এ বছর আমি ঈদ করার চেষ্টা করেছি অনেক। ফিলিস্তিনের মুখগুলি এখন আর আগের মতো বিরক্ত করে না। অ্যালগরিদম সরিয়ে রাখে; ইরানের মুখগুলি মিডিয়ার রাজনীতিতে সামনে আসে কম। তবে ঈদের শুরুতেই লঞ্চের পাটাতনে শুয়ে যে তরুণ আমার দিকে তাকিয়ে ছিল, তার চোখদুটি বন্ধ হয়নি। তার দুটি চোখ আমার দিকে সারাক্ষণ তাকিয়ে থাকে। তার কোমরের নিচে পুরো বাংলাদেশ; যেন থেঁতলে স্তম্ভিত হয়ে আছে। স্থির-অসহায়। পানির তলা থেকে ডুবুরিরা একে একে কারও জীবন, কারও সহধর্মিণী বা কারও সন্তানকে টেনে টেনে তুলছে—সেই দৃশ্য আমি মনে রাখব। জীবনে যতবার আমি লঞ্চ দেখব, পানির দিকে তাকাব, ততদিন তাঁরা আমার দিকে তাকিয়ে থাকবে। আমি তাঁদের সঙ্গে বিড়বিড় করে কথা বলব।
আমার মতো অনেকেই বা অনেকের মতো আমিও গতরাত ঘুমাতে পারিনি। একটা বাস তার ভেতরে আটকে পড়া প্রিয়জনদের শেষ চিৎকার শুনতে শুনতে নদীতে ঝাঁপ দিল। এর সঙ্গে সঙ্গেই আরেকটি দৃশ্য মনে পড়ল; একজন বাবা জ্বলন্ত ট্রেনে তাঁর পরিবার নিয়ে চিৎকার করছেন। ট্রেনের জানালায় তাঁদের মুখগুলি আমার নিউরন পুড়িয়ে একটা স্থায়ী ছায়াছবি হিসেবে বসে আছে।
আমি নিশ্চিত ফিলিস্তিনের প্রতিটি পরিবার, প্রতিবেশী, পরিচিত আর অপরিচিত মুখগুলি মৃত্যুর ঠিক আগে, অন্যের মুখের দিকে তাকিয়ে একটা কথাই বলে, “মনে রাখিস”। যখন বলতে পারেন না, তখন তাঁদের চোখগুলি বলে, বিচ্ছিন্ন হাতগুলি বলে। তা না হলে কীভাবে; কীভাবে প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে এই অসীম যুদ্ধ তাঁরা পার করছেন?
এখন আর বিশ্লেষণ করতে ইচ্ছে করছে না। ক্লান্ত লাগছে। ভীষণ ক্লান্ত। কাঠামোগত হত্যাকাণ্ড, মাফিয়া, রাষ্ট্রের উদাসীনতা, এইসব নিয়ে লিখতে পারছি না। শক্তি আসছে না। আমি আমার বেদনা জানাতে এসেছি। গভীর বিষণ্নতায় এই স্বাধীনতা দিবস ২০২৬ শুরু হয়েছে। অপারেশন সার্চলাইটের বিভীষিকার কারণে স্বাধীনতা দিবস আমার জন্য বিষণ্নতার একটি দিন। আমার পূর্ব প্রজন্ম কোথা থেকে যেন আমাকে ডেকে বলে, “শোন, মনে রাখিস।” আমি মনে রাখছি। আমাদের জীবনে নাম মনে রাখার তালিকা বড় হচ্ছে। এদিকে আমারও বয়স হচ্ছে; আগের মতো নাম মনে রাখতে পারি না। তবে একটা বিষয় বুঝতে শিখেছি। কেন মানুষ মানুষের নাম মনে রাখে। যত্ন করে নাম উচ্চারণ করে।
ঈদের সার্বজনীন আনন্দের মধ্যে আমরা একের পর এক হত্যাকাণ্ডের মুখোমুখি হই। প্রতি বছর। নিয়ম করে। দুর্গাপূজাতে, বড়দিনে, সবদিনেই হই। আমাদের তালিকা বাড়তে থাকে। কেউ কেউ থাকে পরিচিত সার্কেলের। কেউ থাকে নিজের বিশ্ববিদ্যালয়ের। কেউ থাকে দূরের কেউ, কিন্তু সবাই আপন। একটা সামষ্টিক শোকে আমাদের বড় হওয়া, বুড়ো হওয়া। যখন ছোট ছিলাম, দুনিয়াটা ছোট ছিল, তখন এত শোক নিতে হতো না। যতই বড় হচ্ছি, ততই শোকের পাহাড় জমা হচ্ছে। গোটা দুনিয়ার শোক যেন আমার হৃদয়ে জমা হচ্ছে। আমার ছোট্ট হৃদয় এত বড় শোক আর নিতে পারে না। কিন্তু কাকে দূরে ঠেলে দেবো আমি? যেই শহর লালনের, সেই কুষ্টিয়ার ১৩ বছরের আয়েশাকে? যেই শহরে আমি বড় হয়েছি, সেই দিনাজপুরের নাছিমাকে? যেই রাজবাড়ীর মিষ্টি আমি খাবো বলে ভেবে রেখেছি, সেই রাজবাড়ীর রেহেনা আক্তারকে? কাজী সাইফকে? যারা খুন হলেন তাঁদের বয়সের পরিসর: ৭ মাস – ৬১ বছর। যাদের গড় বয়স ২৪ বছর। নারী আর পুরুষের অনুপাত ৫৭%–৪৩%। যেখানে নারী ও শিশুর আধিক্য → এটি একটি civilian-heavy ঘটনা নির্দেশ করে। একই পরিবার/এলাকা থেকে একাধিক সদস্য:
২৬ জন: একটি সংখ্যা নয়
রাজবাড়ীর দৌলতদিয়া ফেরিঘাটে—
একটি বাস, ফেরিতে ওঠার অপেক্ষায়—
হঠাৎ পন্টুন থেকে পদ্মা নদীতে পড়ে গেল। পড়ে যায়? আপনা-আপনি?
একটি যানবাহন না—
একটি পূর্ণ জীবনযাত্রা—
একসাথে ডুবে গেল। এমনিতেই? তাকে ঠেলে দেওয়া হলো না? বারবার ঠেলে দেওয়া হয় না?
২৬ জন। যে সংখ্যা আরও বাড়বে।
৭ মাস থেকে ৬১ বছর।
গড় বয়স প্রায় ২৪।
এই সংখ্যাগুলো কেবল পরিসংখ্যান না।
এগুলো একটি অসমাপ্ত ভবিষ্যতের হিসাব।
এই ২৬ জনের মধ্যে—
১১ জন নারী, ৮ জন শিশু, ৭ জন পুরুষ।
অর্থাৎ—
অধিকাংশই নারী ও শিশু।
এটি কোনো যুদ্ধ না।
এটি কোনো সংঘর্ষ না।
এটি এমনকি কেবল “দুর্ঘটনা” বলেও শেষ হয়ে যায় না।
এটি একটি mass civilian death। কিলিং না?
একই পরিবারের একাধিক সদস্য—
একই গ্রামের মানুষ—
একই যাত্রার সঙ্গী।
চর বারকিপাড়া।
ভবানীপুর।
সজ্জনকান্দা।
এই নামগুলো এখন আর শুধু মানচিত্রের বিন্দু না—
এগুলো হয়ে উঠেছে শোকের কেন্দ্র। মাতমের গ্রাম।
এটি একটি collective loss structure—
যেখানে মৃত্যু ব্যক্তি না, পরিবারকে গ্রাস করে।
যেখানে একটি বাস ডুবে যাওয়া মানে একটি সামাজিক জগত ডুবে যাওয়া।
পন্টুন থেকে নদীতে পড়ে যাওয়া এই বাসটি
শুধু একটি যানবাহন না—
এটি আমাদের রাষ্ট্রের নিরাপত্তা কাঠামোর একটি প্রতিচ্ছবি।
বহু রক্তের বিনিময়ে আমাদের স্বাধীনতা অর্জন করতে হয়। বহু রক্তের বিনিময়ে আমাদের স্বৈরাচার থেকে মুক্ত হতে হয়। আমাদের বাচ্চাদের বারান্দায় গুলি করা হয়। আমাদের ভাইদের লাশ ঝুলতে থাকে রিকশার প্যাডেলে। আমাদের বীরেরা সারা জীবনের জন্য পঙ্গু হয়ে কাতরাতে থাকে। আমাদের স্কুলগুলিতে বিমান ভেঙে পড়ে। আমাদের মা-বোনেরা দগ্ধ হয়ে চিৎকার করতে থাকে। আমাদের শিশুরা বোবা হয়ে বিস্ময়ে কাঁদতে থাকে। হিরোশিমা, ফিলিস্তিন থেকে আমরা কত দূরে? আমাদের বোনদের নৃশংসভাবে ধর্ষণ করা হয়।
আমাদের গার্মেন্টসগুলিতে আগুনে গলে যায় শ্রমিকরা; আমাদের বস্তিতে ঘরবাড়ি ছাই হয়ে যায়, আমাদের বিল্ডিংগুলিতে গ্যাস বিস্ফোরণ হয়, আর আমরা প্রতিবার পরিদর্শনে যাই। যেন এই উলঙ্গ ব্যবস্থার নগ্ন ছবিটা দেখে আমাদের গভীর বিকৃত সুখ হয়। আসলে কী হয়? কাদের হয়?
যাদের হয়, আমি তাদের দলে না। আমি বিশ্বাস করি, এখনো আমাদের অধিকাংশই, পৃথিবীর অধিকাংশ মানুষ এমন না। এই দলের না। আমরা কাউকে পুড়িয়ে মারায় উল্লাস বোধ করি না। তবুও প্রতি বছর, প্রতিটি বছর আমরা শঙ্কিত ডিনায়ালে অপেক্ষায় থাকি। প্রতিটি দিনই অপেক্ষায় থাকি। আমাদের প্রিয়জনরা কি ফিরে আসবে নিরাপদে? আমাদের কি কোথাও নিরাপদে যাওয়ার, ফিরে আসার অধিকার নেই?
আমরা যে রক্ত দিয়ে স্বৈরশাসন থেকে মুক্ত হই, তার কি কোনোই মূল্য নেই? আমরা যে গণতন্ত্র ফিরিয়ে এনে ভোট দিতে যাই, তার কি কোনো মূল্য নেই?
তাহলে এই দেশকে, এই রাষ্ট্রকে রাষ্ট্র কেন বলি আমরা? সেই পরিবারগুলির মুখে কয়েক লক্ষ টাকা গুঁজে দেওয়ার জন্য?
কয়েকটা ডুবুরি, কয়েকটা কমিটি, কয়েকটা থানা আর হাসপাতালের জন্য?
এরপর “কর্তব্যরত ডাক্তার তাঁদেরকে মৃত ঘোষণা করলেন”—এইসব শোনার জন্য?
বাস চালক এবারে নিজেও নিহত হয়েছেন—এই “আশ্বাস” পাওয়ার জন্য? ড্রাইভার কিংবা হেলপার মারা গেলে কিসের আনন্দ?
আমরা স্ক্রিনের সামনে কেন বসে থাকি? স্বজনদের লাশগুলি নিয়ে একে একে গ্রামের বাড়ির দিকে রওয়ানা দিয়েছে অ্যাম্বুলেন্সগুলি—সেই অ্যাম্বুলেন্সগুলির জন্য? নাকি এই স্বস্তির জন্য যে, আমাদের বাড়িতে অ্যাম্বুলেন্সটি আসেনি?
আমরা এমন এক সময়ের মধ্যে শেষ হচ্ছি—
যেখানে শোক ব্যক্তিগত থাকে না।
শোক জমা হয়।
স্তরে স্তরে জমা হয়।
শৈশবে দুনিয়াটা ছোট ছিল—
শোকও ছোট ছিল।
এখন দুনিয়া বড় হয়েছে—
শোকও অসীম হয়েছে।
গোটা পৃথিবীর শোক যেন আমাদের শরীরে এসে জমা হয়।
আমার হৃদয় ছোটই হয়তো—
কিন্তু শোকের পরিমাণ অমানবিক হয়ে গেছে।
আপনি কতটা নিতে পারেন এই শোকের ভার?
আমি কাকে বাদ দেবো?
কাকে দূরে ঠেলে দেবো?
আমরা কি একটি রাষ্ট্রে বাস করি—
নাকি একটি মৃত্যুর ব্যবস্থাপনায়?
রাষ্ট্র কোথায় থাকে?
মৃত্যুর আগে—
নাকি মৃত্যুর পরে?
তাহলে কারা হত্যা করে আমাদের?
ড্রাইভার?
রাস্তা?
অবহেলা?
নাকি একটি অদৃশ্য কাঠামো—
যা প্রতিদিন আমাদের জীবনকে ঝুঁকির মধ্যে ঠেলে দেয়?
আমরা কি তাদের দেখি না—
নাকি দেখতে শিখিনি?
আমরা কি তাঁদের দেখতে পাই না?
আমরা স্বৈরাচার দেখতে পাই, গণতন্ত্র দেখতে পাই, ভোট দেখতে পাই, নিহতদের দেখতে পাই—
আর আমাদের হত্যাকারীদের দেখতে পাই না?
তারা কারা?
মৃত্যুর পরে নয়,
লাশের পাশে নয়,
ক্ষতিপূরণের খামে নয়।
খুন হওয়া পরিবারগুলির মুখে কয়েক লক্ষ টাকা গুঁজে দেওয়ার জন্য রাষ্ট্র নয়—
রাষ্ট্র আমাদের লাশের মুখে লক্ষ টাকা গুঁজে দেওয়ার আগে এবং পরে, যেভাবেই হোক, তাদেরকে আমি দেখতে চাই।
আমাদেরকে প্রতিদিন লাশে পরিণত করার বন্দোবস্তকারীদের আমি দেখতে চাই।
আমি আমার সকল বন্ধু-বান্ধবদের, চেনা-অচেনা সবাইকে—পরবর্তী প্রজন্মকে—এদের দেখিয়ে দিতে চাই।
আর বলতে চাই—
“মনে রাখিস।”
সর্বশেষ এডিট : ২৬ শে মার্চ, ২০২৬ বিকাল ৪:৪৮

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



