
লি হুই’র জাপানী নাম কি জানা হয়নি । লি হুই চীনে শিক্ষকদের দেওয়া নাম । ও সিরামিক্সে পিকিংএ পড়ছে আমার স্ত্রীর একই স্কুলে। আমাদের ফ্লোর ম্যাটের ওপর জাপানী কায়দায় বসে লি হুই আমায় এবং আমার স্ত্রীকে বলছিল হিরোশিমার সেই মর্মান্তিক কাহিনী । দরজার কাছেই হিটারে চিকেন ফ্রাই হচ্ছে , আমরা বিয়ার পান করছি । আসলে আগেই একদিন লি হুইকে কারো জন্মদিনে জিজ্ঞাসা করেছিলাম হিরোশিমার কথা । তাই আজ লি হুই সময় দিয়েছে শোনাবে ওর মায়ের গল্প ।
আমার মা তখন অনুঢ়া কিশোরী । হিরোশিমা শহরে বাগানওয়ালা একটি বাড়িতে মা বাবা ভাই বোন সবাইকে নিয়ে বসবাস । দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ চলছে । সাইরেন বাজলেই ঘরে ঢুকে লুকিয়ে পড়ি । আমার বন্ধুদের সাথে পুতুল খেলা বন্ধ । বাগানে বেরুলে কথা হয় , দেখা হয় । মা ভীষণ ব্যাস্ত আমাদের জন্য রান্না বান্না নিয়ে । বাবা অফিস যাচ্ছেন নিয়মিত । মা বাবাকে পই পই করে সাবধান করে দেন । ছয়ই আগস্ট সকাল , বেশ রোদ্দুর উঠেছে । ঝলমলে দিন । মা বাইরের বাগানে কাপড় নাড়ছেন । বাবা বাজারে । সাইরেন বাজলে এখন কেউ ভয় পায় না কারন আজতক এখানে বোমা ফেলেনি কেউ। আমি জানালার পাশে কিছু একটা হাতে নিয়ে দেখছি । হটাৎ ভীষণ ঝলসানো আলো চারিদিকে , মনে হল সূর্য নিচে নেমে এসেছে । আমার সামনে জানালার কাঁচ ফেটে টুকরো হয়ে ছিটকে পড়ল । আমি বিস্ময়ে হতবাক দেখলাম আমার মা লুটিয়ে বাগানে । আমার শরীর দিয়ে রক্ত পড়ছে কিন্তু আমার শরীরে তো আঘাত লাগেনি , রক্ত কেন ? এবার যন্ত্রনা বোধ হল , শরীর কুঁকড়ে যাচ্ছে । আমার ভাই বোনের অবস্থা সুবিধার না । খেয়াল করলাম সবাই আহত আমরা । আমার মা বাগানেই মারা গেছেন , ফুল গাছের ওপর নেতিয়ে আছেন তিনি । ভীষণ হতভম্ব আমি যন্ত্রনা সয়ে বাগানে গেলাম । মা শুয়ে , তার মাথা , শরীর থেকে ফিনকি দিয়ে রক্ত বেরুচ্ছে । আমার ইচ্ছে হল মাকে ছুয়ে দিই কিন্তু এত বেদনা শরীরে যা ক্রমশ বাড়ছে , ইচ্ছে হলনা বা পারলাম না মাকে ছুতে । আমার ভাইবোনরা ধীরে বেরিয়ে এসেছে । আমার শরীর ভেঙ্গে পড়ছে একদম । রাস্তা দিয়ে ধীর পায়ে দুই দিকে দুইহাত ঝুলিয়ে উচুতে রেখে কি কষ্ট করে হাঁটছে সবাই । আমি দুই হাত শরীর থেকে সরিয়ে দেখলাম যন্ত্রনা কিছুটা কম হচ্ছে । গেটের কাছে এগিয়ে ওদের জিজ্ঞাসা করলাম কোথায় যাচ্ছ তোমরা ?
হাসপাতালে । কষ্টকর কণ্ঠের জবাব ।
আমরা পেছনে খালি বাড়ি রেখে বেরিয়ে এলাম । ধীর পায়ে সবার সাথে এগিয়ে যেতে গিয়ে আমার যন্ত্রনা কিছুটা কম মনে হল । হাজার মানুষ হাঁটছি আমরা । সবাই রক্তাক্ত । অনেক সুস্থ মানুষ হাসপাতালে এসে দ্রুত আমাদের সেবা দিচ্ছিল । মাঠ এবং বাগানে তাবু লাগিয়ে আসতে থাকা বিপুল আহত মানুষের সেবা দিতে সুস্থ জাপানীদের সেকি চেষ্টা । ব্যাথার ওষুধ , শরীরে সংক্রমণ এড়াতে ইঞ্জেকশন , মলম লাগিয়ে নিথর পড়ে রইলাম । ডাক্তার আমায় জানালেন তোমার শরীরে কাচের গুড়ো এমনভাবে ঢুকে গেছে যে তা কখনই বের করা যাবেনা । সুস্থ হয়ে বাড়িতে ফিরলাম । বাবা আমার মায়ের মৃতদেহের সৎকার করেছিল অন্যদের সাহায্যে । ধ্বংসস্তূপ হিরোশিমার রাবিশ সরানোর কাজ চলছে । আমেরিকানরা বোমা ফেলেছে হিরোশিমার উপর । আমি বড় হতে লাগলাম । নিত্য ওষুধ আনি হাস্পাতাল থেকে । শারীরিক বেদনা নিত্য সঙ্গী আমার এবং হাজারো হিরোশিমাবাসির । এরই মধ্যে পুনঃগঠন হল হিরোশিমার । আমার বিয়ে হল । আমি পরপর ২০ বছরে সুস্থ ৫ টি শিশুর জন্ম দিয়েছি । আমরা বান্ধবীরা যারা আহত এবং শারীরিক যন্ত্রনায় ভুগি তারা একটা ক্লাব করলাম । প্রতি সপ্তাহে আমরা ধ্যানে বসি যন্ত্রনা লাঘবের জন্য । এখন আমি অবসর নিয়েছি চাকুরি থেকে । ছেলে মেয়েদের বাচ্চা লালন করি কিন্তু ওই যে লক্ষ টুকরা কাঁচ যা কখনই বের করা যাবেনা তা আমাকে বহন করতে হচ্ছে । প্রতি বছর এইদিন ৬ আগস্ট আমরা নগরীর যে দালানের ওপর বোমা ফেলেছিল সেখানে জমায়েত হই ভোর বেলায় । গান গাই যেন এমন বিপদ আর কারো উপর না আসে ।
লি হুই’র চোখ ছল ছল , আমাদেরও । আরেকটু বিয়ার ঢেলে দিলাম ওর গ্লাসে । আমরা চিকেন ফ্রাই খেলাম , সাথে নুডলস , আলু । লি হুইএর একটি ছবি ছিল , খুজে পেলাম না । হারিয়ে গেছে সম্ভবত । এই লেখা লেখার সময় নিশ্চয়ই লি হুইএর মা বেচে নেই , লি হুইও বুড়ি হয়ে গেছে । আমাদের কোন যোগাযোগ নেই ।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


