somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

পোস্টটি যিনি লিখেছেন

সত্যপথিক শাইয়্যান
অন্যদের সেভাবেই দেখি, নিজেকে যেভাবে দেখতে চাই। যারা জীবনকে উপভোগ করতে চান, আমি তাঁদের একজন। সহজ-সরল চিন্তা-ভাবনা করার চেষ্টা করি। আর, খুব ভালো আইডিয়া দিতে পারি।

সৌদি আরব যেভাবে বিশ্বের ধনী দেশগুলোর সাথে পাল্লা দিয়ে একটি অর্থনৈতিক শক্তিতে রূপান্তরিত হলো

০৪ ঠা জুলাই, ২০২৬ সকাল ৭:২২
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :



সৌদি আরবের অর্থনৈতিক রূপান্তর আধুনিক ইতিহাসের অন্যতম বিস্ময়কর এবং দ্রুততম ঘটনা। বিশ শতকের প্রথমার্ধেও যে দেশটি ছিল মূলত যাযাবর বেদুইন, পশুপালন এবং সীমিত হজের আয়ের ওপর নির্ভরশীল একটি চরম অনুন্নত মরুভূমি, আজ ২০২৬ সালে সেই দেশটি বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় ধনী, আধুনিক এবং ভূ-রাজনৈতিকভাবে সবচেয়ে প্রভাবশালী রাষ্ট্রগুলোর একটি।

মরুভূমির যাযাবর সমাজ থেকে বৈশ্বিক অর্থনৈতিক পরাশক্তিতে পরিণত হওয়ার পেছনের সেই রোমাঞ্চকর ও কৌশলগত ইতিহাস নিয়ে একটু অনুসন্ধান করা প্রয়োজন।

তেলের আবিষ্কার: ভাগ্য পরিবর্তনের মূল চাবিকাঠি (১৯৩৮)

সৌদি আরবের ধনী দেশে পরিণত হওয়ার প্রথম এবং সবচেয়ে বড় টার্নিং পয়েন্ট ছিল ১৯৩৮ সালের ৩ মার্চ, যখন দেশটির পূর্বাঞ্চলীয় দাম্মামে বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ খনিজ তেলের সন্ধান মেলে। মার্কিন কোম্পানি স্ট্যান্ডার্ড অয়েলের সাথে যৌথভাবে (যা পরবর্তীতে - অ্যারামকো নামে আত্মপ্রকাশ করে) সৌদি আরব তেল উত্তোলন শুরু করে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর বিশ্বজুড়ে যখন শিল্পায়ন এবং গাড়ির চাহিদা তীব্রভাবে বৃদ্ধি পায়, তখন সৌদি আরব বিশ্বের প্রধান তেল সরবরাহকারীতে পরিণত হয় এবং দেশটিতে বিলিয়ন বিলিয়ন ডলারের রাজকীয় রাজস্ব আসতে শুরু করে।

১৯৭৩ সালের তেল সংকট: রাতারাতি বিলিয়নেয়ার হওয়ার গল্প

১৯৭৩ সালের আরব-ইসরায়েল যুদ্ধের সময় সৌদি আরবের তৎকালীন বাদশা ফয়সাল পশ্চিমা দেশগুলোর বিরুদ্ধে তেল নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেন। এর ফলে বিশ্ববাজারে তেলের দাম রাতারাতি চার গুণ বৃদ্ধি পায়। এই ঘটনাটি সৌদি আরবের অর্থনীতিতে একটি বৈপ্লবিক জোয়ার এনে দেয়। হঠাৎ করে আসা এই বিপুল পরিমাণ "পেট্রোডলার" দিয়ে দেশটি তাদের আধুনিকায়নের প্রথম মহাপরিকল্পনা শুরু করে।



পেট্রোডলারের সঠিক ব্যবহার ও মেগা অবকাঠামো নির্মাণ

তেলের টাকা কেবল বিলাসবহুল জীবনযাপনে ব্যয় না করে, সৌদি শাসকরা সত্তরের দশক থেকে নব্বইয়ের দশকের মধ্যে দেশের অবকাঠামো আমূল বদলে দেওয়ার জন্য রাষ্ট্রীয় তহবিল ঢেলে দেন:

আধুনিক শহর ও বন্দর:
রিয়াদ ও জেদ্দাহর মতো আধুনিক শহর, কিং আবদুল আজিজ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর এবং জুবাইল ও ইয়ানবুর মতো বিশ্বের বৃহত্তম শিল্প নগরী ও বন্দর গড়ে তোলা হয়।

বিনামূল্যে শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবা:
নাগরিকদের জন্য সম্পূর্ণ বিনামূল্যে আধুনিক পশ্চিমা ধাঁচের শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা এবং করমুক্ত জীবনযাত্রার ব্যবস্থা করা হয়। হাজার হাজার সৌদি শিক্ষার্থীকে সম্পূর্ণ সরকারি খরচে ইউরোপ ও আমেরিকার শীর্ষ বিশ্ববিদ্যালয়ে উচ্চশিক্ষার জন্য পাঠানো হয়, যা দেশটিতে একটি উচ্চ-শিক্ষিত ও দক্ষ আমলাতান্ত্রিক শ্রেণী তৈরি করে।

আরামকো এর জাতীয়করণ: অর্থনৈতিক সার্বভৌমত্ব
শুরুতে সৌদি তেলের সিংহভাগ নিয়ন্ত্রণ ও লভ্যাংশ ছিল মার্কিন কোম্পানিগুলোর হাতে। কিন্তু ১৯৭৩ থেকে ১৯৮০ সালের মধ্যে সৌদি সরকার অত্যন্ত সুকৌশলে এবং ধাপে ধাপে আমেরিকানদের শেয়ার কিনে নিয়ে "সাউদি আরামকো"-কে সম্পূর্ণ রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠানে রূপান্তর করে। বর্তমান ২০২৬ সালেও সাউদি আরামকো বিশ্বের সবচেয়ে লাভজনক এবং অন্যতম সর্বোচ্চ বাজার মূল্যের (Market Cap) কোম্পানি, যা দেশের অর্থনৈতিক সার্বভৌমত্ব সম্পূর্ণ সুরক্ষিত রেখেছে।



বর্তমান যুগের রূপান্তর: "ভিশন ২০৩০" ও আধুনিক সৌদি আরব - ২০২৬

তেল সাময়িক সম্পদ এবং এর বাজার চরম ওঠানামা করে—এই সত্যটি উপলব্ধি করে যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান ২০১৬ সালে ঘোষণা করেন "সৌদি ভিশন ২০৩০" বর্তমান ২০২৬ সালে এসে এই মাস্টারপ্ল্যানটি সৌদি আরবকে এক সম্পূর্ণ নতুন উচ্চতায় নিয়ে গেছে:

তেল-বহির্ভূত অর্থনীতি:
সৌদি আরব এখন আর কেবল তেলের ওপর নির্ভরশীল নয়। পর্যটন, বিনোদন, ফিনটেক এবং খনিজ সম্পদ আহরণ খাতের অবদান দেশের জিডিপিতে রেকর্ড পরিমাণ বৃদ্ধি পেয়েছে।

নিয়মকানুনের আধুনিকায়ন:
নারীদের গাড়ি চালানো ও কর্মসংস্থানে অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা, সিনেমা হল উন্মুক্ত করা এবং বিদেশি পর্যটকদের জন্য দরজা খুলে দেওয়ার মাধ্যমে দেশটি একটি রক্ষণশীল সমাজ থেকে আধুনিক ও উদার অর্থনৈতিক হাবে পরিণত হয়েছে।

ফিউচারিস্টিক মেগা প্রজেক্ট:
লোহিত সাগরের উপকূলে তৈরি হচ্ছে বিশ্বের সবচেয়ে হাই-টেক এবং পরিবেশবান্ধব শূন্য-কার্বন শহর নিওম (NEOM) এবং এর ভেতরের ১৭১ কিলোমিটার দীর্ঘ আড়াআড়ি শহর "দ্য লাইন" (The Line), যা দেশটির ভবিষ্যৎ টেকসই সমৃদ্ধির প্রতীক।

অনুসন্ধানমূলক বিশ্লেষণে শেষে দেখা যায়, সৌদি আরবের এই অভাবনীয় উত্থানের পেছনে কেবল 'তেল' নামক প্রাকৃতিক ভাগ্যই একমাত্র কারণ ছিল না; বরং তেলের সেই রাজস্বকে আরামকোর জাতীয়করণের মাধ্যমে নিজেদের নিয়ন্ত্রণে রাখা, অবকাঠামো ও মানবসম্পদে সঠিক বিনিয়োগ এবং বর্তমান ২০২৬ সালের এই বৈপ্লবিক "ভিশন ২০৩০"-এর মাধ্যমে অর্থনীতিকে বহুমুখীকরণ করার দূরদর্শী রাজনৈতিক সিদ্ধান্তই দেশটিকে একটি অনুন্নত মরুভূমি থেকে বিশ্বের অন্যতম শীর্ষ ধনী ও আধুনিক রাষ্ট্রে পরিণত করেছে।
সর্বশেষ এডিট : ০৪ ঠা জুলাই, ২০২৬ সকাল ৭:২২
৪টি মন্তব্য ৪টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

জুলাই: বাঙালি জাতির জন্য এক অভিশাপ ও মূল্যায়ন

লিখেছেন এস.এম. আজাদ রহমান, ০৩ রা জুলাই, ২০২৬ সকাল ১১:০১


জুলাই: বাঙালি জাতির জন্য এক অভিশাপ ও মূল্যায়ন

আমাদের দৃষ্টিতে, তথাকথিত "জুলাই" বাংলাদেশের জন্য কোনো গৌরবের অধ্যায় নয়; বরং এটি জাতীয় ঐক্য, স্বাধীনতা, অর্থনীতি ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে প্রশ্নবিদ্ধ... ...বাকিটুকু পড়ুন

জাপান যেভাবে মাত্র ৭ বছরে অর্থনৈতিক পরাশক্তিতে পরিণত হয়

লিখেছেন সত্যপথিক শাইয়্যান, ০৩ রা জুলাই, ২০২৬ বিকাল ৩:২৭



জাপানের সাবেক প্রধানমন্ত্রী হায়াতো ইকেদা ১৯৬০ সালের শেষভাগে তাঁর বিখ্যাত "ইনকাম ডাবলিং প্ল্যান" বা "আয় দ্বিগুণকরণ পরিকল্পনা" চালু করেন। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ধ্বংসস্তূপ থেকে ফিনিক্স পাখির মতো জাপানের অর্থনৈতিক... ...বাকিটুকু পড়ুন

আমরা কি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার কাছে হেরে যাচ্ছি ০২

লিখেছেন শেরজা তপন, ০৩ রা জুলাই, ২০২৬ বিকাল ৪:৪৪


কাহিনীটা ৯০ এর দশকের শুরুতে। বুশ তখন আমেরিকার প্রেসিডেন্ট- মার্কিনিদের আগ্রাসন চলছে তখন ইরাক জুড়ে। হাটে মাঠে ঘাটে আড্ডায় গল্প আলোচনা মিডিয়ায় এমনকি বাসর ঘরেও তখন নব পরিণীতার সাথে তার... ...বাকিটুকু পড়ুন

ভাংগুক অচলায়তন

লিখেছেন মাসুদ রানা শাহীন, ০৩ রা জুলাই, ২০২৬ সন্ধ্যা ৬:৪৯


ভয় পাবেন না
আশার পিদিম জ্বালিয়ে রাখুন
প্রাণের ধুকপুকি জাগিয়ে রাখুন
হেরে যাবেন না।

ঘাবড়াবেন না
নতুন স্বর ও সাহসী উচ্চারণে অনবদ্য হোন
ক্ষুরধার সৃষ্টির ঔজ্জ্বল্যে উদ্ভাসিত হোন
থামবেন না।

নগদমূল্যে বিকোবেন না
ক্লান্ত শিরায় নতুন রক্ত বইয়ে দিন
তাতিয়ে... ...বাকিটুকু পড়ুন

জাতিসত্তার পরিচয়ের বাজার

লিখেছেন তানভীর রাতুল, ০৪ ঠা জুলাই, ২০২৬ রাত ৩:২১

ইতিহাসে কোনো আদর্শ সত্যিকার অর্থে মরে না। সে শুধু নাম বদলায়, পরাজিত আদর্শেরও পুনর্জন্ম হয়।

১৯৭০ সালের নির্বাচনে পূর্ব পাকিস্তানে মুসলিম লীগ একটি আসনও পায়নি। কিন্তু সেই রাতে মুসলিম লীগ মরেনি,... ...বাকিটুকু পড়ুন

×