বাংলাদেশ একটি স্বপ্নপতাকার নাম, একটি রক্তপতাকার নাম। এই একটি দেশ, একটি পতাকার জন্য আমাদের ত্রিশ লাখ বীরযোদ্ধা তাদের মহামূল্যবান প্রান বিলিয়ে দিয়েছেন। দুই লাখ মা-বোন তাদের সম্ভ্রম হারিয়েছেন পাকিস্তানি হানাদারদের হাত থেকে বাংলাদেশকে রক্ষা করার জন্য। অসংখ্য মা তাদের প্রাণপ্রিয় সন্তানদের যুদ্ধ করতে পাঠিয়েছিলেন, দেশকে স্বাধীন করতে পাঠিয়েছিলেন। তারা মায়ের কথা রেখেছিল, শত্রুর বুলেটের সামনে দাড়িয়ে নিজের বুকের তাজা রক্ত ঢেলে দিয়ে বিশ্ব মানচিত্রে লিখেছিল একটি নাম, একটি দেশ, একটি বাংলাদেশ।
মহান সৃষ্টিকর্তার কাছে আমি শুকরিয়া জানাই আমাকে এমন একটি দেশে জন্ম নেওয়ার সৌভাগ্য দান করার জন্য।
পৃথিবীর প্রাকৃতিক সৌন্দর্যমন্ডিত যে দেশগুলো প্রথম দেখাতেই আপনার মন কেড়ে নিতে সক্ষম তার মধ্যে বাংলাদেশ প্রথম সারিতেই থাকবে বলে আমার দৃঢ় বিশ্বাস। আমি এই দেশের নাগরিক বলে নয়, বুকে হাত দিয়ে বলতে পারি আমার দেশের সৌন্দর্য বিশ্বের যেকোনো প্রান্তের যেকোনো সৌন্দর্য পিপাসুদের মনে স্নিগ্ধময় অনুভূতি জাগিয়ে তুলবে। এই পর্যটন খাতে বাংলাদেশের ব্যাপক সম্ভাবনা আছে। আমি চাইবো যেন বাংলাদেশ তার রূপবৈচিত্রকে কাজে লাগিয়ে নতুন নতুন পর্যটনকেন্দ্র তৈরি করে কিংবা বর্তমান পর্যটনকেন্দ্রগুলোকে আরও সম্প্রসারিত করে সুযোগ সুবিধা বাড়িয়ে দেশি-বিদেশি পর্যটকদের কাছে নিজেকে ভ্রমনের জন্য আদর্শ দেশ হিসেবে গড়ে তোলবে। কক্সবাজার, সুন্দরবন, রাঙ্গামাটি, নীলাচল, নীলগিরি, বগা লেক, পতেঙ্গা, হাতিয়া, নিঝুম দ্বীপ, কুয়াকাটা, ছেড়া দ্বীপ কাপ্তাই, সেন্টমার্টিন, ফয়'স লেক এইরকম আরও অনেক স্থান আছে বাংলাদেশে যা দেশের পর্যটনশিল্পকে অনায়াসেই নেতৃত্ব দিতে পারে।
অর্থনৈতিক মুক্তি না দিতে পারলে কোনো জাতিই তার স্বাধীনতার স্বাদ নিতে পারেনা। দুঃখজনক হলেও সত্যি যে এখনো দেশের অনেক সংখ্যাক লোক অর্থনৈতিক মুক্তি তো দূরে থাক, মৌলিক চাহিদাগুলোও ঠিকভাবে পূরন করতে পারেনা। আমি অর্থনীতির ছাত্র নই তাই অর্থনীতির মারপ্যাঁচ এতো বুঝিনা। তবে যেটুকু বুঝি বা জানি তা হলো ‘ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ড’ নামক অর্থনীতির এই উপাদানটি আমাদের সামগ্রিক অর্থনীতিতে ব্যাপক সম্ভাবনা নিয়ে এসেছে। আমাদের দেশের জনসংখ্যার একটা নির্দিষ্ট অংশ তাদের সর্বোচ্চ কর্মক্ষম অবস্থায় আছে। অর্থাৎ জনসংখ্যার সবচেয়ে বেশি শতাংশ এখন তরুণদের দখলে। আর এই অবস্থাটা কোনো একটি দেশ বা জাতির জীবনে একবারই আসে। আমাদের তরুণ প্রজন্ম চাইলে দেশের অর্থনীতি কোথায় গিয়ে দাড়াতে পারে আমি শুধু সেই স্বপ্ন্বেই বিভোর না থেকে তরুণদেরকে তাদের মেধা কাজে লাগানোর জন্য অনুরোধ করছি।
আইনের শাসন একটি রাষ্ট্রের জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ। দেশের সামগ্রিক আইনগত অবস্থা, আইন শৃঙ্খলা বাহিনীর সামর্থ্য, তাদের সার্ভিস, বিচার প্রক্রিয়া ও তার স্বচ্ছতা ইত্যাদি নিয়েই গড়ে উঠে আইনের শাসন। দেশের যতই উন্নতি হোক না কেন, যদি দেশের আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক না থাকে তাহলে সেটা হবে যেন মৃত লাশের উপর আইশ্যাডো দিয়ে সাজানোর মত বৃথা চেষ্টা। বৈশ্বিক সন্ত্রাস, রাজনৈতিক সন্ত্রাস, ধর্মীয় সন্ত্রাস ইত্যাদি নিয়ে আমাদের দেশের আইন শৃঙ্খলা পরিস্থিতি এখন মোটেও ভালোনা। যুদ্ধাপরাধীদের বিচার, রাজন হত্যার দ্রুত বিচার এই ক্ষেত্রে আশার কথা হলেও স্বপ্ন দেখাতে যথেষ্ট নয়। আদালতে ঝুলে থাকা লক্ষ লক্ষ অপ্রয়োজনীয় বা কম প্রয়োজনীয় মামলা গুলোকে অতি দ্রুত বিনাশ বা নিষ্পত্তির আওতায় আনতে হবে। মোবাইল কোর্ট স্থাপনের মাধ্যমে ছোট ছোট অপরাধের দ্রুত বিচার করতে হবে। আইন শৃঙ্খলা বাহিনীকে আরও শক্তিশালী করতে হবে, লোকবল বাড়াতে হবে, বিশেষ কাজের জন্য বিশেষ বাহিনী বা দায়িত্ব ভাগ করে দিতে হবে। পুলিশ বাহিনীকে সম্পূর্নরূপে ঢেলে সাজাতে হবে, মানুষের আস্থা অর্জন করতে হবে। পুলিশের মধ্যে দুর্নীতিকে কঠোর হাতে দমন করতে হবে। সাহসীদের পাশাপাশি সুশিক্ষিত ও যোগ্য লোকদের কাছে দায়িত্ব দিতে হবে।
যোগাযোগ ক্ষেত্রে বাংলাদেশ এখনো অনেক পিছিয়ে আছে এবং এই খাতে প্রচুর কাজ করার প্রয়োজন আছে। দেশের রাজধানী শহরে ঢাকার বাসিন্দাদের কাছে ‘ট্রাফিক জ্যাম’ বা ‘যানজট’ রীতিমতো আতংকের নাম। আশার কথা হচ্ছে বেশকিছু ফ্লাইওভার নির্মাণসহ আরও বেশকিছু উদ্যোগের কারনে সমস্যা অনেক কমে এসেছে। তবে তিনরাস্তা বা চৌরাস্তায় যদি ২৪/৭ ঘন্টা ‘ননস্টপ ট্রান্সমিশন সিস্টেম’ তৈরি না করা যায় তাহলে এই সমস্যা সমাধান করা খুবই দুষ্কর হয়ে যাবে। অন্যদিকে দেশের বেশকিছু মহাসড়ক ইতোমধ্যেই নতুন করে ওয়ান ওয়ে মুভমেন্ট সিস্টেমে তৈরি করা শুরু হয়েছে। আশা করছি পুরো দেশের যোগাযোগ ব্যবস্থায় উন্নতির মাধ্যমে আমাদের মূল্যবান সময়ের অপচয় রোধ হবে।
শিক্ষাকে বলা হয় জাতির মেরুদণ্ড, কেন বলা হয় তার বিশ্লেষণ করার প্রয়োজন নেই। কারন আমরা এখন তা টের পাচ্ছি খুব ভালোভাবেই। তবে আমি সুস্পষ্টভাবেই শিক্ষার স্থলে জোর দিয়ে সুশিক্ষা বলতে চাই। কারন যদি শিক্ষিত লোক যদি দুর্নীতিবাজ হয় তাহলে এমন শিক্ষার দরকার নেই। প্রতি বছরই আমাদের দেশের শিক্ষাব্যবস্থায় পরিবর্তন আসছে। আমিও বিশ্বাস করি পরিবর্তন দরকার, কেননা আমরা এখনো শিক্ষার একটা স্ট্যান্ডার্ড লেভেল তৈরি করতে পারিনি। তবে পরিবর্তন এভাবে না করে নীতি নির্ধারকরা একটু ধীরস্থির ভাবে চিন্তা ভাবনা করে একটা রোল মডেল দাড় করাক, তারপরে সেটা বাস্তবায়ন করুক। তাতে যদি ২-৩ বছর সময়ও লাগে তবুও সেটাই করা উচিত। আমি ৫ম শ্রেণির সমাপনীর ঘোর বিরোধি। কেননা এই সময়ে তাদের মানসিক বিকাশের সর্বোচ্চ সময়। তাদের থিংকিং এবেইলিটি এই সময়েই গড়ে উঠে। তাদের হেসেখেলে কাটানোর সময় এটি। পড়াশোনা নয়, নৈতিকতা শেখার সময় এটি। এই সময়ে যদি তাদের উপর একগাদা বইয়ের পাশাপাশি একটি পাবলিক পরীক্ষা ঢুকিয়ে দেই তাহলে তাদের উপর প্রচন্ড চাপ পড়ে।
অন্যদিকে ভার্সিটি লেভেল হলো ক্রিটিক্যাল মাইন্ড তৈরি করার কারখানা। আমার মাঝে আফসোস লাগে এমন দেখে যে, যে ছেলেটা ম্যানেজমেন্ট এর প্রতি প্রবলভাবে আগ্রহী ভর্তি পরীক্ষার মারপ্যাচে পড়ে তাকে হয়ত ফিন্যান্সের মত জটিল সাবজেক্ট পড়তে হচ্ছে। আবার যে ছেলেটা ফিন্যান্সে দক্ষ তাকে হয়ত ম্যানেজমেন্ট বিষয়ের বই গিলতে হচ্ছে। আমি কোনোভাবেই ভর্তি পরীক্ষার বিরুদ্ধে বলছিনা, ভর্তি পরীক্ষা ছাড়া যোগ্যদের যোগ্য স্থানে নিয়ে আসা সম্ভব না। আমি বলছি শুধু সাবজেক্ট চয়েজ এর কথা। ভার্সিটি নিশ্চিত হওয়ার পরে সাবজেক্ট চয়েজ মেধানুসারে চাপিয়ে না দিয়ে কিছুটা সময় নিয়ে হলেও সমন্বিত ভাবে কোনো ব্যবস্থা করা গেলে সেটা অবশ্যই ভালো হবে বলে বিশ্বাস আছে।
আমাদের সংস্কৃতি নিয়ে ভাববার জন্য, নিজেদের আপন সংস্কৃতি রক্ষার জন্য এখনই উপযুক্ত সময়। আমরা এখন এক প্রকার সাংস্কৃতিক দোটানায় আছি। নিজেদের সংস্কৃতিকে হাসিমুখে বরণ করেও নিচ্ছিনা আবার ছুড়ে ফেলে দিতেও পারছিনা। ভারতীয় কিংবা পাশ্চাত্য সংস্কৃতিতে নিজেদের ঠিকভাবে মানিয়ে নিতেও পারছিনা আবার সেটা ছাড়া চিন্তাও করতে পারছিনা। বিজাতীয় সংস্কৃতির কালোছায়া পড়েছে কিন্তু এখনও আমরা তা গ্রহন করিনি। এখনই যদি আমরা বর্জন না করি তাহলে সেটা আমাদের রন্ধ্রে রন্ধ্রে মিশে যাবে যা থেকে চাইলেও আমরা বেরিয়ে আসতে পারবোনা। তবে এর জন্য সবার আগে নিজেদের সংস্কৃতিকে তুলে ধরতে হবে। সবার জন্য গ্রহনযোগ্য করে রিপ্রেজেন্ট করতে হবে। তাহলেই সম্ভব হবে ভারতীয় ও পাশ্চাত্যের অশ্লীলতায় ভরা সংস্কৃতিক আগ্রাসন থেকে মুক্ত হওয়া।
আমার স্বপ্নের বাংলাদেশ থাকবে সকল ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সকল বাংলাদেশীদের জন্য নিরাপদে। সকল প্রকার ধর্মীয় গোঁড়ামি, বিদ্বেষীতা, উগ্রতা, উস্কানি, সন্ত্রাস ও রাজনীতি মুক্ত। যেখানে সকল ধর্মের, সকল বর্ণের, সকল গোত্রের মানুষ একই ছাতার তলে নিরাপদে বসবাস করে নিজের ধর্ম পালন করবে। হিন্দু-মুসলমান, বৌদ্ধ-খ্রিষ্টান কেউ কারো ধর্ম পালনে বাধা দিবেনা, বরং সকল প্রকার ধর্মীয় কুসংস্কারমুক্ত হয়ে একই সৃষ্টিকর্তার সৃষ্টি ‘মানুষ’ হিসেবে বেচে থাকবে। একজনের ধর্মচর্চা অন্যজনের ধর্ম পালনে ব্যাঘাত ঘটাবে না বরং পারস্পরিক সাহায্য-সহযোগিতামূলক সৌহার্দ্যপূর্ণ পরিবেশ গড়ে তুলবে অন্তত আমি এমন স্বপ্নই দেখি।
আমাদের দেশে এখন প্রচুর সমস্যা তারপরেও আমি প্রচন্ডভাবে আশাবাদী। আমি স্বপ্ন দেখি এই কারনে না যে, মানুষ তার স্বপ্নের সমান বড়। বরং আমি দেশকে নিয়ে স্বপ্ন দেখি কারন এই দেশের স্বপ্ন ছিল বলেই একদিন বিশ্বের অন্যতম প্রশিক্ষিত সেনাবাহিনীকে আমাদের দেশের কৃষক-শ্রমিকেরা তাদের লাঠিসোঁটা দিয়েই পরাজিত করেছিল। আমি স্বপ্ন দেখি আমাদের দেশে একদিন এতো সমস্যা থাকবেনা। সেদিন হয়ত আমাদের কিবোর্ডে স্বপ্নের বাংলাদেশ থাকবে না। কেননা সেদিন আমাদের চোখের সামনেই ভাসবে সোনার বাংলাদেশ, আমার স্বপ্নের বাংলাদেশ।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।

