somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

সাঁতারুদের আতঙ্কের নাম 'শীত'

২৭ শে ফেব্রুয়ারি, ২০০৬ ভোর ৬:১৬
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

মিরপুর জাতীয় সুইমিং কমপ্লেক্সের ঠান্ডা পানি থেকে উঠেই দু'হাত পেছনে নিয়ে নিজেকে কেমন জানি কুকড়ে নিলেন সাঁতারু রুবেল রানা। তার আগেই তোয়ালে গায়ে চড়িয়ে এক প্রানত্দে দাড়িয়ে ছিলেন আরেক সাঁতারু জুয়েল আহমেদ। একই অবস্থা জাহাঙ্গীর, নাজমুল, নিয়াজ, মিজানেরও। মিরপুর সুইমিং পুলের পানি নিয়ে সবারই ােভ। কিন্তু বলতে পারছেন না কেউ-ই।
18তম কমনওয়েলথ গেমসের আর মাত্র আড়াই মাস বাকি। এ গেমসে শূ্যটিং, সাঁতার, অ্যাথলেটিক্স ও ভারোত্তোলন ইভেন্টে অংশ নেবে বাংলাদেশের ইতিহাসের সর্ববৃহৎ 24 সদস্যের দল। ইতিমধ্যে ক্রীড়াবিদদের নামও আয়োজকদের কাছে পাঠানো হয়ে গেছে। এ গেমসে একমাত্র শূ্যটিং ছাড়া অন্য কোনো ইভেন্টে পদক জয়ের স্বপ্ন দেখছেন না সংশ্লিস্ট কর্মকতর্ারা। বাকি তিন ইভেন্টে বাংলাদেশ 'আরেকবার' অভিজ্ঞতা সঞ্চয়ের জন্য অংশ নেবে। তবে সাঁতার, অ্যাথলেটিক্স ও ভারোত্তোলনের ক্রীড়াবিদরা এটাকে দশম সাউথ এশিয়ান অলিম্পিক (এসএও) গেমসের প্রস্তুতি বলছেন। এখানে সোনালী সম্ভাবনা রয়েছে তিন ইভেন্টের মধ্যে সাঁতারের। কিন্তু ট্রেনিংয়ে সাঁতারুদের সামপ্রতিক পারফর্মেন্স ভাবনায় ফেলে দিয়েছে কর্মকতর্াদের। শীতের কারণে সাঁতারুরা ভালভাবে প্রশিণ চালাতে পারছেন না। প্রশিণ চলতো প্রতিদিন সকাল 9টা থেকে 11টা ও বিকাল 3টা থেকে 5টা পর্যনত্দ। শীতের তীব্রতার কারণে ডিসেম্বরের শেষ সপ্তাহ থেকে দু'বেলার পরিবর্তে একবেলা প্রশিণ চলছে। মাঝে ঈদের জন্য প্রশিণ বন্ধ ছিল 22 জানুয়ারি পর্যনত্দ। এখনও সেভাবেই চলছে। তবে স্ট্রেচিং আর ফিটনেস ট্রেনিংয়ের পাশাপাশি জলমানবদের পানিতে নামতে কষ্ট হচ্ছে। ঠান্ডার মধ্যে প্রশিণ চালিয়ে নেওয়া প্রসঙ্গে ইসলামাবাদ সাফ গেমসে স্বর্ণ জয়ী সাঁতারু রুবেল রানা বলেন, 'ঠান্ডা পানিতে অনুশীলনের ফলে আমাদের প্রায়ই সর্দি, কাশি, জ্বরে ভুগতে হচ্ছে। অনেকের টনসিলও ফুলে উঠছে। বুকের মধ্যে কফ জমে যাচ্ছে। তাছাড়া জ্বর তো হয়ই।' ঠান্ডা পানিতে প্রশিণের আরেকটি সমস্যার কথা তুলে ধরেন জুয়েল আহমেদ। জুয়েলের ভাষ্যানুযায়ী-প্রায়ই মাংসপেশী শক্ত হয়ে যায়। এর ফলে পানিতে ভালভাবে হাত-পা চালানো যায় না। যদি এভাবে প্রশিণ চলে তাহলে প্রত্যাশিত সাফল্য হাতছাড়া হতে পারে বলে আশংকা করছেন সাঁতারুরা। এ ব্যাপারে 200 মিটার ব্রেস্টস্ট্রোকের সাঁতারু জাহাঙ্গীরের মনত্দব্য-শীতে বাংলাদেশে প্রশিণ চালিয়ে নেওয়া কঠিন। তাই এ সময়টাতে বিদেশে প্রশিণের জন্য পাঠানো যেতে পারে। কোচ মাকসুদুর রহমানও কথা প্রসঙ্গে জানান-'ঠান্ডায় সাঁতারুদের প্রশিণে সমস্যা হচ্ছে। শারীরিকভাবেও তারা তিগ্রস্থ হচ্ছে। এটা পরবতর্ীতে প্রভাব ফেলবে।' ঠান্ডা পানিতে প্রশিণের ব্যাপারে সাঁতার ফেডারেশনের সাধারণ সম্পাদক শাহাবুদ্দিন আহমেদ জানান, সাঁতারুরা এ ব্যাপারে গত নভেম্বরের শেষ দিকে আমাদের সাথে কথা বলে। সে সময় আমরা বিষয়টি এসএও গেমসের এক সভায় বাংলাদেশ অলিম্পিক অ্যাসোসিয়েশন (বিওএ)কে জানাই। তখন বলা হয় সেনাবাহিনীর সুইমিং পুলে পানি গরমের ব্যবস্থা করা হবে। সে পর্যনত্দই। বিওএ দায়িত্ব নিয়ে এখন এ ব্যাপারে সহযোগিতা করছে না।'
এসএও গেমসের প্রস্তুতির জন্য সাঁতার ফেডারেশন বিদেশী কোচ এনে দিতে বিওএকে চিঠি দিয়েছে। জাতীয় ক্রীড়া পরিষদ (এনএসসি)র নিবিড় প্রশিণের আওতায় রাশিয়া অথবা চীন থেকে কোচ দেওয়ার জন্য বিওএকে চিঠি দেয় ফেডারেশন। পরবতর্ীতে বিওএ চিঠি দিয়েছে বাংলাদেশস্থ চীন দূতাবাসে। কিন্তু সাঁতারুরা আপাতত বিদেশী কোচ চান না। তারা চাচ্ছেন শীতের এ সময়টাতে বিদেশে প্রশিণ। এ প্রসঙ্গে রুবেল রানা জানান, 'এখন ঠান্ডার কারণে পুলেই নামতে পারছি না। তাহলে বিদেশী কোচ এনে লাভ কি? অযথা কোচের পেছনে পয়সা খরচ। তারচেয়ে ভাল হয় সাঁতারু বিদেশে প্রশিণ পাঠিয়ে দেওয়া। রুবেলের কথায় কিছুটা হলেও সায় দিয়েছেন আরেক কোচ সারওয়ার হোসেন। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে শীতের মৌসুমে অনুশীলন চালিয়ে নেওয়ার জন্য গরম পানির পুল রয়েছে। তাই তারা প্রশিণ চালিয়ে নিতে পারে। কিন্তু আমাদের দেশে সে ব্যবস্থা নেই। ভাল ফলাফল পেতে অবশ্যই পজিটিভ সিদ্ধানত্দ নেওয়া প্রয়োজন। সাঁতারুদের আরেকটি সমস্যা-তারা এখনো হ্যান্ড টাইমিংয়ের মাধ্যমে প্রশিণ নিচ্ছেন। ফলে আনত্দজর্াতিকভাবে তাদের টাইমিং কি হচ্ছে তা তারা জানতে পারছেন না। এদিকটায় দণি এশিয়ার অন্যান্য দেশের সাঁতারুদের চেয়ে পিছিয়ে রয়েছেন। সাঁতারু জুয়েল আহমেদ জানান-ইলেক্ট্রনিক্স স্কোর বোর্ডের মাধ্যমে প্রশিণ করতে না পারায় আনত্দজর্াতিক প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণের আগে নিজেদের সঠিক টাইমিং জানতে পারছি না। ট্রেনিংয়ে হ্যান্ড টাইমিং ধরা হচ্ছে।' 2004 সালের সাফ গেমসে তার ইভেন্টে রৌপ্য পদকের কথা তুলে ধরে বলেন, 'পয়েন্টের কারণে ভারতীয় সাঁতারুর পেছনে পড়তে হয়েছে আমাকে। এটা হয়তো নাও হতে পারত যদি ইলেক্ট্রনিক্স স্কোরবোর্ডের মাধ্যমে অনুশীলণের সুযোগ পেতাম। জানা গেছে, 1993 সালে ঢাকায় অনুষ্ঠিত ষষ্ঠ সাফ গেমসের সময় মিরপুর সুইমিং পুলে ইলেক্ট্রনিক্স বোর্ড বসানো হয়েছিল। এরপর 1997 সালের দিকে তা অকেজো হওয়ার পর সেটাকে আর মেরামতের প্রয়োজন বোধ করেনি এনএসসি। ফলে সাঁতারুদের হ্যান্ড টাইমিংয়ের উপর নির্ভর করতে হচ্ছে। সাঁতার ফেডারেশনের তরফ থেকে এনএসসিকে বেশ কয়েকবার চিঠি দিয়েও কাজ হয়নি বলে জানান সাধারণ সম্পাদক শাহাবুদ্দিন আহমেদ। 'এনএসসির সাবেক পরিচালক (প্রশাসন) মেজর (অব.) এনামুল হক ঘড়িটি ওমেগাকে মেরামতের জন্য দেয়। ওমেগা ঘড়িটি মেরামত করে এনএসসিকে প্রায় দেড় লাখ টাকা বিল জমা দেয়। এনএসসি এ বিল দেখার পর ঘড়ির ফাইলটি চাপা পড়ে যায়।' ওমেগার পল্টনস্থ কাযর্ালয়ে খোজ নিয়ে জানা গেছে দু'বছর ধরে তাদের স্টোরেই পড়ে রয়েছে সুইমিং পুলের ঘড়িটি। ওমেগার নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক কর্মকর্তা জানান, এনএসসির কাছে ঘড়ি মেরামত বিল অতিরিক্ত মনে হয়েছে। তাই তারা আর যোগাযোগ করেনি।'
সর্বশেষ জাতীয় সাঁতারে 50 মিটার ব্যাকস্ট্রোকে ইসলামাবাদ সাফ গেমসের 28.59 সেকেন্ড টাইমিং পেছনে ফেলে 28.52 সেকেন্ডে ফিনিশিং লাইনে পৌছে নতুন সাফ রেকর্ড গড়েন রুবেল রানা। 100 মিটারে 1:1.96 সেকেন্ডে সাঁতার শেষ করে রেকর্ড গড়ে তিনিই সবার আগে ছুঁয়েছেন টাচ লাইন। জাতীয় সাঁতারের এই টাইমিং ধরে রাখতে পারলে সাউথ এশিয়ান অলিম্পিক গেমসে স্বর্ণ পদক জেতা সম্ভব বলে মনে করেন রুবেল। তবে এ জন্য তিনি উন্নত প্রশিণের প্রয়োজনীয়তার কথা উল্লেখ করেছেন। তাছাড়া ভাল মানের প্রশিকের বড্ড অভাব বোধ করছেন সাঁতারুরা। এ কারণে সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও এসএও গেমসে আধিপত্য বিসত্দার করা সম্ভব হচ্ছে না। বিগত দশ বছরে বহু প্রতিভাবান পুরুষ সাঁতারু বেড়িয়ে এসেছেন। তুলনামূলকভাবে প্রমিলা সাঁতারুর ঝলক টিকে রয়েছে সেই সবুরা, ডলি, মেরিনা, মমতাজ শিরিন আর সামপ্রতিক সময় লাবনী আক্তার জুঁইয়ের মধ্যে। কিন্তু ভাল মানের প্রশিণের অভাবে তারা তাদের সামর্থানুযায়ী পারফর্ম করতে পারছেন না বলে মনে করেন রুবেল রানা। কিছুটা হতাশার সাথেই রুবেল বলেন, 'ভাল মানের বিদেশী কোচ প্রয়োজন। ফেডারেশনের দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা থাকতে হবে। বাছাই করা সাঁতারুদের উন্নত প্রশিণের জন্য বিদেশে পাঠানো প্রয়োজন।'
সাঁতারুরা মিরপুর ক্রীড়াপল্লীতে আবাসিক ক্যাম্পে রয়েছেন। কিন্তু আবাসিক ক্যাম্পে যে খাবার দেওয়া হয় তার মান নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন রুবেল। যারা খাবার সরবরাহ করেন তাদের উদ্দেশ্যেই প্রশ্ন করেন, আপনারাই বলেন এ মানের খাবার দিয়ে ক্রীড়াবিদদের উন্নতি কি সম্ভব? সবশেষে জুয়েল আহমেদ বলেন, 'সবাই শুধু সাফল্য চায় কিন্তু সাফল্য এনে দিতে যা করা প্রয়োজন তার ব্যবস্থা কেউ করে না।'
সর্বশেষ এডিট : ৩১ শে ডিসেম্বর, ১৯৬৯ সন্ধ্যা ৭:০০
০টি মন্তব্য ০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

বিষন্ন মেঘের ভেলায় ভেসে....

লিখেছেন ইন্দ্রনীলা, ০২ রা মে, ২০২৬ রাত ১০:২৯



তোমাকে শুধু একটাবার বড় দেখতে ইচ্ছা করে...
এই ইচ্ছায় আমি হয়ে যাই একটা ঘাসফড়িং
কিংবা আসন্ন শীতের লাল ঝরাপাতা,
উড়ে যাই ভেসে যাই দূর থেকে দূরে...
অজানায়...

শরতের কাঁশফুলের পেঁজা তুলো হয়ে
ফুঁড়ে... ...বাকিটুকু পড়ুন

গ্রেইস

লিখেছেন হুমায়রা হারুন, ০৩ রা মে, ২০২৬ রাত ২:০৯


এরা সাড়ে তিনফুট থেকে চারফুট দীর্ঘ,ছোট খাটো,পাতলা গড়ন বিশিষ্ট। চোখগুলো খুব বড়, নাক দৃশ্যমান নয়,ত্বক ছাই বর্ণের,অমসৃণ এবং কুঁচকানো। উন্নত প্রযুক্তি সম্পন্ন। পুরোই... ...বাকিটুকু পড়ুন

মায়ের বুকের ওমে শেষ ঘুম

লিখেছেন শাম্মী নূর-এ-আলম রাজু, ০৩ রা মে, ২০২৬ সকাল ১০:৪৯



আমার নাম তৃশান। সবে তো স্কুলে যাওয়া শুরু করেছি। আজ আমার খুব আনন্দ! বাবা-মা, দিদি আর দাদু-দিদুন মিলে আমরা মস্ত বড় একটা নৌকায় ঘুরছি। দিদি বলছিল এই জায়গাটার নাম জবলপুর।... ...বাকিটুকু পড়ুন

হিন্দু মুসলমান ভুলে গিয়ে, আমরা সবাই মানুষ হই

লিখেছেন রাজীব নুর, ০৩ রা মে, ২০২৬ দুপুর ১:৫৭

আমি জন্মগত ভাবে মুসলমান।
অবশ্য ধর্মীয় নিয়ম কানুন কিছুই মানতে পারি না। মানুষের সবচেয়ে বড় পরিচয় সে মানুষ। এখন তো আর এটা ফকির লালনের যুগ না। মানবিক এবং সচেতন মানুষ... ...বাকিটুকু পড়ুন

নান্দাইলের ইউনুস ও স্বপ্নভঙের বাংলাদেশ

লিখেছেন শ্রাবণধারা, ০৩ রা মে, ২০২৬ বিকাল ৩:৪০


নব্বইয়ের দশকে বিটিভিতে প্রচারিত হুমায়ূন আহমেদের একটি জনপ্রিয় নাটকে একজন ভাড়াটে খুনীর চরিত্র ছিল। ভাড়াটে খুনীর নাম ইউনুস - নান্দাইলের ইউনুস। গ্রামের চেয়ারম্যান তার প্রতিদ্বন্দ্বী একজন ভালো মানুষ স্কুল শিক্ষককে... ...বাকিটুকু পড়ুন

×