"বাঙালী একটি বিস্মৃতিপ্রবণ জাতি, অনেক কষ্টের বিনিময়ে কোন কিছু অর্জন করার পর সে ভুলে যায় কেন সে সেটি অর্জন করেছিল।" এই প্রবচনটি ড. হুমায়ুন আজাদের। বাঙালী জাতিসত্ত্বা ও আত্মপরিচয়গত বিদ্যমান সরল রেটোরিকের ফাঁদে না পড়ে যতগুলো তী্ন উচ্চারণ হয়েছে এটি সেগুলোর মধ্যে অন্যতম।
বিষয়টা কেবল সাংস্কৃতিক উপলব্ধির তা নয় বরং সমাজ রাজনৈতিক বাস্তবতার যে বিদ্যমানতায় আমরা সবসময় বসবাসরত সেটির মৌল উপলব্ধিকে প্রবচনটি আমাদের সামনে প্রকাশ করে। একটি সরল ও আপাত স্বগতোক্তিসুলভ বাক্যসমষ্টি ইদানিং প্রায়শই নজরে পড়ে; "সেটি হল মুক্তিযুদ্ধের এত বছর পর রাজাকার প্রসঙ্গে আর ঘাঁটাঘাঁটি করার কোন যৌক্তিকতা নেই।" বাক্যসমষ্টিকে খুবই গবেষণাসুলভরূপে দেখলেও বোঝা যায় যে বক্তা এমন একটি যৌক্তিকতাকে হাজির করার চেষ্টা করছেন যার আদতে কোন ভিত্তি নেই। এধরণের প্রস্তাবনার পিছনে যে খোঁড়া যুক্তি দাঁড় করানোর চেষ্টা করা হয়, তা হল এমন যে, আমাদের সব পুরোনো বিভেদ ভুলে ভবিষ্যতের দিকে তাকাতে হবে। দেশ গড়তে হবে এমন জাতীয় বাতুলতাও ল্যনীয়।
আদতে এর সবই বারবার মনে করিয়ে দেয় যে বাহান্ন, উনসত্তুর, একাত্তুর, একানব্বইয়ের বিভিন্ন ঘটনায় অর্থাৎ বাংলাদেশ নামক রাষ্ট্রটির বিভিন্ন সময়ে বেড়ে ওঠার বিপরীতে রাজাকারতন্ত্রের লেগেসিকে। "এত বছর পর" জাতীয় শব্দগুলোর ব্যবহার দেখলে স্পষ্ট মনে হয় যে আমরা কোন ঘটনাকে অনেকদূর ছাড়িয়ে এসেছি। এই পুরো প্রক্রিয়া একটি বিভ্রান্তি তৈরী করে রাজাকার ও তাদের উত্তরসূরীদের মতা দখলের গতিশীল ধারাবাহিকতাকে কায়েম রাখতে চায়। শিবির, জঙ্গীবাদ এগুলোকে বিচ্ছিন্ন ঘটনা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করার মাধ্যমে ধারাবাহিক সূত্রটিকে আড়াল করতে চায়। এেেত্র ইসলামের ব্যবহার একটি রাজনৈতিক আড়াল ও বিভ্রান্তির কৌশল মাত্র। যেটি সবচেয়ে গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করা উচিৎ তা হল রাজাকার কেবল '71 সৃষ্ট একটি প্রপঞ্চ নয়। এর ইতিহাস আরো প্রাচীন। তবে যে মতাদর্শ, কর্মপরিকল্পনা ও ঘটনাগুলোর ভিত্তিতে আমরা রাজাকারকে চিনি সেটির ধরণ এখন অনেক শাণিত, সূ ও শক্তিশালী। এরা ক্রমে রাষ্ট্র যন্ত্রের সবগুলো কেন্দ্রকে নিয়ন্ত্রণ করতে সম হয়ে উঠছে।
ফলে যারা দাবী করেন এখন রাজাকার আলবদর আলশামস নিয়ে বিতর্কের কিছু নেই তারা মানবতার প্রতি অপরাধকেই কেবল বৈধতা দিতে চাননা একইসাথে রাজাকারতন্ত্রের সামপ্রতিক কৌশলকে আড়াল করতে চান। কিন্তু আড়াল করতে যেয়েই আসলে তারা নিজেদের প্রকাশ করে ফেলেন। এটি কেবল একগুচ্ছো মানুষ নয় এটি একটি প্রতিষ্ঠান, যার সাথে বিশ্ব ভূ-রাজনৈতিক পরিস্থিতির যোগাযোগ খুবই স্পষ্ট। রাজাকারতন্ত্র আরেকটি ছদ্মাবরণও নেয় আর সেটি হল ধর্মীয় মোড়কে নিরপেতার প্রচার। এেেত্র গ্লোবালের সাথে লোকালের যোগাযোগের বিষয়টি অনেকেই উপো করে যান যদিও প্রতিটি েেত্র গ্লোবালের প্রতিনিধিত্ব এখানে উপস্থিত। সময়ের পরিক্রমায় কৌশলে ও শক্তিতে অন্য যে কোন রাজনৈতিক গোষ্ঠীর চাইতে এই রাজাকারতন্ত্র ক্রিয়াশীল। দৃশ্যমান যে দুই রাজনৈতিক শক্তিকে আমরা অনবরত কোলাহলরত দেখি এবং আশাকরি যে রাজাকারতন্ত্র আসলে এদের সাহায্য ব্যাতীত কিছু করতে সম নয়, সেটিও আমার মতে একটি সামপ্রতিক বিভ্রান্তি।
রাজাকারতন্ত্র শব্দটি শুনে মনে হতে পারে যে আমি মধ্যযুগের কোন গোষ্ঠীর কথা বলছি। আসলে এটি এমন একটি আধুনিক প্রতিষ্ঠানকে নির্দেশ করে যেটি মতা দখলের জন্য অনেক হাইব্রিড পদপে নিতে সম। গোষ্ঠীবদ্ধতার বিশ্লেষণে এটি একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয় যে সংগঠনের যে রুপ রাজাকারতন্ত্রে বিদ্যমান তা অন্যান্ন অনেক দলের মধ্যেই আছে কিনা।
2য় বিশ্বযুদ্ধ পরবর্তী জার্মানী এখনো নাৎসীবাদের জন্য নিন্দিত হয় সারা বিশ্বব্যাপী এবং সেই ইতিহাসের জন্য ঝুঁকে থাকে মানবতার নৈতিক মানদন্ডে। তাহলে আমরা কি ভুলে যাব আমাদের ইতিহাস, আমরা কি পূর্বের রাজাকার এবং এখনকার রাজাকারতন্ত্রকে অস্বীকার করে একটা শান্তির নিদ্রা দেব? ধর্মীয় অনভূতিকে বারবার ব্যবহৃত হতে দেব মতা সমর্্পকের ডাইকোটোমি ? আমাদের এ সময়টি সচেতন হওয়ার। তা না হলে অচিরে এতটাই বিস্মৃত হব যে আয়নার দিকে তাকিয়ে নিজের মুখকেই হয়ত চিনতে পারব না।
সর্বশেষ এডিট : ৩১ শে ডিসেম্বর, ১৯৬৯ সন্ধ্যা ৭:০০

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।




