চারপাশ থেকে কালো ধোঁয়া ঘিরে ধরছে। দুই চোখ প্রচণ্ড জ্বলছে । সুন্দর করে সাজানো হলরুমের প্লাস্টিক, ফোম, সিনথেটিক সবকিছু পুড়ে বাতাস ভারী হয়ে উঠেছে বিষাক্ত গ্যাসে। ঘরের অক্সিজেন প্রতি সেকেন্ডে কমে আসছে।

সবকিছু এত দ্রুত ঘটছে যে কিছুই বুঝে ওঠা যাচ্ছে না। চিন্তা করার ক্ষমতা দ্রুত লোপ পাচ্ছে। আতঙ্ক আর চিৎকারে ডুবে গেছে পুরো হলরুম। সুন্দর পোশাক পরা মানুষগুলো দিগ্বিদিক ছুটছে। পাশে বসে থাকা সন্তান থরথর করে কাঁপছে। নিজ সন্তানের “আম্মু! আম্মু!” ডাকে আপনার সম্বিত ফিরে এল। জীবনের শেষ আশাটুকু জড়ো করে সন্তানকে বুকে তুলে নিয়ে আপনি দরজার দিকে ছুটলেন। কিন্তু সন্তান ইতিমধ্যে নেতিয়ে পড়ছে। পিঠে লাগছে আগুনের হলকা। দরজার সামনে প্রচণ্ড জটলা। কোথায় যাবেন? তখনই দরজার দিক থেকে কারও চিৎকার ভেসে এল—
“কলাপসিবল গেট বন্ধ।”
আমরা প্রায়ই বলি—“মর্মান্তিক দুর্ঘটনা”।
কিন্তু সত্যিই কি সবকিছু শুধু দুর্ঘটনা?
যদি দেখা যায়, গেট বন্ধ ছিল।
সিঁড়ি আটকে রাখা হয়েছিল।
ফাটল দেখা গিয়েছিল, তবু কাজ বন্ধ হয়নি।
কারখানার ফ্লোর লক ছিল।
লাইসেন্স বা নিরাপত্তা-নিয়ম ঠিকমতো মানা হয়নি।
তবু ব্যবসা চলেছে, তবু মানুষকে ভেতরে ঢোকানো হয়েছে।
তাহলে এগুলোকে কি শুধু দুর্ঘটনা বলা যায়?
আমার কাছে না।
আমার কাছে এগুলো কাঠামোগত হত্যাকাণ্ড—অর্থাৎ এমন মৃত্যু, যা হঠাৎ আগুন, ধস, বা ডুবে যাওয়ার কারণে হয়নি শুধু; বরং বহুদিনের অবহেলা, লোভ, খারাপ নকশা, দুর্বল তদারকি, আর দায়হীনতার কারণে সম্ভব হয়েছে।
বেইলি রোড আমাদের কী শিখিয়েছে?
বেইলি রোডের আগুনে ৪৬ জন মারা যান। ২০২৬ সালে CID চার্জশিটে অভিযোগ তোলে, একটি রেস্তোরাঁর প্রধান ফটক বিল আদায়ের জন্য বন্ধ রাখা হয়েছিল, আর সিঁড়ি ও জরুরি বের হওয়ার পথ গ্যাস সিলিন্ডার ও অন্যান্য জিনিসে বাধাগ্রস্ত ছিল। রেস্তোরাঁর মালিক অবশ্য এই অভিযোগ অস্বীকার করেছেন।
এই ঘটনায় সবচেয়ে ভয়ংকর ব্যাপার শুধু আগুন নয়। ভয়ংকর ব্যাপার হলো—মানুষের বের হওয়ার পথও নিরাপদ ছিল না। অর্থাৎ মৃত্যুর কারণ শুধু শিখা নয়; শিখার আগেই তৈরি ছিল ফাঁদ। আমার ভাষায়, আগুন শুধু শেষ কাজটি করেছে।
রানা প্লাজা কেন এখনো আমাদের তাড়া করে?
রানা প্লাজায় আগের দিনই বড় ফাটল দেখা গিয়েছিল। নিচতলার দোকান ও ব্যাংক বন্ধ হয়ে যায়। কিন্তু ওপরের গার্মেন্টস কারখানাগুলোর শ্রমিকদের পরদিনও কাজে ফিরতে বলা হয়। বহু সূত্রে বলা হয়েছে, ব্যবস্থাপনার চাপ ছিল, আর শ্রমিকেরা জীবিকার ভয়েই cracked building-এ ঢুকেছিলেন। পরে ভবনটি ধসে পড়ে, আর ১,১০০-এর বেশি মানুষ মারা যান।
রানা প্লাজা আমাদের শিখিয়েছে: ফাটল শুধু কংক্রিটে পড়ে না, সমাজেও পড়ে।
যেখানে ঝুঁকি জানা থাকার পরও কাজ বন্ধ হয় না, সেখানে ধস কখনোই পুরোপুরি “হঠাৎ” নয়। সেটি আগেই তৈরি করা হয়। এটা আমার ব্যাখ্যা, কিন্তু সেই ব্যাখ্যার ভিত্তি পরিষ্কার—ফাটল ছিল, সতর্কতা ছিল, তবু শ্রমিকেরা ঢুকেছিলেন।
সেজান জুস কারখানার আগুনও কি আলাদা ছিল?
না, আলাদা ছিল না।
রূপগঞ্জের হাসেম ফুডস/সেজান জুস কারখানার আগুনে অর্ধশতাধিক শ্রমিক মারা যান। Fire Service জানায়, ভবনের বিভিন্ন অংশ লক ছিল, partition বা ভেতরের বিভাজন উদ্ধারকাজকে কঠিন করেছিল, এবং নিরাপদ বের হওয়ার পর্যাপ্ত পথ ছিল না। সংস্থাটি এটিকে factory code-এর গুরুতর লঙ্ঘন বলেছিল।
এরপর আরেকটি পরিচিত দৃশ্য দেখা গেল: মামলা হলো, গ্রেপ্তার হলো, তারপর চার্জশিটে মালিক ও তাঁর ছেলেদের নাম বাদ পড়ে গেল। তদন্তকারী পক্ষ বলল, প্রমাণ পাওয়া যায়নি। কিন্তু জনমনে প্রশ্ন থেকে গেল—এত বড় মৃত্যু হলে দায় ঠিক কোথায় গিয়ে থামে?
এই ঘটনাও দেখায়, অনেক সময় আগুনের পরে শুধু ধোঁয়াই ছড়ায় না—দায়ও ছড়িয়ে যায়।
নাসিমার গল্প আমাদের কেন মনে রাখা দরকার?
নাসিমা বেগম রানা প্লাজা ধস থেকে বেঁচে ফিরেছিলেন। তিন দিন ধ্বংসস্তূপের নিচে চাপা পড়ে থেকেও ফিরে এসেছিলেন জীবনে। কিন্তু ২০২৬ সালে দৌলতদিয়া ফেরিঘাটে পদ্মায় বাসডুবিতে তাঁর মৃত্যু হয়। সংবাদে এসেছে, তিনি আবার কাজের খোঁজে ঢাকায় ফিরছিলেন।
নাসিমার জীবনের সবচেয়ে কঠিন সত্য হলো: এক বিপর্যয় থেকে বেঁচে ফেরা মানেই নিরাপদ হয়ে যাওয়া নয়।
বাংলাদেশে অনেক দরিদ্র, শ্রমজীবী, প্রান্তিক মানুষ একবার নয়, বহুবার ঝুঁকির ভেতর দিয়ে বাঁচে। কখনো কারখানায়, কখনো ভবনে, কখনো রাস্তায়, কখনো ঘাটে। খাত বদলায়, কিন্তু নিরাপত্তাহীনতার যুক্তি একই থাকে। এই অংশটি বিশ্লেষণ, কিন্তু তা দাঁড়িয়ে আছে পুনরাবৃত্ত বিপর্যয়ের বাস্তবতার ওপর।
শুধু বাংলাদেশ নয়, আশেপাশের দেশেও একই গল্প
পাকিস্তানের করাচিতে Ali Enterprises factory fire-এর পর শুধু শোক বা মামলা হয়নি; ILO-সমর্থিত compensation arrangement হয়েছে, পরে Pakistan Accord গড়ে উঠেছে। এই Accord-এর মধ্যে আছে independent inspection, corrective action plan, worker training, public disclosure, আর complaints mechanism—অর্থাৎ শুধু “কি হয়েছে” তা দেখা নয়, “কি ঠিক করতে হবে” তাও বাধ্যতামূলকভাবে ধরা।
ভারতে Uphaar cinema fire-এর পরে আদালত liability বা দায় এবং compensation বা ক্ষতিপূরণের প্রশ্নকে বড় করে তোলে। AMRI Hospital fire-এর পরে licence cancellation, fire safety review, এবং clinical establishment-এ fire safety মানার ওপর জোর বাড়ে। কিন্তু ভারতের অভিজ্ঞতা এটাও দেখায়, নিয়ম থাকলেই হয় না; সেগুলো বাস্তবে মানাতে না পারলে tragedy আবারও ফিরে আসে।
তাহলে আসল শিক্ষা কী?
মানুষকে বাঁচায় না শুধু শোক।
মানুষকে বাঁচায় না শুধু কমিটি।
মানুষকে বাঁচায় না শুধু সংবাদ সম্মেলন।
মানুষকে বাঁচায়—
খোলা exit,
নিয়মিত safety inspection,
প্রকাশ্য audit report,
ত্রুটি ঠিক করার বাধ্যবাধকতা,
এবং ভয় ছাড়া অভিযোগ জানানোর সুযোগ।
পাকিস্তানের Accord-type model এই জায়গায় গুরুত্বপূর্ণ, কারণ সেখানে শুধু কাগজে নিরাপত্তা নয়, বাস্তব inspection আর corrective action-এর ব্যবস্থাও আছে। রানা প্লাজা, বেইলি রোড, আর সেজান জুসের মতো ঘটনার পরে বাংলাদেশেরও এই জায়গায় এগোতে হবে।
বাংলাদেশের জন্য এখন কী জরুরি?
আমার মতে, অন্তত কয়েকটি জিনিস এখন জরুরি।
সব বহুতল রেস্তোরাঁ, event venue, কারখানা, হাসপাতাল, এবং উচ্চ-ঝুঁকির ভবনের স্বাধীন safety inspection দরকার।
inspection report প্রকাশ্য করতে হবে।
locked exit, blocked stair, আর fire safety violation-কে কঠোর শাস্তিযোগ্য করতে হবে।
শ্রমিক, কর্মচারী, ব্যবহারকারী—সবাই যাতে ভয় ছাড়া অভিযোগ জানাতে পারে, সে ব্যবস্থা করতে হবে।
আর ক্ষতিপূরণকে দয়া নয়, অধিকার হিসেবে দেখতে হবে।
এগুলো মতামত, কিন্তু দক্ষিণ এশিয়ার অভিজ্ঞতা স্পষ্ট করে যে শুধু বক্তৃতা দিয়ে মৃত্যু ঠেকানো যায় না; কাঠামো বদলাতে হয়।
শেষ কথা
আমরা যদি প্রতিবার শুধু বলি “খুব দুঃখজনক”, তাহলে কিছুই বদলাবে না।
কারণ অনেক মৃত্যু দুঃখজনক হওয়ার আগেই পরিকল্পিতভাবে সম্ভব করা হয়—অবহেলা দিয়ে, লোভ দিয়ে, দুর্বল তদারকি দিয়ে, আর দায়হীনতা দিয়ে।
প্রশ্নটি এখন শুধু কতজন মারা গেলেন, তা নয়।
প্রশ্নটি হলো:
আর কতবার একই অবহেলা নতুন নতুন মৃতদেহ তৈরি করবে—তারপরও আমরা তাকে শুধু দুর্ঘটনা বলব?
সর্বশেষ এডিট : ০৩ রা এপ্রিল, ২০২৬ রাত ৮:০৭

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


