শহীদ কবির তার ৪৪ বছরের শিল্পচর্চার জীবনে রিয়ালিজম কে পরিত্যাগ করেননি এবং কৃপণতা ও নিচুতাকে আশ্রয় করে শিল্পে বিনিয়োগ করেননি । একটি মাটির খোরায় ডাল ,ভাতসহ সেই টেম্পারা স্টাইলে । একজন ইউরোপীয় শিল্পীর করা সুপের বাটি দেখে সন্মোহিত শহিদ কবির খুজে পেলেন “আমাদেরও ডালের খোরা আছে”। তো ডালের খোরা আঁকতে গিয়ে আসল হলুদ মরিচের গুড়ো ব্যাবহার করলেন তার পেইন্টিংএ । সুপের বাটির দুঃখ প্রশমিত হল , হাসলেন বিজয়ের হাসি । তার অঙ্কন শৈলীর এই ছোপ ছোপ মার্কা কেয়ারলেস স্টাইলের এক অদ্ভুত ধারনা আমায় প্রচণ্ড আকৃষ্ট করল । ৮০ তে করা এগ টেম্পারা স্টাইল আর এই ধারা একইরকম তবে ক্ষিপ্রতা , দুরন্ত চলাফেরায় ভীষণ পরিপক্কতা এসে ভর করেছে।মাটির বহনযোগ্য উনুনের উপর গরীবের নোংরা ট্যাঁপ খাওয়া অ্যালুমিনিয়ামের পাতিলে ফেনা গড়িয়ে পড়ছে । এই অনুভুতি কিন্তু কখনো আমার মাথায় ঢোকেনি। আগুনের যে শিখা , কি তার রঙ আর বৈচিত্র্যপূর্ণ উপস্থাপনা । বিদেশ বিভূঁইয়ে দীর্ঘবাসী হলে কারো কারো দেশজ মোটিফ এর উপর মায়া পড়ে যায় , অনেকেই মায়কি অধিকাংশই স্কেপটিকাল হয়ে আধুনিক হয়ে যান । কবির দেশ ও জনপদকে ভালোবেসে এবার অনেক ছবি একেছেন । বৃক্ষ নাশ রোধে ফুলের ডাটিকে প্রতিক করে মর্গের টেবিলে শুইয়ে রেখেছেন, টেবিলের নিচ অপঘাতে রক্তাক্ত , তাজা রক্তের বহমানতা । ইটের ভাটায় পরিবেশ দূষণ , অবিন্যাস্ত লাল মৃত্তিকার সড়ক ভীষণ বৃষ্টিতে নরম হয়ে গরুর গাড়ির চাকায় ডেবে লাল,কালচে, হলদে পলিমাটির নানা রঙে সেজে তুড়ি দিয়ে কবিরের ক্যানভাসে আশ্রয় পেয়েছে ,আদৃত হয়েছে । এই রকম মাটির জীবনে এবড়ো থেবড়ো পেড়ি কাদা মাটিতে এতো রঙের খেলা দেখিনি , কবির আমায় দেখতে শেখালেন রঙ দেখার গোপন কৌশল । আসলেই শিল্পকলা তো নিজস্ব অন্তঃচক্ষু দিয়ে অনুভব আর দেখে নেবার এক বর্ণনাহীন কৌশল । তবে স্পেনে থাকতে যেসব সুগার লিফটিং পদ্ধতিতে ছাপাই চিত্রমালায় নিজেকে নিয়োজিত করেছিলেন তার স্বরূপ আর মুল গ্যালারিতে দেশে গত চার বছর করা শিল্পকর্মের দন্ধ প্রচুর । দুই ধারার পাণ্ডিত্যে আমি অভিভূত । সব ক্ষেত্রে প্রায়শই শিল্পী হিপোক্রেট হন আপন বলয়ের প্রকাশে । তারা একটি স্বতন্ত্র ধারা বিনির্মাণে পরিশ্রম করেন অহর্নিশি । একবার হিপক্রেসিতে ধরে গেলে আর খোলশ ছেড়ে বেরুতে চান না । আপনি যদি কিবরিয়ার কথা ধরেন তাহলে বলব তার তৈরি খোলশ একটি ইউনিভার্সাল থিম হয়ে দাঁড়িয়েছিল অতএব পরিবর্তনের প্রয়োজন অনুভুত হয়নি ।শহীদ কবির কিবরিয়াকে গুরু মানতেন এবং এখনও মানেন কিন্তু কিবরিয়ার উল্লেখযোগ্য কোন বিষয় আশয় কে আত্তীকরণ করেননি বা সরাসরি অনুসরন যাকে বলা যায় তাও করেননি , তবুও আমাদের অনেকের(অসংখ্য) মত শহীদ কবির কিবরিয়াকে হৃদয় ও মননে ধারন করেন । আমার নিজস্ব ভাষায় “স্কুল অফ কিবরিয়া” । একটি সাময়িকী আমার এই শব্দগুলিকে সেন্সর করেছিল, বড় ব্যাথা পেয়েছিলাম । পিকাসো তার ইউরোপীয় গুরু । ৮০র ঝাঁকড়া কোঁকড়ানো লম্বা চুলের কবির তার কেশগুচ্ছ খুইয়েছেন ইউরোপ গিয়ে অতঃপর গুরুর মত নিট অ্যান্ড ক্লিন টাক মাথা। প্রথম জীবনে এগ টেম্পারা স্টাইলে লালন কে উপজীব্য করে শহীদ কবিরের সৃষ্টিশীল ছবির চর্চা শুরু । নিজেকে অভিহিত করতেন “রঙ মিস্ত্রি” বলে । লালন সাইকে নিয়ে অনেক ছবি একেছেন । নিজেকে আধুনিক বাউল বেশে সাজিয়ে চলাফেরা করতেন । আমরা বেশকিছু সাগরেদও জুটে গেলাম। ৭৮ সালে কুমিল্লা গেলাম পুরো ক্লাশ মিলে । বিকেলে শালবন বিহারের পাশে শাল গাছের নিচে দোতারা বাজিয়ে গান বাজনা ।
একসময় লালনের কিছু দর্শন তত্বের সাথে দন্ধ শুরু হল , লালন থিম থেকে কিছুটা সরে এলেন । সরকারি চাকরি ছেড়ে ইউরোপ গেলেন নতুন জগত দেখার ইচ্ছা নিয়ে । স্পেনে থিতু হলেন ।
শহীদ কবির জীবনমুখী শিল্পী ।জীবনের তাবৎ রঙকে ক্যানভাসে আটকে নিজেও আনন্দ পান এবং অন্যদেরও আনন্দ দেন । ক্রমশ ৭০ এর দিকে ধাবমান কবির এখনও সুঠাম ও কর্মঠ । আমার প্রথম শিক্ষক শহীদ কবির যেন আজীবন এই রঙ আর মননের ভাণ্ডারকে ধরে রাখেন ।
ছবিঃশাহ আজিজ
[img|http://cms.somewhereinblog.net/ciu/image/187001/small/?token_id=353f0129e85f1d9d59db59007cf0a290
সর্বশেষ এডিট : ১৬ ই জুলাই, ২০১৬ বিকাল ৫:৪১

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



