
তৎকালীন অ্যাথেন্সের শাসকেরা সক্রেটিসের দ্বান্দ্বিক পদ্ধতি বা প্রশ্নোত্তর পদ্ধতিকে তীব্র ভয় পেতেন। কারণ, এই পদ্ধতিটি কেবল ব্যক্তিগত আলোচনাতেই সীমাবদ্ধ ছিল না, এটি সরাসরি তৎকালীন রাজনৈতিক ব্যবস্থা, দুর্নীতি এবং সমাজকাঠামোকে চ্যালেঞ্জ করছিল। শাসকরা ভয় পাওয়ায় শেষ পর্যন্ত সক্রেটিসকে হেমলক বিষ পানে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হোয়।
ক্ষমতার ভিত্তি এবং কুসংস্কারের মুখোশ উন্মোচন
তৎকালীন অ্যাথেন্সে যারা ক্ষমতায় ছিলেন (রাজনীতিবিদ, কবি, ব্যবসায়ী), তারা নিজেদের মহাজ্ঞানী এবং ঈশ্বরের প্রতিনিধি মনে করতেন। সক্রেটিস যখন হাটে-বাজারে সাধারণ মানুষের সামনে তাদের প্রশ্ন করতে শুরু করলেন, তখন বেরিয়ে এলো যে এই শাসকেরা আসলে চরম অজ্ঞ ও ভণ্ড। সক্রেটিসের প্রশ্ন শাসকদের তথাকথিত 'জ্ঞানের মুখোশ' টেনে খুলে দিত। এর ফলে সাধারণ মানুষের মনে শাসকদের প্রতি ভয় ও অন্ধভক্তি কমে যেতে শুরু করে, যা যেকোনো একনায়ক বা স্বৈরাচারী শাসকের জন্য সবচেয়ে বড় হুমকি।
তরুণ সমাজকে জাগ্রত করা
সক্রেটিসের চারপাশে সবসময় একদল তরুণ ঘুরত (যাদের মধ্যে প্লেটো অন্যতম)। তরুণরা সক্রেটিসের এই প্রশ্ন করার পদ্ধতিটি দারুণভাবে লুফে নেয়। তারা অ্যাথেন্সের প্রথাগত নিয়ম, অন্ধবিশ্বাস এবং শাসকদের অবিবেচকমূলক সিদ্ধান্তকে প্রশ্ন করতে শুরু করে। শাসকেরা ভাবলেন, সক্রেটিস তরুণদের মাথা খারাপ করে দিচ্ছেন এবং প্রচলিত ব্যবস্থার বিরুদ্ধে খেপিয়ে তুলছেন। তাই তার বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিকভাবে 'তরুণ সমাজকে বিপথগামী করার' অভিযোগ আনা হয়।
নতুন দেবদেবীর প্রবর্তন ও প্রচলিত ধর্মের বিরোধিতা
অ্যাথেন্সের সমাজ ছিল বহুতর দেবদেবীর পূজারি এবং সেখানে ধর্মকে রাজনীতির অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করা হতো। সক্রেটিস কোনো অন্ধ আচার মানতেন না, বরং তিনি এক পরম সত্য ও বিবেকের কথা বলতে থাকেন যাকে তিনি Daimonion বা ভেতরের কণ্ঠস্বর নামে অভিহিত করেছিলেন। শাসকেরা এটিকে তাদের প্রচলিত ধর্মের প্রতি অবমাননা হিসেবে প্রচার করে এবং তার বিরুদ্ধে 'অ্যাথেন্সের দেবতাদের অস্বীকার করা ও নতুন ঈশ্বরের ধারণা আনার' অভিযোগ তোলে।
বিচার এবং বীরোচিত মৃত্যু
খ্রিস্টপূর্ব ৩৯৯ অব্দে ৫০০ জন জুরির সামনে সক্রেটিসের বিচার বসে। বিচারে সক্রেটিস চাইলে ক্ষমা চেয়ে দেশত্যাগ করতে পারতেন কিংবা মৃত্যুদণ্ড এড়াতে জরিমানা দিতে পারতেন। কিন্তু তিনি তা করেননি। তিনি আদালতের সামনে দাঁড়িয়ে বুক চিতিয়ে বলেন - "আইন অমান্য করে পালিয়ে যাওয়ার চেয়ে সত্যের পথে থেকে মরে যাওয়া অনেক শ্রেয়।"
তিনি জুরিদের উদ্দেশ্যে আরও বলেছিলেন, অ্যাথেন্স হলো একটি অলস ঘোড়ার মতো, আর তিনি হলেন একটি মাছি, যার কাজ হলো কামড়ে কামড়ে এই ঘোড়াটিকে জাগিয়ে রাখা। তার এই আপসহীন মনোভাব শাসকদের আরও ক্ষুব্ধ করে এবং জুরিরা তাকে দোষী সাব্যস্ত করে বিষ পানে আত্মহত্যার রায় দেয়।
মৃত্যুর দিন সক্রেটিস বিন্দুমাত্র বিচলিত ছিলেন না। তিনি তার ক্রন্দনরত শিষ্যদের সান্ত্বনা দেন এবং পরম শান্তিতে হেমলক বিষের পেয়ালাটি তুলে নিয়ে চুমুক দেন।
সক্রেটিসের এই মৃত্যু প্রমাণ করে যে, ঘৃণা আর গোঁড়ামি সাময়িকভাবে একজন সত্যবাদীকে হত্যা করতে পারে, কিন্তু সত্যের কণ্ঠস্বরকে চিরতরে স্তব্ধ করতে পারে না। সক্রেটিসের মৃত্যুর পর তার শিষ্য প্লেটো এবং পরবর্তীতে অ্যারিস্টটল গ্রিক দর্শনকে এমন এক উচ্চতায় নিয়ে যান, যা আজও পুরো পৃথিবীর চিন্তা জগতকে শাসন করছে।
আপনি কি মনে করেন না সক্রেটিসদের যুগে যুগে আবির্ভূত হওয়া প্রয়োজন?
সর্বশেষ এডিট : ২২ শে সেপ্টেম্বর, ২০২৬ রাত ২:৪৭

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।





