somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

দেহের মর্যাদা রক্ষা করতে হবে হে রাষ্ট্র

১৯ শে মার্চ, ২০২৬ দুপুর ২:৪৬
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

দুপুরের ঠিক আগে ব্যাংকের বুথ। মুখ বন্ধ করে বসে আছে। চেহারা পরিবর্তন হয়েছে, এসি রুমের বদলে খোলা বারান্দার মত এটিএম মেশিন। আমার চেহারায় এবং মনে খুশি খুশি একটা ভাব। বাতাসে ঈদের আনন্দ, ঢাকা শহর ফাঁকা ফাঁকা লাগছে। একজন রিকশাওয়ালা একদৃষ্টিতে তাকিয়ে আছেন। অসীমের দিকে নাকি আমার দিকে নাকি ঈদের দিকে ঠিক ঠাওর হচ্ছে না। বুথের কর্মচারী মিষ্টি হেসে জানালেন, “স্যার, টাকা নাই।” একটু হতাশ হয়ে ফিরে যেতেই জানালেন, “দেড়টার পরে টাকা আসবে, নতুন নোট পাইবেন স্যার”। আম্মাকে ফোন দিয়ে জানালাম।

ঈদ উপলক্ষে দেশের বাড়ী যাইনা বহুদিন। দেশ কিংবা বাড়ী কোনটা যে আমাদের তা আগের মত আর পরিষ্কার নেই। অভিজ্ঞ হলে সবসময় যে স্বচ্ছতা বাড়ে বিষয়টা এমন নয়। সম্ভবত সন্তান হলে, কিংবা সন্তানদের নিয়ে দেশের বাড়ী বেড়াতে যাবার বিষয়টা আরো জোড়ালো হলে শহুরে মানুষের দেশের বাড়ী বিষয়টা পরিষ্কার হয়। সবই সময়ের খেলা, অর্থনীতিরও। কিছুটা নষ্টালজিয়া; কিছুটা বাস্তবতা। যদিও নিউরণ-এ জ্বলজ্বল করছে ফিলিস্তিনের শিশুদের ঈদের কথা, ইরানেরও। ইউটিউব ভিডিওর মাঝপথে আবেদন আসে যাকাত আর ত্রাণের। স্কিপ করে যাই। কিন্তু মন থেকে মুছতে পারিনা। মাথার মধ্যে দপদপ করতে থাকে। আমার দেহ একটা সিদ্ধান্ত নেয়; এড়িয়ে যেতে শুরু করে। যদিও এড়িয়ে যেয়েও মুক্তি মেলেনা। চোখের ভেতরে সফেদ বগল, বিসিএস পর্ণ, কে কত টাকা নিয়ে বাজারে, আর ৩০ সেকেন্ডে বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়া দেহের ছবি মন থেকে মুছে ফেলতে পারিনা। বয়স যত যায় ততই বুঝি দেহ বড় বুদ্ধিমান। সে ভুলে যাবার অভিনয় ভালো জানে কিন্তু ভুলতে দেয় না।

আলাদা করে না হলেও ক্লাসে আমি দেহ-শরীর এসব পড়াই, ছোট করে। বলি, যে সমাজের বৈষম্য বুঝতে হলে আপনাকে দেহের দাম বুঝতে হবে। একজন আমেরিকান ইসরায়েলি দেহের দাম যে সিরিয়া-ইরান-ইরাকের দেহের চাইতে অনেক অনেক বেশি সেটা বুঝতে হবে। নারীর দেহ আর পুরুষের দেহের দাম, আদিবাসী আর সমতলের দেহের দাম, মেজরিটি আর মাইনোরিটি দেহের দাম, বিপ্লবে বিজয়ী আর পরাজিতের দেহের দাম, বৈধ ও অবৈধতা সব বুঝতে হবে। এই জামানায়, এই দুনিয়ায় দেহের দাম নির্ধারিত হয় রাষ্ট্রের ক্ষমতায় এবং যত্নে। আর তখনি মনেমনে গুণগুণ করতে থাকেন প্রতুল, “জন্মিলে মরিতে হবে রে জানে তো সবাই তবু মরণে মরণে অনেক ফারাক আছে ভাই রে, সব মরণ নয় সমান”। প্রতুলের গান শেষ হয়না; ময়মনসিংহ রোডে বয়স্ক বৃদ্ধের ছবি ভেসে ওঠে। কীভাবে পড়ে রয়েছেন। গা শিউরে ওঠে।

আঞ্জুমান মফিদুল ইসলাম এর কাজের প্রতি আমার বিশেষ রকমের শ্রদ্ধা আছে। বেওয়ারিশ মুসলিম দেহগুলিকে এঁনারা কবরস্থ করেন। অন্যান্য ধর্মগুলির দেহগুলির জন্য কি এমন ব্যবস্থা আছে? যারা ধর্মহীন তাদের দেহগুলির জন্য কি কি ব্যবস্থা আছে সেটা জানতে ইচ্ছে করে। সমাজে সবধরণের দেহের অন্তিম বিদায়ের যে ন্যুনতম ব্যবস্থা সেটাই তো “সভ্যতা” তার চেয়েও বড় প্রমাণ “আমরা এখনো মানুষ”। তখনি বোঝা যায় যে সমাজ বলে কিছু একটা আছে। মানুষ হিসেবে কোন প্রজাতি আছে যারা তাদের অন্যান্য সদস্যদের সম্মানের সাথে বিদায় দেন। দেহের সম্মান করেন।

দেহটাই তো সব। আবার এইসব দেহ সমূহেই সকল বিভেদ। দেহই সকল “অযৌক্তিক” আবেগের আধার। পরিবর্তনের সূতিকাগার। তা-না হলে কেন কোটিখানেক মানুষ প্রতি বছর দুইবার এই শহর ছেড়ে তাদের দেশের বাড়ীতে যাবার জন্য জীবনের ঝুঁকি নিয়ে করে অভিযাত্রা শুরু করেন? সেই অনিশ্চিত বিপদ সংকুল যাত্রাটা তারা কেন করেন? তারা তো জানেন পরিবারের কাছে যাবার জন্য এক নিমিষেই তাদের দেহগুলি হুট করে বিচ্ছিন্ন হয়ে যেতে হতে পারে, একটা অপমানজনক মৃত্যু তাদের ছিন্নভিন্ন করে ফেলতে পারে। একটু অসতর্কতাতেও প্রিয় দেহগুলির সাথে আর দেখা হবে না। ভূমিষ্ঠ না হওয়া শিশুটির সাথে আর দেখা হবে না। যে নতুন দেহটি তারা দুজনে মিলে তৈরি করেছিলেন তাঁকে আর দেখা হবে না। যার নাম সমাজ দিয়েছে সন্তান; কিন্তু এই যে ম্যাজিক এটার জন্যই তো এই সংসার।
এই যে দেহের সাথে দেহের সম্পর্ক তার মধ্যে নৈতিকতা আছে, সম্মান আছে, ভালোবাসা আছে ঘৃণা আছে। আর আছে বৈষম্য। নব্য উদারনৈতিক অর্থনৈতী আর নির্বোধ বিজ্ঞানের যুক্তির চেতনায় বূঁদ হয়ে থাকা নতুন দেহসমূহ যাদের আমরা বলি প্রজন্ম তাই ঠাহর করতে পারেন না কেন তাঁদের পিতামাতারা কোভিডের সময়েও মসজিদে যেয়ে নামাজ পড়ে? কেন তাদের মৃত্যুর আশংকটা আর কাজ করেনা; কোন নতুন জীবনের খোঁজ তারা পান? কেনইবা গুলি আর ট্যাংকের মুখে লাখে লাখে মানুষ পথে নেমে আসে? আন্দোলন এবং সংগ্রামে সম্পূর্ণ অচেনা দেহগুলিকে নিজের করে নেয়? পরিবার হয়ে ওঠে? অচেনা দেহগুলিকে বাঁচানোর জন্য নিজের জীবন বিপন্ন করে? কেনইবা হেলিকপ্টার থেকে ছুঁটে আসা বুলেটে ছিন্নভিন্ন হওয়া শিশুর দেহ দেখে সে ক্রোধে বিস্ফোরিত হয়? কেনই বা জানাযায় হাজির হয়? কেনই বা বন্ধুর পিতার লাশ সে বহন করে নিয়ে যায় চিতা পর্যন্ত? অপরের দেহের প্রতি, কিংবা মৃত দেহের প্রতি কিসের এত টান এত সম্মান?

যখন দেহের কোন সম্মান থাকেনা তখন আসলে মানুষ আর মানুষ থাকেনা, এটাকে বলে যুদ্ধ, গণহত্যা, এথনিক ক্লেনজিং। যদিও এই মানুষই অন্যের দেহের ধংসে আনন্দও পায়। অশ্লীলতায় উত্তেজিত হয়। যদিও যুদ্ধেরও নিয়ম রয়েছে। অনাদিকাল থেকে যুদ্ধ করে তারা যুদ্ধের নিয়মও বের করেছে। কোন অস্ত্র ব্যবহার করা যাবেনা, কোন কোন দেহকে আক্রমণ করা যাবেনা তার রীতি ও নীতি রয়েছে। দেহ থেকে সম্মান সরানোর মধ্য দিয়ে তাকে হত্যাযোগ্য করে তোলা হয়, উৎসব হয় উল্লাসও হয়। এসব থেকে মুক্তির জন্য এই মানুষই আইন ও শৃঙ্খলা তৈরি করেছে। এমনকি “বৈধ হত্যাকান্ডের” জন্য কাঠামোও তৈরি করেছে। যার নাম দিয়েছে রাষ্ট্র। এই রাষ্ট্র কাঠামোর অপরিসীম দায়িত্ব রয়েছে। এই যে অর্থনীতি, সেতো দাড়িয়ে আছে দেহগুলির এনার্জী ব্যবহারের কৌশলের মধ্য দিয়ে। আমাদের রাষ্ট্রের আয়ও তো আসে দেহগুলিকে সস্তায় বিক্রী করার মধ্য দিয়ে। কিন্তু এত সস্তায়?

পুরো রাষ্ট্রের প্রতিটি এসি আর প্রতিটি গাড়ী আর প্রতিটি মোবাইলের পেছনের দেহগুলি এত সস্তা? এই দেহগুলি তো চারগুণ বেশি অর্থ দিয়ে তাদের প্রিয়জনদের সাথে দেখা করতে চেয়েছিল। এই চাওয়াটা অপরাধ? দু-বছরও হয়নি হাজার হাজার মানুষ রক্ত দিয়েছে নিজেদের দেহের মর্যাদা ফিরিয়ে আনার জন্য। এত সহজে ভুলে গেলে হবে? এই যে দামী দেহগুলি আজ বড় বড় দেহসুরক্ষা গাড়ীতে-বাড়ীতে আর বুদ্ধিমত্তায় নিজেদের নিরাপদ রেখেছেন তাদের সকল শক্তির উৎস তো এই দেহগুলোই। বেঈমান হলে চলবে?
একটি দেহও সস্তা নয়। সে মানুষ। এই মানুষগুলি তাদের সকল শ্রম আর ঘাম দিয়ে নিজেদের আবেগ কিনে নিয়েছেন। এই দেহের সম্মান রক্ষা করার জন্যই রাষ্ট্র আর সমাজ। প্রতিবার তাদের দেহগুলিকে আত্মহত্যার জন্য পাঠিয়ে দেয়ার বন্দোবস্ত করার অপরাধ থেকে রাষ্ট্র মুক্তি পাবে না।

সকল শোকে, সকল উৎসবে দেহরা মিলিত হবে একত্র হতে পারবেন নিরাপদে এটার জন্যই এতসব পরিবহন। এখানে লোভ আর লালসার নিয়ন্ত্রণ করবে রাষ্ট্র। এই দেহগুলির প্রতি মাফ চাইবে। বারংবার তাদের আত্মহত্যার দিকে ঠেলে দেবার জন্য যারা দায়ী তাদেরকে কঠোরতম শাস্তির মুখোমুখি করবে। মধ্যবিত্তের অপলাপ বা ধনীর বাহুল্য নয় বরং প্রতিটি দেহের মর্যাদা রক্ষা না করতে পারলে রাষ্ট্রের কোন বৈধতা থাকেনা। আর মানুষ এমন প্রাণী, এই মাটিতে সে বারবার প্রমাণ করেছে যে প্রতিটি দেহের মর্যাদা সুনিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত সে থামবে না।
আমি চাই সেই রিকশাওয়ালা যিনি আমার চেয়ে বহুগুণ বেশি তাঁর দেহকে ঝুঁকিতে ফেলেন, সেই কর্মচারী, আমি আমার মা, মানুষ হিসেবে আমাদের সকলের পরিবার মর্যাদার সাথে বাড়ী ফিরুন। আর তাই হে রাষ্ট্র যেই কাঠামো আমরাই তৈরি করেছি আপনাকে মনে করিয়ে দিচ্ছি; সম্মান জনক বিদায়ের ব্যবস্থা সুনিশ্চিত করুন, দূর্ঘটনা বলে দেহের মর্যাদাহানি করা চলবেনা।

শরৎ চৌধুরী, ১৯শে মার্চ ২০২৬।
সর্বশেষ এডিট : ১৯ শে মার্চ, ২০২৬ বিকাল ৩:৩৫
৩টি মন্তব্য ৩টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

সৌদি আরবে বাংলাদেশের নতুন অধ্যায়

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ০১ লা নভেম্বর, ২০২৬ রাত ১:৫৮


দিন দিন সরকারপ্রধানের ফ্যান হয়ে যাচ্ছি। তাঁর চলাফেরা, সাধারণ মানুষের সঙ্গে মেলামেশা দেখে মানুষ বলতে শুরু করেছে, এ যেন আরেক জিয়া। আর “I have a plan” কথাটার অর্থ এত... ...বাকিটুকু পড়ুন

বিশ্ব রাজনীতি, ক্ষমতা ও অর্থনীতির কেন্দ্রে এখন ভারত

লিখেছেন ...নিপুণ কথন..., ০১ লা নভেম্বর, ২০২৬ রাত ৩:১২


ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী Dr S. Jaishankar কথা বলছেন, মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিওসহ অন্য বিশাল ক্ষমতাধর রাষ্ট্রের মন্ত্রীরা একাগ্রচিত্তে শুনছেন।

হ্যাঁ, অস্বীকার করার উপায় নেই। বর্তমানে বিশ্বে ভারতের অবস্থান এমনই। সামরিক... ...বাকিটুকু পড়ুন

এইচ এস সি রেজাল্ট ২০২৬ -ঢাকা বোর্ড

লিখেছেন হুমায়রা হারুন, ০১ লা নভেম্বর, ২০২৬ সকাল ১১:২৯

খুব অদ্ভুত ব্যাপার। আমাদের সময়ে চলে এলো নাকি? সেই চার দশক আগের মতন !
যা তথ্য পেলামঃ

In the 2026 HSC examinations, a total of 297,621 candidates appeared... ...বাকিটুকু পড়ুন

আমাদের হ্যালোইন উদযাপন

লিখেছেন শ্রাবণধারা, ০১ লা নভেম্বর, ২০২৬ দুপুর ২:৫৩


আজ ছিল হ্যালোইন। এই উৎসব ফসল কাটার মৌসুমের শেষ ও শীতের শুরু - এই উপলক্ষে হলেও বছরের এ সময়ে কানাডায় ঠান্ডা পড়ে যায়। তবে আজ আবহাওয়া ছিল ভালো। সারাদিন রোদ... ...বাকিটুকু পড়ুন

ইয়াংসান থেকে জুলাইয়ের নতুন বন্দোবস্ত

লিখেছেন কলিমুদ্দি দফাদার, ০২ রা নভেম্বর, ২০২৬ রাত ১:৩৯



Youngsan সিউলের ভিতরে আমেরিকান একটি মিলিটারি বেইস। মিলিটারি বেইসের ভিতরে বার্গার কিং, KFC, Macdonald সব আছে। কোরিয়ান ভিতরে সামরিক ঘাঁটি হলে ও মিলিটারি বেইসের ভিতরে প্রধান কারেন্সি ইউএস ডলার।... ...বাকিটুকু পড়ুন

×