কিন্তু এত কিছুর পরও সহকর্মীরা তাঁকে সবসময় একটি ভয় মেশানো দূরত্ব থেকে দেখতেই পছন্দ করে। অথচ সারা জীবন ধরে তিনি মানুষের সাথেই মিশতে চেয়েছেন, বেশিক্ষণ মানুষ ছাড়া থাকা তাঁর অসহ্য লাগে আবার একসাথে বেশি মানুষও তাঁর ভালো লাগেনা। কিন্তু সহকর্মীদের দূরত্বের কারণ যে কি তিনি নিজেও মাঝেমাঝে এর হদিস ঠিক খুঁজে পান না। হ্যা, এটা ঠিক যে কেউ তাকে ঠকিয়ে কোন কিছু করবে এমন বিষয়কে তিনি কোনভাবেই মেনে নিতে পারেন না বরং এজন্য তাঁর ক্রোধই হয়। কিন্তু এই ক্রোধের সাথে সহকর্মীদের আচরণের কোন সাযুজ্য তিনি ঠিক খুঁজে পান না। প্রথমত নিজেকে রক্ষা করা এবং তারপর মানুষের জন্য কাজ করা এদুটো প্রধান কাজই তো তিনি সারাজীবন ধরে করতে চেয়েছেন কারণ এতেই প্রকৃত ভারসাম্য রক্ষা হয়। মানুষজন কি এই সাধারণ বিষয়টিও বুঝতে পারে না?
সাক্ষাৎকার কক্ষে পৌছে নিজের আসন গ্রহণ করতে করতে অভিনেত্রী চারপাশে নজর বুলিয়ে নিচ্ছিলেন। কক্ষের আরামদায়ক তাপমাত্রা এবং বিশেষভাবে নি:শব্দতা তাঁর স্বস্তিবোধকে বাড়িয়ে তুলতে শুরু করেছিল। অটোগ্রাফ প্রদানরত অবস্থায় হঠাৎ এমন বাধাগ্রস্থ হওয়ায় তিনি উপদেষ্টার প্রতি কিঞ্চিত রুষ্ট হয়েছিলেন ঠিকই তবে কক্ষের মিষ্টি সুগন্ধযুক্ত বাতাসের প্রভাবে অতিদ্রুত এই রুষ্টভাব দূর হয়ে একটি প্রশান্তভাব তিনি অনুভব করা শুরু করলেন। এবং গতরাতের নিদ্রাহীনতা জনিত ক্লান্তির কারণেই হয়ত তাঁর চোখ দুটো একটু নিদ্রালু হয়ে উঠল। তবে উপদেষ্টার ভরাট কন্ঠস্বরে অচিরেই তিনি সম্পূর্ণ সচেতন হয়ে উঠলেন। এদিকে তাঁর উপস্থিতিতে দর্শনার্থী কক্ষ থেকে সহকর্মীদের ত্রস্ত চলে যাওয়ায় উপদেষ্টা একদিকে যেমন কাজে মনোনিবেশ করতে পারবেন ভেবে স্বস্তি বোধ করছিলেন আবার সহকর্মীদের আচরণে খানিকটা বিরক্তও তিনি বোধ করছিলেন। অভিনেত্রীর অটোগ্রাফ প্রদানে অনিচ্ছাকৃত বাধাদানের জন্য তিনি আন্তরিকভাবেই ক্ষমা প্রার্থনা করলেন। যে কোন অদূরদর্শী এবং কেবল প্রশ্নপত্রের উপর নির্ভরশীল গবেষকের জন্য বিষয়টিকে অতি সৌজন্যতা বা মেকি বলে মনে হতে পারে, কিন্তু নিজের কাজের প্রতি একনিষ্ঠ উপদেষ্টা খুব ভালোভাবে জানেন যে আলাপচারিতার এসব আপাত ছোটখাট বিষয়গুলো পরিণামে কতটা ফলদায়ক হয়ে উঠতে পারে। তিনি এটাও অনুধাবন করেন যে প্রতিটি সাক্ষাৎকারের সফলতার পেছনে আবশ্যিকভাবে জড়িয়ে রয়েছে তাঁর প্রতি গ্রাহকের সম্পূর্ণ বিশ্বস্ততার বিষয়টি। আর এর প্রাথমিক পদক্ষেপ হিসেবেই নিজের অসময়োচিত অনুপ্রবেশ নিয়ে অভিনেত্রীর সাথে ছোট্ট রসিকতা করে তিনি বিষয়টিকে আরো হালকা করতে চাইলেন। তিনি বললেন, অফিসের কর্মচারীবৃন্দের আগে তাঁরই উচিৎ ছিল অটোগ্রাফ নিতে এগিয়ে যাওয়া আর তাহলেই সব ঠিক হয়ে যেত, মজা করে তিনি আরো বললেন যে তাঁর খুব ভুল হয়ে গেছে যে তিনি ঠিক সময়ে উপস্থিত হতে পারেন নি। উপদেষ্টার কথায় অভিনেত্রী এবার বেশ সহজ বোধ করলেন এবং ঘটনাটির সাথে সাযুয্যপূর্ণ একটি দৃশ্যের কথা উপদেষ্টাকে জানাতে আগ্রহী হয়ে উঠলেন। উপদেষ্টা লক্ষ করলেন যে অভিনেত্রী বেশ সহজভাবেই তাঁর সাথে কথা বলতে শুরু করেছেন। উপদেষ্টা ধারণা করলেন অভিনেত্রীর সমস্যাও নিশ্চয়ই জটিল কিছু হবে না।
অভিনেত্রী জানালেন যে , পুরো ঘটনাটি তাকে ছোটবেলার স্কুলের কথা মনে করিয়ে দিয়েছে, যখন টিফিন পিরিয়ডের পর হঠাৎ করে ক্লাসে প্রধান শিক্ষক উপস্থিত হলে সব ছাত্র ক্লাসে ছোটাছুটি বাদ দিয়ে তড়িঘড়ি করে নিজেদের আসন আর খাতা বই পত্র গোছাতে ব্যস্ত হয়ে পড়ত। প্রধান শিক্ষকটি যদি বিদায়ের আগে শেষবারের মত পরিদর্শনের ছলে ছোট ছোট ছাত্রদের সাথে বন্ধুত্বপূর্ণ মশকরা করতে চাইতেন, তখনো শিক্ষার্থীরা সেটা বুঝতে চাইতো না। বরং প্রধান শিক্ষক যাই বলছেন সেটিকে একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হিসেবে ধরে নিয়ে সহকারী শিক্ষকের ইঙ্গিতের জন্য অপেক্ষা করত, যদি তিনি ইঙ্গিত করতেন তাহলে ছেলেরা হাততালি দিয়ে ঘর ভরিয়ে ফেলত অথবা যদি তিনি ইঙ্গিত করেতেন তবে তারা একেবারেই নিশ্চুপ হয়ে যেত। কোন এক কমেডি সিনেমার উদাহরণ দিয়ে তিনি উপদেষ্টাকে বললেন, এমনি একটি দৃশ্যে ছাত্রদের সামনে একটি দারুণ রসিকতা করে অপ্রস্তুত হেডমাস্টার মাথা নিচু করে সহকর্মীর কানে কানে জানতে চায় কেন সে ছাত্রদের হাততালি আর নিশ্চুপ থাকার ইংগিত ছাড়া অন্যকিছু শেখায় নি। বাচ্চারা তাহলে কিভাবে শিখবে কোন কথায় হাসতে হয়, কোনটা ঠাট্টা আর কোনটা নয়? উত্তরে সহশিক্ষক প্রধান শিক্ষকের কানের কাছে মুখ নিয়ে গিয়ে ফিসফিস করে বলে, স্যার আমরা যখন ছাত্র ছিলাম তখন আপনিও আমাদের কেবল হাততালি আর নিশ্চুপ থাকা এ দুটো বিষয়ই শিখিয়েছিলেন, আপনি যদি তখন আমাদের হাসির বিষয়েও শেখাতেন, তাহলে এ ধরণের কোন সমস্যা তৈরী হোত না।
উপদেষ্টার কাছে ঘটনার বর্ননা শেষ করার সাথে সাথে অভিনেত্রী হেসে উঠলেন। প্রতি উত্তরে উপদেষ্টাও মৃদু হেসে উঠলেন। তবে তাঁর মনে হল যে প্রধান শিক্ষকের উচিৎ ছিল এমন ব্যবস্থা গ্রহণ করা যাতে শিক্ষাজীবনের শুরু থেকেই অন্য সবকিছুর সাথে সাথে ছাত্ররা ঠাট্টার বিষয়ে অনভূতি প্রকাশের ইঙ্গিতও বুঝতে পারে । তেমন সুযোগ ও সময় হলে তিনি হয়ত প্রধান শিক্ষককে পরামর্শকেন্দ্রে আসার পরামর্শ দিতেন। নিজের ধারনাটি তিনি অভিনেত্রীকেও জানালেন। এবার অভিনেত্রী উচ্চস্বরে হেসে উঠলেন তবে একটু ভিন্নভাবে।
হাসির পরপরই কিছুক্ষণের নিরবতা কাটিয়ে উপদেষ্টা এবার অভিনেত্রীটির কাছ থেকে তাঁর সমস্যার কথা জানতে চাইলেন। একই সাথে ভেতরে ভেতরে তিনি অনুভব করলেন যে তাঁর সমগ্র সত্তা এবার অভিনেত্রীর যে কোন সমস্যা সমাধানের জন্য প্রস্তুত হয়ে উঠেছে। তবে সেই পর্বে যাবার আগে তাঁকে বুঝতে হবে অভিনেত্রীর সমস্যাটা ঠিক কোন জায়গায়। একজন পরামর্শকের সাথে যেভাবে কথা বলা দরকার ঠিক সেই ভাষাতেই অভিনেত্রী বলে চললেন, উপদেষ্টাকে বিস্তারতিভাবে জানালেন তাঁর ক্রমবর্ধমান হতাশার কথা, তিনি যে ঠিকমত খেতে বা ঘুমাতে পারছেন না সেই বিষয়টিও তিনি তাঁকে জানালেন। তিনি বললেন ইদানিং তিনি খুব শূণ্য আর আনন্দহীন বোধ করছেন, এমনকি নতুন কোন কাজের জন্যও তিনি কোন উদ্যম বোধ করছেন না। উপদেষ্টা বুঝতে পারছিলেন যে এজাতীয় বিমূর্ত কিছু বাক্য আর শব্দের মধ্য থেকে সমস্যার কুল কিনারা পাওয়া সম্ভব হবে না। কথা শুনতে শুনতেই তিনি এবার অভিনেত্রীর মুখের দিকে গভীরভাবে তাকিয়ে বুঝতে চাইলেন আদৌ সমস্যাটি কতটা গুরুতর। অভিনেত্রীর মুখটাকে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে লক্ষ করতে যেয়েই উপদেষ্টা দেখতে পেলেন চোখের নিচের কালো রেখাগুলোকে যেটি অভিনেত্রীর মেকাপে পুরোপুরি ঢাকা পড়েনি। তিনি বুঝতে পারলেন সমস্যা গুরুতরই। একইসাথে আরেকটি বিষয় খেয়াল করেও তিনি মনে মনে চমকে উঠলেন। তিনি খেয়াল করলেন যে অভিনেত্রীর মুখের সাথে তাঁর প্রাক্তণ স্ত্রীর বেশ মিল রয়েছে। প্রায় একই ধরণের শরীর গঠনও। একটা কথা ভেবে তিনি খুবই বিস্মিত হলেন যে আজকের সাক্ষাৎকারের তালিকায় তাঁর প্রাক্তণ স্ত্রীর নামটিও রয়েছে। সকালে দর্শনার্থীর তালিকায় নিজের প্রাক্তণ স্ত্রী যিনি ঘটনাক্রমে আবার তাঁর সহকর্মীও ছিলেন তার নামটি দেখেই তিনি পুলকিত বোধ করেছিলেন।
সর্বশেষ এডিট : ৩১ শে ডিসেম্বর, ১৯৬৯ সন্ধ্যা ৭:০০

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



