somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

পোস্টটি যিনি লিখেছেন

শাকিল মাহমুদ সুমন
প্রতিনিয়ত নিজেকে জানার ভ্রমনে থাকি। এই ভ্রমনের ফলে নতুন কিছু নিজের ভিতরে আবিষ্কার করতে পারি যেটায় আমি অত্যন্ত আনন্দবোধ করি। এই আবিষ্কারের প্রকাশ এর মাধ্যম আমার অনুভূতি। ভ্রমনের ফলে কখনো অনুভূতি দ্বারা সফলতা প্রকাশিত হয় কখনোবা ব্যর্থতা।

মাঝি বিহীন নৌকার চলন,বাবা বিহীন সন্তানের জীবন একই সূত্রে গাঁথা

১৪ ই ডিসেম্বর, ২০১৮ রাত ৮:৪০
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :


“বাবা”
লেখাঃ শাকিল মাহমুদ সুমন
.
“সুমন সাহেব আপনি ঠিক আপনার বাবার মতই।দেখতে শুনতে,কাজে কর্মে,কথাবার্তায়। জানেন আপনার বাবা অনেক ভালো একজন লোক ছিলেন। অফিসের সকল শ্রেণির কর্মকর্তাদের সাথে অনেক সুন্দর ব্যবহার করতেন। উত্তম মনের অধিকারী ছিলেন লোকটি। কিন্তু ভাগ্যের কি পরিহাস ভালো মানুষগুলোকে আল্লাহ্ খুব তাড়াতাড়ি ছিনিয়ে নেন সকলের কাছ থেকে। জানেন সুমন সাহেব, আপনার বাবা যখন অফিসে আসতো তখন সকলের মুখ হাস্যজ্বল থাকতো, অফিসের কোনো কর্মকর্তার যদি মন খারাপ থাকতো ঠিক কিভাবে যেন তিনি বুঝে যেতেন মন খারাপের বিষয়টি। তারপর উনি তাকে নিজের রুমে ডেকে এনে একান্তভাবে সমস্যাগুলো জানতে চাইতেন এবং তা সমাধান করে দিতেন। সত্যিই লোকটি বড্ড ভালো ছিলেন”।

ইনি রহিম চাচা, আমার কাছে বসে বাবার গল্প শোনাচ্ছেন। আমাদের অফিসের ম্যানেজার তিনি। আমাদের প্রতিষ্ঠানের জন্মলগ্ন থেকেই উনি এখানে আছেন। মাঝে মাঝে অবসরে উনি আমার কাছে আসেন এবং এই প্রতিষ্ঠানের,বাবার এবং বাকি সকলের গল্প শোনান। বাবা মারা যাওয়ার পর অনেকদিন এই প্রতিষ্ঠান দেখাশোনা করেন রহিম চাচা। বাবার খুব পছন্দের এবং বিশ্বাসযোগ্য একজন মানুষ ছিলেন তিনি। আমার স্পষ্ট মনে আছে চাচার গল্প বাবা বাসায় গিয়েও আমাদের কাছে বলতেন।

আমি ঠিক তখন এগারো বছরের একজন কচি শিশু। তখন থেকে আমার খুব ইচ্ছা বাবার অফিসে আসব, বাবার সাথে বসবো, বাবা বিজনেস পার্টনারদের সাথে কিভাবে কথা বলে তা দেখবো, মায়ের হাতে বানানো লাঞ্চ বাবা ও আমি একসাথে খাবো, ১টার দিকে আজান হলে বাবার সাথে মসজিদে গিয়ে নামাজ পড়বো।

ইশ! ইচ্ছে করছে আবারও ফিরে পেতে সময়গুলো। আমার স্কুল যেদিন বন্ধ থাকতো সেদিন বাবাকে রিকুয়েস্ট করতাম আজ যেন বাবা আমায় অফিসে নিয়ে যায় নয়তো বাহানা ধরতাম-না নিলে আজ সারাদিন আমি কিছুই খাবোনা। বাবা মাঝেমাঝে আমায় নিতে দ্বিধাবোধ করতেন কারণ তিনি বলতেন-
‘বাবা ঢাকা হচ্ছে গাড়ির শহর, এখানে প্রায়শই দূর্ঘটনা ঘটে, তুমি ছোট মানুষ কিছু হলে অনেক ব্যাথা পাবে তাই তোমাকে যেতে হবে না। যেদিন রাস্তা ফাকা থাকবে সেদিন তোমায় আমি নিয়ে যাবো’।

আমার বয়স যখন বিশ তখনও বাবার কাছে আমি এই বাহানাগুলো করতাম। আর বাবাও হয়তো মনে করতেন তার সেই এগারো বছরের ছোট্টো সুমন তাকে রিকুয়েস্ট করছে অফিসে নিয়ে যেতে। বাবার শাহাদাৎ আঙুলের ডগায় ধরে হাটতাম একসাথে। বাবা-মায়ের একমাত্র সন্তান আমি। বাবা অনেক স্বপ্ন দেখতেন আমায় নিয়ে একদিন আমি অফিসের দায়িত্ব কাঁধে নিবো,বাবার মতো সৎ হবো। আজ আমি অফিসের দায়িত্ব কাঁধে নিয়েছি, বাবা যে পথ আমাকে দেখিয়েছেন আমি ঠিক সেই পথেই এগোচ্ছি।

আমার খুব মনে পড়ে বাবা যখন অসুস্থ অবস্থায় বিছানায় পড়েছিলেন তখন আমাকে ডেকে নিয়ে তিনি তার পাশে বসাতেন, মাথায় হাত বুলিয়ে দিতেন। আমায় বলতেন কখনও যেন মিথ্যা কথা না বলি,কারো সাথে খারাপ আচরণ যেন না করি, সর্বদা সৎ পথে যেন থাকি। বাবা প্রায়শই আমায় নেলসন মেন্ডেলার সেই বিখ্যাত প্রবাদটি বলতেন-

“সম্মান তাদের প্রাপ্য
যারা কখনো সত্যকে
পরিত্যাগ করে না,
এমনকি পরিস্থিতি যখন
অন্ধকারচ্ছন্ন এবং বেদনাদায়ক”।

বাবা যখন কথাগুলো বলতেন তখন কেন জানি অজানা এক ব্যাথায় চোখ থেকে ঝরঝর করে পানি বেরিয়ে আসত। বাবা তখন আমায় বুকে জড়িয়ে নিয়ে সান্ত্বনা দিতেন।

সকাল বেলা ভার্সিটি যেতাম বাবাকে ঔষধ খাইয়ে, দুপুরে মা খাওয়াত, রাতে আবার আমি খাইয়ে দিতাম। বাবার বয়স হয়ে গেছে ধীরে ধীরে আরও অসুস্থ হয়ে যাচ্ছেন। অফিস দেখাশোনার দায়িত্বে আছেন রহিম চাচা। দীর্ঘদিন অফিসের ভার চাচার কাঁধেই ছিল। হঠাৎ একদিন যখন আমি ভার্সিটিতে মা ফোন করে বাবার গুরুতর অসুস্থতার কথা জানান। মাকে বলে দিয়েছিলাম বাবাকে স্কয়ার হসপিটালে নিয়ে যেতে আমি সেখানে আসছি। কিন্তু ততক্ষণে আল্লাহ্ বাবাকে আর বাঁচিয়ে রাখেননি। বাবা চলে গেছেন ওপাড়ে, আমায় এতিম করে দিয়ে। মা কান্না মিশ্রিত কন্ঠে খবরটুকু আমায় দিলেন। বাবাকে আর হসপিটালে নেওয়া হয়নি, মাঝপথ থেকে গাড়ি ঘুরিয়ে নিয়ে আসা হয় বাড়িতে।

সেই যে বাবা চলে গেলেন তারপর থেকে বঞ্চিত হয়ে যাই বাবার ভালবাসা,আদর,স্নেহ থেকে,অনুপ্রেরণা থেকে। কিন্তু বাবার আদর্শকে আমি আমার ভিতর লালন করি। নিলাম অফিসের ভার, শুরু হলো এক নতুন জীবন। আজ ডিসেম্বরের ৮তারিখ, এই দিনটিতেই বাবা চলে যান পৃথিবীর মায়া ত্যাগ করে। জানি আজ অফিস শেষে যখন মায়ের কাছে যাব তখনই দেখব মা বাবার চশমা,পাঞ্জাবি,স্যুট সামনে নিয়ে কাঁদছেন। এটাই হয়ে আসছে বিগত আটটি বছর। আর এই রাতে আমার ঘুম হয়নি কখনও, মাঝরাতে বাড়ির চিলেকোঠার পাশে বসে আকাশপানে তাকিয়ে কাঁদি বাবার জন্য। সেই গোপন কান্না আল্লাহ্ এবং বাবা ছাড়া কেউ জানেন না। বাবা তোমাকে খুব দরকার খুব খুব।
সর্বশেষ এডিট : ১৪ ই ডিসেম্বর, ২০১৮ রাত ৮:৫১
৭টি মন্তব্য ০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

শুধু উপবাস নয়, আত্মশুদ্ধি অর্জনই রোজার মূল উদ্দেশ্য

লিখেছেন নতুন নকিব, ০৪ ঠা ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ সকাল ৯:০১

শুধু উপবাস নয়, আত্মশুদ্ধি অর্জনই রোজার মূল উদ্দেশ্য

ছবি, সংগৃহিত।

সারসংক্ষেপ

রমজানের রোজা ইসলামের অন্যতম মৌলিক ইবাদত। সাধারণ মুসলিম সমাজে রোজা ভঙ্গের ধারণা প্রধানত পানাহার ও যৌন সংসর্গের মধ্যেই সীমাবদ্ধ। অথচ কুরআন,... ...বাকিটুকু পড়ুন

ভ্রমণব্লগ: আলোছায়ার ঝলকে এক অপার্থিব যাত্রা”

লিখেছেন কলিমুদ্দি দফাদার, ০৪ ঠা ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ বিকাল ৩:৫৬

মালয়েশিয়া আমার বেশ পছন্দের একটি দেশ। আমার জীবনের একটি অংশের হাজারো স্মৃতি এই দেশে। একটা সময় ছিল যখন এই দেশ ছিল আমার সেকেন্ড হোম।‌ এখন ও আমার আত্নীয়-স্বজন, ঘনিষ্ঠ বন্ধু-বান্ধবের... ...বাকিটুকু পড়ুন

Will you remember me in ten years!

লিখেছেন করুণাধারা, ০৪ ঠা ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ রাত ৮:৫৫



উপরের ছবিটি ২০১৫ সালের জানুয়ারিতে একজন ব্লগার তার এক পোস্টে দিয়েছিলেন। জানতে চেয়েছিলেন দশ বছর পর কেউ তাকে মনে রাখবে কিনা!! গতমাসে এই পোস্ট যখন আমার নজরে এলো, হিসাব... ...বাকিটুকু পড়ুন

মানুষ

লিখেছেন বিপ্লব০০৭, ০৪ ঠা ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ রাত ৯:৫৭



মানুষ আসলে কী?

Sophies Verden কেতাবে নরওয়েজিয়ান ইয়স্তেন গার্ডার (Jostein Gaarder) এক বিশাল বয়ান পেশ করেছেন ছোট্ট মেয়ে সোফির জীবনের গল্প বলতে বলতে। নীতি-নৈতিকতা, জীবন-জগৎ, সৃষ্টি নিয়ে সোফির ধারণা ছিলো... ...বাকিটুকু পড়ুন

শোনো হে রাষ্ট্র শোনো

লিখেছেন রানার ব্লগ, ০৪ ঠা ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ রাত ১১:০২


নিশ্চল শহরে আজ ক্ষুধারা হাঁটে পায়ে পায়ে
ফুটপাথে শুয়ে রয় ক্ষুদার্ত মুখ।
চালের বস্তার সেলাই হয়নি ছেড়া,
রুটির দোকানে আগুন ওঠেনি জ্বলে।
ক্ষুদার্ত আধার জাপটে ধরে আষ্টেপৃষ্টে।

আমার চোখ লাল, ভেবো না নেশায়... ...বাকিটুকু পড়ুন

×