somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

চ্যাতা সুকুমার

২৯ শে জুলাই, ২০১৭ রাত ২:৪২
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

ঢাকার উত্তরের এ দিকটা আশির দশকের পর থেকে পুনঃপুনঃ উন্নয়নে মেগাসিটিতে রুপ নিয়েছে। নগর জীবন ভাল না লাগলেও বেঁচে থাকার তাড়নায় জীবিকার তাগিদে নিঃসঙ্গ এই আমি উত্তর ঢাকাকেই বেছে নিয়েছি নিজের আপাত আবাস হিসেবে।

যেখানটায় আমি থাকি সেখানে উন্নয়নের ছোয়া পুরোপুরি লাগেনি। বাড়ির ছাদে ছোট এক চিলেকোঠায় আমার নিবাস। বাড়িতে ঢোকার সড়কটাও বেশ সরু। তেতলা বাড়ির ছাদে দাঁড়িয়ে দক্ষিনে মুখ করে বাঁদিকে তাকালে দেখা যায় উঁচু উঁচু দালানের সারি আর ডানদিকে টিনশেড একতলা দোতলা বাড়ির মেলা। যে কাজ করি তা মন্দ নয়, সে তুলনায় উপার্জন নেহায়েতই চলার মত। একা মানুষ তাই এ নিয়ে আর উচ্চবাচ্য করা হয়নি কখনো। মধ্যবিত্ত মানসিকতার আমি ওই উঁচু উঁচু দালানের সভ্য লোকেদের সাথে মিশে ঠিক প্রশান্তি পাইনা যা পাই ওই টিনশেডে থাকা লোকগুলোর সাথে মিশে।

দিনের কাজ শেষ করে বাসায় ফিরে খানিকটা বিশ্রাম নিয়ে চলে যাই রাস্তার মাথায় এক টং দোকানে। সারি দেয়া ৮ টা দোকান সেখানে। বহু মানুষের আনাগোনা। কেউ কেউ বসে হো হো করে আড্ডা দিচ্ছে আবার কেউ কেউ একটা গোল্ডলীফ আর চায়ের স্বর্গীয় স্বাদ নিয়েই বিদেয় হচ্ছে আপন গন্তব্যে। আমি যার দোকানে বসি তার নাম সুকুমার। দোকানের ভেতরের দিকে বাশের এক চাতালের ব্যবস্থা করেছে সে, তার স্পেশাল কিছু খদ্দেরের জন্য। তার মধ্যে আমিও একজন। স্পেশাল দেখেই গঞ্জিকা বা বাবা সেবনের আখড়া ভাববার কোন কারন নেই, কারন সেখানে প্রবেশাধিকার কিছু উচ্চমার্গীয় চিন্তাধারার লোকেদের। যাদের সিলেক্ট করেছে সুকুমার নিজে। আমি কীভাবে সেই লোকেদের মধ্যে সুকুমারের চোখে সিলেক্ট হলাম তা আজ অব্দি এক রহস্য। হয়তবা সেই স্পেশাল ক্লাবে শ্রবণ করবার মত একজনের প্রয়োজন ছিলো, তাই আমার সিলেকশন!

স্থানীয় সবার কাছে সুকুমারের একটা বিশেষ নাম আছে। চ্যাতা সুকুমার। এককালে সুকুমার মাস্তান টাইপের ছিলো। কথায় কথায় চেতে যাওয়া ছিল তার বিশেষত্ব। র‍্যাব আসার পরে তাকে একবার ধরে নিয়ে গেল। সুকুমার ফিরলো ছমাস পরে। দেখেই বোঝা গিয়েছিল সুনামি বয়ে গিয়েছিল ওই ছ'মাস ওর উপর দিয়ে। আসার পর থেকে সুকুমার হিমালয় পর্বতের মত ঠান্ডা হয়ে গেলো, কিন্তু সে নাম তার পিছু ছাড়লোনা। সে এই দোকান দিলো। এখন সচরাচর সে আর 'চ্যাতেনা'।

আড্ডার সভ্য আমি এবং সুকুমার ছাড়াও আরো কয়েকজন আছে। যেমন ইসাহাক সাহেব (বড় বড় ধরা খাওয়া আমাদের চেয়ে বয়েসে বড় একজন ব্যবসায়ী), ইফতেখার (নারীবিদ্বেষী দার্শনিক), মকবুল আহমদ (দর্শনে মাস্টার্স করা প্রাণ কোম্পানীর সেলসম্যান), সাইফ (১৬ পারা হাফেজ সন্দেহবাদী) আর শ্রীকান্ত (কলেজে পড়ুয়া এক উড়ুটে ভাবুক প্রকৃতির যুবক)।

আড্ডায় প্রতিদিন একেকজন একেক বিষয়ে বক্তব্য দেন (আমি বাদে) আর বাকিরা আলোচনা করে। আজ যেমন সুকুমারের বক্তব্যের দিন। সব সদস্যই আজ হাজির। সুকুমার তার কর্মচারীর হাতে দোকানের দায়িত্ব তুলে দিয়ে এলো দোকানের পেছনে। নির্ধারিত আসনে বসে একটা সিগারেট ধরিয়ে তাকালো দূরে দাঁড়িয়ে থাকা ওই ভবনগুলোর দিকে। এটাই তার গল্প বা বক্তব্য শুরুর স্টাইল! সবাই আগ্রহ নিয়ে অপেক্ষা করছি তার বক্তব্যের শুরুর জন্য,

- বুঝলেন ভাইয়েরা, মাঝে মাঝে আজিব আজিব স্বপ্ন দেখি।

শ্রীকান্ত নির্লিপ্ত কন্ঠে জিজ্ঞাসা করলো 'কেমন আজিব ভাই?'

সুকুমার আধামন ধোঁয়া বাতাসে ছড়িয়ে দিয়ে শ্রীকান্তের দিকে তাকিয়ে বলল 'শোন তাহইলে। আপনারাও শুনেন।

কাইল রাত্তিরে একলা একলা ঘুমাচ্ছিলাম রুমে। আপনাদের ভাবীর সাথে কাল ঝগড়া হইছিল আরকি (ঈষৎ লজ্জার বহিঃপ্রকাশ হল তার চেহারায়)। তারে না ধইরে শুইলে আমার আবার ঘুম হয়না। কাছেও যাইতে পারতাছিনা আবার সহ্যও হইতেছেনা এরম পরিস্থিতি'

- 'তো, কাছে চলি গেলিই ত ফাইত্তেন'। দুষ্টু হাসি হেসে বললেন ইসাহাক সাহেব।

'কাছে গেলে কি আর স্বপ্নটা দেহা হইত মিয়া?' রাগত স্বরে বলল সুকুমার। 'কাছে না গিয়াই একসময় ঘুমায়ে পড়লাম। হঠাত কইরে দেখলাম আমি মইরে গেছি। আসমানে উড়তেছি। শয়ে শয়ে দেবতা চারপাশে দাড়ায় দাঁড়ায় গোল্ডলীফ খাচ্ছে আর কী কী যেন বলতিছে। একসময় আদালতের মত একজায়গায় জাইয়ে দাড়ালাম। এক শালা কম্পিউটারের মত কিছু একটা দেইখে এদিক ওদিক তাকাচ্ছে আর কিভাবে যেন মানুষগুলোর তিনটে লাইন হয়ে যাচ্ছে। দেখতে দেখতে মনে হয় আমার নাম্বার আইসে পড়ল। আমি উইড়ে যাইয়ে পড়লাম মধ্যের লাইনে। চারিদিকের কাজ কারবার দেখতেছিলাম। বামপাশে দেখলাম আমার মত বাঙ্গালিই বেশি। আরব আরব চেহারার লোকজনও খুব একটা কম না। ডানে লোক কম। সব জাতেরই লোক দেখলাম। মধ্যের লাইনে আমার মত পাবলিকের সংখ্যা ডানের চেয়ে বেশি আর বামের চেয়ে কম। চারিদিকে দেখতেছিলাম ভাল কইরে। শুনি দেবালোকে নাকি ধুন্ধুমার সম্পদের ছড়াছড়ি। দেখলাম ঘোড়ার ডিমটাও নাই। চিত্রগুপ্ত যেখানে বইসে আছে সেই তোষকের সাইডে ছেড়া। সাইড দিয়ে দেবতার চেহারার একজন হাইটে যাচ্ছিল। টাইনে ধরলাম। জিজ্ঞাসা করলাম দেবালোকের এই হাল ক্যান।

দেবতার মত চেহারার ভদ্রলোকের মুখের দিকে তাকায়ে নিজেরই কান্না আইসে পড়লো। বামের দিকে দেখায়ে কইলো, দুনিয়াতে যা দানছত্র হয় তা ওই শুয়োরের বাচ্চারাই মেরে দেয়। ব্যবস্থা করা যায় না কারন কলিকাল। তাই দেবতাদের পৃথিবিতে আসার ব্যাপারে বিধিনিষেধ আছে। সচরাচর ভিসা পাওয়া যায়না। লুকায়ে মানব বেশে দুচারজন গিয়ে অকালে প্রাণ হারাইছে। তারমধ্যে একজন নাকি বাংলাদেশে ল্যান্ড করামাত্র গাড়ির তলায়! আরেকজন নারী সাইজা দিল্লিতে ল্যান্ড করার পর বিদিকিস্তি অবস্থা।

আমি তো শুইনা থ। এই হাল দেবতাগোর?

হঠাত শুনি মাইকে আওয়াজ আসলো, "বামে যে শূওরের বাচ্চারা আছে এগুলানরে ডিরেক্ট নরকে চালান করা হোক। পথে মুতার জন্য বসতে দেয়ারও অনুমতি নাই।'

বামে তাকায়া দেখি সব হাওয়ার বেগে কানতে কানতে রওনা দিছে। একটাও খাড়ায়া নাই।

এবার আওয়াজ আসলো, 'ডাইনেরগুলা সিধা স্বর্গে। যাওয়ার সময় একটু বৃহস্পতি আর অন্যান্য সুন্দর গ্রহ নক্ষত্রাদি দেখায়া নিয়া যাওয়া হঊক।'

ডাইনে তাকায়া দেখি। ওগুলানও হাওয়ার বেগে রওনা দিছে। একটাও খাড়ায়া নাই।

আমরা মাঝখানেরগুলা অপেক্ষা করতেছি আমাদের ঘোষণা কখন আসে। সালার টাইম বইয়া যায়, চিত্রগুপ্তের নাক ডাকার আওয়াজ তীব্র থিকা তীব্রতর হয় মাগার আমাগোর কোন আওয়াজ আসেনা।

হঠাত, সব নাই হইয়া গেল। আমরা মাঝখানে যে কয়জনে ছিলাম ধীরে ধীরে উড়তে লাগলাম। গ্রহগ্রহান্তরের মাঝ দিয়া উড়তাছি তো উড়তাছি। এমন সময় কেডা যেন হাসা আরম্ভ করলো। একজন হাসে, তারে দেইখা আরেকজন হাসে, এমনে সবাই হাসতে আরম্ভ করলাম। সবাই খালি হাসি। থামেনা হাসি কারোরই।

এমন সময় ডাক শুনলাম 'ওই, এমনে হাসো ক্যান?'

ঘুম ভাইঙ্গা গ্যালো। বুঝলাম আপনার ভাবীর গলা। উইঠা বইসা দেখলাম যেখানে শুইছিলাম সেখানেই আছি। আপনাগোর ভাবী হাতে পানির গ্লাস লইয়া দাড়াইয়া আছে আর মাঝে মাঝে আমার দিকে ছিটা মারতাছে।'

মকবুল বলল, 'আর বলা লাগবনা বাকিটা আমরা বুইঝা লইছি।'

সুকুমারের চেহারায় আবার লজ্জা ফুঁটে উঠলো।

আমি প্রস্তাব করলাম 'তাহলে আজ ওঠা যাক'। সবাই প্রস্তাবে সম্মতি দিয়ে উঠে দাঁড়ালো। বের হবার সময় পিছে তাকিয়ে দেখলাম সুকুমার হাসছে। এই হাসির কারন কি স্বপ্ন না স্বপ্ন দেখে ওঠার পরের ঘটনা তা নিয়ে আর ভাববার প্রয়োজন মনে হলোনা।


বাসায় ফিরে রাতের খাবার খেয়ে বিছানায় মাথা দিলাম। চোখ বন্ধ করতেই দেখলাম আমি আর সুকুমার সহ অনেক মানুষ গ্রহান্তরের মাঝে ভাসছি। পুরোদমে হাসছি সবাই। পুরোদমে। স্বর্গ আর নরকের মাঝে আটকে গেছি সবাই। তবু হাসছি।

কেউ থামছি না!`
সর্বশেষ এডিট : ৩০ শে জুলাই, ২০১৭ রাত ১২:১৭
২টি মন্তব্য ২টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

ফিরে এসো অনুরাধা, ভেঙে দিয়ে সব বাঁধা....

লিখেছেন জুল ভার্ন, ১৪ ই আগস্ট, ২০২৬ বিকাল ৩:১৩

ফিরে এসো অনুরাধা, ভেঙে দিয়ে সব বাঁধা....

শেখ হাসিনা ডিসেম্বরে দেশে ফিরবেন- ফিরতেই পারেন। তবে প্রশ্ন হলো, কীভাবে এবং কোন উদ্দেশ্যে?

বাংলাদেশে ফিরে আসা তাঁর জন্য অসম্ভব নয়। চাইলে তিনি দেশে ফিরতে... ...বাকিটুকু পড়ুন

আমরা বাস করছি প্রচণ্ড রাজনৈতিক ভণ্ডামোর মধ্যে – হুমায়ুন আজাদ। কিছু কথা।

লিখেছেন অন্তর্জাল পরিব্রাজক, ১৪ ই আগস্ট, ২০২৬ রাত ৮:৩৮



ইংরেজিতে একটা শব্দ আছে সেটা হল plausible. যার একটা অর্থ হল “আপাতদৃষ্টিতে যুক্তিসঙ্গত”। হুমায়ুন আজাদের অনেক লেখার মধ্যে এ জিনিসটা পাওয়া যায়। এমনিতে হুমায়ুন আজাদ খুবই ভালো... ...বাকিটুকু পড়ুন

বাঁশি

লিখেছেন ঠাকুরমাহমুদ, ১৫ ই আগস্ট, ২০২৬ রাত ১২:০৪



হিম শীতল মাঘ মাসের রাত। ঘন কুয়াশার কারণে পাঁচ হাত সামনেও কিছু দেখা যায় না আর খালপাড়ের বাঁশঝাড়টা তো অনেক দূরে, বাতাস নেই তারপরও বিচিত্র কারণে বাঁশপাতার শব্দ শোনা যাচ্ছে।... ...বাকিটুকু পড়ুন

হুলো বেড়াল

লিখেছেন রূপক বিধৌত সাধু, ১৫ ই আগস্ট, ২০২৬ রাত ১:২৮


গ্রামের কাঁচা রাস্তা দিয়ে হাঁটছি। কোথাও মানুষের কোনো সাড়া-শব্দ নেই। মাঝেমধ্যে অবশ্য ঝিঁঝিঁ পোকা ডেকে যাচ্ছে। শব্দে কান ঝালাপালা। এত ঝিঁঝিঁ পোকা কোথা থেকে এলো?

দুটো জঙ্গল পেরিয়ে মূল সড়কে... ...বাকিটুকু পড়ুন

আজকের এই দিনে ১৯৭৫-এর শোকাবহ আগস্ট/ রক্তাক্ত দিবস॥

লিখেছেন ক্লোন রাফা, ১৫ ই আগস্ট, ২০২৬ রাত ২:১১



“আজ থেকে অনেকদিন পরে হয়ত কোন পিতা তার শিশুপুত্রকে বলবেন, জানো খোকা! আমাদের দেশে একজন মানুষ জন্ম নিয়েছিল যাঁর দৃঢ়তা ছিল, তেজ ছিল আর ছিল অসংখ্য দুর্বলতা। কিন্তু... ...বাকিটুকু পড়ুন

×