somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

১৯২০ এর দশকের আরবের বেদুঈন, শহুরে মানুষ ও বাদশাহদের সম্পর্কে জানতে ‘মক্কার পথ’ বইটি পড়ুন

৩০ শে মার্চ, ২০২১ সন্ধ্যা ৭:৪১
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :



‘মক্কার পথ (The Road to Mecca)’, ৩৮৬ পৃষ্ঠার এই মূল বইটি ১৯৫৪ সালে ইংরেজি ভাষায় লিখেছেন মুহাম্মাদ আসাদ। লেখক ১৯০০ সালে অস্ট্রো-হাঙ্গেরীয় সাম্রাজ্যে (বর্তমান ইউক্রেনের লিভিভ) এক ইহুদি রাব্বি (ইহুদি ধর্মযাজক) পরিবারে জন্মগ্রহন করেন। তিনি ১৯২৬ সালে ইহুদি ধর্ম ত্যাগ করে ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেন। ওনার আগের নাম ছিল ‘লিওপোল্ড ওয়েসিস’। উনি একাধারে ছিলেন একজন ভ্রমণকারী, সাংবাদিক, শিক্ষাবিদ, বহুভাষী, ঐতিহাসিক এবং ইসলামী পণ্ডিত।

‘মক্কার পথ’ বইটিকে একটা ভ্রমণ কাহিনী বলা যেতে পারে। আবার এটাকে লেখকের প্রথম জীবনের জীবনীও বলা যেতে পারে। বইয়ের প্রথম অংশে লেখকের বাল্যজীবন এবং তরুণ বয়সের ইউরোপীয় জীবনের বর্ণনা আছে। লেখক ১৪ বছর বয়সে সামরিক বাহিনীতে বয়স ফাঁকি দিয়ে ঢুকলেও তার বাবা তাকে নিয়ে আসেন। পরে পুনরায় ১৮ বছর বয়সে সামরিক বাহিনীতে কিছু সময় ছিলেন। সামরিক বাহিনী ছেড়ে ভিয়েনা বিশ্ববিদ্যালয়ে শিল্প ও দর্শনের উপর পড়াশুনা শুরু করেন। মাঝখানে কিছুদিন চলচ্চিত্র নির্মাতার সহযোগী হিসাবে কাজ করেছেন। এরপর সাংবাদিকতার দিকে ঝোঁকেন।

তরুণ বয়সে লেখক মুহাম্মাদ আসাদ

২২ বছর বয়সে তিনি আরব শহর জেরুজালেমে পৌঁছেন জার্মানের ফ্রাঙ্কফুরটার শাইটুম নামক এক জগত বিখ্যাত পত্রিকার সংবাদদাতা হিসাবে। তখন তিনি সফর করেন মিশর, ফিলিস্তিন, লিবিয়া, জর্ডান, ইরাক, ইরান আফগানিস্তান। এই বছরগুলিতে লেখক আরবের মুসলমানদের জীবন পদ্ধতির উপর আকৃষ্ট হয়ে পড়েন। আরবদের সাথে উটে চড়ে মরুভুমির মধ্যে ভ্রমণ আর অন্তরঙ্গ মেলামশার পর তিনি আবিষ্কার করেন যে আরব মুসলিম সমাজে মন আর ইন্দ্রিয়ের মধ্যে রয়েছে এক সহজাত ভারসাম্য যা ইউরোপ হারিয়ে বসেছে। তিনি তাদের মধ্যে আবিষ্কার করলেন হৃদয়ের নিশ্চয়তা এবং আত্ম অবিশ্বাস থেকে মুক্তি, যে আত্মিক মুক্তি থেকে ইউরোপীয়রা অনেক দূরে। ১৯২৬ সালে ২৬ বছর বয়সে তিনি সস্ত্রীক ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেন।

এরপও আরও ৬ বছর কাটিয়ে দেন সৌদি আরব ও পার্শ্ববর্তী দেশগুলির মরুভুমি, ছোট-বড় শহর আর বেদুঈনদের মাঝে উটে চড়ে ঘুরে ঘুরে। এই সময় তিনি বর্তমান সৌদি আরবের প্রতিষ্ঠাতা বাদশাহ আব্দুল আজিজ ইবনে সউদের ঘনিষ্ঠতা লাভ করতে সমর্থ হন। বাদশাহ তাকে নিজের ছেলের মত স্নেহ করতেন। বাদশাহর ছেলে ফয়সাল, সউদ ( উভয়ে পরবর্তীতে বাদশাহ হন ) এবং রাজপরিবারের অন্যান্য অনেকের সাথে তার বন্ধুত্ব হয়।

আরব দেশগুলিতে তেল পাওয়ার আগে উনি ভ্রমণ করেছিলেন। ১৯৫৪ সালে উনি যখন বই লিখেছেন তখন আরব দেশ তেলের অর্থনীতিতে ফুলে ফেপে উঠেছে। বইয়ের শুরুতে তাই তিনি লিখেছেন পরের অধ্যায়ে আরবের যে বর্ণনা করা হয়েছে তা এখন আর নেই। আরবের নির্জনতা আর সংহতি অকস্মাৎ ধ্বসে পড়েছে প্রবল বেগে উৎক্ষিপ্ত তেলের প্রচণ্ড ধাক্কায়। এর মহৎ সরলতা হারিয়ে গেছে এবং তার সঙ্গে হারিয়ে গেছে অনন্য মানবিকতা। এই হারানো মানবতার কষ্ট নিয়ে তিনি তৎকালীন আরবের পূর্বেকার বেদুঈন জীবনের বর্ণনা দিয়েছেন বইয়ের পাতায় পাতায়। ইহুদি ও খৃস্ট ধর্মের সাথে ইসলামের তুলনা করে তার নিজের অনেক দার্শনিক ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ বর্ণনা করেছেন বিক্ষিপ্তভাবে বইটির বিভিন্ন জায়গায়। বাদশা আব্দুল আজিজের যুদ্ধের অভিযানের কিছু বর্ণনাও আছে বইটিতে।

প্রবীণ বয়সে লেখক মুহাম্মাদ আসাদ

তার এই ভ্রমণ কাহিনীতে বারবার এসেছে বেদুঈনদের সাধাসিধা জীবন, মরুভূমির প্রাকৃতিক সৌন্দর্য, আরবের হরিণ, খরগোশ, বাজপাখি, মরুঝড়, মরুভূমির জীন, আরবদের আতিথিয়তা, পারিবারিক জীবন, নর-নারীর সম্পর্ক, আরব ভূখণ্ড নিয়ে ইউরোপের রাজনীতি, আন্তধর্ম তুলনামুলক বিশ্লেষণ, ইসলামের যৌক্তিক শ্রেষ্ঠত্ব, মুসলমানদের আদর্শগত দীনতা ইত্যাদি। এছাড়া আছে মরুভুমিতে পথ হারিয়ে প্রায় নিশ্চিত মৃত্যু থেকে বেচে যাওয়ার গল্প, বাদশাহ আব্দুল আজিজের জীবনের কিছু উল্লেখযোগ্য ঘটনা, বাদশাহর পক্ষ হয়ে গোপন অভিযান, বাদশাহর নিজের অতি উচ্চতা নিয়ে হীনমন্যতার গল্প।

পরবর্তী জীবনে লেখক মুহাম্মাদ আসাদ ভারতবর্ষে চলে যান। কবি-দার্শনিক আল্লামা ইকবালের বন্ধুত্ব লাভ করেন। কবি ইকবালের অনুপ্রেরনায় মুহাম্মাদ আসাদ সর্বপ্রথম বুখারি শরীফের ইংরেজি অনুবাদ করেন। অস্ট্রিয়ার পাসপোর্ট থাকার কারণে দ্বিতীয় বিশ্ব যুদ্ধের পুরোটা সময় (১৯৩৯-১৯৪৫) আসাদকে জেলে থাকতে হয়। পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পর তিনি পাকিস্তানের প্রথম ব্যক্তি হিসাবে পাসপোর্ট পান এবং জাতিসঙ্ঘে পাকিস্তানের প্রতিনিধিত্ব করেন। মুহাম্মাদ আসাদ শেষ জীবন কাটিয়েছেন স্পেনে। উনি ১৯৯২ সালে ইন্তেকাল করেন। ওনার আরও কয়েকটি বিখ্যাত বই আছে। ওনাকে ওনার জীবনী লেখকরা ‘Europe’s gift to Islam’ বলে অভিহিত করেছেন।

অস্ট্রিয়ার চিত্রনির্মাতা Georg Misch মুহাম্মাদ আসাদের উপর একটি ১ ঘণ্টা ৩২ মিনিটের প্রামাণ্যচিত্র তৈরি করেন ২০০৮ সালে। এটি বিশ্বের বেশ কয়েকটি ফিল্ম ফেস্টিভালে সকলের নজর কাড়ে। ২০০৮ সালে নির্মিত প্রামাণ্যচিত্র

‘মক্কার পথ’ বইটির মূল ইংরেজি ও বাংলা অনুবাদ ‘রকমারি ডট কমে’ পাওয়া যায়। অনুবাদ করেছেন শাহেদ আলী। রকমারিতে মুহাম্মাদ আসাদের আরও কয়েকটি বই পাওয়া যায়।

১। সংঘাতের মুখে ইসলাম
২। Islam at the Cross Roads
৩। ইসলামে রাষ্ট্র ও সরকার পরিচালনার মূলনীতি
৪। The Message of the Quran ( কোরানের ইংরেজি অনুবাদ ও তফসির)
৫। Principle of State and Government in Islam
৬। The Spirit of Islam

সূত্র- মক্কার পথ এবং উইকিপিডিয়া
সর্বশেষ এডিট : ৩০ শে মার্চ, ২০২১ রাত ১০:১৭
১৭টি মন্তব্য ১৬টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

কবিতাঃ পাখির জগত

লিখেছেন ইসিয়াক, ০৯ ই মে, ২০২৬ সকাল ৭:০০



টোনাপাখি লেজ নাচিয়ে গাইছে মধুর গান।
গান শুনে টুনিপাখি আহ্লাদে আটখান।

টোনা যখন উড়ে ঘুরে অন্য ডালে বসে।
টুনি এসে ঠিক তখনই বসে তারই পাশে।

বুলবুলিদের পাড়ায় আজ দারুণ শোরগোল।
নানা শব্দের... ...বাকিটুকু পড়ুন

মোহভঙ্গ!

লিখেছেন এস.এম. আজাদ রহমান, ০৯ ই মে, ২০২৬ সকাল ৭:৪৮



পদ্মা সেতু নিয়ে কত অপবাদই না দেয়া হয়েছিলো! বলা হয়েছিলো- বাংলাদেশ কখনো নিজস্ব অর্থায়নে এত বড় প্রকল্প করতে পারবে না। দুর্নীতির অভিযোগ তুলে বিশ্বব্যাংক সরে দাঁড়ায়। অথচ শেষ পর্যন্ত... ...বাকিটুকু পড়ুন

একাত্তর বাঙালির অভিজ্ঞতা এবং গর্জিয়াস প্রকাশনা উৎসব

লিখেছেন রোকসানা লেইস, ০৯ ই মে, ২০২৬ সকাল ৯:১৭


পহেলা মে বিকেলে একটি আমন্ত্রণ ছিল। অনুষ্ঠানটি ছিল বই প্রকাশনার। এই আয়োজনটি শুরু হয়েছিল বলা যায় এক বছর আগে। যখন একটি লেখা দেওয়ার আমন্ত্রণ এসেছিল। লেখাটি ছিল বিদেশের জীবনযাপনের... ...বাকিটুকু পড়ুন

মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর দৃষ্টি আকর্ষণ করছি

লিখেছেন সত্যপথিক শাইয়্যান, ০৯ ই মে, ২০২৬ দুপুর ১:৪৪



কথা হচ্ছিলো একজন আর্ট সমঝদার মানুষের সাথে। তিনি আক্ষেপ করে বলছিলেন, জীবিতবস্থায় আমাদের দেশে আর্টিস্টদের দাম দেওয়া হয় না। আমাদের দেশের নামকরা অনেক চিত্র শিল্পী ছিলেন, যারা জীবিতবস্থায়... ...বাকিটুকু পড়ুন

মানুষ মারা যাবার পর আবার পৃথিবীতে আসবে?

লিখেছেন রাজীব নুর, ০৯ ই মে, ২০২৬ সন্ধ্যা ৭:১০



আমার মনে হয়, আমরা শেষ জামানায় পৌছে গেছি।
পুরো পৃথিবী ধ্বংস হয়ে যাবে খুব শ্রীঘই। চারিদিকে অনাচার হচ্ছে। মানুষের শরম লজ্জা নাই হয়ে গেছে। পতিতারা সামনে এসে, সে... ...বাকিটুকু পড়ুন

×