somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

পরামর্শকেন্দ্র (ছোট গল্প) পর্ব 10

০৭ ই এপ্রিল, ২০০৭ রাত ২:১০
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

দীর্ঘক্ষণ ধরে একটা আরামদায়ক ও বাইরের শব্দহীন পরিবেশে অভিনেত্রীর মধ্যে একটি আপন বোধের জন্ম হচ্ছিল। চেয়ার থেকে সোফায় অথবা সোফা থেকে টেবিলে অভিনেত্রী যেভাবে ঘুরে ঘুরে সাক্ষাৎকার কক্ষটিকে দেখছিলেন তাতে মনে হচ্ছিল কক্ষটি যেন তাঁর অনেক চেনাপরিচিত। অভিনেত্রীর অভিব্যাক্তি থেকেও উপদেষ্টা বিষয়টি আঁচ করতে পারছিলেন। অভিনেত্রীর কথা বলার ঢংয়ে, নিজের পোশাকের প্রতি সচেতনতায়, চেয়ারে হেলান দেয়ায় একটি শিথীলভাব ক্রমশ স্পষ্ট হয়ে উঠছিল। অভিনেত্রী নিজের পরিবারে অর্থাৎ তার পালক পিতামাতা ভাইবোনের কথা বলে যাচ্ছিলেন, যেসব ছবিতে অভিনয় করে তিনি সবচেয়ে আনন্দ পেয়েছিলেন সেগুলির কথাও তিনি শিশুর মত উচ্ছাসে বলে চলছিলেন। উপদেষ্টা বুঝতে পারছিলেন যে অভিনেত্রীর মধ্যকার শিশুটিকে তিনি জাগিয়ে তুলতে সক্ষম হয়েছেন। আর এটাই তো সাক্ষাৎকার কক্ষের স্বার্থকতা। নিশ্চয়ই অভিনেত্রীর সমস্যার সম্ভাব্য সমাধানের দিকে পৌছে যেতে আর বেশি দেরী নেই।

এতক্ষণ ধরে ঘরের দেয়ালগুলো ভরে ছিল হলুদ আভায়, উপদেষ্টা গোপন সুইচটি টিপে সেটিকে করে দিলেন হালকা সবুজ। হঠাৎ করে কক্ষের রং পাল্টে যাওয়ায় অন্য গ্রাহকের মত অভিনেত্রী ঠিক চমকে উঠলেন না বরং প্রশ্রয় মাখানো দুষ্টু হাসি দিয়ে বললেন, 'গুড ট্রিক! দেয়ালের মাঝে আলোগুলোকে লুকাতে নিশ্চয়ই অনেক পরিশ্রম করতে হয়েছে'। উপদেষ্টা এমন উত্তরের জন্য ঠিক প্রস্তুত ছিলেন না, যদিও তাঁর মুখোভঙ্গিতে এর কিছুই প্রকাশিত হল না। কি মনে করে তিনি এবার কক্ষের স্বর সংবেদী সেন্সরগুলোকে চালু করে দিলেন। হঠাৎ করে অভিনেত্রী কথা বলে উঠলেন এবং বিনয়ের সাথে জানালেন, 'দীর্ঘদিন মঞ্চের সাথে যুক্ত তো তাই এই বিষয়গুলো সহজেই বুঝতে পারি। আপনার সাক্ষাৎকার কক্ষটি অভিনয়ের জন্য একটি দারুণ মঞ্চ হতে পারে ।' অভিনেত্রীর উচ্চারণে এমন একটি আত্মবিশ্বাস ছিল উপদেষ্টা যা অনেকদিন কোন গ্রাহকের মাঝে পাননি। এমনকি কিছু সমাজ বিচ্ছিন্ন প্রথাবিরোধী মানুষের সাথেও তাঁর কথা হয়েছে এবং তা এই কক্ষেই; কিন্তু কারো স্বরেই তিনি এমন বিনয় মেশানো দৃঢ় আত্মবিশ্বাস খুঁজে পাননি। অভিনেত্রীর কথার সাথে সাথেই দেয়ালের সবুজ রং গাঢ় আকার ধারণ করল।

প্রাক্তণ স্ত্রীর সাথে অবিশ্বাস্য মিল নাকি বিনয়ী আত্মবিশ্বাস ঠিক কোনটা যে উপদেষ্টাকে বেশি প্রভাবিত করেছিল এখন আর তা বলার উপায় নেই; তবে এরপর নিশ্চিতভাবেই তিনি অভিনেত্রীর সাথে কেবল গ্রাহক হিসেবে নয় বরং তারচেয়ে একটু বেশি ঘনিষ্ট হয়ে কথা বলা শুরু করে দিয়েছিলেন। যদিও উপদেষ্টার কর্তব্যবোধ থেকে তিনি একচুল বিচূ্যতি হননি। এতক্ষণের আলাপচারিতায় কন্ঠস্বরে পেশাদ্বারীত্বের প্রভাব এমনিতেই কমে গিয়েছিল। যদিও তখন পর্যন্ত সবকিছুই ছিল উপদেষ্টার নিয়ন্ত্রণে। প্রাজ্ঞ উপদেষ্টা নিজের বৈচিত্র্য প্রবণতাকে সচল রাখার জন্যই নানা সময়ে নানা কন্ঠে কথা বলতেন। আদতে এটিও ছিল গ্রাহকের বৈচিত্র্যময়তাকে ধারণ করবার একটি অভিনব উপদেষ্টীয় আবিষ্কার। এবার বন্ধুর মত আন্তরিক কন্ঠেই তিনি অভিনেত্রীর কাছে জানতে চাইলেন যে খুব হতাশ বোধ করলে তিনি কোন মাদক গ্রহণ করেন কিনা। একই সাথে তিনি এটাও যুক্ত করলেন যে যৌবনে নানান ধরণের মাদকের প্রতি তাঁর একধরণের আসক্তির জন্ম হয়েছিল। তবে শরীরে এসবের বিরুপ প্রতিক্রিয়া দেখা দেয়ায় তিনি তা বাদ দিয়েছেন। অবশ্য তিনি এও বললেন, একেবারে শরীরের উপর এসে না পড়লে তিনি হয়ত এখনো মাদক গ্রহণ করতেন।

অনেকক্ষণ ধরেই অভিনেত্রী উপদেষ্টার খুঁতখুঁতে স্বভাবের বিভিন্ন নমুনাকে লক্ষ করছিলেন। যেমন প্রতিবার কফির মগ হাতে নেবার সময় উপদেষ্টা যত্ন করে মগের নিচে লেগে থাকা পানিটুকু টিসু্য দিয়ে মুছে নেন, তবে তিনি এখানেই থেমে যান না, ট্রের মধ্যে প্রতিবার কফি ঢালার পর নিচে পড়ে থাকা পানিটুকুকেও তিনি মোছামুছি থেকে বাদ দেন না। আর যতক্ষণ এই কফি খাওয়ার বিষয়টি থাকবে ততক্ষণই নিরন্তর চক্রটি চলতে থাকবে। অথচ একটু খেয়াল করে কফি ঢাললেই নতুন করে আর পানি জমে যাবার সম্ভাবনা থাকে না। তবে বিষয়টি সবচেয়ে আমোদের হয়ে ওঠে, যে ভঙ্গিমায় উপদেষ্টা সনর্্তপণে ময়লার বাঙ্টিতে ভেজা টিসু্যগুলোকে ছুড়ে দেন। যেন কেউ খুবই যত্নের সাথে নিজের ময়লাটিকে পৃথিবীর বুক থেকে আড়াল করার পাঁয়তারা করছে। নিজের দীর্ঘদিনের অভ্যস্তায় উপদেষ্টা হয়ত বিষয়টিকে স্বাভাবিক হিসেবেই দেখেন তবে নতুন যে কারো কাছেই বিষয়টি নি:সন্দেহে বেশ মজার একটি দৃশ্য হয়ে উঠতে পারে। আপন মনে টেবিলের উপর পা দুলিয়ে বসে থেকে এসব কথা ভাবতে ভাবতে অভিনেত্রী উপদেষ্টার প্রশ্নটিকে মনেযাগ দিয়ে শুনলেন। উপদেষ্টার কন্ঠের আন্তরিকতা ও উচ্চারণের বিনয়টুক তাকে স্পর্শ করল। তিনি সরলভাবে সত্যি কথাটুকুই বললেন। উপদেষ্টাকে তিনি জানালেন যে মাঝে মাঝে তিনি মাদক গ্রহণ করেন ঠিকই তবে পরিমিত মাত্রায়। কিন্তু নিজের সামপ্রতিক হতাশার সাথে বিষয়টি সম্পৃক্ত দেখা বোধহয় পুরোপুরি ঠিক হবে না, কারণ তিনি অনেকদিন ধরেই মাদক সেবন করেন। হয়ত হতাশ হয়ে পড়লে একটু বেশি করেন তবে কখনোই মাত্রাতিরিক্ত নয়। এরপর নিজ উদ্যোগেই তিনি উপদেষ্টাকে জানালেন যে সামপ্রতিককালে তাঁর কাজের চাপ কমে যাওয়াতে তিনি বেশ হতাশ বোধ করছেন। এছাড়া এ্যানিমেশন ছবিটিতে কেবল কন্ঠ দেয়া বিষয়ক যন্ত্রনাকেও তিনি একেবারে মন খুলে উপদেষ্টার সামনে তুলে ধরলেন, তিনি এও স্বীকার করলেন কিভাবে নতুন নতুন নোংরা প্রতিযোগীতায় নিজেকে তাঁর অপাংতেয় মনে হচ্ছে, তিনি যে স্বপ্ন নিয়ে অভিনয় জীবন শুরু করেছিলেন তা কি করে দিনেদিনে হারিয়ে যাচ্ছে। অভিনেত্রীর বিমর্ষ উচ্চারণের সততা এবং স্বচ্ছ জলের মত স্পষ্ট মুখোভঙ্গি উপদেষ্টা এতক্ষণ ধরে যা জানতে চাইছিলেন তার সবটুকুই বলে দিল। আসলে একটা না একটা সময়ে সকলেই বলে, বিষয়টি নির্ভর করে পরামর্শকের বলানোর ক্ষমতা আর তার পূর্ব প্রস্তুতির উপর।
সর্বশেষ এডিট : ৩১ শে ডিসেম্বর, ১৯৬৯ সন্ধ্যা ৭:০০
৩টি মন্তব্য ০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

গল্পঃ প্রত্যাবর্তন

লিখেছেন ইসিয়াক, ১৮ ই জুন, ২০২৬ ভোর ৬:৪৪


চন্দ্রা পশ্চিমের বারান্দায় উদাস হয়ে দাঁড়িয়ে আছে।আকাশে ছড়ানো ছেটানো  মেঘ, সেই মেঘের মতই তার মনটা আজ  বিক্ষিপ্ত ।
ইদানীং মা কি সব সন্দেহ করে তাকে।অকারণই মনে হয় তার কাছে। তারই... ...বাকিটুকু পড়ুন

যুদ্ধে কেউ জয়ী হয়না, যুদ্ধ বন্ধ হলে মানবতার জয় হয়।

লিখেছেন জুল ভার্ন, ১৮ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ১২:৪৩

যুদ্ধে কে জয়ী হয়েছে?

আমার উত্তর খুব সহজ- কেউ না।
যুদ্ধের প্রকৃত বিজয়ী বলে কেউ থাকে না। যুদ্ধ যখন শুরু হয়, তখন শুধু সৈনিক নয়; মায়ের বুক খালি হয়, শিশুর ভবিষ্যৎ ভেঙে... ...বাকিটুকু পড়ুন

ষো-ল-ব-ছ-রঃ আর কি বর্ষপূর্তি পোস্ট লেখা হবে?

লিখেছেন আমি তুমি আমরা, ১৮ ই জুন, ২০২৬ বিকাল ৪:০৬



অবাক হয়েই চেয়ে দেখি
কখন এমন হলো?
এইতো আমার ব্লগবাড়ীটার
বয়স হল ষোল।

দুরুদুরু বুকে তখন
খুলেছিলাম ‘নিক’।
ফেলতে পলক, পেরিয়ে গেল
ষোল বছর ঠিক।

ফেসবুক আর ইউটিউবের
আছড়ে পরে ঢেউ।
সামুপাড়ায় এখন কি আর
উঁকি মারে... ...বাকিটুকু পড়ুন

কটা দুলাল

লিখেছেন শেরজা তপন, ১৮ ই জুন, ২০২৬ বিকাল ৪:৪১



বাল্য বন্ধু শফির ফোন পাইলেই টেনশনে থাকি। কোন একটা দুঃসংবাদ নিশ্চিত। আর সেটা যদি হয় সকাল বেলা তবে তো কথাই নেই। যদিও আমাদের মধ্যে আন্তরিকতার ঘাটতি নেই মোটেও তবুও... ...বাকিটুকু পড়ুন

জীবন পর্ব -১

লিখেছেন মায়াস্পর্শ, ১৮ ই জুন, ২০২৬ সন্ধ্যা ৬:৫২



(শালবন ভ্রমণ)
২০১২ সাল। সদ্য পাশ করে বের হয়েছি। কঠিন সময় পার করছিলাম। এদিক-সেদিক স্টেজ শো করে যে পেমেন্ট পেতাম, বাড়িতে ফিরতে ফিরতেই প্রায় শেষ হয়ে যেত। সকালে মায়ের হাতে... ...বাকিটুকু পড়ুন

×