somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

ঈদের আগে যে গান আমাদের ভেতরকে জাগিয়ে তোলে: নজরুলের এক সাংস্কৃতিক অলৌকিকতা

২১ শে মার্চ, ২০২৬ বিকাল ৩:৩৮
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :



ঈদের চাঁদ উঠেছে কি না—এই প্রশ্নের আগে, বাংলাদেশে আরেকটি প্রশ্ন নিঃশব্দে ভেসে ওঠে:
“ও মন রমজানের ঐ রোজার শেষে…”—গানটা কি বাজছে?

যে মুহূর্তে এই সুর ভেসে আসে, তখন বোঝা যায়—ঈদ এসে গেছে। শুধু ক্যালেন্ডারে নয়, মানুষের মনে, ঘরে, বাতাসে।

এই এক গান কীভাবে একটি জাতির ঈদের প্রতীক হয়ে উঠল—এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গেলে, আমাদের যেতে হয় শুধু সংগীতের কাছে নয়; ইতিহাস, সমাজ, ধর্মীয় অনুভূতি এবং মিডিয়ার গভীর এক মিলনের দিকে।

বাংলা ভাষায় ঈদের গান—একসময় প্রায় অনুপস্থিত একটি জগৎ। ধর্মীয় অনুভূতি ছিল, কিন্তু তার নিজস্ব বাংলা সংগীতভাষা গড়ে ওঠেনি। ঠিক এই জায়গায় Kazi Nazrul Islam প্রবেশ করেন।

১৯৩০-এর দশকে তিনি যখন এই গানটি লেখেন, তখন তিনি শুধু একটি গান তৈরি করেননি—তিনি তৈরি করেছিলেন এক নতুন ভাষা, যেখানে ইসলামি ভাব, বাঙালির কাব্যভঙ্গি এবং গণমানুষের আবেগ এক হয়ে যায়।
এই গান তাই শুরু থেকেই কেবল “একটি গান” ছিল না; এটি ছিল একটি সাংস্কৃতিক প্রয়োজনের উত্তর।

ধর্মের ধারালো শ্লেষের মধ্যে আমাদের শৈশব কাটেনি। উচ্চারণে, টিপ্পনীতে মারমার কাটকাট দূরত্ব আর অবহেলায় অন্য ধর্মের মানুষদের সাথে আমরা বড় হইনি। আমরা কথায় কথায় “বিধর্মী” শব্দটা ব্যবহার করতাম না—জানতামই না আসলে। আমরা সৌভাগ্যবান—এই নোংরা আধিপত্যবাদী বিভাজনের মধ্যে আমরা বড় হইনি। বড় হয়ে জেনেছি, একে তত্ত্বীয়ভাবে বলা হয় সিনক্রোনিক সহাবস্থান।

আমাদের সবার গান—
“ও মন রমজানের ঐ রোজার শেষে এল খুশির ঈদ।”

কারণ এই গানটি শুধু ঈদের আনন্দের গান না; এটি একসঙ্গে রমজানের সাধনা, যাকাত-ফিতরা, ঈদের জামাত, ভ্রাতৃত্ব, ক্ষমা, দানশীলতা এবং বাঙালি মুসলমানের সাংস্কৃতিক আত্মপরিচয়—সবকিছুকে এক গানে বেঁধে ফেলেছে। তাই এটি “শুধু জনপ্রিয়” হয়নি; এটি হয়ে উঠেছে ঈদের সামাজিক শব্দচিহ্ন।

আরও নির্দিষ্ট করে বললে, এই গান বাংলাদেশের ঈদের প্রধান গানে পরিণত হওয়ার পেছনে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ আছে।

প্রথমত, এটি এক ঐতিহাসিক শূন্যস্থান পূরণ করেছিল। ১৯৩১ সালে আব্বাসউদ্দীন আহমদের অনুরোধে নজরুল গানটি লেখেন ও সুরারোপ করেন; ১৯৩২ সালে এটি প্রথম রেকর্ড আকারে প্রকাশিত হয়। তখন বাংলা ভাষায় ইসলামী সংগীতের নিজস্ব শক্ত ভিত্তি ছিল না; ফলে গানটি ধর্মীয় অনুভূতিকে নিজের ভাষায় প্রকাশের এক শক্তিশালী মাধ্যম হয়ে ওঠে।

আজ ভুলে যা তোর দোস্ত-দুশমন
হাত মেলাও হাতে
আজ ভুলে যা তোর দোস্ত-দুশমন
হাত মেলাও হাতে

দ্বিতীয়ত, গানের ভাবনা ঈদকে কেবল উৎসব নয়, নৈতিক আহ্বান হিসেবে নির্মাণ করে। এতে আনন্দ আছে, কিন্তু আত্মভোগ নেই; আছে দান, আছে দরিদ্রের কথা, আছে বিরোধ ভুলে মিলনের কথা। এই নৈতিক গভীরতাই গানটিকে ক্ষণস্থায়ী উৎসব-সংগীত হতে দেয়নি; বরং প্রতি বছর নতুন করে প্রাসঙ্গিক রেখেছে।

এই নৈতিক আহ্বানের পদ্ধতিটিও লক্ষণীয়—

তোর প্রেম দিয়ে কর বিশ্ব
নিখিল ইসলামে মুরিদ
তোর প্রেম দিয়ে কর বিশ্ব
নিখিল ইসলামে মুরিদ

বারবার এই গান দুনিয়াবি মোহমায়া অতিক্রমের কথা বলে—

তুই আপনাকে আজ বিলিয়ে দে
শোন আসমানী তাগিদ
তুই আপনাকে আজ বিলিয়ে দে
শোন আসমানী তাগিদ

এখানে “সেল্ফ” ধারণাটি জটিল হয়ে ওঠে—
নিজেকে হারানো নয়, বরং এমন এক নিজ, যে নিজেকে বিলিয়ে দিতে পারে।

তৃতীয়ত, এর ভাষা ও সুর—দুটিই সহজে স্মরণযোগ্য। আরবি-ফার্সি ইসলামী আবহ ও বাংলা কাব্যভাষার এমন সংমিশ্রণ তৈরি হয়েছে, যা ধর্মীয়, আবেগময়, গণগ্রাহ্য এবং সমবেতভাবে গাওয়ার উপযোগী। ফলে এটি এলিট সংগীত হয়ে থাকেনি; ঘর, মহল্লা, রেডিও, মঞ্চ—সব জায়গায় ছড়িয়ে পড়েছে।

চতুর্থত, এই গানটি ধীরে ধীরে একটি মিডিয়া-রিচ্যুয়াল হয়ে ওঠে। স্বাধীনতার পর বাংলাদেশ টেলিভিশন ও বেতার নিয়মিতভাবে ঈদের আগে এই গান প্রচার করতে থাকে। বিশেষ করে চাঁদরাতের সম্প্রচারে এটি এক ঐতিহ্যে পরিণত হয়। প্রতি বছর, একই সময়ে, একই সুর—ফলে এটি শুধু গান থাকে না; এটি সময়ের চিহ্ন, স্মৃতির অংশ, পারিবারিক অভ্যাস হয়ে ওঠে।

পঞ্চমত, এটি প্রজন্মান্তরে নতুন কণ্ঠে ফিরে এসেছে—
প্রথমে আব্বাসউদ্দীন, পরে বিভিন্ন শিল্পী, সম্প্রচার, পুনর্নির্মাণ—এই ধারাবাহিকতায় গানটি কখনো পুরোনো হয়ে যায়নি; বরং ঐতিহ্য, পুনঃপ্রচার ও পুনর্জন্মের মধ্য দিয়ে টিকে আছে।

ষষ্ঠত, এর সমপর্যায়ের কোনো শক্তিশালী প্রতিদ্বন্দ্বী তৈরি হয়নি। প্রায় এক শতক পরেও অন্য কোনো ঈদের গান একই সঙ্গে সমষ্টিগত গ্রহণযোগ্যতা, আবেগ, ধর্মীয় মর্যাদা এবং মিডিয়া-প্রাতিষ্ঠানিক পুনরাবৃত্তি অর্জন করতে পারেনি।

গানটির ভাষা সহজ, কিন্তু গভীর। এটি দূরে ঠেলে দেয় না; কাছে টানে।

আজ পড়বি ঈদের নামাজ রে মন
সেই সে ঈদগাহে

এখানে ঈদগাহ কেবল একটি ভৌত স্থান নয়—এটি এক অনুভবের ক্ষেত্র।
“আসমানী তাগিদ”, “রাহে লিল্লাহ”, “তৌহিদের শিরনি”—এসব শব্দ ধর্মীয় আবহ তৈরি করে, কিন্তু বিভাজন তৈরি করে না।

আবার এটি আমাদের বাস্তব জগতেও ফিরিয়ে আনে—

যে ময়দানে সব গাজী মুসলিম হয়েছে শহীদ

সুরটিও এমন—যা একা গাওয়া যায়, আবার সমবেতভাবে গাওয়া যায়।
এই সহজ কিন্তু গভীর গুণই গানটিকে ঘরে ঘরে পৌঁছে দিয়েছে।

তোর দাওয়াত কবুল করবেন হজরত
হয় মনে উম্মীদ

এখানে কেবল আচার নয়—মনের কথাও গুরুত্বপূর্ণ। ঈদ কেবল বাহ্যিক নয়; এটি এক অন্তর্গত অবস্থা।

কিন্তু এই গানকে বোঝার জন্য আমাদের আরও গভীরে যেতে হয়—এথনোগ্রাফিক স্মৃতির ভেতরে।

আমাদের স্মৃতির সমাজে—
গৃহকর্মী ছিল পরিবারের অংশ
একই থালা-বাসন, একসাথে খাওয়া—দৈনন্দিন সমতা
স্কুলে ধর্মীয় সহাবস্থান
গ্রামে সমষ্টিগত শ্রম
শিক্ষক-শিক্ষার্থী সম্পর্ক ছিল নৈতিক ও ঘন

এই অভিজ্ঞতাগুলো এক ধরনের “ঘন সামাজিকতা”—
যেখানে সম্পর্ক কেবল লেনদেন নয়, বরং দায়বদ্ধতা ও নৈকট্যে গঠিত।

আজ সেই সমাজ বদলেছে—
দূরত্ব বেড়েছে,
সম্পর্ক প্রাতিষ্ঠানিক হয়েছে,
সমষ্টিগত উদ্যোগ কমে গেছে।

তাহলে কি আমরা আগে বেশি সহনশীল ছিলাম?

প্রশ্নটি সহজ নয়।
স্মৃতি সবসময় বর্তমানের আলোয় পুনর্গঠিত হয়।
তবুও বলা যায়—সম্পর্কের ঘনত্ব, পারস্পরিকতার মাত্রা একসময় বেশি ছিল।

এই প্রেক্ষাপটে গানটি নতুন অর্থ পায়।

গানটি যে মূল্যবোধগুলো ধারণ করে—
দান, আত্মত্যাগ, মিলন, সমষ্টিগত আনন্দ—
এগুলো সেই সামাজিকতারই প্রতিধ্বনি, যা আমাদের স্মৃতিতে রয়ে গেছে।

তাই এই গান শুধু ঈদের ঘোষণা নয়;
এটি এক সামাজিক স্মৃতি, এক নৈতিক মানদণ্ড, এক আকাঙ্ক্ষা।

যখন আমরা শুনি—
“ও মন রমজানের ঐ রোজার শেষে…”

তখন আমরা শুধু ঈদকে মনে করি না—
আমরা মনে করি এক ধরনের সমাজকে।

এই গান আমাদের সামনে একটি প্রশ্ন রেখে যায়—

আমরা কি এখনও সেই মানুষ আছি,
যাদের জন্য ঈদ মানে ছিল “নিজেকে বিলিয়ে দেওয়া”?

হয়তো এই কারণেই, এত বছর পরও,
ঈদের আগে আমাদের ভেতর নিজেই বলে ওঠে—

“ও মন রমজানের ঐ রোজার শেষে…”

আমরা সৌভাগ্যবান, আমাদের একজন কবি ছিলেন। প্রেমে আর দ্রোহে নিমজ্জ কাজী নজরুল ইসলাম। যিনি এত অপূর্ব এক ঈদের গান রচনা করেছিলেন।

শরৎ চৌধুরী, ২১শে মার্চ, ঈদের দিন, ২০২৬। ঢাকা।
সর্বশেষ এডিট : ২১ শে মার্চ, ২০২৬ বিকাল ৩:৩৯
২টি মন্তব্য ২টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

লাভ কার হলো?

লিখেছেন রাবব১৯৭১, ২৪ শে মে, ২০২৬ ভোর ৬:১৮


দীর্ঘদিন একটি দল রাষ্ট্রক্ষমতায় থাকলে, সরকারের ভেতর এক ধরনের সুবিধাভোগী শ্রেণি তৈরি হয়। তারা নিজেদের স্বার্থ রক্ষায় দেশের প্রকৃত অবস্থা আড়াল করতে ব্যস্ত থাকে। বাংলাদেশেও সেই বাস্তবতা ছিল।
২০২৪ সালের আন্দোলন... ...বাকিটুকু পড়ুন

হায়রে জীবন!

লিখেছেন জুল ভার্ন, ২৪ শে মে, ২০২৬ সকাল ৮:৫৬

হায়রে জীবন!

যারা বছরের পর বছর রাষ্ট্রক্ষমতার ছত্রছায়ায় থেকে মানুষ গুম করেছে, নির্যাতন করেছে, পরিবার ধ্বংস করেছে, রাষ্ট্রকে ভয় ও আতঙ্কের কারখানায় পরিণত করেছে- তাদের মধ্যে হাতেগোনা কয়েকজন আজ “ভিআইপি আসামি”।
কারাগারেও... ...বাকিটুকু পড়ুন

রসময় গালগল্প

লিখেছেন রাজীব নুর, ২৪ শে মে, ২০২৬ দুপুর ১২:৫৮



প্রতিদিন ভাবি তুমি এলে বেশ জমিয়ে করবো-
রসকষহীন কাঠখোট্টা গল্প!
আমার সঞ্চয়ে নেই কোনো রসময় গালগল্প-
যা থেকে পেতে পারো যৎকিঞ্চিত উষ্ণতা।

আমি ঠিক নিশ্চিত নই আদৌ তুমি আসো কিনা!... ...বাকিটুকু পড়ুন

ঈদযাত্রায় সচেতন হোন, নিরাপদ থাকুন

লিখেছেন শাওন আহমাদ, ২৪ শে মে, ২০২৬ বিকাল ৩:২১



ঈদ মানে আনন্দ, ঈদ মানে সারা বছরের কর্মব্যস্ততা পেছনে ফেলে শেকড়ের টানে নীড়ে ফেরার চিরন্তন আকুলতা। প্রিয় মুখগুলোকে বুকে জড়িয়ে অপার্থিব শান্তি অনুভব করা। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য, প্রতি বছর... ...বাকিটুকু পড়ুন

মেঝ দা

লিখেছেন শেরজা তপন, ২৪ শে মে, ২০২৬ রাত ৮:৩৩

লেখালেখি ভীষন বিরক্তিকর লাগে এখন। গাইতে গাইতে গায়েনের মত আমি লিখতে লিখতে লেখক হয়েছি। লেখালেখি নি কোন আশাবাদ বা প্যাশন আমার কস্মিনকালে ছিল না- এটা আমার নেহায়েত শখের বিষয়।... ...বাকিটুকু পড়ুন

×