somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

নির্লিপ্ত ক্ষারীয় দ্রবণ, পর্ব 1(ছোট গল্প)

২৫ শে জুন, ২০০৬ বিকাল ৩:০০
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

নির্লিপ্ত ারীয় দ্রবণ, পর্ব 1

একটা পুরোনো বাথটাবে তিন দিনের পুরানো পানিতে গলা পর্যন্ত ডুবিয়ে শুয়ে আছি। এখন আর শুয়ে আছি বললে পুরোপুরি ঠিক বলা হবেনা আসলে আটকে গেছি। ঘরের ঘোলাটে হলুদ বাল্বটা একটু পরপর বাতাসে দুলছে। শীতকাল এসে গেলেও দীর্ঘদিনের জংধরা জানালা বন্ধ করার কোন উপায় নেই। এমনকি আমি বাথটাব থেকে উঠে যে একটু চেষ্টা করব সেটাও এখন আর সম্ভব নয়। যেমন সম্ভব নয় ফিন্কি দিয়ে বের হওয়া রক্তের স্্েরাতটাকে কোনকিছূ দিয়ে চেপে আটকানো। আমার দুহাতই এখন অকার্যকর, অনেকটা পাঘাতগ্রস্থ। একটা বাথটাব ছাড়িয়ে ডান পাশে নিথর ঝুলে আছে, আরেকটা আদৌ আছে কিনা বুঝতে পারছিনা। দেখতে পাচ্ছি এরই মধ্যে রক্তের স্্েরাতটা ক্রমান্বয়ে কমে আসছে। রক্তের আগের ছেলেমানুষি আর নেই, অনেকটা বয়ষ্ক মানুষের মত আচরণ শুরু করেছে, যেন ভিজে নরম হয়ে যাওয়া শরীর হতে বেরিয়ে যেতে এখন আর তার খুব ইচ্ছে নেই। তবে স্পষ্ট বুঝতে পারছি এভাবে ধীর লয়ে বেরোতে থাকলেও পুরোপুরি মরে যেতে খুব বেশি দেরী হবেনা। কিন্তু ঠিক এই মুহূর্তে আমার মরতে ইচ্ছে করছে না। আমার প্রচন্ড ঠান্ডা লাগছে, মনে হচ্ছে কেউ যদি ঘরটাকে, আরো ভালো হত যদি বাথটাবের পানিটাকে একটু উষ্ণ করার ব্যবস্থা্ করত। আসলে আমার সবগুলো কাজই এরকম, একবার ঘটিয়ে ফেললে ফেরার আর কোন উপায় থাকেনা।

যেমন হঠাৎ করেই এখন বুঝতে পারছি নিজের সামনে নিজের মৃতু্যর ঘটনাটা পুরোপুরি সম্পন্ন হতে দেখার আগ পর্যন্ত কোনভাবেই আমার ঘুম ভাঙ্গবেনা। বাল্বের উপর থেকে, জানালার ফাঁকা অংশটা থেকে, দরজার নিচ দিয়ে আসা ছায়াগুলো থেকে, এভাবে উপর নিচ ভেতর বাহির কাছে দূরে সবগুলো কোণ থেকে ক্রমে ক্রমে আমার মৃতু্যর পুরো প্রক্রিয়াটি খুটিয়ে খুটিয়ে না দেখা পর্যন্ত আমার স্বপ্ন শেষ হবেনা। মাঝে মাঝে এমন হয়, স্বপ্ন দেখছি বুঝতে পেরেও স্বপ্ন থেকে বেরিয়ে আসা যায়না, মনে হয় একটা স্বপ্নের মধ্যেই অন্য একটা স্বপ্নে রয়েছি। এর ভেতরেও একটা, তারপরে আরেকটা আবার সবগুলো একসাথে।
যে স্বপ্নটি আমার ইচ্ছানিরপে ও ঘুমের অসহায় অবস্থাতেই শুরু হয়ে,গেছে সেটির চক্র পূর্ণ না হওয়া পর্যন্ত কোনকিছুকে নিয়ন্ত্রণ করার মতা আমার নেই। হয়ত অনেক দিন পর আমি স্বপ্নটা দেখা শুরু করেছি, হয়ত স্বপ্নের গতির সাথে সাথে আস্তে আস্তে পুরো স্বপ্নটা আমার মনে হতে থাকবে। যখন স্বপ্নটা শেষ হবে তখন সত্যিকার অর্থেই আমি হয়ত ঘুমিয়ে পড়ব। কিন্তু এ মুহূর্তে এই ভয়ানক আত্মঘাতী স্বপ্ন থেকে আমার মুক্তি নেই।

এদিকে স্বপ্নের মধ্যেই; আমি একটা অসম্ভব সিদ্ধান্ত নেবার চেষ্টা করলাম, কারণ স্বপ্ন দেখছি বুঝতে পেরে সিদ্ধান্ত নেয়া ততণে আমার জন্য অনেকটা সহজ এসেছে। যেহেতু স্বপ্নটা থেকে আমি বেরুতে পারছিনা অনেকটা বাধ্য হয়ে তাই বাথটাবে শুয়ে থাকা আমার নিথর শরীরের দিকে তাকিয়ে সে কি করছে সেটা জানার জন্য চেষ্টা করতে করলাম। একটা ভয়ংকর কান্তি অনুভূত হল, শীতল, ঘোলাটে হলদে পরিবেশে চোখ খুলে মনে হল বাথটাব থেকে বাল্বটা যেন অনেক উঁচুতে উঠে গেছে, সারা শরীর যেন ভাসমান পারদের মত বিচ্ছিন্ন হতে শুরু করেছে। কব্জিগুলো থেকে হাতের বাকী অংশও যেন অনেক দূরে সরে গেছে। প্রচন্ড ঠান্ডায় সারা শরীর ঠক্ঠক্ করে কাঁপছে এবং বাথটাবের লালচে কালো পানিতে একটা মৃদূ আন্দোলনও যেন তৈরী হয়েছে। আমি একটা শীতল অন্ধকারে আক্রান্ত হলাম। এদিকে মৃতু্য ভয়টা এতটা জোরালো হয়ে উঠেছে যে বাথটাবের বাইরের শূণ্যে বিচরণশীল পর্যবেক আমি তখন মনে করার চেষ্টা করছি পানিটার রং শেষ পর্যন্ত কি হয়, গত স্বপ্নে এর রং যেন কি ছিল, আমি কি স্বপ্নটা আবার দেখছি? আমার অস্তিত্ব তাহলে কয়টি? স্বপ্নের মধ্যে কয়টি আমি? - প্রশ্নগুলো কয়েকবার ঝিলিক দিয়েই হারিয়ে গেল। আর তখনই, এই ভয়ানক স্বপ্নের মধ্যেই আমার মনে হল কোন কিছু নিয়ে সিদ্ধান্ত নেবার কথা; মনে হল আমার এমন কিছু চিন্তা করা উচিৎ যাতে স্বপ্নটা আমি আর না দেখি। কিন্তু আমি অপারগ, আমার ক্রমশ নিস্তেজ হয়ে যাওয়া শরীর এবং চলমান স্বপ্নের বিভীষিকা আমাকে যেন বলছে কোনভাবেই এই স্বপ্ন থেকে আমার মুক্তি নেই। তবুও শুধু বেঁচে থাকার কোন আদিম তাড়ণা স্বপ্নের মধ্যেই স্বপ্ন থেকে মুক্ত হবার একটা সম্ভাব্য পথ যেন দেখাল। মনে হল, যেভাবেই হোক এই স্বপ্নটা আমাকে লিখে ফেলতে হবে। আর তাই চলমান স্বপ্নের বিভিষীকার মধ্যে আমি সিদ্ধান্ত নিলাম যে ঘুম থেকে উঠেই এই স্বপ্নটা আমি পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে লিখে রাখব।


পরদিন। ব্যাম্বু ক্যাসেলে বসে আইক্রীম খাচ্ছি। টেবিলের অপর প্রান্তে লিসা। লাভফ্রুটের উপরের অংশটা শেষ করার পর ভেতরটা খুব যত্ন করে সময় নিয়ে খাচ্ছে। ফোঁটা ফোঁটা কুয়াশা জমা কাঁচের পেয়ালার
ভেতর দিয়ে ভ্যানিলার উপর লাল রংয়ের হৃদয় আকৃতির শিল্পকর্মটা আমাকে চুম্বকের মত আটকে রেখেছে। ওর আইসক্রীমের দিকে আমার অপলক দৃষ্টি দেখে লিসা খাওয়া থামিয়ে লজ্জিত ভঙ্গিতে আমার দিকে তাকাল।
অস্বস্তি দূর করার জন্য আমি বললাম, "কি চমৎকার ডিজাইন, দেখছ"?
লিসা বলল এজন্যই তো আমি এটা এত পছন্দ করি।
আপনি কি আমারটা থেকে একটু খাবেন?
আমি একটু অপ্রস্তুত হয়ে উত্তর দিলাম,
না ঠিক আছে, তোমার জন্য কি আরেকটা অর্ডার দেব?
ঠোঁটের কোণায় কিঞ্চিত হেসে ও বলল,
আগে এটা তো শেষ করি, তারপর দেখা যাবে।
আমরা আরো কিছুণ নি:শব্দ থেকে চুপচাপ আইসক্রীম শেষ করলাম।
সর্বশেষ এডিট : ২৬ শে জুন, ২০০৬ রাত ৩:১৫
৮টি মন্তব্য ০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

কিংকর্তব্যবিমূঢ়

লিখেছেন ইফতেখার ভূইয়া, ০৫ ই মে, ২০২৬ রাত ৯:৩৩


দীর্ঘদিন আগে আমার ব্যক্তিগত ব্লগ সাইটের কোন এক পোস্টে ঘটা করে জানান দিয়ে ফেইসবুক থেকে বিদায় নিয়েছিলাম। কারণ ছিলো খুব সাধারন বিষয়, সময় অপচয়। স্ক্রল করে করে মানুষের আদ্য-পান্ত জেনে... ...বাকিটুকু পড়ুন

গেরুয়া মানচিত্রে পশ্চিমবঙ্গ: একটি রাজনৈতিক বিশ্লেষণ ও শিক্ষা।

লিখেছেন কলিমুদ্দি দফাদার, ০৫ ই মে, ২০২৬ রাত ১০:৩৮


দীর্ঘ ১৫ বছরের টিএমসির শাসনের সমাপ্তি ঘটিয়ে অবশেষে বাংলাদেশের সীমান্তবর্তী ভারতীয় রাজ্য পশ্চিমবঙ্গে ক্ষমতার পালাবদল হয়েছে। গেরুয়া শিবিরের এই ভূমিধস জয়ের পেছনে অবশ্য মোদি ম্যাজিকের চেয়ে সাবেক মুখ্যমন্ত্রী মমতার ব্যর্থতার... ...বাকিটুকু পড়ুন

নিজের দোষ দেখা যায় না, পরের দোষ গুনে সারা

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ০৬ ই মে, ২০২৬ রাত ২:১০


ভারতের বিধানসভা নির্বাচনে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের পতন নিয়ে বাংলাদেশে যে পরিমাণ চুলচেরা বিশ্লেষণ হচ্ছে, তা দেখে অবাক না হয়ে উপায় নেই। সোশ্যাল মিডিয়ায় ঢুকলেই দেখা যায় অদ্ভুত সব তত্ত্ব। ফেইসবুক... ...বাকিটুকু পড়ুন

পশ্চিমবঙ্গে বিজেপির জয়: সব কিছু ভেঙে পড়ে

লিখেছেন শ্রাবণধারা, ০৬ ই মে, ২০২৬ দুপুর ২:২৮


"তোমরা যেখানে সাধ চলে যাও - আমি এই বাংলার পারে
র’য়ে যাব; দেখিব কাঁঠালপাতা ঝরিতেছে ভোরের বাতাসে;
দেখিব খয়েরি ডানা শালিখের..."

জীবনানন্দ দাশ ''রূপসী বাংলা'র কবিতাগুলো বরিশালে তাঁর পৈতৃক বাড়িতে বসে লিখেছিলেন। জীবনানন্দের... ...বাকিটুকু পড়ুন

আপার কারণে দিদি হেরেছন

লিখেছেন মহাজাগতিক চিন্তা, ০৬ ই মে, ২০২৬ বিকাল ৩:০৩




আপা এপারের হিন্দুদেরকে স্নেহ করতেন তাতে ওপারের হিন্দু খুশী ছিল। আপা ভারতে বেড়াতে গেলে মোদীর আতিথ্যে আপা খুশী। কিন্তু আপার আতিথ্যে দিদি কোন অবদান রাখলেন না। তাতে হিন্দু... ...বাকিটুকু পড়ুন

×