ল্যাম্পোস্টকে জড়িয়ে বলি- ডার্লিং !!!!
ওপরের লাইনদুটো উচ্চাংগের আধুনিক কবিতা, যা মুক্তছন্দে লেখা। এটি মুক্তছন্দে লেখা হলেও কিন্তু ছন্দোবদ্ধ দু'টি লাইন। এখানে ছন্দ আছে কিন্তু অন্তমিল নেই। অল্পকথায় এই হলো মুক্তছন্দের বৈশিষ্ট্য।
আমরা যখন ছড়া-কবিতা লিখতাম সেই ৭০ এর দশকে; আমার প্রথম ছড়া ছাপা হয় ১৯৭৭ সালে। আমার ছড়া/কবিতা ইত্তেফাক, সংবাদ, দৈনিক বাংলা, সংগ্রাম, আজাদসহ জাতীয় পত্রিকায় ছাপা হতো--রুকুনুজ্জামান খান দাদাভাই আমার ছড়া প্রথম ছাপেন ইত্তেফাকে।
তখন অক্ষরবৃত্ত, মাত্রাবৃত্ত, স্বরবৃত্ত ইত্যাদি ছন্দই ছিল প্রতিষ্ঠিত এবং প্রচলিত। কিন্তু মুক্তছন্দের নামে পরে আস্তে আস্তে যা এসেছে---তাতেও কিন্তু ছন্দ থাকবেই। ছন্দ ছাড়া ছড়া-কবিতা, গান হয়, তা ইদানিং শুনছি আমি।
আসলে ছন্দ হলো এসবের প্রাণ। সুলিখিত ও উপযুক্ত শব্দ-বাক্যে গঠিত ছড়া-কবিতা-গানকে আবৃত্তি বা পাঠের সময় যে রিদম ও দ্যোতনার ঢেউ সৃষ্টির মাধ্যমে আমাদের হৃদয়-মনকে উদ্বেলিত-আন্দোলিত করে, তাইতো ছন্দ। ছন্দের আকর্ষণেই ছড়া-কবিতা পড়তে মজা পাওয়া যায়।
অথচ অন্তমিলবিহীন মুক্তছন্দের নামে অনেকেই আজকাল রাতারাতি কবি বনে যাচ্ছেন দেখে আমার মাঝে মাঝে হাসিও পায়। আবার যারা শুধু অন্তমিলকেই ছন্দ মনে করে--কবি মধুসুদনের ভাষায় ''শব্দে শব্দে বিয়ে দিলেই কবিতা হয়না''- তারাও বোকামী করে। এদের উচিৎ আধুনিক বা মুক্তছন্দের কবিতা কী বা কাকে বলে তা মধু কবির লেখা থেকে শিখে নেয়া। তার অন্তমিলবিহীন অনেক সনেট অথবা অমিত্রাক্ষর ছন্দের কবিতাগুলো পড়লেই তারা বুঝবে অন্তমিল ছাড়াও দারুণ ছন্দের কবিতা হয়।
এরা ভাবে অন্তমিল ছাড়া লিখলেই তা মুক্তছন্দের আধুনিক কবিতা। ছন্দের কোন দরকার নেই। কী ভুল ধারণা!!
আসলে ছন্দ ছাড়া ছড়া-কবিতা ও গানের অস্তিত্বই নেই-এটা এরা জানেই না। ছন্দ ছাড়া যা হয়--তা আর পদ্য পদবাচ্য নয় স্রেফ গদ্যই হয়ে যায়। তাকে কবিতার আকারে বা পত্রিকার কলামের আকারে সাজালেই কিন্তু কবিতা হয়ে যায়না। তাই যারা ভাবে--পত্রিকার কলামের মত কিছু লাইন কবিতার আদলে সাজিয়ে নিলেই তা আধুনিক মুক্তছন্দের কবিতা হয়ে গেলো, তারা ভুল করে!
তাইতো দেখি--এমন কবিতার নামে পত্রিকার পাতা আজকাল ভরেই যায়, যেন দেশের প্রায় সবাই কবি এবং কবিতা লেখা কতোইনা সহজ?? এসব লেখায় না থাকে পড়ার আকর্ষণ আর না থাকে মুন্সিয়ানা। পড়তে চরম বিরক্তি লাগে। সংশ্লিষ্ট কবি ছাড়া এসব লেখা আজকাল কেউ পড়ে বলে আমার মনে হয়না। তবে এর ফাকে কিছু কিছু ভাল কবির ভাল কবিতাও যে ছাপা হয়না, তা কিন্তু নয়। আমি নিজেই সেসব পড়ে রসাস্বাদন করি।
আমাদের সময় পত্রিকায় সাহিত্যপাতা বা শিশুপাতা দেখতেন একজন করে প্রকৃত সাহিত্যিক এবং অনেক কাঠ-খড় পুড়িয়ে তবে সেসব পত্রিকায় আমাদের লেখা ছাপা হতো। তখন দৈনিক ইত্তেফাকের শিশুতোষ পাতা দেখতেন রুকুনুজ্জামান খান দাদাভাই, দৈনিক বাংলা দেখতেন কবি আফলাতুন, দৈনিক আজাদ দেখতেন আবু নসরত মোহাম্মদ রহমতুল্লাহ, সংগ্রাম দেখতেন জয়নুল আবেদীন আজাদ, ছড়াকার সাজ্জাদ হোসাইন খান প্রমুখ। কিন্তু এখন তার তেমন কিছুর বালাই নেই। শিশু বা সাহিত্যপাতার বিভাগীয় সম্পাদক কবি-সাহিত্যিক না হলেও সমস্যা নেই। মুক্তছন্দের নামে তথকথিত কবির যেমন অভাব নেই তেমনই প্রকৃত সাহিত্যিক সম্পাদক না হলেও সেই পাতাগুলো চালানোর লোকের অভাব কিন্তু এখন নেই। দিন ঠিকই চলে যাচ্ছে, পাতাও চলছে।
আমি মনে করি, মুক্তছন্দের নামে যারা পত্রিকার কলামের মত করে ছন্দহীন কিছু লাইন সাজিয়ে কবিতা লেখে, তারা কোনোদিনই ভাল কবি হবেন না। আর তা পত্রিকায় ছাপা হলেই খুশি হবারও কারণ নেই। তাই লিখতে হলে ছন্দ শিখতেই হবে। নতুবা কবি কবি ভাব, ছন্দের অভাব, থেকেই যাবে?? (চলবে)
সর্বশেষ এডিট : ১২ ই মে, ২০১৪ দুপুর ২:৫৬

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



