আমাদের স্ক্রিনে যা দেখা যায়, তা কি শুধু প্রতিবাদ—নাকি সহিংসতাও?
স্ক্রিনে আমরা অনেক কিছু দেখি। ক্ষোভ দেখি। প্রতিবাদ দেখি। বিচার চাইতে দেখি। আবার একই স্ক্রিনেই দেখি ধর্ষণের হুমকি, মেয়েদের নিয়ে নোংরা কথা, ভিকটিম-ব্লেমিং, ট্রলিং, আর দল বেঁধে আক্রমণ।

তাই প্রশ্নটা খুব জরুরি: social media কি সত্যিই ন্যায়বিচারের জায়গা? নাকি এটি এমন এক জনপরিসর, যেখানে কেউ মুখ খুললে তাকে আরও বড় ঝুঁকির মুখে পড়তে হয়?
এই লেখাটি সেই প্রশ্ন নিয়েই। একটি ছোট জরিপের তথ্যের ভিত্তিতে আমি বুঝতে চেয়েছি—বাংলাদেশের ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে যৌন সহিংসতা, অনলাইন হুমকি, এবং মব সংস্কৃতি কীভাবে কাজ করছে।
কেন এই বিষয়ে কথা বলা জরুরি
ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম এখন আমাদের জীবনের অংশ। এখানে আমরা কথা বলি, খবর পাই, প্রতিবাদ করি, সম্পর্ক গড়ি, আবার একে অন্যকে আঘাতও করি। বিশেষ করে নারীদের ক্ষেত্রে, social media অনেক সময় মতপ্রকাশের জায়গা যেমন হয়, তেমনি ভয় দেখানোর জায়গাও হয়ে ওঠে।
অনলাইনে কাউকে চুপ করাতে এখন খুব পরিচিত কয়েকটি পদ্ধতি আছে:
অশ্লীল গালি, ধর্ষণের হুমকি, চরিত্রহনন, screenshot ছড়িয়ে দেওয়া, meme বানানো, comment box-এ coordinated attack, inbox harassment—সবই তার অংশ।
এগুলোকে “শুধু অনলাইন” বলে হালকাভাবে নেওয়ার সুযোগ নেই। কারণ এই ভাষা মানুষের মানসিক নিরাপত্তা ভাঙে, জনপরিসরে থাকার সাহস কমায়, এবং বিশেষ করে দৃশ্যমান নারীদেরকে চুপ করাতে কাজ করে।
জরিপটি কী বলছে
এই বিষয়ে জরিপ করেছিলাম। জরিপে মোট ৩২টি response ছিল। এর মধ্যে ৩১ জন অংশ নিতে সম্মতি দিয়েছেন। এই ৩১ জনের উত্তর থেকেই লেখাটির বিশ্লেষণ করা হয়েছে।
উত্তরদাতাদের বেশিরভাগই তরুণ। অনেকেই শিক্ষার্থী। এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—তাদের প্রায় সবাই social media নিয়মিত, বরং দিনে বহুবার ব্যবহার করেন। অর্থাৎ, তারা এই জগতকে দূর থেকে দেখেন না; বরং এর ভেতরেই থাকেন।
আরেকটি বিষয় স্পষ্ট: উত্তরদাতাদের বড় অংশ Facebook-কে প্রধান প্ল্যাটফর্ম হিসেবে উল্লেখ করেছেন। অর্থাৎ অন্তত এই জরিপের অভিজ্ঞতায়, যৌন সহিংসতা, অনলাইন হুমকি, এবং মব আচরণের প্রধান ক্ষেত্র হিসেবে Facebook-ই সবচেয়ে বেশি সামনে এসেছে।
যৌন সহিংসতার আলোচনা এখন খুব দৃশ্যমান
জরিপে দেখা গেছে, উত্তরদাতাদের বড় অংশ social media-তে যৌন সহিংসতার ঘটনা নিয়ে আলোচনা “প্রায়ই” দেখেন। প্রায় সবাই অন্তত “মাঝে মাঝে” দেখেন।
এটা আমাদের একটা গুরুত্বপূর্ণ কথা বলে: এই বিষয়টি আর আড়ালে নেই। কোনো ঘটনা ঘটলে এখন তা দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। মানুষ আলোচনা করে। ক্ষোভ দেখায়। অনেকে বিচার দাবি করে।
এই দৃশ্যমানতা অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ। কারণ অনেক ঘটনা আগে চাপা পড়ে যেত। এখন অন্তত সেগুলো সামনে আসে।
কিন্তু সমস্যা হলো, দৃশ্যমানতা মানেই নিরাপত্তা নয়। দৃশ্যমানতা কখনও সহায়তা করে, কখনও আবার আরও বড় সামাজিক শাস্তির কারণ হয়।
ধর্ষণের হুমকি এখন “অচেনা” কিছু নয়
জরিপের আরেকটি খুব গুরুত্বপূর্ণ ফল হলো—বেশিরভাগ উত্তরদাতা বলেছেন, তারা অনলাইনে ধর্ষণের হুমকি বা যৌন অপমানসূচক ভাষা অন্তত মাঝে মাঝে দেখেছেন। অনেকেই বলেছেন, প্রায়ই দেখেন।
অর্থাৎ এগুলো rare বা ব্যতিক্রমী নয়। বরং social media-র ভাষার ভেতরেই এমন সহিংসতা অনেকটা জায়গা করে নিয়েছে।
এখানে একটা বিষয় খুব গুরুত্বপূর্ণ: ধর্ষণের হুমকি কেবল “খারাপ কথা” না। এটি ভয় দেখানোর ভাষা। এটি চুপ করানোর ভাষা। এটি বলে—“তুমি বেশি কথা বলছ”, “তোমার জায়গা এটা না”, “তোমাকে শাস্তি দেওয়া হবে”।
এমন ভাষা তাই কেবল যৌন নয়, রাজনৈতিকও। এটি ক্ষমতার ভাষা।
কারা সবচেয়ে বেশি টার্গেট হন
জরিপে সবচেয়ে বেশি উঠে এসেছে যে নারী কর্মী, অ্যাক্টিভিস্ট, বা জনপরিসরে দৃশ্যমান নারীরাই সবচেয়ে বেশি এই ধরনের আক্রমণের শিকার হন।
এটা খুব তাৎপর্যপূর্ণ। কারণ এতে বোঝা যায়, অনলাইন যৌন হুমকি স্রেফ random aggression নয়। যে নারী দৃশ্যমান, যে মত দেয়, যে প্রতিবাদ করে, যে public space-এ থাকে—তাকে টার্গেট করার সম্ভাবনা বেশি।
অর্থাৎ শরীরকে লক্ষ্য করে আসা এই ভাষা আসলে কণ্ঠকে আঘাত করে। শুধু একজন নারীকে না, তার উপস্থিতিকেই প্রশ্নবিদ্ধ করে।
অনেক সময় এই আক্রমণের ভাষা এমন হয় যেন নারীর public presence-টাই অপরাধ।
কোনো ঘটনা ভাইরাল হলে কী হয়?
এখানে জরিপটি একটি খুব বাস্তব ছবি দেখায়।
কিছু মানুষ বলেছেন, social media-তে কোনো যৌন সহিংসতার ঘটনা ভাইরাল হলে ব্যাপক ক্ষোভ তৈরি হয়। প্রতিবাদ হয়। অনেকে কঠোর শাস্তি চান। কেউ কেউ সচেতনতা বাড়ান।
কিন্তু একই সঙ্গে আরেকটি জিনিসও খুব জোরে এসেছে: victim-blaming।
অর্থাৎ, ঘটনা সামনে আসার পর মানুষ প্রশ্ন তোলে—
সে কেন সেখানে গিয়েছিল?
সে কী পোশাক পরেছিল?
সে আগে কী লিখেছিল?
তার ব্যক্তিগত জীবন কেমন?
সে কি attention চাইছে?
এর সঙ্গে যোগ হয় meme, ব্যঙ্গ, নৈতিক পুলিশিং, আর public shaming।
এখানেই social media-র দ্বৈত চরিত্র বোঝা যায়। এটি একই সঙ্গে প্রতিবাদের জায়গা, আবার অপমানেরও জায়গা। একই সঙ্গে সংহতির ক্ষেত্র, আবার মব শাস্তির ক্ষেত্রও।
social media ক্ষোভ বাড়ায়, কিন্তু বিচার কি আনে?
জরিপে উত্তরদাতাদের বড় অংশ মনে করেন social media জনরোষ বাড়ায়। এই কথা ঠিকও। কোনো ঘটনা দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে, মানুষ একত্রে কথা বলে, pressure তৈরি হয়।
কিন্তু যখন প্রশ্ন করা হয়েছে—এই online discussion কি ভুক্তভোগীর বিচার পাওয়ার ক্ষেত্রে সত্যিই সহায়ক? তখন সবচেয়ে বেশি উত্তর এসেছে: “কখনো কখনো”।
এই “কখনো কখনো” শব্দটি খুব গুরুত্বপূর্ণ।
এটি দেখায়, মানুষ social media-কে পুরোপুরি বিশ্বাস করে না। তারা জানে, অনেক সময় অনলাইন ক্ষোভ তৈরি হয়, কিন্তু কিছুদিন পর তা থেমেও যায়। আরেকটা নতুন ঘটনা আসে, attention সরে যায়। বিচার প্রক্রিয়া থাকে অনিশ্চিত।
অর্থাৎ viral হওয়া আর বিচার হওয়া এক জিনিস নয়।
অনেক সময় social media শুধু ঘটনার শব্দ বাড়ায়, কিন্তু ফল দেয় না। আবার অনেক সময় visibility ভুক্তভোগীর ওপর চাপই বাড়িয়ে দেয়।
সহিংস ভাষা বারবার দেখলে তা স্বাভাবিক লাগে
জরিপের সবচেয়ে গভীর দিকগুলোর একটি হলো—অধিকাংশ উত্তরদাতা মনে করেন, অনলাইনে বারবার সহিংস ভাষা দেখলে তা একসময় স্বাভাবিক মনে হতে শুরু করে।
এখানে আমরা বড় বিপদের মুখোমুখি হই।
কোনো কিছু প্রথমবার দেখলে মানুষ চমকে ওঠে। কিন্তু যখন সেটি প্রতিদিন দেখতে থাকে, তখন ধীরে ধীরে চমক কমে যায়। গালিগালাজ, ধর্ষণের হুমকি, নারীবিদ্বেষী কৌতুক—সবকিছু “normal internet behaviour” বলে মনে হতে শুরু করে।
এটাই স্বাভাবিকীকরণ।
এই প্রক্রিয়াটি খুবই বিপজ্জনক। কারণ তখন সহিংস ভাষা কেবল কয়েকজন মানুষ ব্যবহার করছে না; পুরো জনপরিসরের নৈতিক মানদণ্ড নষ্ট হতে থাকে। মানুষ আর প্রশ্নই তোলে না—এটা এত স্বাভাবিক হয়ে যায়।
সবাই সমস্যা দেখে, কিন্তু রাষ্ট্রকে ভরসা করে না
জরিপে প্রায় সবাই এই সমস্যাকে গুরুতর বলেছেন। অর্থাৎ অনলাইন ধর্ষণের হুমকি, যৌন অপমান, এবং সহিংস ভাষাকে মানুষ ছোট করে দেখছেন না।
কিন্তু একই সঙ্গে বড় অংশ মনে করেন, আইন প্রয়োগকারী সংস্থা বা রাষ্ট্রীয় প্রতিকার কার্যকর নয়।
এই জায়গাটিই খুব গুরুত্বপূর্ণ।
যখন মানুষ মনে করে যে আনুষ্ঠানিক বিচারব্যবস্থা কাজ করছে না, তখন অনেকে social media-তেই বিচার চাইতে শুরু করে। naming and shaming, expose culture, public outrage—এসব তখন বাড়ে।
কিন্তু এই বিকল্প বিচার সবসময় ন্যায়বিচার আনে না। অনেক সময় সেটাও মব সংস্কৃতির দিকে চলে যায়। সেখানে তথ্যের বদলে আবেগ কাজ করে, ন্যায়ের বদলে প্রতিশোধ চলে আসে, আর ভুক্তভোগীও আবার আঘাত পায়।
অর্থাৎ রাষ্ট্রীয় দুর্বলতা অনেক সময় online mob justice-কে কমায় না; বরং আরও জায়গা করে দেয়।
এর পেছনে কী কাজ করছে?
Open-ended উত্তরে সবচেয়ে বেশি যে কারণটি এসেছে তা হলো—নারীবিদ্বেষ।
এর সঙ্গে এসেছে ট্রলিং সংস্কৃতি, রাগ, হতাশা, এবং রাজনৈতিক ভয় দেখানোর বিষয়।
এই উত্তরগুলো থেকে মনে হয়, অনলাইন যৌন সহিংসতাকে কেবল individual bad behaviour হিসেবে পড়লে ভুল হবে। এর পেছনে বড় সামাজিক কাঠামো আছে।
যেখানে নারীর কথা বলা অনেকের কাছে অস্বস্তিকর।
যেখানে দৃশ্যমান নারীকে শাস্তি দেওয়ার সংস্কৃতি আছে।
যেখানে comment box-ও patriarchal control-এর জায়গা হতে পারে।
যেখানে ভয় দেখানো একটি রাজনৈতিক কৌশলও হতে পারে।
অর্থাৎ patriarchy এখন শুধু ঘর, রাস্তা, বা কর্মক্ষেত্রে নেই; এটি ডিজিটালেও আছে।
social media-কে একেবারে বাতিল করা যাবে না
তবু এখানেই থামা যাবে না। কারণ জরিপের কিছু উত্তরদাতা বলেছেন—social media সচেতনতা তৈরি করে, ভুক্তভোগীদের সাহস দেয়, এবং কখনও কখনও জনচাপ তৈরি করে।
এটাও সত্য।
অনেক নারী, অনেক ভুক্তভোগী, অনেক marginal voice social media ছাড়া হয়তো কথা বলতেই পারতেন না। অনেক ঘটনা public attention-এও আসত না।
তাই social media-কে শুধু খারাপ বা শুধু ভালো—কোনোটাই বলা যাবে না।
এটি দ্বৈত।
এটি সাহায্যও করে, আবার আঘাতও করে।
এটি visibility-ও দেয়, আবার humiliation-ও তৈরি করে।
এটি solidarity-ও গড়ে, আবার spectacle-ও বানায়।
এই জটিলতাটিই বুঝতে হবে।
তাহলে আমাদের কী বোঝা উচিত?
এই জরিপের তথ্য খুব পরিষ্কারভাবে বলে: ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে যৌন সহিংসতা, অনলাইন হুমকি, এবং মব সংস্কৃতি কোনো বিচ্ছিন্ন ব্যাপার নয়। এটি এখন আমাদের ডিজিটাল জনপরিসরের ভেতরে থাকা একটি বড় সামাজিক সমস্যা।
এটি বারবার ঘটছে।
এটি gendered।
এটি দৃশ্যমান।
এটি স্বাভাবিক হয়ে যাওয়ার ঝুঁকিতে আছে।
এবং এটি এমন এক জায়গায় ঘটছে, যেখানে বিচার এখনো অনিশ্চিত।
এখানে শুধু আইন করলেই হবে না।
শুধু content delete করলেই হবে না।
শুধু reaction দিলেই হবে না।
প্রয়োজন:
আরও কার্যকর reporting ব্যবস্থা,
platform accountability,
ডিজিটাল সাক্ষরতা,
নারীবিদ্বেষী ভাষার সামাজিক অস্বীকৃতি,
এবং সবচেয়ে বড় কথা—ভুক্তভোগীকেন্দ্রিক প্রতিক্রিয়া।
শেষ কথা
ডিজিটাল যুগে সহিংসতা শুধু রাস্তায় হয় না। এটি এখন comment box-এ হয়, inbox-এ হয়, mention-এ হয়, screenshot-এর মাধ্যমে হয়, share-এর মাধ্যমে হয়, viral circulation-এর মাধ্যমে হয়।
এই সহিংসতা শরীরকে লক্ষ্য করে, কিন্তু সেখানে থেমে থাকে না। এটি কণ্ঠকে আঘাত করে। উপস্থিতিকে আঘাত করে। জনপরিসরে নারীর বৈধ অস্তিত্বকেই চ্যালেঞ্জ করে।
তাই ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে যৌন সহিংসতার বিরুদ্ধে লড়াই মানে শুধু abusive content কমানো নয়। এর মানে হলো—এমন একটি জনপরিসর দাবি করা, যেখানে দৃশ্যমানতা অপমানের ভাষায় নয়, জবাবদিহির ভাষায় রূপান্তরিত হয়।
সর্বশেষ এডিট : ০১ লা এপ্রিল, ২০২৬ বিকাল ৩:৫২

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


