় নাই। পরবর্তীতে আইনের মারপ্যাঁচের মাধ্যমে চালু রাখা হয়। তবে অর্থনৈতিক উন্নতির সাথে সাথে পরে এই প্রথার প্রয়োজন ফুরিয়ে যায়। দরিদ্রতা আর সিঙ্গেল মাদারের ব্যাপারে সমাজের দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তন হয়। এই ব্যাপারে কিছুটা প্রাসঙ্গিক একটা মজার তথ্য হল সুইজারল্যান্ডের মেয়েরা ১৯৭১ সালের আগে ভোট দেয়ার অনুমতি পায়নি। ১৯৭৯ সালের একটা ঘটনা বিবিসি বর্ণনা করেছে। দুইটা শিশু নিয়ে একজন ডিভরসি মহিলা সমস্যায় ছিলেন। রাষ্ট্র এসে হস্তক্ষেপ করে এবং বাচ্চা দুটোকে একটা খামারে পাঠিয়ে দেয় কাজ করার জন্য। একটা বাচ্চা কাজ করতে গেলে তার পায়ের ভিতরে ফরকের ধারাল অংশ ঢুকে যায়। ঘটনাটা তার মাকে জানান হয়নি। তাদের কাজে সন্তুষ্ট না হলে খাবার কমিয়ে দেয়া হত।
সমাজ কর্মীরা মাঝে মাঝে এই খামারগুলি পরিদর্শন করতে যেত। এই খবর তারা আগে থেকে জেনে যেত এবং পরিদর্শনের দিন এই বাচ্চাগুলোকে টেবিলে বসে বাড়ির অন্যদের সাথে খেতে দেয়া হত। সেদিন তাদের দিয়ে কোনও কাজ করান হতোনা। পরিদর্শক তাদের সাথে খেতে বসে কিছু জিজ্ঞেস করলে এই বাচ্চারা ভয়ে চুপ করে থাকত কারণ আগেই তাদের নিষেধ করা থাকত কথা না বলার জন্য।
সরকারের কর্তৃপক্ষের কাছে বাচ্চাদের জন্য রক্ষিত নথিতে নির্যাতনের বিরুদ্ধে পরিবার থেকে করা অভিযোগ গুলি গায়েব করে দেয়া হত ( যা পরবর্তীতে অনুসন্ধানে জানা যায়)। এই শিশুরা ও তাদের পরিবার সমাজে হীনমন্যতায় ভুগত। পরবর্তী জীবনেও অনেকে তাদের অতীতকে লুকাতে চাইত। ২০১৭ সালে সুইস সরকার এই সমস্ত বাচ্চা যারা ক্ষতিপূরণ দাবি করেছে তাদের প্রত্যেককে ২৫,০০০ ফ্রাঙ্ক দিতে সম্মত হয়। এরকম শিশু যারা এখনও জীবিত আছে তার সংখ্যা ১৫,০০০ হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। তবে ৪,৩১০ জন ২০১৭ সাল পর্যন্ত দাবী করেছে বলে জানা যায়।
তবে সব ক্ষেত্রেই যে নির্যাতন হত তা নয়। অনেকে বাচ্চাদের সাথে ভালো ব্যবহারও করত। দ্বিতীয় বিশ্ব যুদ্ধ পর্যন্ত সুইজারল্যান্ড একটি কৃষি নির্ভর দরিদ্র দেশ ছিল। দরিদ্র পরিবারকে সাহায্যের উদ্দেশে সরকারি পৃষ্ঠপোষকতায় ও নীতিমালা অনুযায়ী এভাবে এই ধরণের শিশুদের ও তাদের পরিবারের প্রতি অন্যায় আচরণ করা হয়েছে। আসলে যেসব দেশ এখন অনেক ধনী তাদের মধ্যেও এই ধরণের বিভিন্ন সমস্যা ছিল। তাই আমাদের একদম আশা হত হওয়ার দরকার নাই। শুধরানোর সুযোগ আছে। বর্তমানে সুইস সরকার আনুষ্ঠানিকভাবে দুঃখ প্রকাশ করেছে ও ক্ষতিগ্রস্তদের ক্ষতিপূরণের ব্যবস্থা করেছে। আমাদের দেশের ভিতর রাষ্ট্রীয়ভাবে এধরনের ঘটনার কোনও নজির নেই তবে সামাজিকভাবে আমরা গৃহ কর্মীদের নির্যাতন করে থাকি। আমাদের এই অন্যায় আচরণ পরিবর্তন করতে হবে যদি আমরা নিজেদের একটি সভ্য জাতি হিসাবে পরিচয় দিতে চাই। রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় মধ্যপ্রাচ্যে নারী গৃহ কর্মী পাঠানো একটি ভুল সিদ্ধান্ত ছিল। আমরা না জানার ও না বোঝার ভাণ করে এদেরকে পাঠিয়েছে। আরব দেশ কি জিনিস তা আমরা ১৯৮০ সালেরও আগে থেকে জানি। আশা করি আমরা সকল ধরণের সামাজিক অসাম্য ও বিভাজন থেকে দেশকে রক্ষা করব ও ধীরে ধীরে একটি আদর্শ জাতিতে রুপান্তরিত হবো। আল্লাহ্ আমাদের সেই সামর্থ্য দান করুন। কয়েকটা লিঙ্ক দিলাম যারা আরও জানতে আগ্রহী তাদের জন্য;
BBC News 1
dw 2
swisinfo
সর্বশেষ এডিট : ২৭ শে জুন, ২০২০ রাত ১০:৩০

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


