somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

ক্রিশ/পে চেক: আমাদের নিরন্তর হিরোদের খোঁজ

০৩ রা জুলাই, ২০০৬ সকাল ৮:০২
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

পপুলার ডিসকোর্সে সিনেমা একটা শক্তিশালী প্রভাবক মাধ্যম। গতকালই ক্রিস মুভিটা দেখলাম। আর সেটির বিভিন্ন দিক নিয়েই আজকের বিশ্লেষণ। প্রথমেই স্পষ্ট করা প্রয়োজন যে সিনেমা কি উৎকৃষ্ট শিল্প , এই বিতর্ককে নির্দেশ করা লেখার উদ্দেশ্য নয়। বরং একজন নৃবিজ্ঞানীর বিনোদন মাধ্যম পর্যবেণ এর শিরোনাম হতে পারত।

ক্রিশ সিনেমার প্রথমেই চোখে পড়ে বিনোদন বানিজ্যের সূ কিছু বিষয়। যেমন টার্গেট অডিয়েন্স হিসেবে শিশুদের, তরূন তরূনীদের, বয়স্ক ও গৃহবধুদের ল্য করে যে ঘটনা বিন্যাস তৈরী হয়েছে তা কতগুলো বিশেষ কোম্পানীর পণ্য বিস্তার এবং স্বয়ং একটি রাষ্ট্র হিসেবে সিঙ্গাপুরের পর্যটন বানিজ্যের প্রচারণাকে প্রকাশ করে। যেমন: ক্রিশ হতে হলে ছোটবেলা থেকে কি খেতে হবে? খেতে হবে বর্ণ ভিটা। ক্রিশের দাদী কি দিয়ে কাপড় কাঁচেন? টাইড ডিটারজেন্ট পাউডার। ক্রিশ যখন তরুন বা যুবক হয়ে ওঠে প্রেম করার জন্য উপযুক্ত হয় তখন যোগাযোগের জন্য প্রয়োজন পড়ে কি? স্যামসাং মোবাইল, ল্যাপটপ, ক্যামকর্ডার ইত্যাদি। ইন্ডিয়ার লোকেশন ভালো হলেও ক্রিশ কোথায় সত্যিকারের হিরো হয়ে ওঠে?
পর্যটন নগরী সিঙ্গাপুরে। গণমাধ্যম হিসেবে কে এগিয়ে আসে? সিঙ্গাপুরের স্টার নেটওয়ার্ক।
আমরা পরিচিত হতে থাকি প্রচার ও প্রসারে টিভি মিডিয়ার শক্তিমত্তাকে, বিশেষভাবে টিআরপিকে।

সিনেমার বৌদ্ধিক ঋণের জায়গা হিসেবে সরাসরি এসেছে হলিউডের পে চেক সিনেমাটি। ভবিষ্যৎ দর্শনের যে প্রযুক্তি ও ধারণা তা সরাসরি এটি থেকেই এসেছে। আবার সুপারম্যান, স্পাইডার ম্যানের নায়ক বা নায়িকাদের সাথে সরাসরি প্রিন্ট মিডিয়ার যে যোগাযোগ দেখতে পাওয়া যায় সেটিরও একটি উপযোগী এডাপটেশন এখানে উপস্থিত। এই এডাপটেশন আমরা দেখতে পাই সিনেমার প্রতিটি েেত্র। আর এটাই হল সিনেমাটি নির্মাণের বিহাইন্ড দ্যা সিনের ঘটনা।

কিন্তু প্রশ্ন থাকে সিনেমাটির যৌক্তিকতা কি? প্রতিটি সিনেমা প্রকাশ্যে, প্রচ্ছন্নে বা অসচেতনভাবে কোন না কোন ম্যাসেজ ঠিকই ধারণ করে। ধারণ তাকে করতেই হয়।
প্রেম, পরিবার এবং সবচেয়ে বেশি যেটা কাজ করে সেটা হল সুপারহিউম্যান হয়ে ওঠা। আমাদের প্রত্যেকের ভেতরেই হিরো হতে চাইবার একটা সুপ্ত প্রবৃত্তি বিদ্যমান। সেটি আমাদের বিনোদন মাধ্যমেরও একটা বড় অংশ। আমি খুব মনোযোগ দিয়ে ল্য করছিলাম যে এর পরিণতি কি হয়। যেমন পে চেকের েেত্র নায়ক যেহেতু তার ভবিষ্যৎ কে
আগেই দেখে ফেলে সেহেতু সে সেটিকে পরিবর্তন করতে চায়। আর সেই পরিবর্তনে সহায়তা করে নায়িকা। কিন্তু খেয়াল করার মত বিষয় হল যে দুটো সিনেমার কোনটাতেই নারীর ভূমিকা আসলে মুখ্য নয়। যেমন কোই মিল গ্যায়া সিনেমাতে নায়িকা যেভাবে স্বল্পবুদ্ধি সম্পন্ন রোহিতকে স্বাভাবিক জীবনে ফিরিয়ে আনার জন্য শ্রম দেয় তা কিন্তু ততটা হাইলাইট হয়না। অথবা মনে করুন ক্রিশের দাদী যখন প্রথমে স্বামীকে হারিয়ে পরে
সন্তানকে হারিয়ে ক্রিশকে বাঁচাতে দূরে কোথাও নিয়ে যায় সেখানে একজন নারী হিসেবে তার কর্মমতাকে চিহ্নিত না করে টিপিক্যাল ভারতীয়, বেদনা সহ্যকারী দু:খিনী মা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করা হয়। সবশেষে রোহিতকে উদ্ধার করার পর যে পরিবারের ছবি আমরা দেখি তা হল দাদা বাবা পুত্র পরিবার, একেবারে খাঁটি পিতৃতান্ত্রিক উত্তরাধিকার। এভাবে পে চেকের েেত্র নায়িকার ভুমিকাও কেবল সহায়কের।

আমার কাছে সিনেমা দুটির চমৎকার মজা হল ভবিষ্যৎ দর্শন এবং সেটাকে ঘিরে নীতি নৈতিক যুক্তিগুচ্ছো। যেমন দুটো সিনেমাতেই প্রযুক্তিকে ব্যবহার করে ভবিষ্যৎ দর্শনের বিষয়টিকে উপস্থাপন করা হয়েছে। ভবিষ্যৎ দর্শন আসলে কতটা প্রয়োজনীয় সে প্রসঙ্গও এসেছে। দেখা গেল যে প্রযুক্তি ও নিজস্ব জ্ঞানকে নির্ভর করে যে ভবিষ্যৎকে জয় করতে চেয়েছে এবং তাকে নিয়ন্ত্রণ করতে চেয়েছে সে আত্ম স্বৈরতায় মৃতু্যবরণ করেছে এমনকি ভবিষ্যৎ দেখেও সেটাকে পরিবর্তন করতে পারেনি। এটা মানবতার ধারণার একধরণের নৈতিক বিজয়কে নির্দেশ করে। বিষয়টি অত্যন্ত আকর্ষণীয় তাই সেটি নিয়ে পরে আরো লিখব ভাবছি।

এবার দেখা যাক ক্রিশের হিরো হয়ে ওঠা.....সে তার শক্তি ও মতা প্রদর্শন না করতে চাইলেও অন্যকে সাহায্য করার জন্য একসময় সে সুপার ক্রিশই হয়ে ওঠে..কিন্তু একটা চমৎকার মন্তব্য আমার বেশ মনে পড়ে তা হল যখন সে তার সিঙ্গাপুরের বন্ধুকে (যে তার বোনকে বাঁচানোর জন্য শারীরিক কসরৎ দেখায়) বলে ভালো কিছুর জন্য যে লড়াই করে তারা প্রত্যেকেই এক একজন হিরো। আমরা যদি মহত্তের কথা চিন্তা করি তাহলে দেখব যে ভারতীয় দর্শনের পুরোটাকে এই বক্তব্য প্রকাশ করে। কিন্ত অন্য দিকে পে চেকের নায়ক কিন্তু সুপার হিউম্যান নয়, সে প্রতিভাবান এবং অর্থের জন্য নিজের প্রতিভাকে ব্যবহার করে। আর কর্পোরেট সিদ্ধান্তের জন্য প্রতিবার নতুন কিছু আবিষ্কার করার পর তার স্মৃতিকে মুছে দেয়া হয় যাতে সে তার আবিষ্কার অন্য কোথাও বিক্রি করতে না পারে, কর্পোরেটকরণের কি চমৎকার প্রকাশ। দেখা গেল যে পে চেকের নায়ক তার নিজের ও পরবর্তীতে সমগ্র মানবপ্রজাতির জন্য লড়ছে অন্যদিকে ক্রিশের নায়ক লড়ছে নিজের হারিয়ে যাওয়া পরিবারের জন্য। এক জায়গায় ব্যাক্তি ও তার সঙ্গিনী (একটা নিউকিয়ার পরিবার )
অন্যদিকে ব্যাক্তির পরিবার যার মধ্যে সঙ্গিনী(এটিও নিউকিয়ার পরিবার তবে একই ধাঁচে নয়, ফ্যামিলি ভ্যালুজ খুবই শক্ত)..খেয়াল করার মত বিষয়।

দেখছি বিশ্লেষণ বেড়েই চলেছে। শেষ করছি দুটো বিষয় দিয়ে। প্রথমত, নাম রাখা হয়েছে ক্রিশ অর্থাৎ কৃষ্ণ হিন্দু ধর্মীয়বোধ কিভাবে এমবেডেড দেখছেন এবং কতটা সূচারূ বানিজ্য হয় ধর্মীয় বোধকে নিয়ে? আর পূর্বের জন্য উপযোগী করে তৈরী একটি সিনেমা ও পশ্চিমের জন্য উপযোগী করে তৈরী করা সিনেমার দার্শনিক যৌক্তিকতা পপুলার কালচারে কিভাবে ভিন্ন হয় ল্য করেছেন?

পরিশেষে বলিউড বনাম হলিউড নয় অথবা কে কাছে ছাড়িয়ে যাচ্ছে সেটি নয় বরং আমার কাছে আকর্ষণীয় মনে হচ্ছে প্রায় সমমানের প্রযুক্তি ও স্পেশাল ইফেক্ট ব্যবহার করার পরও দুটি ভিন্ন বলয়ে তৈরী হওয়া সিনেমা ভেতরের অন্য একটা সিনেমাকে কিভাবে সামনে আনে সেটাকে দেখার চেষ্টা করা। বাস্তব জীবন এই সিনেমেটিক হিরোদের চাইতেও সিনেমেটিক। তবে হিরো হবার সকল প্রবণতার জন্য এবং হিরোইক সিনেমা উপভোগের জন্য সমগ্র মানবজাতিকে সাধুবাদ। আর নওরীণের জন্য অশেষ শুভেচ্ছা।
সর্বশেষ এডিট : ৩১ শে ডিসেম্বর, ১৯৬৯ সন্ধ্যা ৭:০০
১২টি মন্তব্য ০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

থাক অহমিকায়

লিখেছেন আলমগীর সরকার লিটন, ১৮ ই আগস্ট, ২০২৬ বিকাল ৩:২৫


তোমার রঙিন আকাশে নেই
যে অমাবস্যার- অন্ধকার
ঝলমল করছে শুধু চাঁদ-
ডুবছ ডুবছ সুখমারী রাত!
উড়ছ শঙ্খচিলের ডানায়;
তোমার আকাশে অমাবস্যা নাই।

আমি মাটি বন্দি হয়েছি
মরার আগেই- মরার আগেই-
স্বপ্ন দেখি শুধু হুতুম পেঁচা হব... ...বাকিটুকু পড়ুন

বঙ্গবন্ধু: একটি নাম- যাকে ঘৃণা করার আগে একবার থামুন

লিখেছেন এস.এম. আজাদ রহমান, ১৮ ই আগস্ট, ২০২৬ বিকাল ৫:৫০



বঙ্গবন্ধু: একটি নাম- যাকে ঘৃণা করার আগে একবার থামুন[

শেখ মুজিব ইতিহাসের খলনায়ক।
জাতীয় বেইমান।
পাকিস্তান ভাঙার অপরাধী।
- এই কথাগুলো আপনি বিশ্বাস করেন?
তাহলে আজ আপনাকে একটা অনুরোধ করব- একবার শুধু থামুন।

রাগ... ...বাকিটুকু পড়ুন

প্রিয় কন্যা আমার- ৯৩

লিখেছেন রাজীব নুর, ১৮ ই আগস্ট, ২০২৬ সন্ধ্যা ৭:২৫

ফারাজা তাবাসসুম খান-
অনেকদিন তোমাকে নিয়ে লিখি না। খুব ব্যস্ত আছি। আমার সব সময় নিয়ে নিচ্ছে অফিস। আমি অফিস থেকে তোমাকে ফোন করলে তুমি কথা বলতে চাও না। আবার আমি... ...বাকিটুকু পড়ুন

Mystic River – জোয়ারে ফিরে আসে সবকিছু

লিখেছেন রাজসোহান, ১৮ ই আগস্ট, ২০২৬ রাত ৯:৩১



১৯৭৫ সালের বোস্টন। শ্রমজীবী মানুষের সাধারণ পাড়া। রাস্তায় হকি খেলছিল তিনটে বাচ্চা ছেলে। হঠাৎ বল গড়িয়ে পড়ল ড্রেনে। খেলা ওখানেই শেষ। ফুটপাতের একপাশে তখন সদ্য ঢালা ভেজা সিমেন্ট। ছেলেগুলো কাঠি... ...বাকিটুকু পড়ুন

গোলাপী এখন বাসে ....

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ১৯ শে আগস্ট, ২০২৬ রাত ১:২০


দেশে আজ থেকে পিংক বাস সার্ভিস চালু হয়েছে। ঢাকা সহ আরও তিনটি বড় শহরে এই বাস চলবে। খবরটা শুনে মনে হলো, দেশ যেন হঠাৎ করেই এক ধাপ আধুনিক হয়ে... ...বাকিটুকু পড়ুন

×