বিংশ শতকের চিন্তা জগতে যতগুলো চিন্তাস্রোত ও মানবীয় কর্মময়তা অভিনবত্বে এবং আমূল পরিবর্তনকামীতায় মৌলিক অবদান রাখতে পেরেছিল তার মধ্যে সবচেয়ে তী্ন ধারাগুলোর অন্যতম হল নারীবাদ। দু্যতিতে, অভিনবত্বে, উত্তরণে, বিশ্লেষণে, আবিষ্কারে সবদিক দিয়েই অসামাণ্য । সময়ের হিসেবে 1960 এর দশক থেকে আমরা দ্বিতীয় পর্বের নারীবাদীতার সাথে পরিচিত হতে শুরু করি, যদিও এর আগের শতকগুলো থেকে নারীবাদীতাকে বিচিছন্ন করার কোন উপায় নেই। কালবিভাজনে সব "বাদীতাকেই" খাপে খাপে বসিয়ে দেয়া সম্ভব নয় বলে কিছু উজ্জ্বল সময়, কিছু অসামান্য উত্তরণ প্রচেষ্টা, কিছু জ্যোতির্ময় মানুষ , এসব নিয়েই আমরা একটা ধারাক্রম তৈরীর চেষ্টা করি। নারীবাদের সবগুলো ধারাই উদারনৈতিকতাবাদী, আমূল, মার্ঙ্ীয়, মনোবিশ্লেষণাত্মক, সমাজতান্ত্রিক বা কালো নারীবাদ (ব্ল্যাক ফেমিনিজম) অত্যন্ত মৌলিক ও শিনীয়। ব্যাক্তি মানস ও সমাজসংস্কৃতিকে বুঝবার জন্য নারীবাদ তাই খুবই গুরুত্বপূর্ণ।
নৃবিজ্ঞানীদের আত্মসমালোচনায় প্রায়শই একটা ব্যাপার সামনে আসে আর তা হল সমষ্টি নিয়ে ঘাটাঘাটি করতে যেয়ে অনেক সময় আমরা ব্যাক্তি মনস্তত্বকে ভুলে যাই। আর এই ভুলে যাওয়া থেকে বেরিয়ে আসার জন্যই মনোবিশ্লেষণাত্মক নারীবাদ নিয়ে লেখালেখি। হিউম্যান সাইকি শব্দটির সীমা কেবল মনস্তাতি্বক পর্যন্ত নয় বরং আরো বিসতৃত, কখনো কখনো মানব অস্তিত্বের বিমূর্ত সামগ্রিক উপলব্ধি। ফ্রয়েড এেেত্র অনেক আলোচিত ও অনেক নারীবাদী কতৃক ভয়ানকভাবে সমালোচিত। কিন্তু মানব মনের বিশ্লেষণ এবং এর সাথে লৈঙ্গিক ও "আত্ম" পরিচয় নির্মাণের বিষয়টিকে সামনে আনার েেত্র তার ভূমিকা পাইয়োনিয়ারের। তবে যে কারণে নারীবাদে ফ্রয়েডের সমালোচনা তা হল তার "জৈব নির্ধারণবাদীতা" অর্থাৎ শিশ্নহীনতাই নারীর অধ:স্তনতার মূল কারণ। কেননা শিশ্ন হীনতার কারণে একটি নারী শিশু কখনোই একজন পূর্ণাঙ্গ "সেলফ" হয়ে উঠতে পারে না। কাম, ফ্রয়েডের কাজের একটা মৌল বিষয় তবে এটি কেবল যৌনতাকে নির্দেশ করে না, নির্দেশ করে লিঙ্গীয় অস্তিত্ব, আত্মপরিচয় এবং সর্বপোরি পরিপূর্ণ মানুষ হয়ে ওঠার একটা বিবর্তনবাদী স্কিম কে এবং একভাবে নিশ্চিত করে দেয় নারীর অধস্তনতাকে।
ফ্রয়েডের ব্যাখ্যা ও বিশ্লেষণের পুরোটাই গড়ে উঠেছিল একটি ভিক্টোরিয়ান ইউরোপীয় সমাজের প্রেীতে। নারীর নারী হয়ে ওঠা ও পুরুষের পুরুষ হয়ে ওঠার যে ব্যাখ্যা তিনি হাজির করেন তা অত্যন্ত চিত্তাকর্ষক। পুরো ঘটনাটাকে তিনি কয়েকটা পর্বে ভাগ করেন যেমন 1. ওরাল পর্ব 2. এনাল পর্ব 3. ফেলিক পর্ব 4. লেটেন্সি পর্ব 5. পিউবার্টি পর্ব 6. জেনিটাইল পর্ব।
সাধারনভাবে নারীর নারী হয়ে ওঠা ও পুরুষের পুরুষ ওঠা অর্থাৎ একদিকে নারীর পরনির্ভরশীল, দূর্বল, অস্থির, সিদ্ধান্ত না নিতে পারা, ভঙ্গুর ইমেজ ও অন্যদিকে পুরুষের সিদ্ধান্ত প্রবণ, আত্মনির্ভরশীল, শক্তিশালী ইমেজের গল্পটা ফ্রয়েড তার তৃতীয় প্রবন্ধে অর্থাৎ, " দ্যা ট্রান্সফরমেশন অফ পিউবার্টিতে" যেভাবে ব্যাখ্যা করেন তা অনেকটা এরকম। ছোটবেলা থেকেই নারী ও পুরুষ শিশুর প্রথম ও সর্বশ্রেষ্ঠ ভালোবাসার বস্তু হল তার মা। মায়ের সাথে উভয় শিশুর সম্পৃক্ততা সবচেয়ে বেশি একই সাথে নির্ভরশীলতাও। জন্মানোর পর প্রথম দিককার বছরগুলোতে নারী ও পুরুষ শিশু উভয়ই বেশ আনন্দেই থাকে যে তাদের লাভ অবজেক্ট ঠিকই আছে। কিন্তু সময়ের সাথে সাথে শিশুদের সাথে মায়ের সম্পৃক্ততা কমে আসে অন্তত পূর্বের মাত্রায় আর থাকে না। অন্যদিকে স্বাভাবিক ভাবেই মা তার নিজের মত জীবন যাপন করতে চায়। পিউবার্টির আগে থেকেই নারী ও পুরুষ শিশু নিজেদের যৌনাঙ্গ সম্পর্কে সচেতন হয়ে উঠতে থাকে। ছেলে মিল খুঁজে পায় তার বাবার সাথে এবং মেয়ে তার মায়ের সাথে। ফ্রয়েড বলছেন যে একসময় নারী শিশু আবিষ্কার করে তার যৌনাঙ্গ ছেলেদের মত নয়। সে বোধ করে তারটা ক্যাসট্রেটেড। এদিকে লাভ অবজেক্টকে অধিকার করার বিষয়টি কিন্তু বলবৎ থাকে। ছেলে শিশু অধিকার বোধের েেত্র দেখে যে তার পিতা তার মাকে অধিকার করে আছে সে এজন্য প্রথমে তার পিতাকে শতু্র ভাবতে শুরু করে যেটাকে ফ্রয়েড বলছেন অডিপাস কমপ্লেঙ্। তবে একটা সময়ে সে তার কমপ্লেঙ্ থেকে বেরিয়ে আসে যখন সে বোধ করে তার পিতা তার চেয়ে শক্তিশালী। এবার বরং সে পিতার মত হতে চেষ্টা করে কেননা তাহলেই সে কেবল তার লাভ অবজেক্টকে অধিকার করতে সম হবে। কিন্তু এটা সে করে মা থেকে বিচ্ছিন্ন বোধ করার মধ্য দিয়ে এবং একসময় যে নিজের আইডি বা সেল্ফকে চিহ্নিত করতে পারে। অন্যদিকে মেয়ে শিশু লাভ অবজেক্টকে অধিকার করতে যেয়ে পিতার সাথে শত্রুতা বোধ করে ঠিকই কিন্তু এটাকে সে পুরুষ শিশুর মত সামাল দেবার কোন পথ পায়না। কেননা তার প্রতিরূপ হিসেবে রয়েছে তা মা স্বয়ং। লাভ অবজেক্টকে না পাবার কষ্টে সে পুরুষ যৌনাঙ্গকে ঈর্ষা করতে থাকে আবার সে মাকে অধিকার করারও কোন পথ পায়না। এজন্য নারী শিশু বোধ করে যে সে ক্যাস্েট্রটেড বা শিশ্নহীন, সে অসম্পূর্ণ। ফ্রয়েড ব্যাখ্যা দেন যে নারী লাভ অবজেক্টকে অধিকার করতে না পারার কষ্টে এবং শিশ্নহীনতার কারণে সিদ্ধান্তহীন হয়ে ঘুরে বেড়ায় এবং তার সেলফ বা আইডি বিকশিত হয় না। নারী তাই তার জীবনের অন্যান্য পুরুষের মধ্যে সম্পূর্ণতা বা আশ্রয়কে খোঁজে। যদিও কোন দিনই সে তার লাভ অবজেক্ট থেকে পুরোপুরি বেরিয়ে আসতে পারে না। ফলে সে পুরুষের মত সিদ্ধান্তপ্রবণ হতে পারে না। আদতে কোন নারীই মাকে ছাড়া অন্য কাউকে তার প্রকৃত লাভ অবজেক্ট মনে করতে পারেনা, সে পুরুষকে ভালোবাসে ঠিকই কিন্তু ভেতরে ভেতরে তার মাকে জড়িয়ে রাখে। ফলে পুরুষ তাকে ছেড়ে চলে
গেলে সে কষ্ট পায় ঠিকই কিন্তু সামলে ওঠে কেননা তার কাছে তার প্রথম লাভ অবজেক্ট তো রয়েছেই।
পুরুষ লাভ অবজেক্ট থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে সম্পূর্ণ মানুষ হয়ে উঠলেও নারী পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন না হওয়ার কারণে সম্পূর্ণ মানুষ হয়ে ওঠে না। আর এটাই নারীকে পুরুষের চেয়ে অধস্তন করে রাখে।
আলফ্রেড এডলার, কারেন হর্নী এবং কারা থমসন এই তিনজন নারীবাদী মনোবিশ্লেষক ফ্রয়েডের বিশ্লেষণের তীব্র সমালোচনা করেন এবং তার জৈবনির্ধারণবাদীতাকে খারিজ করে দেন। এরা বলেন একেবারে শিশু অবস্থায় নারী ও পুরুষ শিশু যে ধরণের অসহায়ত্বের মধ্য দিয়ে যায় তা তাদেরকে কোনকিছূ আকড়ে ধরতে উৎসাহিত করে ঠিকই কিন্তু এর অর্থ এই নয় যে এটি থেকে উত্তরণের পথ শিশুরা জৈব প্রক্রিয়ায় নির্ধারণ করে। এটি অনেক বেশি সামাজিক সাংস্কৃতিক পরিবেশের সৃষ্টি। নারীর মর্ষকামীতাকে তারা বলেন যে একটি পুরুষতান্ত্রিক সমাজ ব্যবস্থায় নারী-পুরুষ সম্পর্কের
পূর্বেকার আচরণই পরবর্তী নারীদের ব্যক্তিত্বকে গঠন করে। এছাড়া আরো নানাভাবে নারীর একটি আদর্শ আকার দেবারও চেষ্টা করা হয় যা পুরুষ আধিপত্যের জন্য উপযোগী।
ন্যান্সী চ্যাডারাউ বলছেন যে নারী ও পুরুষ শিশুর যৌনমনস্তাতি্বক গঠন খুবই সামাজিক এটিকে অডিপাস ও ইরিনা কমপ্লেঙ্ দিয়ে বোঝা সম্ভব নয়। যে প্রেীতে ফ্রয়েডের কাজ অন্য প্রেীতে এমন কাজের বিপরীত উদাহরণও ভুরিভুরি পাওয়া যাবে।
ফ্রয়েডের কাজ এবং তৎপরবর্তী সমালোচনাকে মাথায় রাখলে একটা বিষয়ে কিন্তু প্রশ্ন তৈরী হয় আর তা হল আমাদের সমাজের সাধারন ধারণায় নারীকে মনে করা হয় রণশীল এবং সবকিছু আঁকড়ে ধরে রাখতে চায় কিন্তু আসলেই কি নারী রণশীল? মনোবিশ্লেষণ বলে যে পুরুষ আলাদা সত্তা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হওয়ায় (যদি ফ্রয়েডকে অংশত সঠিক বলে ধরে নেই ) তার অন্য নারীকে অধিকার করার যে সংরণ প্রবণতা. তা কিন্তু নারীর মধ্যে থাকতে পারে না কারণ তার নিজের আইডি বা সেল্ফই তো প্রতিষ্ঠিতই নয়। তার বড়জোর থাকতে পারে একটি পুরুষকে অধিকার করার মর্ষকামী চাওয়া কিন্তু সেটাও জোড়ালোভাবে নয় কেননা সে তো সিদ্ধান্তপ্রবণ শক্তিশালী কেউ নয়, সে তো তার লাভ অবজেক্ট থেকে পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন হতে পারেনি। তাহলে নারী না পুরুষ কে বেশি রণশীল?
পুরো প্রক্রিয়ায় জৈবনির্ধারণবাদীতা কতটুকু ক্রিয়াশীল? জৈবনির্ধারণবাদীতার পুরোটা কি খারিজ যোগ্য? আমাদের জীবন কতটুকু জৈব কতটুকু সাংস্কৃতিক?
বি: দ্র: পাঁচতারার একটা সূরম্য সন্ধ্যা এবং তিনজন নারীপুরুষের সংশ্লিষ্টতাজাত এই বিশ্লেষণ। সৌন্দর্য ও কৌতুহল একসাথে ধরে রাখার এক রকম শেষ প্রচেষ্টাও(সব অর্থেই)।
সর্বশেষ এডিট : ৩১ শে ডিসেম্বর, ১৯৬৯ সন্ধ্যা ৭:০০

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



